ব্লগ: আদিবাসীদের হৃদয় ছুঁতে হবে দিদি, এলিটস্য এলিট ঋতবাবুদের দিয়ে হবে না

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    মারাংবুরু মাহাত: সরকারি উদ্যোগে পালিত হল আদিবাসী দিবস। স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়  সেই জন্য চলে গেলেন ঝাড়গ্রামে। বলাই বাহুল্য তিনি এ বারই প্রথম অতিরিক্ত উদ্যোগে  আবির্ভূত হইলেন। নইলে বহুকাল ধরে আদিবাসী দিবস পালন হয়ে আসছে। প্রশাসন বা রাষ্ট্রের দিবসটিবস নামকরণের তোয়াক্কা না করেই নিজেদের আত্মমর্যাদায় শান দেওয়ার কাজ নীরবে নিভৃতে আদিবাসীরা করে আসছেন। তাঁরা নিজেরাই নিজেদের সংস্কৃতি মেনে এই দিবস পালন করে থাকেন।

    অধিকন্তু ন দোষায়। কিন্তু এ বার স্বয়ং মুখ্যমন্ত্রী আদিবাসী অধ্যুষিত কিংবা উপদ্রুত ঝাড়গ্রামে উপস্থিত হলেন। কেন?

    নিন্দুকেরা বলবেন, তার একটাই কারণ, সাম্প্রতিক পঞ্চায়েত নির্বাচনের ফলাফল। ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া,পুরুলিয়ার জঙ্গলমহলে শাসক দল গো হারান হেরেছে। মন্ত্রী, জেলা পরিষদের সভাধিপতিদের এলাকায় ঘাসফুল প্রতীক নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। জঙ্গলমহলে এখন নতুন চাষের ধুম, পদ্মচাষ। দিনের আলোয় দেখা যাচ্ছে পদ্মকলি শুধু হাই তুলছে মাত্র নয়, খিলখিলিয়ে সংসার করছে। বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে রীতিমতো একান্নবর্তী পরিবারের কর্তার মতো কোঁচাটি সামলে গুছিয়ে বসেছে। ফলে টনক নড়েছে তৃণমূল সুপ্রিমোর। প্রয়োজনটাও গুরুতর। সামনেই লোকসভা নির্বাচন। পঞ্চায়েত ভোটের নিরিখে জঙ্গলমহলের তিনটি লোকসভা কেন্দ্রে পরাজিত শাসক দল। তাই মমতার পাখির চোখ জঙ্গলমহল। আদিবাসীদের মন ফিরে পাওয়া! একজন রাজনৈতিক দলের নেতা হিসাবে মুখ্যমন্ত্রীর এই দাবিতে কোনও অন্যায় নেই। ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি যে গণতন্ত্রে সর্বশেষ কথা বলে, সেখানে এটাই স্বাভাবিক। ফলে নিন্দুকদের সমালোচনার ঊর্ধ্বে না রেখেও বলা যায় স্বাভাবিক নিয়মেই আদিবাসীরা এখন সরকারের পোষ্যপুত্তুর হবে।

    কিন্তু যাঁরা ঠিক নিন্দুক নই, মনের মধ্যে একটু ‘কুটুস কুটুস’ করে কৌতূহলের ঘুণপোকারা, তাঁদের ভাবনা একটু গোলমেলে। তাঁরা ভাবছেন, আদিবাসীদের মন ফিরে পাবেন কি মমতা? আদিবাসীরা মমতা­-সরকারের প্রতি বিরূপ। মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে এটা প্রমাণিত। কেন নিয়েছে?

