মানবিকতার বিশ্বায়ন কবে? প্রথম কুর্মালি ছবি ‘ডেথ সার্টিফিকেট’

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    চৈতালী চক্রবর্তী

    ‘কী চাও?’

    ‘একটা ডেথ সার্টিফিকেট!’

    না, সারকাসম নয়, এটাই বাস্তব। একটা ঘোর বাস্তব। এক টুকরো কাগজের পাতায় লেখা নাম, ঠিকানা আর মৃত্যুর সময় একটা মানুষের পরিচয় হয়ে ওঠে অজান্তেই। চিরনিদ্রায় শায়িত মানুষটির অস্তিত্বকে জানান দেয় একটা ডেথ সার্টিফিকেট। এটাই রূঢ় বাস্তব, আমলাতান্ত্রিক জটিলতার একটা কালো দিক। মৃত্যুর থেকে বড় সত্যি তো আসলে নেই, জীবনের সংজ্ঞাও যেমন আছে, মৃত্যুর যন্ত্রণাও তারই মধ্যে অন্তর্নিহিত। কিন্তু এই মৃত্যুই যখন একটা অন্তঃসার শূন্য কাগজের পাতায় মামুলি কয়েকটা তথ্যনির্ভর হয়ে পড়ে, তখন সেটা শুধু শরীরের মৃত্যু হয় না, হয় একটা মানবিকতার মৃত্যু, মূল্যবোধের মৃত্যু, ভালোবাসার মৃত্যু। ‘ডেথ সার্টিফিকেট’ তাই কোনও সরকারি স্ট্যাম্প মারা নথি নয়, একটা প্রতীক। অন্তঃসলিলা ফল্গুধারার মতো সমাজের বুকে বয়ে চলা একটা Genocide। এই সত্যটাই ছবির পরতে পরতে ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক রাজাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়।

    ছবির নামও তাই ‘ডেথ সার্টিফিকেট’। বাবা প্রখ্যাত সাহিত্যিক দেবাশিস বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্প ‘ডেথ সার্টিফিকেট’ অবলম্বনে ছবির কাহিনী।

    রাজাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়। ছবি সৌজন্যে: শুভজিৎ চন্দ

    পৃথিবীর নানা প্রান্তের চলচ্চিত্র উৎসব ঘুরে সম্প্রতি কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে দেখানো হয়েছে এই ছবি।  পুরুলিয়া-ঝাড়খণ্ডের লাল মাটির দেশে এক কুর্মি রমণীর চাওয়া-পাওয়া, হারানোর গল্প। আদ্যপান্ত ছবিটাই কুর্মালি ভাষায়। রুক্ষ প্রকৃতির মাঝে বেড়ে ওঠা একটি মেয়ে সমাজের জটিল শৃঙ্খলের নাগপাশে আবদ্ধ। ছটফট করতে করতে প্রতি মুহূর্তে বাঁচার লড়াইটাই এই ছবির ভাবনা। সে জানে তার স্বামী মৃত, আর ফিরবে না, তাও সেই হারিয়ে যাওয়া প্রেমকে শেষবারের মতো ছোঁয়ার জন্য শুরু হয় এক অনন্ত লড়াই। এক চিরন্তন খোঁজ। স্বামীর দেহ ফেরাতে গেলে দরকার একটা ডেথ সার্টিফিকেট। আদিবাসী কুর্মি মেয়েটি জানেই না সেই বিষম বস্তুটি কী, যা তার ও তার প্রিয়তমের মধ্যে এক দুর্লঙ্ঘ প্রাচীর হয়ে রয়েছে। কাগজের সেই টুকরোটা হাতে পেলেই সে ফিরে পাবে তার অর্ধেক আত্মাকে। অথচ কী জটিল এই জীবনযুদ্ধ!  একটা কাগজের টুকরো মুঠোবন্দি করতে প্রান্তিক মেয়েটিকে যে লড়াইটা লড়তে হয়েছে সেটাই বড় বাস্তব ভাবে ছবিতে ফুটিয়ে তুলেছেন পরিচালক।

