বৃহস্পতিবার, জুন ২৭

বাংলাদেশের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের গল্প

একটি একরোখা ছেলের মা রিফাত আফরিন। বুধবার রাতেই তার ছেলে গোঁ ধরেছিল, ‘আম্মু আমি কিন্তু সকালে মিছিলে যাব, যাবই।’ ছেলের বাবা দেশে নেই। ছয় ক্লাসে পড়া ছেলের পিছন পিছন তাকেই থাকতে হয় সর্বক্ষণ।

সাজু বিশ্বাস

‘তুই তো খুব ছোট্ট মিছিল করার জন্য! বড়ভাইদের ভিড়ের মধ্যে চ্যাপ্টা হয়ে যাবিরে বাবু…’

রিফাত ছেলেকে বোঝানোর চেষ্টা করে।

‘তুমি দেখোনি কীরকম করে ওই ছেলেমেয়েদুটোর গায়ের উপর দিয়ে গাড়ি চলে গেল! তারা সেখানেই থেতলে মারা গেল! নাহ, আমি যাবই। আমার বন্ধু ইশান, আরাফ ওরাও যাবে। আমি মিছিলে যাবই। আমি নিরাপদ সড়ক চাই।’

দুপুরের পর থেকে ঘনঘন টিভিতে দেখাচ্ছে সংবাদটা। জাবালে নূর নামক এক পরিবহনের দু’টি গাড়ি একটি আরেকটিকে ওভারটেক করার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে রাস্তার পাশে চলে আসে।

সেইখানে কলেজ ছুটির পর অপেক্ষা করছিল শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের ছাত্রছাত্রীরা। রেষারেষি করা দুটো বাসের একটা তাদের ওপর দিয়ে চলে যায়।অকুস্থলেই মারা যায় দিয়া খানম আর আব্দুল করিম নামের দু’টি ছেলেমেয়ে। আহত আরও কয়েকজন।

ঘটনার সময় সাংবাদিক বৈঠক করছিলেন পরিবহণমন্ত্রী। মংলা বন্দরের কোন কোন কাজ সময়ের মধ্যে শেষ হয়েছে তার তালিকা পেশ করছিলেন তিনি। এক তরুণ সাংবাদিক সেই সম্মেলনের মাঝখানেই পিছন থেকে প্রশ্ন ছুড়ে দেয়, ‘মাননীয় মন্ত্রী, মাননীয় মন্ত্রী, এই একটু আগেই এক ঘন্টা আগে জাবালে নূর পরিবহনের একটি বাসের ধাক্কায় মারা গেছে দু’টি ছেলেমেয়ে! আপনি জবাব দিন।’

লোকে বলে, জাবালে নূরের মালিক মন্ত্রীর খুবই পরিচিত। তিনি মোলায়েম সুরে উত্তর দিলেন, ‘এইতো পাশের দেশেই বাস খাদে পড়ে তেত্রিশজন মারা গেছে, আপনারা কি সেখানে দুর্ঘটনা নিয়ে এমন জবাব দিতে দেখেছেন?’

খাদের দুর্ঘটনা আর প্রতিযোগিতা করে লাইন ক্রস করতে গিয়ে রাস্তার উপর উঠে এসে মানুষ চাপা দিয়ে মেরে ফেলার ঘটনা এক নয়। এবার কথাটা বলেন আরেক সাংবাদিক।

মন্ত্রীর এক সঙ্গী এই প্রশ্নবাণ থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করলেন তাঁকে, ‘এটা কী সেই প্রসঙ্গের সাংবাদিক সম্মেলন! নাকি মংলা বন্দর নিয়ে?’

‘কখনও না কখনও তো আপনাকে জবাব দিতে হবে মাননীয় মন্ত্রী’ এবার চিৎকার করে ওঠেন এক মহিলা সাংবাদিক, ‘আমরা এই সম্মেলনের শেষে হলেও জবাব চাই – কেন সড়ক দুর্ঘটনা নিয়ে এমন হেলাফেলা।’

‘আমার আর যথেষ্ট সময় নেই আপনাদের জন্য।’ মন্ত্রী মহোদয় উঠে দাঁড়ালেন। প্রতিদিন কত লোক মারা যায় দুর্ঘটনায়। সবকিছুর কড়ায় গন্ডায় হিসাব জাহির করা তার কাজ নয়।

রিফাতের একদম মনে ভাল ঠেকেনি মন্ত্রীর এই ভাবে মৃত্যু নিয়ে প্রশ্ন সামনে ঠেলে সরিয়ে রেখে চলে যাওয়া। তার উপরে তাঁর হাসিহাসি মুখের অভিব্যক্তিও যন্ত্রনা দেয় তাকে। কাল যদি আমার ছেলেটাও এইরকম পথের পাশে বাস চাপায় পড়ে মারা যায়! মন্ত্রী ঠিকই হেসে হেসেই বলবেন, ‘ভাই দুর্ঘটনা তো দুর্ঘটনাই’!

