বৃহস্পতিবার, জুন ২৭

ভিড়-জ্যাম এড়িয়ে আকাশেই পথঘাট খুঁজে নিতে পারে শহরবাসী!

দ্য ওয়াল ব্যুরো: শহরের পথঘাট জুড়ে থিকথিক করছে গাড়ি। যানবাহন-অবরুদ্ধ শহরের কোনও এক রাস্তায় একটানা ককিয়ে যাচ্ছে একটি অ্যাম্বুল্যান্স। ততোধিক কষ্ট পাচ্ছেন তার ভিতরে থাকা রোগীও। কিন্তু এই পথ পেরিয়ে হাসপাতালে পৌঁছনো এক রকম অসম্ভব!

পরীক্ষার সময় এগিয়ে আসছে স্কুলপড়ুয়া মেয়েটির। এখনও সিগন্যাল পেরিয়ে এগোতে পারছে না বাবার স্কুটার। একটু পাশ কাটিয়ে বিপজ্জনক টার্ন নিতে গিয়েই, পথের গর্তে পড়ল স্কুটারের চাকা। উল্টে গেল গাড়ি। চোট নিয়ে ছুটতে হল হাসপাতালে। দেওয়া হল না পরীক্ষা!

আধ ঘণ্টার রাস্তা, তবু হাতে ঘণ্টা দুয়েক সময় বেশি নিয়ে বিমানবন্দরের দিকে রওনা হয়েছিলেন এক ব্যবসায়ী। রাজনৈতিক দলের দীর্ঘ মিছিলের কল্যাণে, সময়ে পৌঁছনো হল না। ছেড়ে চলে গেল দেশের বাইরে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি মিটিংয়ে পৌঁছনোর বিমান। চরম ক্ষতি হল ব্যবসায়িক কাজের।

কলকাতা শহরের পথেঘাটে এই দৃশ্যগুলোর কোনওটাই নতুন নয়। কিন্তু, এই সব দৃশ্যই এবার বদলে যেতে পারে অনেকটাই। পথঘাটে বেশ কমতে পারে যানবাহনের সংখ্যা, এড়ানো যেতে পারে দুর্ঘটনার আশঙ্কা। অফিসটাইমে বা স্কুলটাইমে ঠিক সময়ে গন্তব্যে পৌঁছনো আর ততটা কঠিন না-ও থাকতে পারে। শুধু তা-ই নয়, এক ধাক্কায় কমে যেতে পারে শহরের দূষণের পরিমাণও।

কী ভাবে?

জোকার কাছে ভাষায় পরীক্ষামূলক ভাবে চলছে কার্ভো।

‘কনভেয়র অ্যান্ড রোপওয়ে সার্ভিসেস’ সংস্থার কর্ণধার, ৮৪ বছরের বৃদ্ধ শেখর চক্রবর্তী জানালেন, রোপওয়ের ব্যবহারিক প্রয়োগের মাধ্যমে শহরের এই যানবাহন সমস্যার অনেকটাই সমাধান করে ফেলা যায়। কিন্তু রোপওয়ে তো চলে সরলরেখায়। এ শহরের আঁকাবাঁকা পথে কী ভাবে চলবে এই যান? এইখানেই তাঁর বিশেষ আবিষ্কার দিয়ে বাজিমাত করেছেন শেখরবাবু। কার্ভো। রোপওয়েরই এক বিশেষ ধরন, যা শুধু সরললেখায় নয়। আঁকাবাঁকা সর্পিল পথেও যাতায়াত করতে পারে। এই আবিষ্কারের পেটেন্টও রয়েছে শেখরবাবুর। রোপওয়ের ইতিহাসে প্রায় বিপ্লব এনে ফেলা এই আবিষ্কারের কারণে সারা বিশ্বের কাছে সম্মানিত হয়েছেন এই বঙ্গসন্তান। সমাদৃত হয়েছে তাঁর আবিষ্কার।

নিজের অফিসে শেখর চক্রবর্তী।

পার্ক স্ট্রিটের অফিসে বসে শেখরবাবু বলছিলেন, দেশভাগের সময়ে দাদু ও বাবার সঙ্গে ঢাকা বিক্রমপুর থেকে কলকাতায় এসে শুরু হয় তাঁদের বসবাস। কালীধন ইনস্টিটিউশন থেকে স্কুল-পর্ব পেরিয়ে পদার্থবিদ্যায় অনার্স নিয়ে ভর্তি হন স্কটিশ চার্চ কলেজে। ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ার তীব্র ইচ্ছে থাকলেও এবং যাদবপুর ও শিবপুরে পড়ার সুযোগ পেলেও, অর্থাভাবে তা হয়ে ওঠেনি। কিন্তু প্রতিভা যে চাপা রাখা যায় না, তার প্রমাণ হয়ে উঠেছিলেন শেখরবাবু। বিভিন্ন যন্ত্র সম্পর্কে স্বতঃস্ফূর্ত জ্ঞান এবং নিখুঁত ড্রয়িং করার দক্ষতা তাঁকে আলাদা করে তোলে বাকি ছাত্রদের থেকে।

