মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ১১

চেনা মানুষদের কথা পৌরাণিক চরিত্রের আদলে

মহাশয় শুনঃশেপ, চিরঞ্জয় চক্রবর্তী, প্রণতি পাবলিশিং হাউস,  ৭০টাকা

বিশ্বজিৎ পাণ্ডা

চিরঞ্জয় চক্রবর্তী একেবারে নিজের মতো করে লেখেন। তাঁর প্রথা-ভাঙা গল্প-উপন্যাসগুলিতে বিশেষভাবে চোখে পড়ে নিজস্বতার ছাপ। সম্প্রতি প্রকাশিত হল তাঁর একটি নতুন উপন্যাস ‘মহাশয় শুনঃশেপ’। অদ্ভুত এই নাম। উপন্যাসটিও অদ্ভুত। এর আখ্যান শৈলীও অদ্ভুত। অভিনব। শুনঃশেপ শব্দটি যদিও লেখকের তৈরি নয়। পৌরাণিক চরিত্র। ঋষি তিনি। তাঁর কথাই বিধৃত এই আখ্যানে। শুধু মহাশয় শুনঃশেপ নয়, অজীগর্ত, রাজা হরিশ্চন্দ্র ও তাঁর পুত্র রোহিত— এরাও পৌরাণিক চরিত্র। উপন্যাসের সবকটি প্রধান চরিত্র পৌরাণিক। কিন্তু লেখক কোনও পৌরাণিক আখ্যান রচনা করেননি। তিনি আমাদের চেনা আধুনিক সমাজের কথাই বলেছেন। আমার আপনার সবার চেনা মানুষজনের কথা। আর তা বলার জন্য পৌরাণিক আখ্যানকে বিকৃতও করেননি। পুরাণ থেকে সরেও আসেননি। উপস্থাপনের ভঙ্গিতে মনে হবে হরিশ্চন্দ্র বা অজীগর্ত এই সময়ের, এই সমাজেরই মানুষ। শুধু নামগুলোই পৌরাণিক। চিরঞ্জয় এই আখ্যানে যেন প্রমাণ করেছেন পুরাণের স্বার্থপর, সুবিধেবাদী, কৌশলী… মানুষগুলো আজও একই রকমভাবে রয়েছে। নামগুলো বদলে গেছে তাদের। লেখকের স্বাতন্ত্র্য এখানেই।

গ্রন্থপরিচিতি অংশে বলা হয়েছে—“জীবন আদতে আলোর দিকেই প্রধাবিত। আলোই তো দিশা। কখনও দীপ্র, প্রখর—মায়াবি মেদুর কোথাও বা মহিমার অনির্বান দীপ। চলিত জীবনের বাইরে যে জীবন আছে—জীবনখনিজে মণিময়—মহাশয় শুনঃশেপ তার মার্গদর্শী। মার্গ-প্রদর্শকও বটে।” আখ্যানে তিনি যে সুনির্দিষ্ট কোনও পথের দিশা দেখিয়েছেন তা নয়। শুধু আমাদের চারপাশের বাস্তবতাটা তুলে ধরেছেন। তিনি নিজে দেখতে দেখতে গেছেন। আর পাঠকও তাঁর সঙ্গী হয়েছে। সেই দর্শন-অভিজ্ঞতাই প্রকৃত পক্ষে জীবনের দিশা। মনে রাখতে হবে মহাশয় শুনঃশেপের পৌরাণিক পরিচয় আমরা জানতে পারি আখ্যানের শেষে এসে। অজীগর্তের কথা লেখক প্রথম থেকে বললেও তাঁর যে মধ্যম পুত্র মহাশয় শুনঃপেশ তা একবারও বলেননি। আর যেহেতু এই পৌরাণিক চরিত্রটি তত পরিচিত নয়, তাই তার পৌরাণিক পরিচয় সম্পর্কে আমরা সচেতনও নই। রাজা হরিশ্চন্দ্র পরিচিত চরিত্র। প্রথমাবধি হরিশ্চন্দ্রের আখ্যান পুরাণের অনুসরণেই এসেছে। যদিও তার ব্যবহারে আমরা আধুনিক মানুষের বৈশিষ্ট্যই দেখেছি।

