সোমবার, আগস্ট ২০

এক অভূতপূর্ব ছাত্র আন্দোলন দেখল বাংলাদেশ

অনার্য তাপস

সরকারের আহ্বানে এবং আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীদের ঘোষণায় সীমিত পরিমান সহিংস ঘটনার মধ্য দিয়ে অবশেষে বাংলাদেশে শেষ হয়েছে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের “নিরাপদ সড়ক চাই” আন্দোলন। সরকার আশ্বাস দিয়েছে, যেহেতু আন্দোলনকারীরা স্কুল ও কলেজের ছাত্রছাত্রী, তাই বয়সের কথা বিবেচনা করে আন্দোলন পরবর্তী কোন ধরনের আইনি প্রক্রিয়ায় তারা যাবে না। এছাড়া আন্দোলনকারী ছাত্র-ছাত্রীদের প্রায় সব দাবি মেনে নিয়ে সেগুলো ক্রমান্বয়ে বাস্তবায়নের আশ্বাস দিয়েছে সরকার। গুরুত্বপূর্ণ খবর হলো, নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মধ্যেই গত ৬ আগস্ট সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের সাজা ও পাঁচ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রেখে মন্ত্রিসভার বৈঠকে চূড়ান্ত অনুমোদন দেয়া হয়েছে ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ এর।

সম্ভবত স্বাধীনতার পর সব থেকে স্বতঃস্ফুর্ত আন্দোলন দেখল বাংলাদেশ। এই একটি আন্দোলনে আন্দোলনকারী, সাধারণ মানুষ, সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, নেতা-মন্ত্রী সবাই একই দাবীতে কণ্ঠ মিলিয়েছেন। সরকারের তরফ থেকে আহত ছাত্রছাত্রীদের উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়েছে। নিহতদের পরিবারকে সরকারী কোষাগার থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছে। বিচারের আওতায় আনা হয়েছে দুর্ঘটনা ঘটানো পরিবহনের মালিক, চালক এবং সহকারীকে। রুটপারমিট বাতিল করা হয়েছে সংশ্লিষ্ট পরিবহণ কোম্পানিটির।

পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশের রাস্তায় ২০ লাখ যানবাহনের কোনও রেজিস্ট্রেশন নেই। ফলে সরকারের কাছে এই পরিমান যানবাহনের কোনও তথ্য নেই। স্বাভাবিকভাবে এই রেজিস্ট্রেশনবিহীন গাড়ির চালকরা আইনের আওতায় আসেন না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই যানবাহনগুলোর মালিক ও ড্রাইভারদের কাগজপত্র, লাইসেন্স বা ট্রেনিং কোনওটাই নেই। কাজেই এই যানবাহনের চালকদের হাতে মানুষ মরবে এটা খুব স্বাভাবিক। এই ২০ লক্ষ যানবাহনের কী হবে সরকারের কাছেও সম্ভবত তার কোন উত্তর নেই। এই উত্তর না থাকাটাই ভাবিয়েছিলো আন্দোলনকারী এবং সাধারণ মানুষকে। বিভিন্ন লেখাপত্র ও রিপোর্ট থেকে জানা যাচ্ছে, গত সাড়ে তিন বছরে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা গেছে প্রায় পঁচিশ হাজার মানুষ। তার মধ্যে চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে রাস্তায় মারা গেছে প্রায় আড়াই হাজার মানুষ। সংখ্যাটা দিন দিন বাড়ছে। এই “নিরাপদ সড়ক চাই” আন্দোলন চলার সপ্তাহখানেকের মধ্যে বাংলাদেশে প্রায় ২০ জন মানুষ মারা গেছে। ৩ আগস্ট ঢাকার অদূরে সাভারে দুটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে মারা গেছে পাঁচ জন। অর্থাৎ বাংলাদেশ সরকার কোনওভাবেই রাস্তায় মৃত্যুর মিছিল থামাতে পারছে না। সে কারণে মানুষ সরকারের কথায় বিশ্বাসও রাখতে পারছে না। বিভিন্ন গণমাধ্যমের রিপোর্টে জানা যাচ্ছে, বাংলাদেশের পরিবহণ খাত চলে গেছে সরকারি নেতা-মন্ত্রীদের হাতে। ফলে রাস্তায় দুর্ঘটনার কোনওরকম বিচারও হচ্ছে না। এই বিচারহীনতাই মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তুলেছে। স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রীদের এই আন্দোলনে সর্বস্তরের মানুষের প্রকাশ্য ও পরোক্ষ সমর্থন সে কথাই প্রমান করেছে। কিন্তু এটাও ঠিক যে, এই আন্দোলন সরকারবিরোধী কোন আন্দোলন নয়। যদিও এখন ঢাকায় গুজব ছড়াচ্ছে প্রচুর এবং সরকারের একাধিক নেতা ঠারেঠোরে বলতে চেয়েছেন, বিএনপি এবং তার মিত্রসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ছাত্র-ছাত্রীদের ভুল বুঝিয়ে রাস্তায় নামিয়েছে।