এর পরে, প্রথাগত পড়াশোনার পথে না এগিয়ে, জেসপের কারখানায় ট্রেনিং নিতে শুরু করেন শেখরবাবু। পাঁচের দশকের জেসপ, এশিয়ার অন্যতম প্রধান ক্রেন প্রস্তুতকারী সংস্থা হিসেবে তখন জ্বলজ্বল করছে শিল্পের মধ্যগগনে। সেখানেই মাসিক ৪২ টাকার বিনিময়ে পাঁচ বছরের টানা প্রশিক্ষণের শেষে কলকব্জার বিন্যাস নিয়ে আরও স্পষ্ট হল শেখরবাবুর ধারণা। যে কোনও যন্ত্র বাইরে থেকে দেখেই যেন ভিতরের ছক পরিষ্কার হয়ে যেত চোখের সামনে। সে ছক ড্রয়িং পেপারে নির্ভুল ভাবে এঁকে ফেলাও যেন নিমেষের কাজ ছিল। শুধু তা-ই নয়, নতুন কোনও যন্ত্রের আইডিয়া মাথায় এলে, বা কারও কাছ থেকে পেলেও, কাগজে-কলমে তার ড্রয়িং করে ফেলাটা জলভাত হয়ে উঠছিল সহজাত দক্ষতায়।

কৈলাশগিরিতে শেখরবাবুর রোপওয়ের কাজ।

এই দক্ষতা আর প্রশিক্ষণের জোরেই ডাক পেলেন বিদেশে। চাকরিও করলেন কয়েক বছর। কিন্তু যাঁর মাথায় নিত্যনতুন যন্ত্রের অভ্যন্তরীণ কলকব্জার ডিজ়াইন গিজগিজ করছে, যাঁর মনে নতুন যন্ত্র তৈরির তীব্র খিদে, প্রথাগত চাকরি তাঁর পোষাবে কেন! তবে সেই সঙ্গে এ-ও ঠিক, নিজে কিছু করতে গেলে প্রথাগত ডিগ্রিটুকু দরকার। তাই কয়েক মাস চাকরি করে কিছু টাকাপয়সা জমিয়েই লেগে পড়লেন পড়াশোনায়। অর্জন করলেন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সেরা ডিগ্রি। এবং কিছু দিন পরে, ফিরেও এলেন দেশে।

ব্রিটিশ রোপওয়ে সংস্থা ব্রেকো-তে যোগ দিয়ে কাজ শুরু করলেন ধানবাদ-রানিগঞ্জ-ঝরিয়ার কয়লাবেল্টে। শেখরবাবু জানালেন, কয়লাখনিতে গ্যাস লিক করে বা আগুন লেগে বা অন্যান্য কারণে যে সব দুর্ঘটনা ঘটে, তা আটকানোর একটা বড় উপায় হচ্ছে, প্রচুর পরিমাণে বালি এনে খনিতে ফেলা। এই বালি ফেলার সিস্টেমই বিশেষ ক্রেনের সাহায্যে অত্যন্ত সহজ করে তুলেছিল শেখরবাবুর টিম। “আমরা প্রতি ঘণ্টায় দেড় হাজার টন করে বালি তুলে আনতে পারতাম অজয় ও দামোদর নদীর গভীর থেকে। অনেক সহজ হয়ে গিয়েছিল কাজ। প্রশংসাও পেয়েছিলাম।”—বললেন শেখরবাবু।

কিন্তু ভাল জিনিস এ দেশে সমাদর পায় না কোনও দিনই। তাই এই কাজই নজরে পড়ে গেল দুষ্কৃতীদের। ছয়ের দশকের শেষের দিক, কয়লাখনিগুলির সরকারিকরণ হচ্ছে তখন। সেই সঙ্গে উঠে আসছে বালি মাফিয়ারা। কয়লাখনির কাজে যে বালি লাগে, তা জোগান দেওয়ার একচ্ছত্র কারবার তাদের হাতে রাখার চেষ্টা শুরু হল। ফলে যা হওয়ার তা-ই হল, “অন্তর্দ্বন্দ্বের শিকার হল আমাদের ওই প্রকল্প।”— বললেন শেখরবাবু। সেই সঙ্গে জানালেন, এর পরেই নদীর পাড় থেকে অবাধে বালি তোলা শুরু হল। যন্ত্রের মাধ্যমে যতটা গভীর থেকে এবং যতটা সহজ পদ্ধতিতে ভিতরের মাটি ওঠানো যেত, ম্যানুয়ালি, ট্রাকে করে তা কখনওই সম্ভব নয়। ফলে ফাঁকা হতে শুরু করল নদীর পাড়। শেখরবাবু জানালেন, এখন যে এই নদীগুলির সংলগ্ন এলাকায় বছর-বছর এত বন্যার প্রকোপ, তা অনেকটাই এড়ানো যেতে পারত সেই সময়ের যান্ত্রিক পদ্ধতিটি চালু থাকলে।