বিভিন্ন পৌরাণিক গ্রন্থে শুনঃশেপের উল্লেখ আছে। ঐতরেয় ব্রাহ্মণে বলা হয়েছে— ইক্ষ্বাকুবংশীয় রাজা হরিশ্চন্দ্র নিঃসন্তান হওয়ায় পণ করেন সন্তানলাভ করলে বরুণদেবের কাছে উৎসর্গ করবেন। হরিশ্চন্দ্র সন্তানলাভ করেন। রোহিত তার নাম। কিন্তু সন্তানস্নেহে অন্ধ হয়ে নানা অজুহাতে প্রতিজ্ঞা পালন করতে দেরি করেন। তারপর একদিন পিতা রোহিতকে উৎসর্গ করবেন ঠিক করলে রোহিত অসম্মত হন এবং ছয় বছরের জন্য বনবাসে যান। সেখানে এক ব্রাহ্মণের সঙ্গে যোগাযোগ হয়। ব্রাহ্মণ তাঁর মধ্যম সন্তান শুনঃশেপকে একশত গাভীর বিনিময়ে বিক্রি করে দেন। রোহিত তাঁর পরিবর্তে শুনঃশেপকে উৎসর্গ করতে চান। বরুণও এতে সম্মত হন। শুনঃশেপ পূজার্চনা করে নিজেকে রক্ষা করেন। আবার রামায়ণে দেখি মহর্ষি ঋচিকের মধ্যম পুত্র শুনঃশেপ। সেখানেও লক্ষ ধেনুর বিনিময়ে পিতা তাঁকে রাজা অম্বরীশের কাছে বিক্রি করেন। উদ্দেশ্য সেই একই। যজ্ঞে নরবলির জন্য রাজা শুনঃশেপকে ক্রয় করেছিলেন। বিশ্বামিত্রের পরামর্শে অগ্নি, ইন্দ্র ও বিষ্ণুর স্তব করে শুনঃশেপ মুক্তি পান এবং দেবতারা তাঁকে দীর্ঘায়ু দান করেন।

উপন্যাসে ঐতরেয় ব্রাহ্মণের অনুসরণেই এসেছে শুনঃশেপ এবং হরিশ্চন্দ্রের কাহিনি। উপন্যাসে দেখছি হরিশ্চন্দ্রের পুত্রলাভ হয়েছে বরুণদেবের আশীর্বাদে। সন্তানজন্মের পর বারবার বরুণ রাজার কাছে এসে রোহিতকে চেয়েছেন। আর হরিশ্চন্দ্র তা এড়িয়ে যাওয়ার জন্য বিভিন্ন যুক্তি দেখিয়েছেন। প্রথমে অশৌচের কথা বলে সময় চেয়েছেন। অশৌচ মুক্তির পর বরুণ এলে রোহিতের দাঁত ওঠা পর্যন্ত সময় চান, আবার দাঁত পড়া পর্যন্ত। এরপর আবার দাঁত ওঠা। আবার বলেন সন্নাহ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে। অর্থ্যাৎ ধনুর্বাণ, কবচ ধারণে সক্ষম না হলে ক্ষত্রিয় মেধ্য নয়। বরুণদেব হেসে অনুমতি দিয়েছেন।

লক্ষ করবার মতো হরিশ্চন্দ্র প্রত্যেকবারই শাস্ত্রের দোহাই দিয়েছেন। আমরা এখানে আধুনিক শাস্ত্র আইনের কথা বলতে পারি। শাস্ত্রের মতো আইনেরও অনেক মারপ্যাঁচ, নিয়ম। সেই নিয়মের ফাঁক গলে বেরোনোর সুযোগ থাকে। যেমন প্রয়োজন মতো হরিশ্চন্দ্র শাস্ত্রের নিয়মকে ব্যবহার করে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছেন। ফাঁকি দিয়েছেন বরুণকে।