এই আন্দোলনের সূত্রপাত হয়েছিলো অত্যন্ত নির্মমভাবে, গত ২৯ আগস্ট। ঢাকার অন্যতম ব্যস্ত রাস্তা এয়ারপোর্ট রোডের একটি বাস স্টপে কলেজ থেকে বাড়ি ফেরার সময় বাসে উঠতে গিয়ে ছাত্রছাত্রীদের বেপরোয়া অন্য একটি বাসে পিষ্ট হন দুই ছাত্রছাত্রী। ঘটনাস্থলেই দিয়া খানম মিম এবং আব্দুল করিম রাজিব নামের দুই কলেজ ছাত্র নিহত হয় এবং অন্তত  দশ জন ছাত্রছাত্রী আহত হয়। যাদের মধ্যে বেশ কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। বাসের অপেক্ষায় থাকা ছাত্র-ছাত্রীরা ছিল রমিজউদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল ও কলেজের। এ ঘটনার পর সহপাঠীদের মর্মান্তিক মৃত্যুতে দোষীদের বিচার চেয়ে রাস্তায় নামে মিম ও রাজিবের সতীর্থরা। বেশকিছু পাবলিক বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি ভাঙচুর এবং বেশ কয়েকটি বাসে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে । ছাত্র-ছাত্রীদের এই আন্দোলনে যোগ দেন সর্বস্তরের সাধারণ মানুষের সমর্থন। সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হওয়া মানুষ মূলত নিজেদের অসহায়ত্বের কথা স্মরণ করে আন্দোলনটিকে সমর্থন করে।

উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে আন্দোলনের পঞ্চম দিন অর্থাৎ ২ অগস্ট। সেদিন পুরো ঢাকা আন্দোলনকারী চলে যায়। যানবাহন শূন্য হয়ে যায় রাস্তাঘাট। অফিস যাত্রীদের পড়তে হয় ব্যাপক সমস্যার মুখে। কিন্তু খুব বেশি উচ্চবাচ্য না করে সবাই ব্যাপারটিকে মেনে নেয় মূলত একটি আশায়, যদি এই সুযোগে বাংলাদেশের গণপরিবহণ খাতে কিছুটা সংস্কার ঘটে। বলা ভালো, বাংলাদেশের গণপরিবহণ এবং সড়ক ব্যবস্থাপনায় ব্যাপক অনিয়ম, দুর্নীতি আর অব্যবস্থাপনা রয়েছে। ঢাকার বাইরের হাইওয়েগুলোর কিছুটা উন্নতি হলেও ঢাকার ভেতরের অবস্থার তেমন কোন পরিবর্তন চোখে পড়ে না। ব্যাপক জ্যাম, বেপরোয়া ড্রাইভিং, ট্রাফিক আইন অমান্য, অপ্রতুল জেব্রাক্রসিং ও আন্ডারপাসের ব্যবস্থা, ওভার ব্রিজ ব্যবহারে সাধারণ মানুষের অনিহা, দুর্ঘটনা ঘটিয়েও পরিবহণ শ্রমিকদের আইনের আওতায় না আনা ইত্যাদি কারণে দীর্ঘদিন ধরে তৈরি হয় এই নৈরাজ্য।