এ সব পাট চুকিয়ে ১৯৭৪ সালে জন্ম নিল শেখরবাবুর নিজের সংস্থা, ‘কনভেয়র অ্যান্ড রোপওয়ে সার্ভিসেস’। আর তার পরেই তাঁর পাখির চোখ হল, লব্ধ জ্ঞান, বুদ্ধি এবং মেধা ও দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে মানবকল্যাণকে আরও এগোনোর জন্য কোনও এক নতুন পথ খোঁজার চেষ্টা। শেখরবাবুর আক্ষেপ, “প্রতি বছর কয়েক লক্ষ ইঞ্জিনিয়ার তৈরি হচ্ছেন দেশে।কিন্তু তাঁদের সেই বিপুল শিক্ষার প্রতিফলন কই? নতুন কাজ কই, আবিষ্কার কই, যন্ত্রের ব্যবহারিক প্রয়োগে মানুষের শ্রম হ্রাস করার যে চিরন্তন বিজ্ঞান, তার উত্তরোত্তর বৃদ্ধি কই?”

দার্জিলিঙের রোপওয়েও তাঁরই তৈরি।

এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় কার্ভোর আইডিয়া। যার বাস্তবায়ন এ শহরের পরিবহণ মানচিত্রকেই বদলে দিতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। শেখরবাবুর দাবি, আন্তর্জাতিক পেটেন্ট নেওয়া এই প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে যানজট ও দূষণের জোড়া সমস্যা মোকাবিলা করা সম্ভব। প্রকল্পের রূপরেখাও তৈরি। আজ নয়, চার বছর আগেই। শিয়ালদহ থেকে বিবাদী বাগ—এই রুটে রোপওয়ে চালানোর পরিকল্পনা সরকারকে জমা দেন তিনি। শেখরবাবু জানান, পাইলট প্রকল্প হিসেবে এই রুট বেছে নেওয়ার কারণ শহরের অন্যতম ব্যস্ত এই পথে যান চলাচল ও যাত্রী সংখ্যার অত্যধিক চাপ। রোপওয়ের প্রতি কিলোমিটার তৈরি করতে খরচের পরিমাণ দাঁড়াবে ২০ কোটি টাকা। অন্য দিকে যান চলাচল ও যাত্রী পরিবহণ ব্যবস্থায় স্বস্তি আনতে উড়ালপুল বা মেট্রোর মতো পরিকাঠামো তৈরি অনেকটাই ব্যয়সাপেক্ষ। বিশেষজ্ঞদের মতে, উড়ালপুলের প্রতি কিলোমিটার তৈরি করতে গড়ে খরচ হয় ৭০ কোটি টাকা। মেট্রো তৈরি করতে কিলোমিটার প্রতি খরচের পরিমাণ ৩০০ কোটি টাকা।

কী বলছেন শেখরবাবু, দেখে নিন ভিডিও।

ব্যয়ের পাশাপাশি রয়েছে দূষণ ও গতির বিষয়ও। কার্ভো রোপওয়ের নির্মাতা সংস্থার দাবি, দূষণহীন এই যান ব্যবস্থার গতি থাকবে ঘণ্টায় ১২.৫ কিলোমিটার। যেখানে তথ্য বলছে, কলকাতায় যান চলাচলের গড় গতি ৭ কিলোমিটার। শেখরবাবু জানালেন, প্রতি কিলোমিটারে মাত্র ১৭ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ প্রয়োজন এই রোপওয়ে চালাতে। গোটা শহরকে এই যান ব্যবস্থার সুযোগ পাইয়ে দিতে দিনে লাগবে ১১ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ। এ ছাড়াও স্টেশন তৈরি করতে জমির প্রয়োজন ন্যূনতম বলে জানান তিনি। ফুটপাথেই তৈরি হতে পারে টাওয়ার ও স্টেশন। এর জন্য টাওয়ার পিছু দুই বর্গ মিটার জায়গা হলেই যথেষ্ট। শিয়ালদহ থেকে বিবাদী বাগ যাওয়ার জন্য যাত্রী পিছু ১৫-১৭ টাকা ভাড়া যথেষ্ট হবে বলেই দাবি তাঁর।

মেয়ে রচনার সঙ্গে শেখরবাবু।

এই প্রকল্প রাজ্য সরকারের দ্বারা অনুমোদিত হলেও, কোনও এক অজ্ঞাত কারণে, লালফিতের ফাঁসে আজও আটকে রয়েছে তার রূপায়ন। আর ৮৪ বছরের শেখরবাবু স্বপ্ন দেখছেন, শহরের গতির ইতিহাসে বিপ্লব আনবেন তিনি। সাত তলার অফিস থেকে নীচে তাকিয়ে চোখে পড়া যানবহুল ও অবরুদ্ধ রাস্তার দিকে তাকিয়ে ভাবছেন, এই পথেই রোপওয়েতে করে মানুষ সহজে পার করছেন ব্যস্ত সময়। আক্ষেপ একটাই, দিন নষ্ট হয়ে যাচ্ছে একটা একটা করে।

তাঁর সঙ্গেই সংস্থার কাজকর্ম সামলানোর দায়িত্ব নিয়েছেন মেয়ে রচনা। বাবার স্বপ্ন এগিয়ে নিয়ে যেতে সর্বোচ্চ চেষ্টা রয়েছে তাঁরও।

Leave A Reply