‘আমার লেখা বইগুলোই সামগ্রিকভাবে আমি’, ভি এস নইপল (১৯৩২ – ২০১৮)

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

শমীক ঘোষ

‘মারা যাওয়ার কয়েক সপ্তাহ আগে, মিস্টার মোহন বিশ্বাস, সেন্ট জেমস, পোর্ট অব স্পেনের সিকিম স্ট্রিটের একজন সাংবাদিক তাঁর চাকরি থেকে বরখাস্ত হন।’

তাঁর চতুর্থ এবং সব থেকে বিখ্যাত উপন্যাস ‘আ হাউজ ফর মিস্টার বিশ্বাস’ এর কেন্দ্রীয় চরিত্র মোহন বিশ্বাস সম্পর্কে এইরকমই লিখেছিলেন সদ্যপ্রয়াত নোবেল জয়ী সাহিত্যিক বিদিয়াধর (বিদ্যাধর) সুরযপ্রসাদ নইপল।

না, নইপল মারা যাওয়ার আগে তাঁকে কেউ বরখাস্ত করতে পারেনি। কিন্তু গোটা বিশ্বের অনেকেই নইপলকে সাহিত্যের সর্বোচ্চ সিংহাসন থেকে বরখাস্ত করতে পারলে খুশিই হতেন।

তার কারণ অবশ্য নইপল নিজেই। ভারতীয় বংশোদ্ভূত ত্রিনিদাদে জন্মানো এই লেখক ছিলেন উপনিবেশ থেকে সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশগুলোর জীবনধারার কট্টর সমালোচক। তাঁর সেই সমালোচনা এত চাঁচাছোলা ছিল যে হয়তো কোনও শ্বেতাঙ্গ ইউরোপিয়ানও ততটা করতে পারতেন না।

আফ্রিকাকে ‘আদিম ও বর্বর’ বলেছিলেন তিনি। ভারত সম্পর্কে বলেছিলেন, ওরা পাহাড়ে মলত্যাগ করে, নদীর ধারে মলত্যাগ করে, রাস্তার ধারে মলত্যাগ করে। তাঁর বক্তব্য, ‘বিশ্বের আর কোনও দেশ একজন বিদেশী শাসকের জন্য এত বেশি তৈরি ছিল না, আর বিদেশী শাসকদের মধ্যেও ব্রিটিশদের থেকে বেশি যোগ্য কেউ ছিল না। ভারতকে দমন করতে করতে ব্রিটিশরা তাঁদের সামনে এক ইংল্যান্ডকে তুলে ধরেছিল। আর তাই ভারতীয়রা প্রথম দিকে এমন এক জাতীয়তাবাদ গড়ে তুলতে বাধ্য হয়েছিল যা হচ্ছে ইংল্যান্ডের নকল। যে দেশে তিনি জন্মেছিলেন, সেই ত্রিনিদাদ ও টোব্যাগো সম্পর্কে তাঁর মন্তব্য, আমি ওখানে ভুল করে জন্মেছিলাম।

আফ্রিকান লেখক চিনুয়া আচেবে লিখেছিলেন, নইপল আসলে উপনিবেশ সম্পর্কে শ্বেতাঙ্গদের কাছে আরামদায়ক অতিমিথ্যাগুলোকেই পুনরুদ্ধার করেন।

ক্যারিবিয়ান কবি ডেরেক ওয়ালকট নইপলকে ব্যঙ্গ করে একটা কবিতায় তাঁকে ‘ভি এস নাইটফল’ বলে অভিহিত করেন। ইংরাজি নাইটফল শব্দটার কাছাকাছি বাংলা ‘শীঘ্রপতন।’

আবার কালো বলে নইপলকে শ্বেতাঙ্গ লেখকদের থেকেও অনেক বক্রোক্তি সহ্য করতে হয়েছিল।

১৯৩২ সালে ১৭ অগস্ট ত্রিনিদাদ ও টোব্যাগোর চাগুনাসে জন্মান নইপল। তাঁর ঠাকুর্দা সেখানকার আখের খেতে দাস হিসেবে কাজ করতে এসেছিলেন ১৮৮০ সাল নাগাদ। তাঁর বাবা সীপরসাদ ছিলেন ত্রিনিদাদের একটি খবরের কাগজের সাংবাদিক। নেহাতই ভাগ্যক্রমে তাঁর স্কুলে যাওয়ার সুযোগ ঘটে। কারণ সীপরসাদের দাদাকেও তাঁর পরিবার সামান্য মজুরিতে আখের খেতে পাঠিয়েছিল আর সীপরসাদের ছোট বোন ছিল পুরোপুরি নিরক্ষর।

