বৃহস্পতিবার, জুন ২০

দেবতারা কি গ্রহান্তরের মানুষ,কী বলেছিলেন দানিকেন?

রূপাঞ্জন গোস্বামী

হে প্রাচীন হে প্রবীণ
হে আদিম মহাকাশ
লুকিয়ে রেখেছো ভুলে যাওয়া ইতিহাস
স্মৃতিতে তবু কার প্রতিধ্বনি শুনতে পাই
প্রবাসী আকাশি
সেকি কোনো ….দেবতাই

বাঙালি  রকস্টার  রূপম ইসলাম তাঁর সুপারহিট ভিডিও  অ্যালবামে, তাঁর জন্মেরও আগে পৃথিবীতে সাইক্লোন তোলা  এক মানুষ ও তাঁর তত্বকে সম্মান জানিয়ে বাঙালির দরবারে নতুন করে হাজির  করেছেন। লেখার শুরুতে রুপমের গানের লাইনগুলি বুঝি সেই মানুষটির বিশ্বকাঁপানো  তত্বেরই নির্যাস।

১৯৭০-এর দশকে কলকাতা আর শহরতলি- মফস্বলের পাড়ার রোয়াক, চায়ের দোকান, সেলুন থেকে মা কাকিমাদের দ্বিপ্রাহরিক আড্ডাতে, উত্তম সৌমিত্র , মোহন-ইস্ট , সিদ্ধার্থ-জ্যোতি ,ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশ, নকশাল-রুনু গুহনিয়োগী  নিয়ে  ফাটাফাটি আলোচনাকে ডজ করে সেই মানুষটির  অনুপ্রবেশ ছিলো অবধারিত। পাড়ার  লাইব্রেরিগুলোয় জেমস্ হ্যাডলি চেজ, নিক কার্টারদের যৌনগন্ধী  বইগুলির থেকেও পপুলার ছিল এই মানুষটির  বই। যিনি বাঙালি না হয়েও কিশোর কুমারের রবীন্দ্রসঙ্গীতের মতো বাঙালীর ঘরে ঘরে পৌঁছে গেছিলেন l তিনি হলেন, সুইস যুক্তিবাদী প্রাবন্ধিক ও গবেষক ও  লেখক এরিক ভন দানিকেন। যাঁকে আজ বাঙালি ভুলে গেছে। আশাপূর্ণা দেবী , তারাশংকর, মানিক ব্যানার্জী,  আশুতোষ মুখোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব গুহ, নিমাই ভট্টাচার্যের, মুজতবার আলির  পাশা পাশি এই ভিনদেশি লেখকটি কোন জাদুর স্পর্শে সেই সময়ের বাঙালির মা-কাকিমাদের  আপন হয়ে উঠেছিলেন তা  ভেবে কুল পাইনা না। প্রাবন্ধিক দানিকেনের  যাবতীয় গবেষণার মূল  বিষয়ই ছিল পৃথিবী আর অন্যগ্রহগুলির মধ্যে অনাবিস্কৃত অথচ কল্পিত  যোগাযোগগুলি সম্পর্কিত কিছু তথ্য ও তত্ব । যা সত্য-কল্পনা-বাস্তবের এক চমকপ্রদ মিশেল।

ভিনগ্রহের দেবতা আর এ গ্রহের মানুষ (শিল্পীর কল্পনায়)

