বুধবার, মার্চ ২০

বউ কেনার হাট! লক্ষ লক্ষ টাকায় কুমারী মেয়েদের হাটে বিক্রি করাই ঐতিহ্য এই সম্প্রদায়ের

চৈতালী চক্রবর্তী

দূর থেকে দেখলে মনে হবে রঙিন মেলা বসেছে শহরের প্রান্তে। কাছে গেলে ততটাই তাজ্জব হতে হয়। মেলার মতোই সাজানো গোছানো চারপাশ। জিনিসপত্রের পসরা সাজিযে বসেছেন দোকানীরা। মানুষজন রঙবেরঙের পোশাকে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। সবচেয়ে বেশি দৃষ্টি আকর্ষণ করে আধুনিক ও ট্রাডিশনাল সাজে এক ঝাঁক তরুণীর ভিড়। মডেলিংয়ের কায়দায় তারা হেঁটে বেড়াচ্ছে, নাচছে, আর পাশেই তাদের অভিভাবকরা দাঁড়িয়ে তারস্বরে নিলামের কায়দায় দর হাঁকছে। যে মেয়ে যত সুন্দর তার দর ততটাই বেশি। একবিংশ শতকের ডিজিটাল বিশ্বে দাঁড়িয়ে মেয়ে কেনাবেচা! এমনটাও হয়?

মধ্য বুলগেরিয়ার স্টারা জাগোরা। বসন্তের শুরুতে এখানকার একটি মেলা প্রাঙ্গনে দাঁড়িয়ে এমনই প্রশ্ন মনে জেগেছিল একদল সাংবাদিকের। মেলা নয় আসলে ব্রাইড মার্কেট। বাংলা অর্থ করলে দাঁড়ায় বউ কেনার হাট। শুনতে খারাপ লাগলেও এটাই ঐতিহ্য এখানকার এক সম্প্রদায়ের। এই সম্প্রদায়কে স্থানীয়রা বলে কালাইদঝি। তরুণী ও কুমারী মেয়ের বর খোঁজার জন্যই এমন হাটের আয়োজন। রীতিমতো দাম দিয়ে কালাইদঝিরা তাদের মেয়েদের এই হাটে বিক্রি করে। ১৩-২০ বছরের মেয়েদের চাহিদা বেশি, দামও চড়া। বয়স বাড়লে দরও কমে।

কারা এই কালাইদঝি?

দ্য ট্রাকিস্কি কালাইদঝি হল পূর্ব ইউরোপের এক প্রাচীন জনগোষ্ঠীর নাম। গোঁড়া খ্রিষ্টান এই জনজাতিরা রোমা সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। মূলত জাজাবর জনজাতি। এক জায়গায় থিতু হওয়া এদের অভ্যাসে নেই। পূর্ব ইউরোপে এই সম্প্রদায়ের প্রায় ১৮,০০০ মানুষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছেন।

তামার জিনিসপত্র তৈরি করাই এদের পেশা। তবে বর্তমানে কালাইদঝিরা নানা পেশার সঙ্গে যুক্ত। অভাব এদের নিত্যসঙ্গী। তাই পছন্দের জীবনসঙ্গী খুঁজে নেওয়ার জন্য এমন মেলারই আয়োজন করে থাকে কালাইদঝিরা। এটা তাদের রোজগারের একটা পন্থাও। অনেকেই রোমা সম্প্রদায়ের এই জনগোষ্ঠীর এমন রেওয়াজকে মধ্যযুগীয় বর্বরতা আখ্যা দিলেও, তাদের কাছে এটাই ঐতিহ্য এবং পেশাও বটে।

কেমন হয় এই ব্রাইড মার্কেট

বছরে চার বার এমন মেলার হয়। তবে বসন্তের মেলার মেজাজ কিছু আলাদা। মূলত ফাঁকা মাঠেই হয় এলাহি আয়োজন। সকাল হতেই মেয়েদের সাজিয়ে গুছিয়ে বাবা-মায়ের হাজির হয়ে যায় মেলার মাঠে। মঞ্চও তৈরি থাকে। যারা একটু বেশি গাঁটের কড়ি খসায়, তারা মেয়েদের সার বেঁধে মঞ্চের উপর তুলে দেয়। তার পর শুরু হয় দর হাঁকা। মেলায় বউ কিনতে নানা জায়গা থেকে হাজির হয় পুরুষেরা। নিলামের মতো হাঁকডাক করে যে পুরুষ বেশি দাম দেয়, তার হাতেই মেয়েকে তুলে দেয় তাদের অভিভাবকরা।

