শনিবার, নভেম্বর ২৩
TheWall
TheWall

দু’টি ছবি, মাঝে মাত্র একটা বছর! বদলের গল্প লিখেছে ‘অবসন্ন শিশু’ গ্রেটা থুনবার্গ

  • 1.2K
  •  
  •  
    1.2K
    Shares

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

মাত্র এক বছর আগের কথা। স্কুল-পালানো একটা বাচ্চা মেয়ে, প্রতি সপ্তাহের শুক্রবার করে বসে থাকত পার্লামেন্টের সামনে। একা। সঙ্গী বলতে, কয়েকটা প্ল্যাকার্ড। কেউ পড়ত, কেউ পড়ত না। যারা পড়ত, তারা দেখতে পেত পরিবেশ রক্ষা নিয়ে কী সব লেখা আছে। কিন্তু পড়ে বা না পড়ে, সকলেই পাশ কাটিয়ে চলে যেত। কেউ কেউ আবার বকাবকিও করত, এইটুকু মেয়ে স্কুল কামাই করে পার্লামেন্টের দুয়ারে কেন! কেউ কেউ তো ভেবেই নিয়েছিল, সে এক মানসিক ভারসাম্যহীন, অবাধ্য কিশোরী।

বদলের একটা বছর…

ঠিক একটা বছর পার হয়েছে। সারা বিশ্ব জুড়ে কাতারে কাতারে ছেলেমেয়েরা পথে নেমেছে প্ল্যাকার্ড হাতে। দাবি তুলছে পরিবেশ রক্ষার, চিৎকার করে স্লোগান দিয়ে সারা বিশ্বকে সচেতন করার চেষ্টা করছে আসন্ন বিপদের কথা বলে। মানুষের তৈরি করা দূষণের সীমা বাড়তে বাড়তে গোটা পৃথিবী ধ্বংস হতে বসেছে, তাকে বাঁচাতে হবে। প্যারিস থেকে পাকিস্তান, তিউনিশিয়া থেকে তুর্কী– লক্ষ মানুষের মিছিলে অবরুদ্ধ পথঘাট।

আর এই এক বছরের মাঝে থেকে গেছে, সেই ‘মানসিক ভারসাম্যহীন’, ‘অবাধ্য’, ‘স্কুলপালানো’ কিশোরীটির নিঃশব্দ লড়াই। পৃথিবীর জন্য নিজের পড়াশোনা, কেরিয়ার, কৈশোর– সমস্তটা বাজি রাখা এক আগুনে-মেয়ে। হাল ছাড়তে না জানা এক ‘অবসন্ন’ তরুণী। সুইডেনের ষোড়শী গ্রেটা থুনবার্গ।

অবসাদের শিকার হওয়া সেই ছোট্ট শিশু…

হ্যাঁ, গ্রেটা থুনবার্গ আদতে অবসাদের শিকার। ২০১১ সালে, মাত্র ৮ বছর বয়সে প্রথম জলবায়ু বদলে যাওয়ার কথা অর্থাৎ ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’-এর কথা জানতে পারে ছোট্ট মেয়েটা। তার পর থেকেই অবসন্ন হতে শুরু করে সে। প্রথমে স্বাভাবিক ভাবেই বোঝা যায়নি, এতটুকু মেয়ের এই অবসাদের কারণ। কিন্তু যত দিন যায়, সমস্যা বাড়তে থাকে। এক সময়ে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিতে থাকে সে।

গ্রেটার মা অপেরা গাইকা ম্যালিনা ইমান, বাবা অভিনেতা ভ্যানতে থুনবার্গ। উদ্বিগ্ন বাবা-মা মেয়েকে নিয়ে যান চিকিৎসকের কাছে। এবং তাঁদের বিস্মিত করে দিয়ে চিকিৎসকেরা জানান, ‘অ্যাস্পারগারস সিনড্রোম’-এ ভুগছে গ্রেটা। কোনও এক নির্দিষ্ট কারণে, সমাজ-পরিবার থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। তার মনে হচ্ছে, তার চার পাশে যা কিছু হচ্ছে, তা ঠিক নয়। সে খাপ খাওয়াতে পারছে না।