এরিক ভন দানিকেন বলেছিলেন – ‘দেবতা বলে আমরা  এক শ্রেণীর কাল্পনিক অশরীরী  মনুষ্য আকৃতির জীবের  নাম শুনে থাকি, তাঁরা সকলেই অস্তিত্ববিহীন বা কাল্পনিক জীব নন। বহু দেবতা বাস্তবে যে ছিলেন  তার  প্রমাণ পাওয়া যায়  গ্রীস, মিশর, ব্যাবিলন ও ভারতের মহাকাব্য পুরাণ ও বেদসমূহে। এই সব পুঁথির নথি ঘেঁটে দেখা যায়,দেবতারা সবাই স্বর্গের অধিবাসী। তাঁরা  স্বৰ্গ থেকে পৃথিবীতে নিয়মিত আসা যাওয়া করতেন। এই দেবতারা আসলে  ছিলেন মহাকাশের কোনও  অজানা গ্রহবাসী সুসভ্য মানুষ। জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্পকলা এবং সাংস্কৃতিক জীবনে তাঁরা ছিলেন পৃথিবীবাসী মানুষের চেয়ে বহুগুণে উন্নত। মানুষ  আজ মহাকাশযান তৈরী করে মহাকাশযাত্রা শুরু করেছে,প্রস্তুতি নিচ্ছে   গ্রহ থেকে গ্রহান্তরে যাবার জন্য। কিন্তু ভিনগ্রহের দেবতারা এপথে  নেমেছিলেন  হাজার হাজার বছর আগে ।তাঁরাই আবিষ্কার করেছিলেন আমাদের এই পৃথিবী নামক গ্রহটিকে।

এগুলি কাদের আঁকা আজও জানতে পারেনি পৃথিবী

তাঁদের  মহাকাশযান অবতরণ করেছিল ভূপৃষ্ঠে। ভিনগ্রহবাসী দেবতারা  বসবাসও করেছিলেন কিছুদিন। কোনও কোনও দেশে, কোনও এক যুগে। সে যুগের মানুষ  তাঁদের অবয়ব, শৌর্য-বীর্য ও জ্ঞান-গরিমা দেখে বিস্ময়ে অভিভূত হয়েছিলো। সেদিনের মানুষের কাছে  তাঁরা পেয়েছিলেন ভক্তি, অর্ঘ্য, নৈবেদ্য এবং দেব, প্রভু, ঈশ্বর ইত্যাদি আখ্যা। যেভাবে  কলম্বাস পেয়েছিলেন আমেরিকার আদিম অধিবাসীদের কাছ থেকে। দেবতারা রথে (বিমানে) চড়ে  যাতায়াত করতেন স্বর্গে ও মর্ত্যে। অর্থাৎ তাঁদের নিজস্ব  বিমানযোগে পৃথিবী ও মহাকাশে, তাঁদের নিজ নিজ গ্রহে। ভিনগ্রহের  এই অভিযাত্রীদল একবার অভিযান চালিয়ে স্বগৃহে ফিরে যেতেন। কোনও কোনও দল পৃথিবীতে স্থাপন করতেন উপনিবেশ। যাঁরা আস্তানা বা উপনিবেশ স্থাপন করতেন, তাঁরা মানুষের কোনো দলপতি, সমাজপতি বা রাষ্ট্রপতিকে বশবর্তী করে তাঁর মারফত স্বমত প্রচার করতেন,মানুষের কল্যাণ কামনায়।তাঁরা তাঁদের একান্ত ভক্তদের  অস্ত্ৰ ,বর (আশীৰ্বাদ), রথ (বিমান) দান করতেন। আবার অবাধ্য ব্যক্তিদের অভিশাপ দিতেন। প্রয়োজন হলে যুদ্ধও করতেন।

এখানে কি কোনও ভিনগ্রহের যান নেমেছিল?

দানিকেনের বক্তব্য, পৃথিবীজুড়ে বিভিন্ন ধর্মের সঙ্গে যুক্তিবাদীদের  ধুন্ধুমার বাকযুদ্ধ লাগিয়ে দিয়েছিলো। ভারতীয় যুক্তিবাদীদের আঁতুড়ঘর বাংলাও বাদ পড়েনি।  ভিন গ্রহের প্রাণী বা এলিয়েনরাই দেবতা কিনা সেটা নিয়ে দীর্ঘ দিন লড়েগেছে বাঙালি, কফি হাউস থেকে বারদুয়ারী কিংবা গড়ের মাঠ থেকে পাড়ার মাচায়। বাংলা সাহিত্যেও সেই সময় জম্পেশ  একটা এলিয়েন-হাওয়া উঠেছিলো।  সত্যজিৎ রায়, নারায়ণ সান্যাল  অদ্রীশ বর্ধনের মতো কল্পবিজ্ঞানের লেখক থেকে শুরু করে  সৈয়দ মুজতবা সিরাজ, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়,  শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের মত সাহিত্যিকদের কলমেও উঠে এসেছিল কল্পিত  এলিয়েনের দল।

