একসময় পুলিশ হন্যে হতো তাঁর খোঁজে, পাল্টে যাওয়া সেই টারজানকে খুঁজছে কুমারগ্রাম

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো, আলিপুরদুয়ার: এক সময় তাঁর খোঁজে হন্যে হয়ে ঘুরতো পুলিশ। জারি হয়েছিল শ্যুট অ্যাট সাইট নোটিসও। সেই তিনিই রবিবার মারা গেলেন মোটরবাইকের ধাক্কায়। কর্তব্যরত পুলিশকর্মীর পোশাক পরে রাস্তায় নাকা চেকিং চালানোর সময়। এক দিন পর মঙ্গলবারও সেই খবর মেনে নিতে পারছেন না তাঁর স্ত্রী। তিন মেয়ে। আর কেএলও আন্দোলনের আঁতুড়ঘর কুমারগ্রাম।
    রবিবার দুপুরে ফালাকাটার জটেশ্বর সুপার মার্কেট সংলগ্ন এলাকায় একটি মোটরবাইক ধাক্কা মেরে চলে যায় তাঁকে। পুলিশের নজর এড়াতেই মোটর বাইকটি তাঁকে ধাক্কা মারে বলে অভিযোগ। এখনও খোঁজ মেলেনি ঘাতক মোটরবাইক বা তার আরোহীর। আলিপুরদুয়ার জেলা পুলিশ সুপার নগেন্দ্রনাথ ত্রিপাঠি বলেন, “গোটা জেলার পুলিশ মহল শোকাহত। অত্যন্ত নিষ্ঠাবান পুলিশ কর্মী ছিলেন মধুসূদন দাস। সমাজের মুল স্রোতে ফিরতে গত বছর পুলিশে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। এখনও মোটর বাইকটিকে চিহ্নিত করা যায়নি। আমরা সংলগ্ন এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখছি।”
    সমাজের মূল স্রোতে ফিরতে পুলিশে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। জীবনটাকেও পাল্টে ফেলেছিলেন পুরোপুরি। তার সাক্ষী কুমারগ্রাম। একসময় দু হাতে বন্দুক চালানো টারজান শিষ্যত্ব নিয়েছিলেন দেবানন্দ গৌড়ীয় মঠের। তিনি একা নন, স্ত্রী ও তিন মেয়ে সহ বাড়ির সবাই হয়ে গিয়েছিলেন একেবারে খাটি বৈষ্ণব। পরিবারের প্রত্যেক সদস্য সদস্যার কপাল থেকে নাক পর্যন্ত সুন্দর তিলক কাটা। পরনে পরিষ্কার পোষাক। পাল্টে যাওয়া সময়ে গীতা ভগবত পাঠ করে দিন কাটাতে ভালোবাসতেন কেএলওর প্রথম ব্যাচের প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এক সময়ের জঙ্গি টারজান ওরফে মধুসুদন দাস।
    জন্মের পর বাবা মা শখ করে নাম রেখেছিলেন মধুসূদন। আলিপুরদুয়ার হাইস্কুলের সেই ছাত্র যে সমাজের মানুষের মুক্তির পথ খুঁজতে চলে যাবেন সশস্ত্র আন্দোলনের পথে ভাবতে পারেননি তাঁরা। একবার টারজানই বলেছিলেন, “আমাদের বাবা মায়েরা এখনকার দিনের বাবা মায়ের মতো সচেতন ছিলেন না। আমাদের মনের অবস্থা অতটা বোঝার চেষ্টা করতেন না। গরীব মানুষের মুক্তির কথা ভেবে চলে গিয়েছিলাম ভুল পথে। আর সে পথে যাওয়ার প্রশ্ন ওঠে না। সকলের কাছে আবেদন রাখি ওই পথে যেন কেউ না জান। ধর্মের পথই পৃথিবীতে একমাত্র সঠিক পথ।” ‘‘এই আত্মপোলব্ধির আনন্দটা স্থায়ী হল না, এটাই খারাপ লাগছে।’’ বলছেন এক সময়ে হন্যে হয়ে তাঁর পিছনে ছুটে বেড়ানো এক পুলিশ আধিকারিক।