    সে বিশ্লেষণে যাওয়ার আগে অন্য একটা কথা বলা আবশ্যক। আদিবাসী মন পেতে মুখ্যমন্ত্রী নিজে উদ্যোগী হয়েছেন। সেই উদ্যোগের অন্যতম নমুনা একদা বামপন্থী ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়কে তিনি আদিবাসী উন্নয়ন কমিটির চেয়ারম্যান করেছেন। কে এই ঋতব্রত? যিনি এলিটস্য এলিট শ্রেণির প্রতিনিধি। হাতে থাকে লক্ষ টাকার ঘড়ি, দামি অ্যানড্রয়েড ফোন। যাঁর বিরুদ্ধে আবার ব্যাভিচারের অভিযোগ। এমন একজন মানুষ আদিবাসীদের উন্নয়ন নিয়ে কী ভাবতে পারেন, তার একটি ধারণা শিক্ষিত আদিবাসী সমাজে তৈরি হয়ে গিয়েছে। সরকারের এই পদক্ষেপকে আদিবাসীরা মোটেও ভাল চোখে নেননি। বেজায় খাপ্পা হয়েছেন। সিপিএমের অত্যাচার দেখেছে জঙ্গলমহল। সিপিএমের হার্মাদদের অত্যাচারে একটা সময় দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গিয়েছিল আদিবাসীদের। তাই জঙ্গলমহল সিপিএমের বিরুদ্ধে গর্জে উঠেছিল। সেই সিপিএমের বহিষ্কৃত সাংসদকে (আস্তাকুঁড়ে ফেলে দেওয়া) আদিবাসী কমিটির চেয়ারম্যান পদে বসানো হল! শাসক দলে কি আদিবাসীদের প্রতিনিধি নেই? ঋতব্রত কি জানেন সাঁওতালি ভাষা, কুড়মালি ভাষা? কদিন তিনি আদিবাসী গ্রামে রাত কাটিয়েছেন? উনি কি জানেন, সারাদিন না খেয়ে জঙ্গলে কাঠ কুড়িয়ে হাটে বিক্রি করার পর রাতে ফ্যান ভাত খাওয়া? উনি কি জানেন, বর্ষায় ছেঁদা হওয়া ঘরের চালের নীচে রাত কাটানো? উনি কি জানেন, দুলি খাটে অসুস্থ রোগীকে নিয়ে হাসপাতালে পৌঁছনো? উনি কি জানেন, সেতুহীন নদীতে সাঁতরে পেরিয়ে স্কুলে যাওয়া? উনি কি জানেন, বাহা পরব? করম পরব? জানেন না। তবুও আমি তো ঠিক নিন্দুক নই কুটুস কুটুস পোকা কাটে তাই ধরে নিচ্ছি এসব উনি জানেন। কারণ উনি ক্যামু, কাফকা, বোদলেয়্যর গুলে খেয়েছেন, সংগ্রামী মানুষের ইতিহাসের সঙ্গে পরিচিত। নিজের চুল কালো হলেও পলিতবুড়োদের সঙ্গে ওঠাবসার সুযোগ পেয়েছিলেন। ফলে একদা ছাত্রনেতা কিছু জানতেও পারেন। কিন্তু আদিবাসীদের আত্মাকে চেনেন কি? এ তো কোনও পুঁথি পড়ে জানা যায় না, হৃদয়ঙ্গম করতে হয়। মান্যবরেষুর জিভে রতি সরস্বতী বাস করতে পারেন কিন্তু আদিবাসী আত্মার সঙ্গে তাঁর হৃদয় পরিচিত, এমন দাবি তাঁর হিতৈষীও করবে না। এমন মানুষের হাতেই ন্যস্ত হয়েছে আদিবাসী উন্নয়নের ভার। আদিবাসীদের উন্নয়ন কতটা হবে, তা অনুমান করাই যায়।

     আসন্ন লোকসভা নির্বাচনের জন্য মমতা ঝাড়গ্রামে গেলেন। প্রশাসনের আয়োজন করা সভায় আদিবাসীদের উদ্দেশে সহমর্মিতা দেখালেন। ক্ষমতায় থাকার এটাই নীতি তাই তিনি ব্যতিক্রমী হবেন না সেটা তো জানাই ছিল। তাতে আপত্তি বিশেষ নেই। কিন্তু দিদি কুড়মিদের উন্নয়নে তপশীলি জাতি অর্ন্তভুক্তির দাবি তুলবেন না। কেন্দ্রের কাছে পাঠাবেন না। সাঁওতালি ভাষায় পঠনপাঠন চালু হলো কিন্তু কতটা গুরুত্ব পেল? খোঁজ নেই। আদিবাসী হোস্টেলগুলি সংস্কার হচ্ছে না। জঙ্গলমহলের আদিবাসী হোস্টেলগুলি আজ প্রায় সব বন্ধ। কেন বন্ধ? তার খোঁজ নেয় না মমতাময় সরকার।  দিদির কাছে খবরও যায় না। উচ্চবর্ণের ঋতব্রত উন্নয়ন কমিটির মাথায় থাকায় খবর যাওয়ার কথাও নয়। অথচ লাগাতার সংখ্যালঘু হোস্টেল তৈরি হয়ে চলেছে। প্রয়োজনে এবং অপ্রয়োজনে। দিদি করেছেন অনেক। হ্যাঁ আদিবাসীদের জন্যে তিনি করেছেন। কিন্তু দিদি তাহা হস্তের সীমা এড়াইয়া মরমে গিয়া পশিয়াছে কিনা একটু খোঁজ নেবেন প্লিজ।