প্রবল দরিদ্র পরিবারে জন্মানো নইপল কিন্তু সমাজতন্ত্র বা বামপন্থার দিকে কখনও আকৃষ্ট হননি। বরং প্রথম থেকেই তিনি ছিলেন দক্ষিণপন্থী। ১৮ বছর বয়সে স্কলারশিপ পেয়ে তিনি পড়তে যান অক্সফোর্ডে।

প্রায় দু’বছর তিনি বিবিসির ক্যারিবিয়ান সার্ভিসে সাহিত্য নিয়ে একটা অনুষ্ঠান উপাস্থাপনা করতেন। নইপল একবার বলেছিলেন, তিনি মিনিটে ১৩০টা শব্দ বলতে পারেন। রেডিওতে কাজ করার সূত্রে তিনি এটা নিশ্চিত ভাবে জানেন।

১৯৭১ সালে ‘ইন আ ফ্রি স্টেট’ এর জন্য বুকার প্রাইজ পান নইপল। তাকে নাইটহুডও দেওয়া হয়। ২০০১ সালে সাহিত্য নোবেল প্রাইজ পান তিনি।

ইংরাজিভাষার লেখক জোসেফ কনরাডের (১৮৫৭-১৯৩৪) উত্তরসূরি বলে মনে করা হত তাঁকে। নইপল অবশ্য নিজে বলেছিলেন, কনরাডকে তিনি বড় লেখক মনে করেন। কিন্তু তাঁর ওপর কনরাডের কোনও প্রভাব নেই। তিনি আরও জানিয়েছিলেন, তিনি নিজে মনে করেন যে তাঁর ‘আ বেন্ড ইন দ্য রিভার’ উপন্যাসটা কনরাডের থেকে অনেক বেশি ভালো।চ

সমালোচকদের অনেকের মতে, নইপলের লেখায় কখনই উপনিবেশের সপক্ষে যুক্তি ছিল না। বরং তিনি অকুণ্ঠভাবে ঔপনিবেশিক প্রভুদের অজ্ঞতা এবং নিজেদের স্বমহিমান্বিত করার প্রচেষ্টাকে ব্যঙ্গই করেছেন। একই সঙ্গে উপনিবেশের স্বাধীনতাকামী আন্দোলনগুলো সম্পর্কেও তিনি ছিলেন একই রকম নির্মোহ। উপনিবেশের সমাজ ও জীবনযাপনের ছবি নইপলকে ক্রুদ্ধ করত। সেই কারণেই তাঁর লেখা শ্লেষবিদ্ধ করত তাদের।

একজন প্রকৃত লেখকের মতোই ব্যক্তিজীবন আর তার ছোটবড় প্রাপ্তিগুলোকেই লেখার বিষয় করতে চাইতেন নইপল। বিশ্ব সাহিত্য তাঁকে মনে রাখবে তাঁর নির্মোহ এবং অসাধারণ পর্যবেক্ষণের জন্য।

বাইরে থেকে কেঠো, কটূভাষী নইপলের ভেতরে লুকিয়ে ছিল একজন অসাধারণ সংবেদনশীল মানুষ।

নইপলের লেখা আসলে জীবন ও সমাজ সম্পর্কে এক প্রবল রোমান্টিক বোধ থেকে সঞ্জাত। একই সঙ্গে তা হল সেই রোমান্টিকতা ও বাস্তবের দ্বন্দ্বের ফসল।

তাঁর নোবেল ভাষণে নইপল বলেছিলেন, আমি আগে একবার বলেছিলাম যে আমার লেখা বইগুলো ছাড়া আমার আর কোনও মূল্য নেই। এখন আরও একধাপ এগিয়ে আমি বলছি, আমার লেখা বইগুলোই সামগ্রিকভাবে আমি।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More