আমায় হয়তো মরে যেতে হবে…

চলে কাউন্সেলিং। দীর্ঘ দিন ধরে। আর সেখানেই উঠে আসে, পৃথিবীর এই মৃত্যুর মুখে এগিয়ে যাওয়ার ঘটনা তাকে তুমুল ব্যথিত করেছে। স্তব্ধ করে দিয়েছে ভেতর থেকে। সবাই সব জানার এবং বোঝার পরেও যে ভাবে পরিবেশের ক্ষতি বাড়িয়ে যাচ্ছে, তা মেনে নিতে পারছে না গ্রেটা। কাউন্সেলিং-এর সময়ে সে স্বীকারও করেছিল, “পৃথিবীকে বাঁচাতে না পারলে আমায় হয়তো মরে যেতে হবে।”

স্কুলড্রেস পরা মেয়ে ব্যাগ কাঁধে ঢুকবে পার্লামেন্টে!

স্বাভাবিক ভাবেই গ্রেটাকে আগলে রাখতেন মা-বাবা। বোঝাতেন অনেক। কিন্তু গ্রেটার প্রশ্ন ছিল একটাই। “আমরা কেন কিছু করতে পারি না।” কিশোরী গ্রেটা ঠিক করে, পার্লামেন্টে গিয়ে রাষ্ট্রনেতাদের জানাবে তার কনসার্নের কথা। অনুরোধ করবে, প্রকৃতি রক্ষার জন্য উদ্যোগী হতে। এক দিন স্কুলে যাওয়ার পথেই সটান চলে যায় পার্লামেন্টে। কিন্তু স্কুলড্রেস পরা, পিঠে ব্যাগ নেওয়া ছোট্ট কিশোরীকে কে ঢুকতে দেবে পার্লামেন্টে!

অবসাদের বারুদে প্রতিবাদের আগুন…

গ্রেটার ভেতরের অবসাদ তত দিনে জ্বলে উঠেছে প্রতিবাদ হয়ে। দাঁতে দাঁত চেপে সে ঠিক করে নিয়েছে, বেঁচে থাকলে পৃথিবীকে বাঁচানোর দায়-ও নিতে হবে। কেউ না নিলে একাই। সেই শুরু। প্রত্যেক শুক্রবার স্কুল কামাই করে, সুইডেনের পার্লামেন্টের সামনে এসে বসে থাকত গ্রেটা। একা। কিছু দিন পর থেকে সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের নজর কাড়ে সে। নানা জাতীয় ও আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় খবর হয়, স্কুল-পালানো মেয়ের কথা।

এর পর থেকেই যেন রূপকথার শুরু।

রূপকথার নাম: ফ্রাইডে ফর ফিউচার…

গ্রেটার অনুপ্রেরণা প্রথম সাড়া ফেলে অস্ট্রেলিয়ায়। গত ডিসেম্বর মাসে কয়েক হাজার ছাত্র-ছাত্রী পরিবেশ রক্ষার মিছিলে যোগ দিয়েছিল সে দেশে। ক্রমে এই আন্দোলনের স্রোত ছড়িয়ে পড়ে বেলজিয়াম, সুইটজারল্যান্ড, জাপান, আমেরিকা, ব্রিটেন ও কানাডায়। আফ্রিকা ও দক্ষিন আমেরিকার খুদে পড়ুয়ারাও গ্রেটার আন্দোলনে সামিল হয়েছে। বাদ নেই ইউরোপের প্রায় ২৭০টি শহরের ৭০ হাজারের বেশি স্কুল পড়ুয়া। প্রতি শুক্রবার করে স্কুল না গিয়ে পথে নামে তারা। তাদের হাতে পোস্টার, যার ট্যাগলাইন #ফ্রাইডে ফর ফিউচার।