রিফাত অবশ্য ছেলেকে একলা ছাড়ে না বাইরে। তার ছেলে এতটা বড় হয়নি এখনো যে বাইরে কোথাও সে একা একা ঘুরবে। কতটা বড়? কতটা বড় হলে ছেলে বাইরে নিরাপদ? রিফাতের মন টুক করে প্রশ্ন করে বসে। কতটা বড় ছেলের জন্য রাস্তা নিরাপদ!

রাজিব হোসেনের বয়স ছিল একুশ বছর।  ছেলেটি প্রানান্ত চেষ্টা করে নিজের আর ভাইয়ের লেখা পড়া চালাতো এই কংক্রিটের ঢাকা শহরে। গত ৩ এপ্রিল কলেজ থেকে বিআরটিসির একটি দোতলা বাসের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে মেসে ফিরছিল রাজিব।

প্রচন্ড ভিড়ের কারনেই হয়তো কোনওরকমে দরজায় দাঁড়িয়ে দরজার পাশের হ্যান্ডেলটি ধরেছিল রাজিব। আরেকটি বাসকে ওভারটেক করার সময় রাজীবের বাসটা চলে আসে বিআরটিসির দোতলা বাসটার একদম গায়ে। রাজিবের হাতটা দুটো বাসের মাঝে পড়ে চাপে শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে আটকে যায়।

প্রত্যক্ষদর্শি তড়িঘড়ি রাজিবকে নিয়ে হাসপাতালে ছোটে। হাতের কথা আর কারও মনে নেই। ডাক্তার বলছে, ‘হাত কই? কী জোড়া লাগাবো!’ আবার সবাই ছুটছে দুর্ঘটনার জায়গায়। রাজিবের হাতের খোঁজে।

আহারে! বেচারা রাজিব! রিফাতের বুকের মধ্যে মোচড় দিয়ে ওঠে। কঠিন ঢাকা শহরের বুকে দুই হাতে নিজের ভাইকে আগলে যুদ্ধ করা ছেলেটির একটি হাত জ্যান্ত ছিঁড়ে নিল দু’টি যন্ত্র দানব! রাজিবও আর ফিরল না।

শেষমেশ ছেলের জেদের কাছে হার মানতে হল রিফাতকে। তবে রিফাতও শর্ত জুড়ে দিল। আমিও তোমার সঙ্গে যাবো, আর তুমি কিন্তু সব সময় আমার কাছাকাছিই থাকবে। ছেলেটা মায়ের শর্তে সামনে আনন্দে দুই বার প্রবল কাঁধ ঝাঁকানি দিয়ে পড়ার টেবিলের দিকে ছুটল। ঘরের অন্য দিকে নিজের কাজে ডুবে গেল রিফাত। কিছুক্ষণ পর ছেলে এসে হাজির। স্কুলের নতুন বছরের ক্রিয়েটিভ ওয়ার্কের কম্পিটিশনের জন্য যে আর্ট পেপার আনা হয়েছিল তার উপর রঙ পেন্সিলের বড় বড় দাগ টেনে সে লিখেছে, ‘WE WANT JUSTICE’ জাস্টিস!

রিফাতের বুক নিঙড়ে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল! জাস্টিস! আমাদের দেশের বিচার পেতে গেলে কত সাগর নদীর জল কোথায় নামিয়ে নিয়ে যেতে হয়, এই বাচ্চাদের কে বোঝাবে!