তরুণীদের সাজ পোশাকও দেখার মতো। ব্রাইডাল স্কার্টের সঙ্গে ঝলমলে টপ থেকে ট্রাডিশনাল, পোশাকের বাহারও রকমারি। আধুনিক ওয়েস্টার্ন আউটফিটেও স্বচ্ছন্দ অনেকে। পোশাকের সঙ্গে নজর কাড়ে তাদের গয়না আর চুলের বিন্যাস। সেই সঙ্গে চড়া মেকআপ তো রয়েছেই।

পছন্দের পাত্রী কেনার পাশাপাশি খানাপিনারও বেশ ঢালাও আয়োজন থাকে মেলায়। গ্রিল করা মাংস আর বিয়ার থাকে পছন্দের তালিকায়। তা ছাড়াও অন্যান্য দেশের কুইসিনও রাখা হয়। জীবনসঙ্গী পছন্দ হয়ে যাওয়ার পর নাচ-গান-হুল্লোড় শুরু হয়।

নাবালিকা বিয়ে এখানে বৈধ

মেলা. উৎসব সবই হল, তবে রোমা সম্প্রদায়ের মেয়েরা এই বিয়েতে কতটা খুশি হয় বা আদৌ খুশি হয় কিনা সেই প্রশ্ন তাদের বয়জ্যেষ্ঠদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়। কালাইদঝিরা সবকিছুকেই তার রোজগারের নিরিখে মাপঝোপ করে। এই বিয়ের মূল শর্ত হল মেয়েদের ভার্জিনিটি। কুমারিত্ব হারিয়ে ফেললে তাকে দাম দিয়ে কেউ কিনবে না। তাই একটি মেয়ে প্রথম রজঃস্বলা হওয়ার পরই তাকে বাড়িতে বন্দি করে ফেলে কালাইদঝি বাবা-মায়েরা। স্কুলে যাওয়াও নিষিদ্ধ হয়ে যায় কিশোরীর। বাড়িতেই একটু একটু করে তাকে বিয়ের জন্য প্রস্তুত করে তুলতে শুরু করে তার অভিভাবকরা। মেয়েকে শেখানো হয় কেমন আদব-কায়দা, পোশাক ও হাবভাব করলে তাকে একটি ছেলের পছন্দ হতে পারে। যত সুন্দরভাবে সে নিজেকে মেলে ধরবে, ততটাই বেশি দাম পাবে তার পরিবার।

এমন মেলা নিয়ে ডকুমেন্টারি করার জন্য দুই চিত্রপরিচালক মিলেন লারসন ও অ্যালিস স্টেইন বুলগেরিয়া গেছিলেন। তাঁরা জানিয়েছেন, এখানকার মেয়েদের অভিজ্ঞতা ভয়াবহ। বাইরে থেকে যতটা চাকচিক্য, আমোদ নজরে পড়ে ভিতরে ততটা নয় মোটেই। অনেকটা জোর করেই মেয়েদের সাজিয়ে মেলায় নিয়ে আসে তাদের বাবা-মায়েরা। আড়াই লক্ষ টাকা থেকে সাড়ে চার লক্ষ টাকা অবধি মেয়েদের দর ওঠে। কমবয়সী নীল চোখের সুন্দরীদের দাম আরও বেশি। অনেক মেয়েই জানিয়েছে, পাত্র পছন্দ না হলেও দাম বেশি দিলে তার হাতেই হাত রাখতে হয়। অপছন্দের মানুষের সঙ্গে কাটাতে হয় সারাটা জীবন। বিয়ের আগে প্রমাণ দিতে হয় সে ভার্জিন কিনা। মিথ্যা প্রমাণিত হলে চরম তীরস্কারের পাশাপাশি জরিমানাও দিতে হতে পারে তার পরিবারকে।

বুলগেরিয়ার একজন নৃতত্ত্ববিদ ভেল্কো ক্রুস্টেভ এই মেলা সম্পর্কে বলেছিলেন,  এখানে জীবনসঙ্গী খোঁজার মূলমন্ত্র হল ‘অর্থ’। পশুদের শিকলে বেঁধে হাটে বেচার মতো, দর হেঁকে মেয়েদের বিক্রি করা হয়। তাঁর কথায়, “বউ কেনার নামে পুরুষরা আসলে মেয়েদের সম্মান কিনে নেয়। সংস্কৃতির আড়ালে চলে ব্যবসায়িক লেনদেন।”

এত কিছুর পরেও কালাইদঝিরা কিন্তু তাদের এই সংস্কৃতিকে হারাতে মোটেও রাজি নয়। বর্তমানে কালাইদঝি তরুণ-তরুণীরা প্রথা মানতে অস্বীকার করলেও, তাদের চোখ রাঙিয়ে সামলে রাখে পরিবারের বয়জ্যেষ্ঠরা। তারা মনে করে এই প্রথার অন্যথা হলে একদিন গোটা কালাইদঝি গোষ্ঠীই অবলুপ্তির পথে চলে যাবে।

Shares

Comments are closed.