সোমবার, ডিসেম্বর ৯
TheWall
TheWall

পুরনোকে সরিয়ে নতুনকে স্বাগত, ‘চলো পাল্টাই’ স্লোগানে জমজমাট স্টার জলসার দশ বছর

চৈতালী চক্রবর্তী

‘চলো পাল্টাই..আরও জোরসে চলো/চলো বদলাই..আজ আওয়াজ তোলো’— দশ বছর পূর্তিতে এটাই স্টার জলসার থিম সং। পাল্টানোর শুরুটা হয়ে গেছে অনেকদিন আগেই। জোর কদমে এক পা, দু’পা করে আজ স্টার জলসা বাংলার অন্যতম সেরা চ্যানেল। প্যানপ্যানানি ইমোশনকে গুডবাই জানিয়ে জলসায় স্মার্ট, চৌখস ধারাবাহিকের রমরমা। ইমোশন দিয়েই দর্শকদের বশ করতে তারা একেবারে পটু।

ত্রিশের ঝকঝকে স্মার্ট ম্যানিকিওরের তরুণী হোক বা পঞ্চাশোর্ধ্ব রমণী, কেউ অফিসের পথে ইউটিউবে আবার কেউ রুটি বানাতে বানাতে সন্ধেয় হাঁ করে নিখিল-মৌরি-ঝিলিক-পটলদের দেখেননি এটা হতেই পারেনা। যে মা-মাসিমারা শাশুড়ি-বৌমার ঝগড়া-কাজিয়াকে সম্বল করেই মুখরোচক আলোচনার আসর বসাতেন, তারাও আজ কাল ঘ্যানঘ্যানে মেলোড্রামা দেখতে দেখতে ক্লান্ত। তাই চ্যানেলে চ্যানেলে এখন অন্য ধারার গল্প।

রূপকথা থেকে সাহিত্য, ইতিহাস থেকে ধর্ম— পারমুটেশন-কম্বিনেশন করে দর্শককে ভিন্ন স্বাদ চাখাতেই তৎপর চ্যানেল কর্তৃপক্ষেরা। তাই জলসায় বারে বারেই ফিরে আসে কিরণমালা, গানের ওপারে বা পটল কুমার গানওয়ালারা।

স্টার জলসা এবং জলসা মুভিসের চ্যানেল হেড সাগ্নিক ঘোষের কথাতেও ফিরে এল চলো পাল্টাইয়ের গল্প। তাঁর কথায়, ‘‘প্রতিদিনই একটু একটু করে বদলাচ্ছি আমরা। যত দিন যাবে আরও নতুন স্বপ্ন, নতুন গল্প দর্শকদের উপহার দেব। কারণ দর্শকরাই তো বস। তাই না!’’ ধারাবাহিকে যদি চটকই না থাকল তাহলে আর মজা কথায়। চোখের সঙ্গে মনের মিল করাতে পারলে সেটাই হবে সেরার সেরা টিআরপি। এমনটাই মনে করেন সাগ্নিক।

গুটি গুটি পায়ে পথ চলার শুরুটা হয়েছিল ২০০৮ সালের ৮ সেপ্টেম্বর। সাগ্নিক জানালেন, ২০১২ থেকে শুরু হয় ‘চলো পাল্টাই’ ক্যাম্পেন। বদলের গান গেয়েই বাংলা টেলি চ্যানলকে আরও আঁটোসাঁটো করতে বেশ কোমর কষেই নামেন কর্তৃপক্ষেরা। তৈরি হয় অনেকগুলো ঘরানা। যার মধ্যে রূপকথা যেমন আছে, তেমনই আছে গান ভিত্তিক ধারাবাহিক। সম্পর্কের কূটকচালি যে একেবারেই নেই তা বলা যায় না, কারণ সব ধরণের দর্শকের কথাই তো মাথায় রাখতে হয় কর্তৃপক্ষদের। তাই প্রেম, বিয়ে থেকে দ্বিতীয় বা তৃতীয় বিয়ের মেলোড্রামা যেমন আছে তেমনিই আছে সাহিত্যের নানা চরিত্র নিয়ে জমজমাটি ধারাবাহিক। অর্থাৎ আর পাঁচটা মনগ়ড়া চরিত্রের মতোই সাহিত্যনির্ভর চরিত্ররা জাঁকিয়ে বসে রোজ সন্ধেয় রাজত্ব করতে পারবে বাংলার বৈঠকখানায়।