পূর্ণা নামে এগারো বছরের একটি কিশোরী স্কুলের টিফিনের সময় বাড়ি গিয়েছিল খাবার খেতে। স্কুলের কাছাকাছিই তার বাড়ি। তার বাবা নেই। দু’জনের পেটের দায় মায়ের একার কাঁধে। তাঁকে সকালেই পূর্ণার দুপুরের খাবার গুছিয়ে রেখে কাজে বের হতে হয়। পূর্ণা দুপুরবেলা টিফিনের ফাঁকে এসে খেয়ে আবার স্কুলে ফেরে। ছুটি সেই বিকেল চারটায়। কিন্তু দশ মিনিটের পথে সেদিন স্কুলে আর পৌঁছানো হল না।

এগারো বছরের ছোট্ট পাহাড়ি মেয়েটির পথ আগলে দাঁড়ালো একটা ট্রাক। চারটে নখ-দন্তওয়ালা হায়েনা নেমে এল ট্রাক থেকে। মেয়েটি কিছু বুঝে ওঠার আগেই সেই শ্বাপদেরা তাকে টেনে নিয়ে গেল গভীর জঙ্গলের দিকে। পালাক্রমে মেয়েটিকে ধর্ষণ করার পরও শুরু হল আরও নির্মম অত্যাচার।  পূর্ণার হাত দুটো কেটে ফেলল তারা। এরপর তার পায়ু পথে কাঠের গুড়ি ঢুকিয়ে দিল। পূর্ণার অসহায় মা তার একমাত্র সম্বল মেয়েটিকে হারিয়ে কেমন আছে এখন কে জানে!

‘একমাত্র’ শব্দটি আবার যেন চাবুকের মত এক ঘা যেন বসিয়ে দিল রিফাতের মাথায়। তারও তো একটাই মাত্র ছেলে।

পায়েলের মা বাবারও একটাই মাত্র ছেলে ছিল পায়েল। ছেলেটি ঢাকার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে। ছুটিতে ফিরেছিল চট্টগ্রামের বাড়িতে। ফেরার সময় তার মামা তাকে তাঁর এক বন্ধুর সঙ্গে তুলে দিয়েছিল ঢাকার বাসে। হানিফ পরিবহন। অনেক পুরনো পরিবহন সার্ভিস।

রাস্তার জ্যামের ফাঁকে পায়েল বাস থেকে নেমেছিল প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে।  ফেরার সময় গাড়িতে ওঠার সময় একটা অটো ধাক্কা মেরে চলে যায় ছেলেটিকে। ড্রাইভার আর কন্ডাক্টর খুঁজতে এসেছিল পায়েলকে। অচেতন দেহটি খুঁজেও পায় তারা।

একটু বুদ্ধি খরচ করলে, ছেলেটিকে বাসে তুলে এনে কয়েক কিলোমিটারের মধ্যেই একটা হসপিটাল পাওয়া যেত। কিন্তু সেইরকম মানবিক শিক্ষা আমাদের দেশের ড্রাইভারদের কোথা থেকে হবে? তাদের তো প্রাথমিক শিক্ষাই নেই!

বদলে ড্রাইভার এবং কন্ডাকটর পায়েলের রক্তাক্ত অচেতন মাথাটি ইট দিয়ে আরও একটু থেতলে দিল, যাতে সে মরে না গিয়ে থাকলে দ্রুত মরে যায়! তারপর পায়েলের শরীরটা ঠেলে পাশের ডোবায় ফেলে দিল। এই ভয়ংকর ঘটনার কথা জানতেও পারলেন না বাসের ভিতরে থাকা যাত্রীরা।

একজন আহত যাত্রীকে ঠান্ডা মাথায় মেরে ফেলে তারা নিশ্চিন্তে বাস ছুটল গন্তব্যের দিকে।

পায়েলের সঙ্গী বন্ধুটি ঘুমিয়ে পড়েছিল। ঘুম থেকে উঠে পাশের সিটে বন্ধুকে না পেয়ে ফোন করে পায়েলে বাড়িতে জানায় সে।

পরদিন সেই রুটে খোঁজাখুঁজি করার পর রাস্তার পাশের ডোবা থেকে পায়েলের মৃতদেহটি উদ্ধার করে পুলিশ। আহারে জীবন! যে জীবন ঘাসের জীবন, যে জীবন ফড়িঙের জীবন, উড়ে উড়ে নেচে চলার মত টগবগে জীবন, সেই জীবন কাঁদার নালায় হঠাৎই ফুরিয়ে গেল!