পৃথিবীর বুকে এ কাদের আঁকা ছবি (স্যাটেলাইট ক্যামেরায় তোলা)

এরিক ভন দানিকেনকে বাঙালির ঘরে ঢুকিয়ে দিয়েছিলেন অনুবাদক  অজিত দত্ত।  অজিত দত্তের সহজ সরল অনুবাদে ভর করে এরিক ভন দানিকেনের তত্ত্ব,বাঙালিদের  মধ্যে  অল্পদিনেই আকাশছোঁয়া  জনপ্রিয়তা লাভ করে। দানিকেনের জনপ্রিয় বইগুলির মধ্যে “দেবতা কি গ্রহান্তরের মানুষ“, বীজ ও মহাবিশ্ব“,”নক্ষত্রলোকে প্রত্যাবর্তন“, “দেবতার গোধূলিবেলা”,”আবির্ভাব“,” “আমার পৃথিবী“,  “প্রমাণ“,   “দেবতার চাতুর্য” বইগুলি উল্লেখযোগ্য।দানিকেনের  বই, যত দ্রুত বাংলায় অনুদিত হয়েছে, ঠিক  ততটাই  দ্রুততার সঙ্গে নিঃশেষিত হত সেই সব বইয়ের  এডিশনগুলি। দানিকেনের বিভিন্ন বই ,পৃথিবীর  ৩২ টি ভাষায় অনূদিত হয়েছে এবং পৃথিবীব্যাপী প্রায় ৬৩ মিলিয়ন কপি বিক্রি হয়েছে। তাঁর বই নিয়ে দুটি বিখ্যাত সিনেমাও তৈরী হয়েছিল  :  চ্যারিয়ট্স অফ দ্য গড্স এবং  মেসেজ অফ দ্য গড্স।

দানিকেন ব্যস্ত তাঁর গবেষণায়

এরিক ভন দানিকেন তাঁর “চ্যারিয়টস অফ গডস?” বইয়ে দাবী করেছিলেন, ভারতের ঐতিহাসিক
কুতুব মিনারের পাশে অবস্থিত প্রাচীন কালের যে লৌহস্তম্ভটি রয়েছে। তা কোনো মানুষের তৈরী নয়। কারণ, এতে  জং ধরে না। দানিকেন বলছেন ,এটি ভিন গ্রহের প্রাণী বা দেবতাদের সৃষ্টি। সম্রাট অশোক, স্বর্গ মানে ভিনগ্রহতে বসে  কী ভাববেন,তা নিয়ে অবশ্য সেই সময় কোনও মাথা ব্যথা ছিল না, দানিকেন ও দানিকেনে মজে থাকা আপামর বাঙালির।

দানিকেনের এই সব তত্ত্ব অবশ্য মানতে রাজি হননি বিজ্ঞানীরা। পৃথিবীর বাইরে থেকে আসা দেবতাদের আসার এই কথা, গালগল্প বলে উড়িয়ে দিয়ে বইও লেখা হয়েছে অনেক।

কিন্তু তাঁর জনপ্রিয়তার ধারে কাছেও দাঁড়াতে পারেনি সে সব বই। বিশেষজ্ঞদের হিসেব অনুযায়ী, দানিকেনের বই গোটা বিশ্বজুড়ে বিক্রি হয়েছে প্রায় ৬ কোটি ৩০ লক্ষ কপি।

আর দানিকেন নিজে? কিছুদিন আগেই এক ডকুমেন্টারিতে তিনি বলেছেন, আসলে মানুষের তৈরি করা বিজ্ঞান এখনও তাঁর তত্ত্ব বোঝার মতো জায়গাতেই পৌঁছায়নি। তাঁর মতে, ব্রহ্মাণ্ডের সত্যিটাকে বিশ্বাস করার জন্য মানবসভ্যতাকে আগে প্রস্তুত হতে হবে।

Leave A Reply