নড়ে বসে প্রশাসন…

এর পরে, ফেব্রুয়ারি মাস থেকে ব্রিটেনের বিভিন্ন শহরের পড়ুয়ারাও স্কুল বন্ধ করে বিক্ষোভ শুরু করে। ছাত্র-ছাত্রীদের এই কর্মসূচীকে সাধুবাদ জানিয়ে ধীরে ধীরে শিক্ষক-শিক্ষিকা, একাধিক স্বেছাসেবী সংস্থা ও ছাত্র সংগঠনও যুক্ত হয় এই আন্দোলনে। ১৫ ই ফেব্রুয়ারি লন্ডন, এডিনবার্গ, কার্ডিফ, বেলফাস্ট, কেমব্রিজ, ব্রাইটন, ম্যাঞ্চেস্টার-সহ ব্রিটেনের প্রায় ৬০টি শহরে স্কুল বন্ধ করে পথে নামে পড়ুয়ারা। স্কুল ইউনিফর্ম পরে লন্ডনের রাজপথে খুদেদের মিছিলের জেরে থমকে যায় ট্র্যাফিক। মিছিলে যাওয়ার পথ করে দিতে দেখা যায় সাধারণ মানুষদের। বিক্ষোভের আঁচ গিয়ে পড়ে ডাউনিং স্ট্রিটেও। নড়ে বসে প্রশাসন।

“এত আস্পর্ধা কী করে হয়!”…

এখন বিশ্বের প্রায় সব ক’টি দেশের বেশির ভাগ শহরে এই আন্দোলনের স্রোত বইতে শুরু করেছে। আগামী শুক্রবার পথে নামার কথা কলকাতারও। আর এ সবের মাঝে আরও বেশি করে জ্বলে উঠেছে সে দিনের সেই একরোখা জেদী কিশোরী মেয়েটি। সারা বিশ্বকে প্রতিবাদে তাতিয়ে দিয়ে, পরিবর্তনের কাজটা শুরু করে দিয়েছে সে। একই সঙ্গে নিজে পৌঁছে গেছে রাষ্ট্রপুঞ্জের মঞ্চেও। চড়া গলায়, রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে রাষ্ট্রনায়কদের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছে, “মিথ্যে কথা বলে, আমাদের শৈশব নষ্ট করে দেওয়ার আস্পর্ধা আপনাদের কী করে হয়!” মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের উদ্দেশে তার অগ্নিদৃষ্টির ভিডিও এখন সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল।

নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনীত…

গ্রেটা আসলে মেনে নিতে না পারা এক কিশোরী। ভয় না পাওয়া, বশ্যতা স্বীকার না করা এক কিশোরী। পৃথিবীর ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা জানার পরেও তা মেনে নেওয়া তো এক রকম বশ্যতাই! এই বশ্যতার উল্টো দিকে, অবাধ্য, জেদী গ্রেটা বিশ্বাস রেখেছে, এই পৃথিবীটা যতটা রাষ্ট্রনায়কদের, ততটাই তাদের মতো তরুণ প্রজন্মেরও। তাই পৃথিবীর স্বার্থে, ভরা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে তাবড় দেশনেতাদের সামনে ক্ষোভ, বিরক্তি, চিৎকার ছুড়ে দিতে একটুও দ্বিধা হয় না তার।আগামী নোবেল পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন পেয়েছে সে।

কুর্নিশ গ্রেটা!

পার্লামেন্টের সামনে একা বসে থাকা স্কুলপালানো মেয়ের এই অগ্নিকন্যা হয়ে ওঠার পথকে কুর্নিশ করছে সারা বিশ্ব। নেট-দুনিয়া জুড়ে আজ উপচে পড়ছে প্রশংসা আর বিস্ময়। এক বছর আগেও যা দেখে অনেকের মনে হয়েছিল এ হয়তো কিশোরবেলার চাপল্য, সেটাই যে আজ আমাদের গ্রহটাকে বাঁচানোর সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ লড়াই হয়ে উঠবে, তা কে ভেবেছিল!

Comments are closed.