আখ্যানে অজীগর্ত পাঁচশত গাভীর লোভে পুত্রকে বিক্রি করেই ক্ষান্ত হননি। শুনঃশেপকে যূপকাষ্ঠে বাঁধার লোক না পেলে একশত গাভীর বিনিময়ে পুত্রকে যূপকাষ্ঠে বাঁধেন এবং আরও একশত গাভীর লোভে তিনি খড়্গ ধরতেও প্রস্তুত হন। এরপরের কাহিনি আর উপন্যাসে নেই। তার প্রয়োজনও ছিল না। লেখক এইটুকু ঘটনার সূত্রে আমাদের সমাজের বাস্তব চেহারাটা তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছেন।

পুরাণ এবং সমসময়ের কথা লেখক বলেছেন একই সঙ্গে। একই তলে দাঁড়িয়ে। পৌরাণিক সময় আর বর্তমান সময়ের মধ্যে কোনও রকম দূরত্ব রাখেননি। শুধু সময় নয়, চরিত্র আখ্যানের মধ্যেও কোনও ব্যবধান নেই। একে অন্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে আছে। এই আশ্চর্য মিশ্রণ আখ্যানে অন্য এক স্বাদ এনেছে। একে পুরাণাশ্রিত উপন্যাস বলাও সঙ্গত হবে না। আধুনিক যাপনের কথা বলতে গিয়ে পুরাণকে তিনি ব্যবহার করেছেন মাত্র। পুরাণ এই উপন্যাস সৃষ্টির অন্যতম প্রেরণা। এর বেশি কিছু না।

উপন্যাসের শুরু হয়েছে মহাশয় শুনঃশেপের একটি শহরে প্রবেশের মধ্য দিয়ে। সেই শহরে প্রবেশ করতে হলে পরীক্ষা দিতে হয়। তাঁকেও পরীক্ষা দিয়ে পাস করে প্রবেশ করতে হয়েছে। পরীক্ষা বলতে ভাবসম্প্রসারণ লেখা— ‘সে ভাত খাইয়া বাড়ি গেল’।

শহরে প্রবেশ করে প্রথমে তিনি পরেশ দাশগুপ্তের সঙ্গে দেখা করেন। পরেশবাবু অন্যের জন্যই জীবনটা উৎসর্গ করেছেন। শ্রমিকদের আর্থিক উন্নতির জন্য সর্বদা লড়াই করেন তিনি। শ্রমিকদের সঙ্গে থাকেন। শ্রমিকদের নিয়েই তাঁর যা কিছু কাজ। এই দুনিয়ায় এরকম কেউ আছে যিনি পরহিতের জন্য বেঁচে আছেন—এমনটা শুনঃশেপ ভাবতেই পারেননি। হরিশ্চন্দ্র, রোহিত, পিতা অজীগর্তকে দেখে তার অন্য ধারণা হয়েছিল।

চিরঞ্জয় এভাবে পৌরাণিক সময়ের থেকে আধুনিক সময়কে একদিক থেকে জিতিয়ে দিয়েছেন। ভালো মানুষ, স্বার্থত্যাগী মানুষ, পরোপকারী মানুষ এই সময়েও কিছু কম নেই। এরকম ভাবনা থেকেই তো এসেছে খাবোকি এবং তার মা ললিতার মতো চরিত্র। ললিতা লোকের বাড়িতে কাজ করে। দেশভাগের সময় গণধর্ষণের শিকার হয়েছিল। তার একমাত্র পুত্র খাবোকি। ঘুম থেকে উঠেই সে প্রথমে জিজ্ঞেস করে—‘খাবো কী ?’ কোনো কাজ করে না। খায় আর ঘুমায়। হাওয়া, শব্দ, ভালোবাসা, আদর, অপমান সবই সে খেতে পারে। আর এই সব খেলে পেট ভরে যায় তার। তার দুজন বন্ধু চাঁদ আর বাতাস। শুনঃশেপের বড় ভালো লাগে এযুগের সত্যকাম খাবোকিকে। মূল্যবোধহীন সভ্যতার মাঝে মূল্যবান এক মানুষ।