২ আগস্ট ছাত্রছাত্রীরা ঢাকার দখল নিলে সাধারণ মানুষ পরিবর্তনের আশা করা শুরু করেন। ছাত্রছাত্রীরা এদিন দল বেঁধে ড্রাইভিং লাইসেন্স চেক করতে শুরু করে। উল্টোপথে আসা ভিআইপিদের গাড়ি ঘুরিয়ে দেয় – বাংলাদেশের  দুজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর গাড়ি, প্রধানমন্ত্রীর অফিসের গাড়ি, সেনাবাহিনীর গাড়ি, র‌্যাব ও পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের গাড়ি, সরকারী সচিবের গাড়ির লাইসেন্সও চেক করে আন্দোলনকারীরা। লাইসেন্স না পেলে পুলিশকে দিয়ে কেস করিয়ে নেয়। এমনও ঘটনা ঘটেছে, ট্রাফিক সার্জেন্টও নিজের নামে কেস দিতে বাধ্য হয়েছেন ছাত্রদের চাপে। ঢাকার রাস্তায় জ্যাম পরিষ্কার করে নিয়ম মেনে রিকশা, প্রাইভেট কার ইত্যাদি চলতেও বাধ্য করে তারা, তৈরি করে এম্বুলেন্সের জন্য এমার্জেন্সি লেন- আইন থাকার পরেও যা ঢাকা শহরে কল্পনাতীত ব্যাপার। এসব ঘটনায় সাধারণ মানুষ দ্বিধাহীনভাবে এই আন্দোলনকে সমর্থন করে। অফিস ফেরত মানুষ হেঁটে বাসায় ফিরলেও অসন্তোষ প্রকাশ করেনি। ষষ্ঠ দিন (৩ আগস্ট) অভিভাবকরা ঢাকার বিভিন্ন স্থানে জমায়েত হয়ে এই আন্দোলনকে আনুষ্ঠানিকভাবে সমর্থন জানায়।

প্রতিটি আন্দোলনে যেমনটা হয়, বিভিন্ন পক্ষ সেই আন্দোলন থেকে সুবিধা নেওয়ার চেষ্টা করে। এই আন্দোলনেও সেটা হয়েছে। আন্দোলনের শেষের দিকে ঢাকা পরিণত হয় গুজবের শহরে। বিভিন্ন মানুষের ছড়ানো লাইভ ভিডিও, ফটোশপ করা ছবি, বিনোদন জগতের সেলিব্রিটেদের ফেসবুক লাইভ সাধারণ মানুষকে বিভ্রান্ত করে। ইতিমধ্যে লাইভে এসে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের দায়ে একজন অভিনেত্রীসহ কয়েকজনকে আটক করেছে পুলিশ ও র‌্যাব। সরকারের বিভিন্ন স্তর থেকে গুজব না ছড়ানোর জন্য সবার প্রতি আহ্বান করা হয়েছে।

গত ৬ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘সড়ক পরিবহন আইন-২০১৮’ চূড়ান্ত ভাবে অনুমোদন দেয়ার পর ছাত্র-ছাত্রীরা তাদের আন্দোলন স্থগিত করেছে। এই আন্দোলনের ফলে বাংলাদেশের সড়ক পরিবহনের বিভিন্ন স্তরে কিছু স্বতঃস্ফূর্তৃ পরিবর্তৃন লক্ষ্য করা যাচ্ছে যাকে এই আন্দোলনের সফলতা হিসেবেই ধরে নেওয়া হচ্ছে।

সংবাদ মাধ্যম জানাচ্ছে, “নতুন আইন অনুযায়ী বেপরোয়াভাবে বা অবহেলা করে গাড়ি চালানোর কারণে কেউ আহত বা নিহত হলে দণ্ডবিধির ৩০৪ (খ) ধারায় মামলা দায়ের হবে। আর এই ধারায় সাজা সর্বোচ্চ পাঁচ বছর কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ড এবং সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা। বর্তমান এই আইন অনুযায়ী সর্বোচ্চ তিন বছর কারাদণ্ডের বিধান আছে। তবে গাড়ি চালানোর কারণে কারো নিহত হওয়ার ঘটনা তদন্তে হত্যা বলে প্রমাণিত হলে ফৌজদারি আইনে মৃত্যুদণ্ডের বিধান প্রয়োগ হতে পারে। নতুন আইনে বলা হয়েছে, গাড়ি চালানোর অপেশাদার লাইসেন্স পেতে হলে অষ্টম শ্রেণি পাস ও ১৮ বছর হতে হবে। পেশাদার ড্রাইভিং লাইসেন্সের জন্য ২১ বছর হতে হবে।

এছাড়া লাইসেন্সেপ্রাপ্ত চালকের জন্য থাকবে ১২ পয়েন্ট। অপরাধ করলে পয়েন্ট কাটা যাবে। এভাবে ১২ পয়েন্ট শেষ হয়ে গেলে লাইসেন্স বাতিল হবে। অপরদিকে কোনো অপরাধী ড্রাইভিং লাইসেন্স পাবেন না। আগে যেসব অপরাধী লাইসেন্স পেয়েছে তা বাতিল করা হবে।”

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত 

অনার্য তাপস লোকসংস্কৃতি বিষয়ক গবেষক ও লেখক। ঢাকায় বসবাস করেন।

Shares

Leave A Reply