রিফাতের প্রচন্ড রাগ হয় রাগের সামনে টিভির পর্দায় মন্ত্রীসাহেবের সেই তেলতেলে হাসি যেন আগুনে ঘি ঢেলে দেয়। রিফাত মনে মনে দ্রুত গতিতে বাক্যটি আওড়াতে থাকে, উই ওয়ান্ট জাস্টিস! উই ওয়ান্ট!! উই ওয়ান্ট!!!

আজ সরকারি ভাবে সব স্কুল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ছেলেমেয়েদের থামানোর জন্যই হয়তো এমন একটা উদ্যোগ। ছুটি হলে সবার মনে একটু আনন্দ আনন্দ ভাব হবে, বাসায় গরম খিচুড়ি রান্না হবে। ছেলেমেয়েরা টিভি বা গেম নিয়ে মাতবে।

কিন্তু আজ তেমন কিছু হল না। সবাই সকাল সকাল স্কুল ড্রেস পরেই রাস্তায় বেরিয়ে পড়েছে। কারও কারও হাতে প্ল্যাকার্ড, কেউ কেউ আবার গালাগালি লিখেছে তাতে। দু’জন ছাত্র মারা গেছে। হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে আরও কয়েকজন। গত একমাসে কয়েকটি করুণ মৃত্যু ঘটে গেছে অ্যাক্সিডেন্টে। কারও মন থেকে সরছে না সেই সব ক্ষোভ। চলো, আমরাই ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করে দেখাই।

মিরপুর দশের সামনে চারটে ছেলেমেয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছে। গাড়ি আসছে, তারা কাগজপত্র দেখতে চাইছে। একজন পুলিশ সদস্য মুখ খিস্তি করতে করতে এগিয়ে এসেছিলেন, একটা ছোট্ট বাচ্চার জামার কলার ধরে হিসহিস করতে করতে বললেন, ‘আন্দোলন! দাঁড়া, আন্দোলন আমি তোর মায়ের…’। সঙ্গে সঙ্গে দশটা ছেলেমেয়ে চারপাশ দিয়ে পুলিশ লোকটাকে ঘিরে ধরল, ‘মারো দেখি কাকা, কেমন পারো!’ কিছু সময় দু’পক্ষের বিবাদ চলল। কিন্তু কতক্ষণ চলবে! ছাত্রদের উপর গুলি করাও তো আর যায় না।

ঢাকার বিরামহীন বর্ষার জলের মতো প্লাবন হয়ে ছুটে আসছে ইউনিফর্ম পরা সব স্কুল কলেজ পড়ুয়ারা। কে কাকে থামায়!

মোটরসাইকেলে করে রাস্তায় রুটিন ডিউটি দেওয়া একজন পুলিশ পড়ে গেলেন এরকম একটা দলের মুখোমুখি।

‘আপনার মোটরসাইকেলের লাইসেন্স বের করেন?’

পুলিশের আবার লাইসেন্স হয় নাকি! তিনি হেসে বললেন।

‘কেন, পুলিশ মানুষ নয়?’ সবাই চিৎকার করে উঠল, ‘লাইসেন্স দেখান’।

পুলিশ ভদ্রলোকের গলা শুকিয়ে গেল। ছাত্ররা সেইখানে ডিউটিতে থাকা ট্রাফিক পুলিশকে বলল, এই পুলিশ সদস্যের নামে কেস লিখুন। ছেলের হাত ধরে রিফাত মিশে গেছে ক্ষুদে শিক্ষার্থীদের ভিড়ে৷ কত চমৎকার ছবি আজ দেখা যাচ্ছে! বাচ্চারা ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করছে! ঢাকার রাস্তায় সাতচল্লিশ বছরে প্রথমবারের মত এমারজেন্সি লেন!

সারি বেঁধে গাড়িগুলো লাইন ক্রস করার চেষ্টা ছাড়াই চলছে!

উল্টো পথে আসা মন্ত্রীর গাড়ি ফিরিয়ে দিয়েছে ছেলেরা। মন্ত্রীর গাড়ির ড্রাইভার, তার আবার লাইসেন্স কিসের! আছে অবশ্য! সময় অসময়ে দরকার আছে।

মন্ত্রীসাহেব চুপচাপ গাড়ি থেকে নেমে গেলেন। এমন বাংলাদেশের আশাও করেন সাধারণ মানুষ। কতদিন ধরেই তো কত মানুষ  নানাভাবে নিরাপদ সড়কের দাবি করে আসছে। ড্রাইভারদের পেশাগত শিক্ষার দরকার তা বলে আসছে। সেইসব কথা কখনোই ঠিকঠাক জায়গায় পৌঁছোয়নি। আজ বাচ্চারা মাঠে নেমে পড়েছে।

আর তার ফলে বেরিয়ে এল চমকপ্রদ সব দৃশ্য।  যে পুলিশ কারনে অকারণে রাস্তায় গাড়ি থামায় – তারই গাড়ির লাইসেন্স নেই!

