সোমবার, অক্টোবর ২২

ব্লগ: আমার বিচিত্র কথা/ বৈধ-অবৈধ সমাচার

রানা আইচ

প্রায় দু’দশক আগের ঘটনা। আমি ও আমার দুই সহকর্মী তখন প্রায় মাস নয়েক ধরে জাপানে রয়েছি চাকুরিসূত্রে। কাজের শেষে আবার কাওয়াসাকি শহরের এক জাপানি স্কুলে গিয়ে সন্ধেবেলায় ‘আরিগাতো গোজাইমাস, সায়োনারা’ ইত্যাদি শিখতে হচ্ছে।

সেদিন স্কুল থেকে ফেরার পথে আমাদের সবার মনেই বেশ একটা স্ফূর্তির ভাব – আর তিন মাস বাদেই দেশের চেনা পরিবেশে ফিরে যাব। এই নিয়ে আলোচনা করতে করতেই ফিরছি। এমন সময় পেছন থেকে ভেসে এল কণ্ঠস্বর।

–  আর ইউ ইন্ডিয়ান?

এই ভর সন্ধেবেলায় জনবহুল কাওয়াসাকি স্টেশনে কে পিছু ডাকে – তাও নির্ভেজাল ভারতীয় উপমহাদেশীয় উচ্চারণে? প্রায় স্লো মোশানে পিছন ফিরে দেখি চল্লিশোর্দ্ধ ছোটোখাটো চেহারার এক ভদ্রলোক, আমাদের মতোই স্যুট-বুট পরা – দেখে তো আমাদের স্বজাতি বলেই মনে হল, আমাদের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন। আমার এক সহকর্মী হ্যাঁ বলতেই তিনি ততোধিক দ্রুততায় ঘোষণা করলেন – আই অ্যাম ফ্রম বাংলাদেশ। নাহ, হালটা তাহলে তো আমাকেই ধরতে হয়, কারণ আমার দুই সহকর্মীই অবাঙালি, যদিও ওরা অনেকদিন কলকাতায় থাকার ফলে ফড়ফড়িয়ে বাংলা বলতে পারে। তাছাড়া নিজে বাঙাল ঘরের ছেলে হওয়ার দরুণ এই সুদুর জাপানে ওপার বাংলার লোকের সাথে কথোপকথনের লোভও সামলাতে পারলাম না। সোনার কেল্লায় ফেলুদার জটায়ুকে বলা সেই বিখ্যাত ডায়লগ দিয়ে আমি ভদ্রলোককে আশ্বস্ত করলাম – আপনি স্বচ্ছন্দে বাংলা বলতে পারেন, আমরা সবাই কলকাতা থেকে আসছি। উনি পরম উষ্ণতায় আমার হাত জড়িয়ে ধরলেন। আলাপ করিয়ে দিলাম আমার সহকর্মীদের সাথে – সঙ্গে যোগ করলাম আমার সঙ্গীরা ভারতের অন্য প্রান্তের কিন্তু বাংলার সমঝদার। পরিচয় আদানপ্রদানের পালা শেষ হতেই উনি সোজা প্রশ্নোত্তর পর্বে চলে গেলেন। আমার সহকর্মীদের খাতিরে উত্তরগুলো আমিই দিচ্ছিলাম খাঁটি কলকাত্তাইয়া ভাষায়।

–   আপনাগো দেখলাম বাংলায় কথা কইতে কইতে যাইতাসেন, তা ভাবলাম একটু আলাপ করি আপনাগো লগে। কবে আইসেন এই দ্যাশে?

–  গত বছর সেপ্টেম্বরে।

–  কইদ্দিন থাকবেন?

–  এই তো সামনের সেপ্টেম্বরেই ভিসা শেষ হয়ে যাচ্ছে, তারপরেই চলে যাবো।

–  কন কি? যাইবেন ক্যান? থাইক্যা যান।

–  সে কি করে হবে বলুন – এখানকার কোম্পানীতে তো এক বছরের কনট্র্যাক্টে এসেছিলাম, ফিরে তো যেতেই হবে।

–  না না – থাইক্যা যান। কিস্যু হইবো না।

–  সে উপায় নেই দাদা। আমাদের কোম্পানি আর ভিসা এক্সটেন্ড করবে না।

–  আরে কোনো ভয় নাই, এই আমি তো আসি – আমার মতো থাকবেন। আপনাগো সব শিখাইয়া পড়াইয়া দিমু।

এবার শুরু হয় আমার প্রশ্ন করার পালা।

–  আপনার ভিসার মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে?

–  হ, সে তো অনেকদিনই হইয়া গেলো।

–  কবে এসেছেন এদেশে?

–  তা ধরেন প্রায় বছর দশেক তো হইবই। আগে ছিলাম লেবাননে। তারপর গৃহযুদ্ধ শুরু হইলো ওইখানে। প্রাণ হাতে কইর‍্যা পলায়া আসলাম দ্যাশে। তারপর কিছুদিন গ্রামে বইস্যা ছিলাম। তারপর এক বন্ধু কওনে এই জাপানের ভিসা লইয়্যা চইল্যা আইলাম।

–  বলেন কি আপনি দাদা? তারপর দেশে ফিরতে পেরেছিলেন?

–  কইলাম কী? আর তো দ্যাশে ফিরিই নাই। এরা তো ধরতেও পারে নাই আমারে – এতোদিন তো রইয়্যা গেলাম।

–  ভিসা ছাড়া কাজ পেতে অসুবিধা হয় না?

–  না না – এদ্যাশে সব রকম ব্যবস্থাই আসে। আর কাজও আসে প্রচুর। আল্লার দোয়ায় ধীরে ধীরে জাপানি ভাষাটাও শিইখ্যা নিসি। তাই কাজ পাইতে কোনো অসুবিধা নাই।

–  দেশে কেউ নেই আপনার? যেতে ইচ্ছে করে না?

