সোমবার, আগস্ট ২০

আম জনতার চোখে কালাইঙ্গার ছিলেন এক অনন্য তামিল রাজা  

শালিন মারিয়া লরেন্স

মুথুভেল করুণানিধি। তামিলনাড়ুর মানুষের কাছে তিনি শুধু পাঁচবারের মুখ্যমন্ত্রী নন। তার চাইতে অনেক বেশি কিছু – দুঃসাহসী সমাজসংস্কারক, আদর্শ রাজনীতিবিদ, অনমনীয় যুক্তিবাদী, দ্রাবিড় বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক দার্শনিক, তামিল সাহিত্যের এক অবিস্মরণীয় নাম, লেখক-স্ক্রিপ্টরাইটার-কবি, সাংবাদিক-কলমলেখক, সংবাদপত্রের সম্পাদক, অসামান্য বক্তা, অক্লান্ত প্রশাসক, কিংমেকার।

তামিল দলিত পরিবারের সন্তান করুণানিধির রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়েছিল ১৪ বছর বয়সে। হিন্দিবিরোধী আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েছিলেন তিনি। সেদিন থেকে একটাই স্বপ্ন তাঁর – ব্রাহ্মণ্যবাদের শেকল ছিঁড়ে ফেলে সমাজের নিপীড়িত মানুষদের ক্ষমতায়ণ। তামিল জনতাকে মুক্তচিন্তার পথে চালিত করে রাজ্যের অভূতপূর্ব উন্নয়ন করা। আর এই স্বপ্নই আগামী ৮০ বছর চালিত করবে তাঁকে,মৃত্যুর মুহূর্ত অবধি। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে একবারের জন্যও এই স্বপ্নের পেছনে দৌঁড়ানো বন্ধ করবেন না তিনি।

করুণানিধি ছিলেন পেরিয়ারের স্বাভিমান আন্দোলনে অনুপ্রাণিত। তাঁর গুরু আন্নাদুরাইয়ের মতো তিনিও তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্বের সময় সমাজের আমূল পরিবর্তন করার মতো অসংখ্য কাজ করেছেন। তামিল জনতা আদর করে তাঁর নাম দিয়েছিল ‘কালাইঙ্গার’ – শিল্পী। তাঁর মুখ্যমন্ত্রিত্বেই সমাজের দলিত ও পিছড়েবর্গের জন্য আলাদা মন্ত্রক তৈরি করা হয়। প্রি-ইউনিভার্সিটি লেভেল অবধি বিনামূল্যে শিক্ষার ব্যবস্থা করা হয় সবার জন্য। সমস্ত পরিবহণ ব্যবস্থার পরিষেবার জাতীয়করণ করা, দেশে প্রথম পুলিশ কমিশনের গঠন, দেশে প্রথমবার চাষীদের বিনামূল্যে বিদ্যুৎ দেওয়া,  জেলেদের জন্য বিনামূল্যে আবাসন তৈরি, বিধবা এবং বিধবা বিবাহের জন্য বিশেষ ভাতা ঘোষণা, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য ২০ শতাংশ সংরক্ষণ, তফশিলি জাতিদের জন্য ১৮ শতাংশ এবং তফশিলি উপজাতিদের জন্য আলাদা এক শতাংশ সংরক্ষণ, আরুনথাথিয়ার বা সাফাইকর্মীদের জন্য ৩ শতাংশ সংরক্ষণ, মহিলাদের জন্য সরকারি চাকরিতে ৩০ শতাংশ সংরক্ষণ, আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলোতে মহিলাদের জন্য ৩৩ শতাংশ আসন সংরক্ষণ, তামিলনাড়ুতে মণ্ডল কমিশনের সুপারিশের সফল প্রয়োগ, দুঃস্থ বাচ্চাদের জন্য সরকারের তরফ থেকে প্রতি সপ্তাহে পাঁচ ডিম অথবা কলার সঙ্গে দুপুরের পুষ্টিকর খাবারের ব্যবস্থা করা – এই রকম বহু জনদরদী কাজ করে গিয়েছেন তিনি। তাঁর এই ধরণের বহু কাজ পরে সারা দেশে প্রচলন করা হয়েছে।

তামিলনাড়ুর রাজ্য রাজনীতির বাইরেও জাতীয় রাজনীতিতে করুণানিধি ছিলেন এক উল্লেখযোগ্য নাম। বহু ক্ষেত্রেই ভারতের উত্তর এবং দক্ষিণাংশের সম্পর্কের উন্নতি ঘটানোর কাজ করেছেন তিনি। আবার করুণানিধির জন্য উন্নতি হয়েছে তামিলনাড়ু রাজ্যের স্বায়ত্তশাসনের। বিকেন্দ্রীভূত হয়েছে রাজনীতি ও প্রশাসনিক কাজ। দ্রাবিড় মুন্নেত্রা কাজাঘমের নেতা হিসেবে করুণানিধি ৫০ বছরেরও ওপর অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন তামিলনাড়ুর তামিল জাতিসত্ত্বা ও ভাষার রক্ষায়। ‘কাল্লাকুড়ি; শহরের নাম বদলে ‘ডালমিয়াপুরম’ করার প্রতিবাদে এই করুণানিধিই চলন্ত ট্রেনের সামনে রেললাইনের ওপর শুয়ে পড়েছিলেন।

তামিলনাড়ুর আমজনতার চোখে তিনি ছিলেন এক তামিলরাজা। যাঁকে সমীহ করেন ইন্দিরা গান্ধী, রাজীব গান্ধী থেকে বাজপেয়ী, ভিপি সিংয়ের মতো কেন্দ্রীয় নেতৃত্বও। তাঁরা ভাবতেন তাঁদের এই রাজা তামিল রাজ্যের জন্য কেন্দ্রের থেকে শেষ বিন্দু পর্যন্ত সাহায্য নিঙড়ে নিতে পারবেন।

আবার তিনি ছিলেন জ্যোতি বসু, লালুপ্রসাদ, রামবিলাস পাসওয়ান, মায়াবতী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অজিত সিং, চন্দ্রবাবু নাইডু,দেবেগৌড়ার মতো অন্য আঞ্চলিক নেতাদের পরম বন্ধু।

তামিল রাজনীতি শেষ সামুরাই মুথুভেল করুণানিধি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছেন। কিন্তু তিনি বেঁচে থাকবেন তামিলনাড়ুর অসংখ্য যুবার প্রেরণা হিসেবে। তাঁদের আজকের মুক্তি ও ক্ষমতায়ণের স্বপ্নের পথপ্রদর্শক ছিলেন কালাইঙ্গার। তাঁর আত্মার শান্তি কামনা করি।

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

শালিন মারিয়া লরেন্স তৃতীয় লিঙ্গ ও দলিতদের অধিকার নিয়ে কাজ করেন। তিনি তামিলনাড়ুর একজন পরিচিত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক এবং টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব। 

Shares

Leave A Reply