    প্রশিক্ষণের সময় আলফা কম্যান্ড্যান্ট রাজু বড়ুয়া জঙ্গলে গেরিলা যুদ্ধে পারদর্শীতা দেখে মধুসুদনের নাম রেখেছিলেন টারজান। বাঙলাদেশে জীবন সিংয়ের সাথে অনেকবার রাত কাটিয়েছেন দোর্দন্ডপ্রতাপ টারজান। ২০০৩ সালে অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট শুরু হলে ভুটান পাহাড় ছেড়ে নেমে আসেন টারজান। তাঁকে দেখা মাত্র গুলির নির্দেশ ছিল রাজ্য পুলিশের কাছে। ওই বছরই দুর্গা পুজোর আগে জলপাইগুড়ির পুলিশ সুপার সিদ্ধিনাথ গুপ্তার কাছে আত্মসমর্পণ করেন টারজান । আলিপুরদুয়ারের ১ নম্বর ব্লকের শালকুমারে প্রেমিকা নীলিমা দাসের বাড়িতে আত্মগোপন করেছিলেন তখন। সেই পর্বেই সেরে নিয়েছিলেন বিয়েটাও। নীলিমাও কাজ করতেন কেএলওর হয়ে। এখন তাঁদের বড় মেয়ের বয়স আঠেরো। ছোট মেয়ে ক্লাস এইটের ছাত্রী।
    ২০১১ সালে জেল থেকে ছাড়া পেয়েছিলেন টারজান। তারপর একবারে ঘরোয়া জীবন। জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর আবার একবার গ্রেফতার করা হয়েছিল তাঁকে। সে বার আবার ৭০ দিন জেলা খেটেছিলেন টারজান। আর এই ৭০ দিন জলপাইগুড়ি কেন্দ্রীয় সংশোধনাগারে নানা ধর্মের বই পড়েই নাকি সময় কাটাতেন। যা জীবনের গতি পথ ঘুরিয়ে দিয়েছিল টারজানের। ছাড়া পাওয়ার পর প্রতি বছর নিয়ম করে পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়াতেন নানা তীর্থে।
    জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর একসময় নদী থেকে বালি তোলার পারমিট পরিচালনা করে সংসার চালাতেন। বাবা রাজেন্দ্র নাথ দাস ছিলেন কৃষক। সামান্য কিছু জমি রয়েছে। তাতে চাষাবাদ হয়। আর সঙ্গে বালির ব্যবস্থা। এইভাগে দাস পরিবারের তিন কন্যা স্ত্রী বৃদ্ধ বাবাকে নিয়ে ভালোই ছিলেন। তারপর সুযোগ পেয়ে পুলিশের চাকুরিতে যোগ দেন।
    স্মৃতি হাতরাচ্ছেন স্ত্রী নীলিমা। যে পথে গিয়েছিল তা ভুল ছিল। কিন্তু তাতে ওঁর দোষ কোথায়। সমাজের ভালো করার উদ্দেশ্য নিয়েই তো যৌবনে ওই পথে যোগ দিয়েছিলেন। কোনও খারাপ উদ্দেশ্য তো ছিল না। আর্থিক সংকটে ছিলাম আমরা। কিন্তু ভালো ছিলাম। এখন কী করে বাঁচি? ”
    একসময় একই শিবিরে প্রশিক্ষিত মিহির দাস ওরফে মিলটন বলছিলেন, “ আমরা বন্ধু ছিলাম। পাহাড়ে জঙ্গলে কত রাত কতরকম পরিস্থিতিতে কাটিয়েছি। এমন মানুষ এত তাড়াতাড়ি চলে যাবেন, ভেবেই পাচ্ছি না।”

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More