মোদ্দা কথা, মা-মাসিমা-কাকু-জেঠু থেকে ঝিঙ্কু পিসি, হালে কলেজ কেটে প্রেম করা তরুণ-তরুণীকেও তাঁদের জীবনের নানা পর্যায়ের স্বাদ চাখাতে হবে সিরিয়ালের মাধ্যমেই। ‘বোঝে না সে বোঝে না’র পাখি-অরণ্যের প্রেম হোক বা ‘ইচ্ছে নদী’র অনুরাগ-মেঘলার মাখোমাখো সম্পর্ক— জেন এক্স আর জেন ওয়াইয়ের মন ছুঁয়ে গেলেই সেটাই হবে সেরা টিআরপি-ফ্যাক্টর। যত বেশি প্রেম, তত বেশি টিআরপি। ব্যাকগ্রাউন্ডে পছন্দের বলিউড বা টলিউডের দু’কলি রোম্যান্টিক গান, তাহলেই সিরিয়াল জমে ক্ষীর।

‘মা’ সিরিয়ালের সেই ছোট্ট ঝিলিক। নরম কিন্তু আত্মবিশ্বাসে ভরপুর চরিত্র। আবার, ‘ইস্টি কুটুম’-এর বাহা, অথবা ‘বোঝে না সে বোঝে না’র পাখি, ‘কে আপন কে পর’-এর জবা, নারী চরিত্ররাও এখন মাথা উঁচু করে সমাজকে স্লোগান দেয়। পুরুষশাসিত সমাজকে চোখ রাঙিয়ে ‘চলো পাল্টাই’ আওয়াজ তোলে। চরিত্রেরাও সমাজের মূল ধারার সঙ্গে জুড়ে গিয়ে সোজা এন্ট্রি নেয় মনের গভীরে। একটা ভিন্ন স্বাদ পায় দর্শক, একঘেয়েমি কাটে।

একই সঙ্গে যে কোনও পিরিয়়ড ড্রামার ক্ষেত্রে বদলে যায় তার ক্যানভাস। একই সঙ্গে পাল্টায় চরিত্রের সাজপোশাক, আলোর কাজ, মিউজ়িকের অনুষঙ্গ। সর্বোপরি এই বদলে যাওয়া মেজাজ আসলে যোগ করে আলাদা ফ্লেভার। সিলভার স্ক্রিনের স্বাদ যদি ছোট পর্দায় পাওয়া যায় তাতেই বা কম কিসের। ‘কিরণমালা’ ধারাবাহিকের পরী পরী পোশাক হোক বা ‘গোপাল ভাঁড়’-এ হারিয়ে যাওয়া দিনকে ফিরিয়ে আনা, সবেতেই একটা আলাদা চটক যোগ করেছে স্টার জলসা। আর এখানেই তার বিশেষত্ব। বাড়ির ছোটোদেরও এখন মুখে মুখে ফেরে ঝিলিক, পটল, রাখি বা গোপালের নাম।

পুজোর বাজার হোক বা দিওয়ালির আগে শপিং মলে ঢুঁ— সেখানেও হাই টিআরপি বাহা শাড়ি বা পাখি সালোয়ারের। তাই অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়ের লেখনিতে এবং লোপামুদ্রার গলায় যখন তুফান তোলে ‘চলো পাল্টাই…আরও ফোর্সে চলো’ কথাগুলো অনেকটাই মিলে যায় স্টার জলসার নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের সঙ্গেই। আর টিআরপির কথায় যদি আসা যায়, তাহলে সাগ্নিকের ভাষায়, সেই অঙ্কটা সহজেই অনুমান করা যায়। বহু ঘরেই সন্ধেটা শুরু হয় পিরিয়ড ড্রামা বা সাহিত্যনির্ভর ধারাবাহিক দিয়ে। ক্রমে প্রেমের আলতো আদর ছুঁয়ে ঘুমোবার আগে ধর্মের শিকড় ছুঁয়ে যায় ‘ভক্তের ভগবান শ্রীকৃষ্ণ’। লাভের পারদ তাই উর্ধ্বমুখী সেটা বলাই বাহুল্য। এই ট্রেন্ড দিন দিন আরও পাকাপোক্ত হবে।

এ বার স্টার জলসার সঙ্গে গলা মিলিয়ে আপনিও বলতে পারবেন ‘সব ফ্যামিলির চেনা স্টেশন..জলসা দশে দশ।’

Comments are closed.