বুধবার, জানুয়ারি ২৯
TheWall
TheWall

নো পার্কিং জোন/ মৃণালিনী

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

সৌমিলি সরকার

 ‘অনুচ্চারিত পবিত্র সব নিষিদ্ধ কথা’

অলিখিতভাবে  নিষিদ্ধ তো বটেই। কিন্তু, সেই নিষেধের বেড়াজালের তোয়াক্কা না করে সোশ্যাল মিডিয়ায় ঝড় তুলে দিয়েছে  ‘মিটু’। এককথায় মনের মধ্যে জমে থাকা বিক্ষোভের বিস্ফোরণ। সম্প্রতি, শব্দের বিস্ফোরণের ছায়া পড়ল একটি কবিতার বইতেও।

মৃণালিনীর ‘নো পার্কিং জোন’।

‘নো পার্কিং  জোন’- এ  দাঁড়িয়ে মৃণালিনী, ‘কবিতায় অর্থ ও শব্দে’ পৌঁছে গিয়েছেন আগামীর দশকে। সেই সময়ে, ‘অন্ধকার রাতের কোরাস চিরে তোমার সুর/বর্ষার রিমঝিম/নুপুরের ঝম ঝম ময়ূরের পেখম/চাবুকের গভীর কালো দাগে দাগে/ নতুন বসন্ত অজানা উন্মাদে/ নো পার্কিং জোনে লেখা হবে/এবার/অনুচ্চারিত পবিত্র সব নিষিদ্ধ কথা-আমাদের প্রেমের কবিতা।’

নিষিদ্ধ কথা বলার জন্য তিনি বেছে নিয়েছেন শব্দ। তার সঙ্গে শব্দের শরীরে কবিতাকেও। একইসঙ্গে  শব্দকে ভালোবেসে তিনি  উচ্চারণ করেছেন, ‘তোমায় ভালোবেসে ভালোবেসেছি কবিতা/ কবিতার শব্দে শব্দে তোমার শরীর/ তোমার শরীরে শরীরে কবিতা/ আর শব্দ/ শব্দ জুড়ে জুড়ে বাক্য, বাক্য পরিণত হলেই/ তোমার অবয়ব/ শব্দের অর্থ বহুমুখী/ তোমাকে নিয়েই শুরু কবিতা; কবিতার শব্দ ও অর্থে দুঃসাহসী পাগলামি।’

এই দুঃসাহসিকতার পাগলামি  ছড়িয়ে আছে  গোটা  বইটি  জুড়ে।

কী রকম সেই দুঃসাহস আর পাগলামি?

‘মেনোপজের প্রশ্নে ‘ বিজ্ঞানের উত্তর ‘যথোচিত’  হলেও ‘অ্যাডোলেসেন্স পিয়িয়ডের কৌতূহল’ মেটাতে  তিনি অনায়াসে লেখেন, ‘বিড়বিড় কিছু কথা মানেই নতুন অধ্যায়/ প্রেম ভালোবাসা ডট কম’।

তাই,  ‘ইচ্ছেরা সন্ধ্যামালতী হলে রাত প্রথম পা রাখে নো পার্কিং জোনে’ যেখানে দ্রৌপদীর পঞ্চব্যঞ্জনের আস্বাদ গ্রহনের সামনে ‘নো পার্কিং জোন/ ‘আমাদের নিছক গদ্য ভালোবাসা’,  যা অকপটে বলতে পারে  –‘আলোকবর্ষ পরেও জ্যোতিতে জোনাকির আলো/তোমাকে জড়িয়ে আমার রাতভর বৃষ্টি… ‘।

মানুষের  মনের বিচিত্র সব  ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার রূপান্তরও তাঁর চোখ এড়িয়ে যায় না। তিনি  নির্দ্ধিধায় লিখে ফেলেন, ‘ভাবনারা রঙিন হলেই পার্কিং নয়; নো পার্কিং খোঁজে মন, কারণ ‘ইতিহাসের অলিখিত পাতায় স্থান- নো পার্কিং জোন।’

পাশাপাশি,   কখনও আবার তাঁর কবিতায় বেজে ওঠে  শ্লেষোক্তির  প্রবল সুর,  ‘রাষ্ট্রপুঞ্জ থেকে ধার চেয়ে নেব ধারালো শরীর’।

সমসময়কে দেখে সময়ের কাছেই তিনি খুঁজে ফেরেন নিজের  প্রশ্নের উত্তর, ‘ বিষণ্ণ মনের শেষ প্রশ্নের উত্তর দাও হে জগৎজননী’।

কারণ, তাঁর কবিতা  জানে’ ড্যানড্রফের নীতিহীনতা’, আর  ‘বিশ্বাসের প্রতিশব্দ ভেজাল’— ‘হিডেন ক্যামেরায়’ যা সহজেই দেখা যায়।          সভ্য চেহারার অন্তরালে সামাজিক অবক্ষয়ও  দেখে নেয় ‘ নো পার্কিং জোন’ এর কবিতারা। নিস্পৃহ স্বরে তারা জানান দেয়, ‘অবাক করে না ঋতুচক্র নিথর চোখে আজ…’।

নারী ও পুরুষের মন, তাদের চাহিদা ও  সম্পর্ক থেকে চূড়ান্ত  ভালোবাসার পেলব অনুভূতির সঙ্গে অবদমিত যৌনভাবনা—  এমন অনেক চেতন অবচেতন স্তর ওঠে এসেছে এই বইয়ের কবিতায় — যা শুধু নামকরণকেই  সার্থক করে তোলে না,  একইসঙ্গে একজন সার্থক কবির দৃষ্টিভঙ্গী, শব্দ চয়ন আর  প্রকাশ রীতিকে  পূর্ণতা দেয়।   এইসময়ের বাংলা কবিতায় এমন নির্ভীক  শব্দ উচ্চারণ খুব কমই  দেখা যায়।

এখানেই  মৃণালিনীর স্বতন্ত্রতা। তাঁর স্বতন্ত্র শব্দ চয়ন সময়ের সীমারেখা পেরিয়ে পৌঁছে যায় ভবিষ্যতের ঠিকানায়।

‘তবুও প্রয়াস’ থেকে প্রকাশিত বইটির অসাধারন প্রচ্ছদ তৈরী করেছেন রাজদীপ পুরী। বাংলা কোন কবিতার বইয়ের প্রচ্ছদে ইংরেজী হরফ ব্যবহার করাও নিঃসন্দেহে চমকপ্রদ।মোট আঠাশটি কবিতা রয়েছে বইটিতে। কোনটিরই নামকরন করেননি মৃণালিনী।

হয়ত, তাঁর কবিতারা সমসময় থেকে শুরু করে আগামীর একটি ধারাবাহিক শব্দচিত্র ধরে রাখে,  সেইজন্যেই।

বইটি প্রকাশিত হয়েছে  সোশ্যাল মিডিয়ায়  ‘মিটু’ ঝড় আসার আগেই। অথচ, এই প্রসঙ্গেও কত প্রাসঙ্গিক হয়ে যায় তাঁর নির্ভুল উচ্চারণ, ‘যৌনতার নগ্ন নৃত্যে/ দুর্যোধন পিউরিফায়েড – সক্রিয়’।

Share.

Comments are closed.