    “ডেথ সার্টিফিকেট গল্পটা বাছার কারণ প্রথমত আমি মানবিক বিষয় নিয়ে কাজ করতে চেয়েছি, আমি প্রান্তিক মানুষদের কথা বলতে চেয়েছি, বলেওছি প্রবাসে আমার নাটকে, থিয়েটারে। বাবার এই গল্পটা আমাকে ভীষণভাবে নাড়া দেয়, কারণ এই গল্পে যে পৃথিবীর ছবি তিনি দেখিয়েছেন আমাদের, সেই পৃথিবীর সঙ্গে আমাদের বিশেষত তরুণ প্রজন্মের কোনও পরিচয় নেই”, ছবি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে জানালেন পরিচালক রাজাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়। দাদা প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক বাপ্পাদিত্য বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যু হয়েছে আগেই, তার এগারো মাসের মধ্যেই হারিয়েছেন বাবাকে। মৃত্যুকে খুব কাছ থেকে স্পর্শ করার অনুভূতি যেন এক হৃদয় নিংড়ানো যন্ত্রণার মতো বাইরে বেরিয়ে এল, বললেন, “বাবা তখনও বেঁচে যখন তাঁর গল্প ডেথ সার্টিফিকেটকে সিনেমার রূপ দিচ্ছি। ভাবতেই পারিনি কখনও সেই বাবার ডেথ সার্টিফিকেটই হাতে উঠে আসবে।”

    গোটা ছবিতে একটা ক্যানভাস এঁকেছেন পরিচালক। রঙ-তুলিতে জীবন্ত হয়ে উঠেছে এক একটি চরিত্র। বৃষ্টির ফোঁটা, পাহাড়ি বাঁক আর রেলগাড়ির চলমানতার মাঝে ভাসমান রূপকথা যেন। অথচ বাস্তবের এক আশ্চর্য মেলবন্ধন। সাবিত্রী। এক কুর্মি মেয়ে তার স্বামী রামলখনকে খুঁজতে বেরিয়েছে। রামলখন রেলস্টেশনের ‘পানিপাঁড়ে।’ স্টেশনে আসা তৃষ্ণার্ত যাত্রীদের জল খাওয়ায় সে, এটাই তার পেশা। একদিন সাবিত্রী জানতে পারে তার স্বামী রামলখন নিখোঁজ। সে দিনই গ্রামে যাত্রা বসেছে। সাবিত্রী-সত্যবান পালা। সাবিত্রী যখন যাত্রা দেখতে যায়, রামলখনের বন্ধু শিবু এসে জানায় রামলখন সারাদিন স্টেশনে আসেনি। হাতে লন্ঠন নিয়ে তখন স্বামীকে খুঁজতে বার হয় সাবিত্রী, সঙ্গী হয় রামের দাদু ও বন্ধু শিবু। পাহাড়ি পথ ভেঙে, জঙ্গলে ঘেরা নদীর বাঁক পেরিয়ে সেই যে খোঁজ, তাকে কেন্দ্র করেই এগিয়ে চলে গল্প। স্টেশনমাস্টার জানায়, ট্রেনে কাটা পড়েছে এক ব্যক্তি। সে কি তবে রামলখন?

    গল্পের মাঝে মাঝে মোচড় দেয় ফ্ল্যাশব্যাকে ভেসে ওঠা সাবিত্রী-রামলখনের প্রেমের টুকরো টুকরো দৃশ্য। এক হাতে ছৌ নাচের দেবী মুখোশ অন্যহাতে সাবিত্রীর মুখ তুলে ধরে অকপটে চেয়ে রয়েছে রামলখন। সাবিত্রীর দু’চোখে লজ্জা, শরীরী শিহরণের এক অদ্ভুত বহিঃপ্রকাশ, প্রিয় মানুষটির বাহুপাশে নিজেকে সম্পূর্ণ সমর্পিত করে দেওয়ার বাসনা। পরিচালক বললেন, “একটি নারী-পুরুষের প্রেম, তাদের মধ্যেকার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ককে ফুটিয়ে তোলার জন্য যৌনতাকে হাতিয়ার করতে চাইনি। গড়পড়তা সিনেমায় অনেকটা জোর করেই দর্শককে বোঝানোর চেষ্টা হয় এটা প্রেম, ওটা রোম্যান্স, সেটা যৌনতা। শরীর, বিছানা, যৌনতার আতিশয্য দেখে দর্শক ক্লান্ত। ডেথ সার্টিফিকেট তাই রোম্যান্সকে ওভার প্লে করেনি।”

    রামলখন আসলে কে?  পরিচালকের ভাষায় রামলখন একটা প্রতীক, জীবনের প্রতীক। যে জীবন দিয়ে মানুষের তৃষ্ণা মেটায়। আশ্চর্যের বিষয় তার জীবনেরই মূল্য খুব কম। এখানেই দর্শকদের কাছে একটি মোক্ষম প্রশ্ন ছুঁড়েছেন পরিচালক, একটা মানুষের জীবনের দাম কি একটা ডেথ সার্টিফিকেটের চেয়ে কম?  একটা আদিবাসী পরিবার, সামান্যতেই যাদের বেঁচে থাকা, চাওয়া-পাওয়ার হিসেবটা জটিল অঙ্কের মতো যারা কষতে জানে না, তারা তো ভাবতেই পারে না একটুকরো কাগজ আসলে কত দামি হয়ে উঠতে পারে। যেমন ভাবতে পারেনি সাবিত্রী। প্রয়োজনের মাপকাঠিটা একেক জনের কাছে একেক রকম। রামপুরহাটের দারোগার কাছে প্রয়োজন ছিল টাকা, আবার হাসপাতালের দালালের কাছে সার্টিফিকেটের বিনিময়ে প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছিল সাবিত্রীর শরীর।

