বুধবার, মার্চ ২০

সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় (১৯২৯-২০১৮), আজীবন ছিলেন সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে

প্রসেনজিৎ বসু

লোকসভার প্রাক্তন স্পিকার সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় আজ সকালে চলে গেলেন। সাধারণ মানুষ থেকে রাজনৈতিক নেতা-নেত্রী, দলমত নির্বিশেষে সকলেই তাঁর প্রয়াণে শোকাহত। কমরেড সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের পাঁচ দশকের সুদীর্ঘ এবং তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক জীবন অনেকের জন্যই দৃষ্টান্তমূলক।

আজ থেকে প্রায় নব্বই বছর আগে একটি রাজনৈতিক পরিবারেই সোমনাথবাবুর জন্ম। তাঁর বাবা ব্যারিস্টার নির্মলন্দ্র চট্টোপাধ্যায় স্বাধীনতার আগে হিন্দু মহাসভার অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। ১৯৪৮ সালে কেন্দ্রের নেহেরু সরকার কমিউনিস্ট পার্টিকে নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করলে, মতাদর্শগত পার্থক্য সত্ত্বেও তিনি কমিউনিস্ট নেতাদের মুক্তির দাবিতে সরব হন। হিন্দু মহাসভার সর্বভারতীয় সভাপতি হওয়া সত্ত্বেও গান্ধী হত্যার পরে হিন্দু-সাম্প্রদায়িক রাজনীতির প্রতি ওঁর গভীর সংশয় জন্মেছিল। ১৯৫২ সালে প্রথম বার হিন্দু মহাসভার প্রার্থী হিসেবে লোকসভা সাংসদ নির্বাচিত হলেও, পরবর্তী কালে ১৯৬৩ সালের উপনির্বাচনে নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় কমিউনিস্ট পার্টির সমর্থনে বর্ধমান কেন্দ্র থেকে সাংসদ নির্বাচিত হন এবং ১৯৭১ সাল অবধি ওই কেন্দ্র থেকেই সাংসদ ছিলেন।

সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় তাঁর বাবার পদাঙ্ক অনুসরণ করে বিলেতে গিয়ে ব্যারিস্টার হয়েছিলেন ঠিকই, কিন্তু রাজনীতিতে তিনি যোগ দিয়েছিলেন সিপিআই(এম)-এর সদস্য হিসেবেই। নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের মৃত্যুর পর বর্ধমান কেন্দ্র থেকেই ১৯৭১-এর লোকসভা নির্বাচনে সিপিআই(এম)-এর প্রার্থী হিসেবে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় প্রথম বার সাংসদ নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই ইতিহাস আজকে পশ্চিমবাংলার রাজনীতির ক্ষেত্রে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক, কারণ নির্মলচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় থেকে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের যে রাজনৈতিক বিবর্তন, সেটা ওই সময়ের একটি গোটা প্রজন্মের রাজনৈতিক গতিপথকে প্রতিফলিত করে। দেশভাগ, ওপার বাংলা থেকে আসা লক্ষ লক্ষ রিফিউজিদের মরণ-বাঁচন লড়াই, লাল ঝান্ডার নেতৃত্বে কৃষকদের জমি আন্দোলন, খাদ্য আন্দোলন—স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে অগ্নিগর্ভ বাংলার রাজনীতিতে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় ইতিহাসের গতিপথ চিনে নিতে ভুল করেননি। বাবার রাজনৈতিক উত্তরাধিকার না মেনে অবস্থান নিয়েছিলেন গণ-আন্দোলনের পক্ষে, বামপন্থার পক্ষে।

সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়ের কমিউনিস্ট হওয়াটা কিন্তু নিছক নির্বাচনী স্বার্থে ছিল না, উনি মতাদর্শগত ভাবে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির তীব্র বিরোধী ছিলেন আজীবন। ছাত্রজীবনে জেএনইউ-তে বামপন্থী ছাত্র আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত থাকার সুবাদে একাধিক বার ওঁর বক্তৃতার আয়োজন করা এবং শোনার সুযোগ হয়েছিল আমার মতো আরও অনেকেরই। সাম্প্রদায়িকতাই যে ভারতের এবং বাংলার রাজনীতিতে সব চেয়ে বড় বিপদ, এই কথাটাই তিনি তরুণ প্রজন্মকে বারেবারে বোঝাতেন। নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই যে তাঁর এই মূল্যবান উপলব্ধি, সেটা ওঁর সঙ্গে ব্যক্তিগত কথোপকথনেই বোঝা যেত। সাম্প্রতিক সময়ে দেশের এবং বাংলার রাজনীতিতে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পুনরুত্থান তাঁকে শেষ জীবনে প্রবল ভাবে ব্যথিত করেছিল। বাংলায় যারা সাম্প্রদায়িক বিভেদের রাজনীতিকে ফিরিয়ে এনে ইতিহাসের চাকা পিছন দিকে ঘোরাতে চাইছেন, তাদের বিরুদ্ধে মতাদর্শগত-রাজনৈতিক লড়াইকে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় চিরকালই অনুপ্রাণিত করবেন।

দশ বার জেতা সাংসদ হিসেবে সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় হয়ে উঠেছিলেন সংসদীয় রাজনীতির এক জন বিশ্বস্ত স্তম্ভ। সংসদে তাঁর ভূমিকা যেমন একাধারে ছিল শ্রমজীবী মানুষের দাবি-দাওয়ার প্রতি সদা-দায়বদ্ধ, তেমনই নিজের দল সিপিআই(এম)-এর গণ্ডির বাইরে বেরিয়ে সমস্ত দলের সাংসদদের কাছেই তিনি গ্রহণযোগ্য হয়ে উঠেছিলেন। ২০০৪-এর লোকসভা নির্বাচনের পরে স্পিকার পদে তাঁর নির্বাচন ছিল এই দীর্ঘ সংসদীয় জীবনের প্রতি সকলের সম্মান-প্রদর্শন।

২০০৮-এ যখন সিপিআই(এম) এবং বামপন্থী দলগুলি ইউপিএ সরকার থেকে সমর্থন প্রত্যাহার করে, তখন সোমনাথ চট্টোপাধ্যায় সেই বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করেছিলেন। তিনি মনে করেছিলেন, যে স্পিকার হিসেবে আস্থা ভোটের আগে তাঁর পদত্যাগ করা অনুচিত হবে। এই বিষয় নিয়ে মত-পার্থক্যের জেরে পার্টির সঙ্গে তাঁর বিচ্ছেদও ঘটে। ব্যক্তিগত ভাবে পার্টির সদস্য থাকাকালীন আমিও ওঁর এই অবস্থানকে সমর্থন করি নি, এখনও করি না। কংগ্রেস দলের সাথে বামপন্থীদের সম্পর্কের বিষয়ে অথবা পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়নের প্রশ্নে ওনার অবস্থান সিপিআই(এম)-এর পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য নেতৃত্বের মতের থেকে ভিন্ন কিছুই ছিল না। উনি মনে করতেন রাজ্য নেতৃত্বের অবস্থান নয়, পার্টির কেন্দ্রীয় লাইনই পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীদের বিপর্যয়ের জন্য দায়ী। এই মতামত অনেক বামপন্থীদের কাছেই হয়তো গ্রহণযোগ্য হবে না; বিগত কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা বরং বিপরীত কার্য কারণ সম্পর্কের দিকেই ইঙ্গিত করে।

এই বিষয়ে অনেকের মতপার্থক্য থাকলেও আজীবন ধর্মনিরপেক্ষতার আদর্শে অবিচল একজন বামপন্থী নেতা এবং কৃতী সাংসদ হিসেবে প্রগতিশীল মানুষ চিরকালই সোমনাথ চট্টোপাধ্যায়কে স্মরণ করবে।

(প্রসেনজিৎ বসু .অর্থনীতিবিদ ও বামপন্থী রাজনৈতিক কর্মী)

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

 

Shares

Leave A Reply