পরেশবাবু শহর দেখিয়েছিলেন শুনঃশেপকে। আর খাবোকি তাঁকে দেখায় শহরের বিখ্যাত অনেক জিনিস। যেমন— জাতীয় জাদুঘরের সামনের কাঁথায় মোড়া ভিখিরি, বিভিন্ন বস্তির হাঘরে অনাথ বাচ্চাদের ইত্যাদি। এদেরই প্রকৃত মানুষ মনে করে সে। খাবোকি বলেছে তাঁকে—“এসব মানুষ ইতিহাসে থাকবে না, কেউ এঁদের কাজ বা ইছাকে মর্যাদা দেবে না। তবু এঁরা নিজের মতো করেই বেঁচে থাকবে। এঁদেরও দেখা উচিত।” ও বলে, ওর মা প্রথম দ্রষ্টব্য হওয়া উচিত। কারণ ওর মা পরিবার পরিত্যক্তা। সমাজ থেকে বিতাড়িত হওয়া সত্ত্বেও কুমারী গর্ভবতী দ্বারে দ্বারে ঘুরেছেন শুধু মাত্র বাঁচার জন্য। আগামী সন্তানের জন্য বাঁচতে হবে। পুরুষেরা ভেবেছে সহজলভ্য। সবকিছুকে উপেক্ষা করেছেন তিনি। সরকার ভাতা দেয়নি। নাম দিয়েছে—‘কুমারী মাতা’।

আমাদের পরিচিত অথচ আশ্চর্য এক জগতের কথা উঠে এল। সমাজের অন্ধকার জগত বলে যেসব জায়গাকে দেগে দেওয়া হয় খাবোকির চোখে তাই হয়ে ওঠে বিশিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ। লেখকের স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষণের স্বাক্ষর পাতায় পাতায় ছড়িয়ে রয়েছে। খাবোকির সহজ অনুভবের কথা শুনে, তার কাণ্ড দেখে মহাশয় শুনঃশেপ বিশ্বাস করেন সত্যিই এই ছেলেটা চাঁদের বন্ধু।

আখ্যান শেষ হয়েছে—অতুলপ্রসাদ সেনের একটি গান দিয়ে—

অভাবে রেখেছ সদা হরি হে
                   পাছে অলস অবশ হয়ে যাই।
আমায় দাওনি তো প্রচুর ধনরত্ন
পাছে পাপে ডুবিয়া মরে যাই…

গ্রন্থ পরিচয় অংশে যে মার্গদর্শনের কথা বলা হয়েছিল, সেই দার্শনিক প্রত্যয়ই এই গানের সারাৎসার। আর গানটি গেয়েছে খাবোকি। দারিদ্র্যের মধ্যেও অতিথি আপ্যায়নে নিবেদিত মাকে এনার্জি দেওয়ার জন্য গানটি করে সে। যে খাবোকি মহাশয় শুনঃশেপের সান্নিধ্যে এসে দিশা পেয়েছে।

প্রচলিত উপন্যাসের ছকে চিরঞ্জয় চক্রবর্তীর ‘মহাশয় শুনঃশেপ’ উপন্যাসটিকে বাঁধা যায় না। কোনও রকম চমক নেই। নাটকীয় ঘটনা নেই। তেমন কোনো সংকটও মূর্ত হয়নি কাহিনিতে। কৌতুক আছে। আছে আড্ডার সাবলীল মেজাজ। সাদামাঠা সরল ভঙ্গি। লেখক আখ্যানকে এর মাধ্যমেই অনায়াসে ইঙ্গিতময় করে তুলেছেন। প্রতিদিনের চেনা মানুষদের পটচিত্রের মতো উন্মোচিত করেছেন পাঠকের কাছে। একেবারে স্বতন্ত্র একটি ধারার আখ্যান। বিষয় এবং উপস্থাপনা সকল দিক থেকেই বাংলা উপন্যাসের আঙিনায় একটি উজ্জ্বল ও অন্যরকম সংযোজন ‘মহাশয় শুনঃশেপ’। অবশ্যই মনে রাখবার মতো।

বিশ্বজিৎ পাণ্ডা বাংলার অধ্যাপক। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ—“যৌনতা ও বাংলা সাহিত্যের পালাবদল”; “বাংলা লিট্‌ল ম্যাগাজিন”; “পথের পাঁচালীর আঁকেবাঁকে”; “আরণ্যকের আলোছায়া”; “উৎপল দত্ত”।

Shares

Leave A Reply