    রামলখন ঈশ্বর মানে না। তার স্বপ্ন গোটা পৃথিবীটাকেই একদিন সবুজে ভরিয়ে দেবে সে। রুক্ষ, জলশূন্য তাদের বাসভূমিতে আর মেয়েদের দূর থেকে জল বয়ে আনতে হবে না। সে জানে ঈশ্বর বলে যদি কেউ থাকেন তাহলে তিনিও তারই মতো একজন ‘পানিপাঁড়ে’, যিনি জল দিয়ে মানুষের প্রাণ বাঁচান। পরিচালক রাজাদিত্যের কথায়, “আমি যে জিনিসটা সিনেমায় ধরার চেষ্টা করেছি তা হল আমলাতান্ত্রিক জটিলতা। আমরা যতই বিশ্বায়নের কথা বলি, এগিয়ে চলার কথা বলি, কিন্তু সবাই কি এই এগিয়ে চলায় শরিক হতে পারছেন? বিশেষত প্রান্তিক মানুষরা কি পারছেন? যদি না পেরে থাকেন, তাহলে কেন পারছেন না?”

    ছবির শেষ দৃশ্যে, সদ্য স্বামীহারা সাবিত্রী কোনও এক অজানাকে ছুঁতে পাহাড়ি পথ বেয়ে ছুটে চলেছে, চেতনায় রামলখন এসে তার হাত ধরছে–জীবন-মৃত্যুর সূক্ষ্ম সীমারেখা পেরিয়ে এক অনন্ত-অসীমকে ছোঁয়ার চেষ্টা। সাবিত্রীর কান্নাকে সঙ্গ দিতে পাহাড়ি পথে বৃষ্টি নামে। মানুষের যন্ত্রণার সঙ্গে মিশে যায় প্রকৃতির দীর্ঘশ্বাস। ঠিক সেই সময়েই মহাশূন্যে উৎক্ষেপণ করা হয় একটি রকেট। একদিকে ভিনগ্রহে প্রাণের খোঁজ, অন্যদিকে নতুন করে প্রাণ খুঁজতে বেরিয়ে পড়া এক মেয়ের অনির্দিষ্ট গন্তব্যের দিকে হারিয়ে যাওয়া নতুন করে ভাবনার জন্ম দেয়। পরিচালকের কথায়, “প্রযুক্তির বিশ্বায়ন হয়েছে, কিন্তু মানবিকতার বিশ্বায়ন কবে হবে সেটাই বড় প্রশ্ন। আমি চাই মানবিকতার ভাইরাস নতুন করে ছড়িয়ে পড়ুক সকলের মধ্যে। এই ভাইরাস ক্ষতি করে না, সবার উপকার করে।”

    এই ছবি নিছকই কিছু মুষ্টিমেয় চরিত্র ও তাদের জীবনের টানাপড়েনের গল্প নয়, একটা সামাজিক বার্তা দেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। গ্রামে গ্রামে মর্গের অভাব, খবরের শিরোনামে এখনও উঠে আসে রাস্তাতেই মৃতদেহ কাঁটাছেড়া করার নানা দৃশ্য। অপঘাতে মৃত্যু হলে সেই দেহ সনাক্ত না হওয়া অবধি ৭২ ঘণ্টা মর্গে রেখে দেওয়ার নির্দেশ সরকারি খাতাতেই রয়েছে, কিন্তু বেওয়ারিশ লাশ মনে করে তার আগেই দেহ পুড়িয়ে দেওয়ার পদ্ধতি চলছে নানা জায়গায়। বিশেষত রাজ্যের প্রান্তিক এলাকাগুলিতে। সেই সঙ্গে অবশ্যই রয়েছে শববাহী গাড়ির অভাব ও সরকারি হাসপাতালগুলির সীমাহীন ঔদাসীন্য। ওড়িশার কালাহান্ডির দানামাঝি নিজের স্ত্রীর মৃতদেহ কাঁধে ফেলে ১২ ঘণ্টা পথ চলেছিলেন, সঙ্গী ছিল তাঁর কিশোরী মেয়ে।

    ‘ডেথ সার্টিফিকেট’ তাই একটা জীবনের গল্প। বিশ্বায়নের এ-পাড় আর ও-পাড়ের তফাৎটা বড় সত্যি হয়ে ধরা পড়েছে ছবির গল্পে।

    The Wall-ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন  

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More