–  আসে তো। আমার বৌ আসে, দুইট্যা পোলা মাইয়া আসে। পোলাডা বড়। যখন আইসিলাম এই দ্যাশে, পোলাডা তখন কেজিতে পড়তো – এই পরের বসর হ্যায় মাধ্যমিক দিবো।

–  এতোদিন যে দেশ ছাড়া! ফিরে যেতে ইচ্ছে করে না?

–  ইস্যাতো খুবই হয়। প্রতি বসরই ভাবি এইডাই শ্যাষ বসর – এইবারে ঠিক চইল্যা যামু। তারপর আর যাওন হয় না। ভাবি, ফিইর‍্যা গেলে এইরকম টাকা কি আর কামাইতে পারুম? জানেন, এই কতগুলান বসরে – তা প্রায় কম কইর‍্যা কুটি টাকা কামাইসি। গ্রামের বাড়িটা প্রথমে পাকা করসি – তারপর দোতালা। গরীব সিলাম কইয়্যা আমাগো তো গ্রামে আগে কেউ পুছতোও না। এখন খুব খাতির করে। পালা পার্বণে ভালো চাঁন্দা দিই, পাড়া প্রতিবেশীগো দাওয়াত দিই – হের লেইগ্যা।

–  বাহ – খুব ভালো খবর। তা আপনি বাড়িতে কি ভাবে যোগাযোগ করেন?

–  আইজকাল তো এই টেলিফুনেই কথা হইয়্যা যায়। এইড্যা একখান সুবিধা হইসে এতোদিনে। বাড়িতে একখান ফোন বসাইয়্যা লইসি। আগে তো চিঠি ছাড়া তো কুনো উপায় সিলো না। এখন তো কথা কওনের ইস্যা হইলেই ফোন করি। তবে বৌরে কৈসি সবার ফোটো য্যান চিঠি কইর‍্যাই পাঠায়। সেই ফোটো দেইখ্যা আবার ফোন করি। এই মাসখানেক আগেই বাড়িতে একখান বিয়া আসিলো। সব আত্মীয়স্বজন আইসিলো – ত্যাগো সবার ফোটো দেখলাম – আবার তখন ফোনেও কথা কইলাম।

–  তা এইখানে যে এতদিন থাকলেন – এখানে বন্ধুবান্ধব হয়নি কিছু?

–  হ হ আমি তো আমার দ্যাশের লোকের লগেই মেস কইর‍্যা থাকি। চার পাঁচ জনায় – তবে খুব সাবধানে থাকতে হয়।

–  কেন?

–  পুলিশের ভয় আসে না! কখন কোথা দিয়ে রেড হইয়্যা যায় কিসু কওন যায়?

–  বলেন কি? পুলিশের রেইড হয়!

–  তা তো মাঝে মাঝেই লাইগ্যা থাকে। কত বন্ধু তো ধরাও পড়সে।

–  ধরা পড়লে কি হয়?

–  কি আবার হইবো – দ্যাশে ফেরার প্লেনে তুইল্যা দ্যায়। একবার তো আমিও প্রায় ধরা পইড়্যা যাইতাসিলাম। রাতের বেলা রান্না করতাসিলাম বাড়িতে। সেই সময় রেড হইলো। সব কিছু ফালায়া পেসনের দরজা দিয়া বেড়া টপকাইয়্যা দৌড় দিলাম।

–  ওরেব্বাস – এতো ঝামেলা তবুও এদেশে পড়ে আছেন! এই তো বললেন – অনেক টাকা কামিয়েছেন। তবু ফিরে যাচ্ছেন না কেন?

–  হ হ যামু যামু। টাকা অনেক কামাইসি এইড্যা একদম ঠিক। তবে কি জানেন, এই টাকাও অনেকে কামাইতে পারে না। সব ফুর্তি কইর‍্যা উড়াইয়্যা দেয়। বুঝতেই পারতাসেন চাইরদিকে তাকাইয়্যা – এইদ্যাশে তো পদে পদে পয়সা উড়ানের ফাঁদ। আমাগো মইধ্যে অনেকেই আসে – জোয়ান ছেলেগুলান তো কতো মাইয়্যার পেসনেই পয়সা ঢাইল্যা দ্যায়। সবার চরিত্র তো আর এক হয় না।

–  এসব শুনে মনে হচ্ছে আপনার এদেশে আর বেশিদিন না থাকাই ভালো। এবার দেশে ফিরে ছেলেমেয়ে পরিবারের সাথে আনন্দ ফুর্তি করে দিন কাটান।

–  ঠিকই কইসেন। এইবার আস্তে আস্তে ভাবতাসি চইল্যাই যামু, গত বসর তো প্লেনের টিকিটও কাইট্যা ফেলাইসিলাম, তারপর কি ভাইব্যা টিকিটটা ক্যান্সেলও কইর‍্যা দিলাম। ভাবলাম সামনের দুই বসরে আরো কিসু কামাইয়া তারপরে ফিরুম। এইবার একদম ঠিক কইর‍্যাই ফেলাইসি – সামনের বসর ফিরুমই ফিরুম। দ্যাশে ফিইর‍্যা ব্যাবসাপাতি কিসু করুম অনে।

আমাদের যাওয়ার সময় হয়ে আসে। ভদ্রলোককে বিদায় জানাই। ভারাক্রান্ত মনে আমাদের প্ল্যাটফর্মের দিকে পা চালাই। বেশ রাত হলো – এবার হোস্টেলে ফিরে যেতে হবে।

ফাইল চিত্র 

লেখক সিলিকন ভ্যালিতে কর্মরত 

Shares

Leave A Reply