    এই জায়গায় অন্তত যাঁদের বিরুদ্ধে আপনার জেহাদ, তাঁরা অনেক এগিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে নানান সংগঠনের আড়ালে গেরুয়ার রঙে হৃদয় রাঙাতে একটি রাজনৈতিক দল উদ্যোগী হয়েছে। তারা হুল্লোড় করে না। নানা প্রয়োজনে আদিবাসীদের একজন হয়ে তাঁদেরই পাশে থাকে। আদিবাসী আত্মাকে ছুঁয়ে থাকতে চায়। কোনও ভুল নেই যে, সেটাও সেই ভোটব্যাঙ্কেরই রাজনীতি। কিন্তু দিদি আমাদেরই সনাতন শিক্ষা- আয়োজনের বাহুল্যে নয় আন্তরিকতায় জয় করতে হয়। এই শিক্ষায় আদিবাসী মনে দাগ ফেলেছে ‘ওঁরা’। সেটা দিনের আলোর মতো গভীর হয়ে উঠেছে। দিদি, আদিবাসীরা চিরদিনই আত্মমর্যাদাসম্পন্ন জাত। করুণা আর ভিক্ষের ফরমে দেওয়া উপহারের থালা তাঁরা নিয়েছে কিন্তু গ্রহণ করেনি। তাঁদের মর্মের সঙ্গে যোগসূত্র রচিত হয়নি, এটাই বাস্তব।

    আর এই কাজ আর যাইহোক এলিটস্য এলিট ঋতুবাবুদের দিয়ে হবে না। কেন্দু পাতার দাম পড়ে গিয়েছে। এ খবর কি রাখেন ঋতব্রত? রাখেন না।  আয়াসে অভ্যস্ত বিরাটবপু আর আদরে অভ্যস্ত জিভ নিয়ে আদিবাসী মর্মে প্রবেশের চাবিকাঠি খুঁজে পাওয়া সম্ভব নয়।

    একটা প্রসঙ্গ বাদ পড়ে থেকে গিয়েছে, কেন জনমত পেল না শাসকদল। তার প্রধান কারণ, যাঁদের হাতে স্থানীয় উন্নয়নের দায়িত্ব বর্তেছিল তাঁরা নিজেদের উন্নয়নে ব্যস্ত ছিলেন। মানুষের ছোঁয়া লাগা বাচ্চাকে যেমন হাতি ফেরায় না তেমনি দিকু হয়ে ওঠা আদিবাসীকেও তার সমাজ গ্রহণ করে না। আদিবাসীরা যূথবদ্ধ জীবনে অভ্যস্ত। পৃথিবী যতই গ্লোবাল ভিলেজ হোক, আদিবাসীদের আত্মার রঙ আজও বীরসা ভগবানের সময়েই রয়ে গেছে। এটা ব্যর্থতা নয়, একধরণের পিউরিটির অহং। তাই ভিক্ষে নয়, করুণা নয়, পারলে তাদের হৃদয়কে ছুঁয়ে দেখতে হবে। নইলে কী হবে? তা পঞ্চায়েত বলে দিয়েছে।

    জল জমি জঙ্গল পাহাড় রক্ষায় আদিবাসীদের পক্ষে এই লেখকের কলম গর্জে ওঠে। একাধিক আদিবাসী আন্দোলনের নেতৃত্ব দিয়েছেন। বন ভূমি পাহাড়ের জন্য তিনি সদা জাগ্রত। জঙ্গলমহলে জন্মে জঙ্গলমহলেই বিচরণ করেন এই লেখক।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More