বড় চমৎকার করে এক পুলিশ কর্মকর্তা ছাত্রদের সাথে গলা মিলিয়ে দিয়েছে। ‘আগে কি সুন্দর দিন কাটাইতাম, গ্রামের নওজোয়ান, হিন্দু মুসলমান। মিলিয়া বাউলা গান আর ঘেঁটু গান গাইতাম….’ একজন পাশ থেকে প্রশ্ন করছে, ঘেঁটু গান কি আঙ্কেল, ঘেঁটু গান কি? সে গানের মানে পরে বোঝা যাবে। আগে তো রাস্তা নিরাপদ হোক! একটা প্ল্যাকার্ড বেশ আলোড়ন তুলেছে, ‘যদি তুমি হেরে যাও, তবে তুমি শেষ। যদি তুমি রুখে দাঁড়াও, তবেই তুমি বাংলাদেশ!’

তবে কিছু পোস্টারে গালাগালি থাকায় কেউ কেউ অসন্তুষ্টও হলেন। আবার কেউ বললেন বাচ্চারা সব কথাই সোজাসাপটা বলে। বলবেই। তারা এখনও ভাওতাবাজি শেখেনি। দলাদলি শিখে উঠতে পারেনি। মুখে কুলুপ এঁটে থাকাও শেখেনি। তারা তো মুখে যা আসে তাইই বলবে!

বিকেলে ছেলের সাথে ক্লান্ত পরিশ্রান্ত হয়ে বাসায় ফিরল রিফাত। ছেলের স্কুলের ইউনিফর্ম ছোপ ছোপ কাঁদার দাগে ভরে গেছে। রিফাতের জামায় ভেজা কাঁদার থকথকে ময়লা। তাদের ক্ষিদে তৃষ্ণাও যেন কোথায় হারিয়ে গেছে। তারা হাঁ করে বসে গেছে টেলিভিশনের সামনে। সরকারের একজন প্রভাবশালী মন্ত্রী আশস্ত করছেন, ছাত্রদের নয় দফা দাবী মেনে নেওয়া হবে, মেনে নেওয়া হবে।

নয় দফাগুলো রাস্তার পোষ্টারে দেখেছিল রিফাত। সে আরেকবার মনে করার চেষ্টা করল দাবীগুলো।

১. বেপরোয়া চালককে ফাঁসি দিতে হবে এবং এই শাস্তি সংবিধানে সংযোজন করতে হবে।

২. নৌপরিবহনমন্ত্রীর বক্তব্য প্রত্যাহার করে শিক্ষার্থীদের কাছে নিঃশর্ত ক্ষমা চাইতে হবে।

৩. শিক্ষার্থীদের চলাচলে এমইএস ফুটওভার ব্রিজ বা বিকল্প নিরাপদ ব্যবস্থা নিতে হবে।

৪. প্রত্যেক দুর্ঘটনাপ্রবণ এলাকায় স্পিড ব্রেকার দিতে হবে।

৫. সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ছাত্র-ছাত্রীদের দায়ভার সরকারকে নিতে হবে।

৬. শিক্ষার্থীরা বাস থামানোর সিগন্যাল দিলে থামিয়ে তাদের বাসে তুলতে হবে।

৭. শুধু ঢাকা নয়, সারাদেশে শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

৮. রাস্তায় ফিটনেসবিহীন গাড়ি চলাচল এবং লাইসেন্স ছাড়া চালকদের গাড়ি চালনা বন্ধ করতে হবে।

৯.বাসে অতিরিক্ত যাত্রী নেওয়া যাবে না।

শেষ অবধি ছাত্রদের ন্যায্য দাবী মেনে নিল সরকার। ৬ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে পাশ হল বাংলাদেশের ‘সড়ক পরিবহন আইন–২০১৮’।

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

সাজু বিশ্বাস ঢাকায় থাকেন। তিনি পেশায় ব্যাঙ্ককর্মী

Leave A Reply