ব্লগ: সূর্যের সোনার বর্শার মতো জেগে উঠে

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অংশুমান কর

    হরিণের কথা প্রথম আমাকে বলে পিয়ালী। কর্ণেল ইউনিভার্সিটির ক্যাম্পাস থেকে একটু দূরে জঙ্গল যেখানে নারীর ভুরুর মতো ঘন হয়ে উঠেছে, সেইখানে ওদের ছোট্ট ছবির মতো বাসা। বাড়ির মালকিন একজন জাঁদরেল জার্মান মহিলা।  বাড়ির বাইরে লাগানো আছে মেরুনের আভা ছড়ানো ছোট্ট একটা লাল আলো। মালকিনের নির্দেশ, ওই আলো যেন পিয়ালীরা কখনও না নেভায়। সারাক্ষণ জ্বলতে থাকা সেই আলোর সামনে রেলিং ঘিরে পিয়ালী আর কর্ণেল ইউনিভার্সিটির পোস্ট-ডক ফেলো ওর বর শাওন  লাগিয়েছে ছোট ছোট টবে নানা রকমের গাছ। পিয়ালী বলেছিল, সেই গাছ খেয়ে যাচ্ছে হরিণে। আমাদের দেশে ছাগলে গাছ খেয়ে যায়, গরু-বাছুরদের আটকাতে বেড়া দিতে হয় গাছ বাঁচাতে, আর আমেরিকায় গাছ বাঁচাতে হয় হরিণদের থেকে! শুনে প্রথমে একটু অবাক হলেও, পরে পুলকই জেগেছিল। হরিণ সম্বন্ধে বাঙালি মাত্রই দুর্বল। রামায়ণের কথা যদি নাও তুলি, তবুও তো সেই রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দ হয়ে আজ পর্যন্ত বাংলা কাব্যে কতবারই না প্রবেশ করেছে হরিণ! হরিণ দেখার জন্য আমরা যাই চিড়িয়াখানায়, ন্যাশনাল পার্কে।  যে চিড়িয়াখানায় আর কিচ্ছু থাকে না, সেখানেও বাঙালির হৃদয়ে তাদের নিষ্পাপ চক্ষুর মায়াকাজল বুলিয়ে দিতে ঠিক একদল মায়ামৃগ থাকে। দেশে কতই না শ্রমের পর যে হরিণের দেখা পাই আমরা আমেরিকায় সেই হরিণকে দেখার জন্য চিড়িয়াখানা বা পার্কে যেতে হয় না শুনে যারপরনাই পুলকিত হয়েছিলাম।  পাখির ডাক আর মাঝে মাঝে একটি-দু’টি মোটর গাড়ির গাড়লের মতো কাশির মাঝখানে আমার হাত থেকে ঘাসপাতা ছিনিয়ে নিয়ে খেয়ে যাচ্ছে হরিণ—এর চেয়ে বড় রোমান্টিক দৃশ্য আর কী হতে পারে! আমি পিয়ালীকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, হরিণের দেখা পাবো তো? উত্তর দিয়েছিল শাওন, কাল পাবেন, নায়গ্রা যাওয়ার পথে।

    #

    শাওন পাকা ড্রাইভার। ওদের বাড়ি থেকে নায়গ্রা প্রায় চারঘন্টার ড্রাইভ। গাড়ির ডিকিতে জল, খাবার-দাবার ভরে নিয়ে শাওন জানাল, ড্রাইভ করতে ওর দিব্যি লাগে। আমি আবার হরিণের প্রসঙ্গ তুললাম। শাওন বলল, জ্যান্ত হরিণ দেখতে পাব কিনা জানি না, তবে একটা দু’টো মরা হরিণের দেখা পেতেই পারি। আমি চমকে উঠেছিলাম। মরা হরিণ! পিয়ালী আর শাওন জানিয়েছিল যে, আমাদের দেশে যেমন রাস্তা পার হতে গিয়ে কাটা পড়ে কুকুর, ছাগল—তেমনই  আমেরিকায় রাস্তা পার হতে গিয়ে কাটা পড়ে হরিণ। তাই মৃত হরিণের দেখা একটা-দুটো মিলতেই পারে। শুনে বড্ড মনখারাপ হয়ে গিয়েছিল। একটু অবাকও লাগছিল। আমার ধারণা ছিল যে, হরিণ এক দ্রুতগামী প্রাণী। চিতার মতোই সে ক্ষিপ্র। সে কি করে কাটা পড়ে চাকার তলায়? নায়গ্রা যাওয়ার পথে শাওন একবার আঙুল তুলে বলল, ওই দেখুন স্যার, ওই যে, কাটা পড়েছে। উঁকি দিলাম, কিন্তু দেখতে পেলাম না। দেখলাম ফেরার পথে।  থেঁতলানো মুখ নিয়ে শুয়ে রয়েছে মায়ামৃগ। বিশাল তার চেহারা। ধূসর আকাশের মতো গায়ের রঙ। তার মায়া অন্তর্হিত, সে কেবলই মৃত মৃগ।

    #

    গাড়ির চাকার তলায় হরিণ কাটা পড়ে কারণ হরিণ খুব বোকা। ব্রেকফাস্ট করতে করতে আমাকে একথা বলেছিলেন সুব্রতদা, সুব্রত ভৌমিক। উত্তর আমেরিকার বঙ্গসম্মেলন ২০১৮তে যে সাহিত্যের অনুষ্ঠানগুলি আয়োজিত হয়েছিল সুব্রতদা ছিলেন সেই অনুষ্ঠানগুলির টিম লিড। নিউ জার্সিতে তাঁর বাড়িতে আমার একদিনের যাপন।  তখনই দেখলাম যে, সুব্রতদা আর সীমা বউদির সমস্যাও সেই হরিণ। কিছুদিন আগেই সুব্রতদার গাড়িতেই ধাক্কা খেয়েছিল একটা বাচ্চা হরিণ। সুব্রতদা বলছিলেন যে, মনে হয় ও মরেনি, মনে হয়, ধাক্কা খেলেও ও বেঁচে গেছে। বলতে বলতে তাঁর চোখ ঈষৎ আর্দ্র হয়ে আসছিল। কথা থামছিল না তাঁর, তিনি বলে চলেছিলেন, হরিণরা খুব বোকা। দূর থেকে তুমি হয়তো দেখলে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে হরিণ, নড়ছে না, তারপর যেই তোমার গাড়ি এল হরিণটার কাছাকাছি অমনি লাফ দিয়ে ও রাস্তা পার করতে যাবে। ভাবে বোধহয়, যন্ত্রের চেয়ে ওর গতি বেশি।  শুনতে শুনতে আমি অন্যমনস্ক হয়ে পড়ছিলাম। আমার  চোখের সামনে ভেসে উঠছিল নায়গ্রা থেকে ফেরার পথে দেখা সেই বিশাল বপুর মায়ামৃগ। বেচারি রাস্তা পার হয়ে যাবে ভেবেছিল। কিন্তু পারেনি। গতির কাছে, উন্নতির কাছে পরাজিত হয়ে হাইওয়ের ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে আছে।  মনে হচ্ছিল, হরিণ নয়, ও তো আমাদের মতো গরীব দেশের সাধারণ মানুষের স্বপ্ন, সূর্যের সোনার বর্শার মতো জেগে উঠতে চেয়েছিল, কিন্তু পারেনি; হয় শিকারী শিকার করে নিয়ে গেছে তারে আর নয়তো দু’শো কিলোমিটার বেগে ছুটতে থাকা চাকার তলায় কাটা পড়েছে। একটি-দু’টি হয়তো বেঁচেছে। তারপর প্রতিশোধের কথা না ভেবে নারীর ভুরুর মতো গভীর অরণ্যের ভেতরে নিজেই নিজের শুশ্রূষা করছে। হ্যাঁ, বোকার মতোই। স্বপ্ন কখনও চালাক হয় না। হরিণের মতোই সে ছটফটে আর বড্ড বোকা।

    জন্ম বাঁকুড়ার বেলিয়াতোড়ে। বর্তমানে বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরাজি সাহিত্যের অধ্যাপক। স্বল্পকালের জন্য ছিলেন সাহিত্য অকাদেমির পূর্বাঞ্চলীয় সচিব। কবিতার জন্য পেয়েছেন – বাংলা আকাদেমি, কৃত্তিবাস, মল্লিকা সেনগুপ্ত, বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের মতো পুরস্কার। কবিতা পড়ার জন্য গিয়েছেন আমেরিকা, জার্মানি ও স্কটল্যান্ডে।    

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More