শনিবার, মার্চ ২৩

ঘরে ঘরে, জোড়ায় জোড়ায়, আটশো যমজ শিশু নিয়ে রহস্যে মোড়া কেরলের এই গ্রাম

চৈতালী চক্রবর্তী

জিনের বদল কি না জানা যায়নি। চিকিৎসকের ছুরি-কাঁচিও চলেনি। তবুও কী আশ্চর্য মিল! মুখে, চোখে, চেহারায়, চলাফেরা, হাবেভাবে, আয়নায় প্রতিফলিত প্রতিচ্ছবি যেন। রাস্তাঘাটে, দোকানে-বাজারে, পুকুর পাড়ে, গ্রামের আনাচ কানাচে জোড়ায় জোড়ায় মিল। ধাঁধিয়ে যাবে চোখ। মনে হবে, দৃষ্টিবিভ্রম নয় তো। অথবা ভাবনার ভুল। প্রথম এই গ্রামের মাটিতে পা দিয়েই এমনই মনে হয়েছিল সরকারি কর্মচারী থেকে সাংবাদিকদের। ক্ষণিকের বিড়ম্বনা কাটিয়ে চোখ কচলে তাকিয়ে নিশ্চিত হয়েছিলেন সকলেই। যে খবরটা শুনে গ্রামে আসা সেটা সর্বৈব সত্য, কোনও ভুল নেই। যমজের গ্রাম। এই গ্রামের সিংহভাগ ছেলেমেয়েই যমজ।

গ্রামের নাম কোদিনহি। কেরলের মাল্লাপুরম জেলার এই প্রত্যন্ত গ্রামের ইট-কাঠ-পাথরে আজও দানা বেঁধে রয়েছে রহস্য। গোটা দেশের কাছে যমজদের গ্রাম নামেই এর অধিক পরিচিতি। আশ্চর্যের বিষয়, এই গ্রামে প্রতি হাজার জনে ৪৫ জনই যমজ। সংখ্যাটা দিন দিন বেড়েই চলেছে। একশ জোড়া, দু’শো জোড়া…বর্তমানে সংখ্যাটা চারশো জোড়া। একই মায়ের দুই সন্তান জন্মালে তাদের মধ্যে যেমন দেখা গেছে হুবহু মিল, তেমনি তিন সন্তান জন্মালে তাদের মধ্যেও দেখা গেছে সাদৃশ্য। বিজ্ঞানীরা বলেন, মুখের আদলে আমাদের জিনের প্রভাব সুস্পষ্ট থাকে। আইডেন্টিক্যাল টুইনদের তো আলাদা ভাবে চেনাই যায় না। তবে জিনের ভোলবদল কি না সে বিষয়টা এখনও স্পষ্ট নয়। কারণ গ্রামের মহিলারা বিয়ের পর গ্রামের বাইরে গিয়েও যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন।

আট থেকে আশি, যমজের ছড়াছড়ি গ্রামে

কালিকট থেকে ৩৫ কিলোমিটার দক্ষিণে এবং মাল্লাপুরম থেকে ৩০ কিলোমিটার পশ্চিমে কাোদিনহি গ্রাম আজও বিজ্ঞানীদের কাছে গোলোকধাঁধার মতো। সদ্যোজাত থেকে বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, এই গ্রামে জোড়ায় জোড়ায় মিল। ২০০৮ সালের জনসংখ্যার নিরিখে, গ্রামে সাকুল্যে দু’হাজার পরিবারের বাস। অধিকাংশই সুন্নি মুসলিম। প্রায় সব বাড়িতেই রয়েছে যমজ সন্তানের রেকর্ড। হয় বংশপরম্পরায় যমজ, নয়তো কয়েক পুরুষ পরে যমজ সন্তানের জন্ম হয়েছে। আইডেন্টিক্যাল টুইন না হলেও, মুখ বা চেহারায় বিস্তর মিল রয়েছে এমন মানুষজনের সংখ্যাও কম নয়।

গ্রামবাসীরা বলেন, সবচেয়ে বর্ষীয়াণ যমজরা জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৯ সালে। দুই বোন। তাঁদের বিয়েও হয় বাইরের গ্রামে। সেখানে গিয়েও যমজ সন্তান প্রসব করেছিলেন তাঁরা দু’জনেই। সেই শুরু। পরেরটা ইতিহাস হয়ে গেছে।

 

২০০৬ সালে টনক নড়ে প্রশাসনের

গ্রামে ঢোকার মুখেই নজর কাড়ে রাস্তার পাশের একটা নীল রঙের সাইন বোর্ড। তাতে লেখা, ‘ঈশ্বরের নিজের যমজদের গ্রামে স্বাগত।’ সেখান থেকে রাস্তাটা সোজা চলে গেছে কোদিনহিতে। ছোট্ট গ্রাম। পাশাপাশি ঘিঞ্জি ঘরবাড়ি। অভাবের ছাপ স্পষ্ট বাড়িগুলির দেওয়ালে, উঠোনে, ঘরের আনাচ কানাচে। ‘টুইনস অ্যান্ড কিনস অ্যাসোসিয়েশন’-এর কর্ণধার পি ভাস্করনের কথায়, ‘‘কেন গ্রামে এমনটা হয়ে চলেছে, তা জানতে বদ্ধ পরিকর আমরা। গবেষণা চলছে, প্রাথমিক অনুমানও করা গেছে, তবে স্বচ্ছ সমাধান এখনও মেলেনি।’’

কোদিনহিতে দুই পুরুষের বাস ভাস্করনের। তাঁর পরিবারেও রয়েছে যমজ সন্তান। জানিয়েছেন, এই অবিশ্বাস্য ঘটনার পিছনে কোনও নির্দিষ্ট ধর্ম বা জাত দায়ি নয়। কারণ ভিন্ ধর্মের মধ্যেও দেখা গেছে এই ব্যতিক্রম। গ্রামের মানুষ বাইরে গিয়েও যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। আবার বাইরের গ্রাম থেকে কোদিনহিতে এসে বসতি গড়ে তুলেছে, এমন পরিবারেও দেখা গেছে যমজের চমক। ভাস্করন জানিয়েছেন, যমজ শিশু জন্মের ধারা শুরু হয়েছিল ৬০-৭০ বছর আগে থেকেই। ২০০৬ সালে বেশ কয়েকটি পরিবারে যমজ সন্তান জন্মানোর পরই বেশ নড়েচড়েই বসে প্রশাসন। কারণ অনুসন্ধানে তৎপর হন স্থানীয় চিকিৎসকরা। খবর যায় বিজ্ঞানীদের কাছেও।

সত্য অনুসন্ধানে ২০১৬ সালে হামলে পড়েন বিজ্ঞানীরা

২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে হায়দরাবাদের সেন্টার ফর সেলুলার অ্যান্ড মলিকিউলার বায়োলজি(CSIR), কেরল ইউনিভার্সিটি অব ফিশারিজ অ্যান্ড ওসেন স্টাডিজ (KUFOS) কোদিনহিতে এসে গবেষণা শুরু করে। লন্ডন ও জার্মানি থেকেও ভিড় জমান গবেষকরা। যমজ ছেলেমেয়েদের চুল, নখ, থুতুর নমুনা সংগ্রহ করে শুরু হয় গবেষণা।  KUFOS-এর অধ্যাপক এবং গবেষক ই প্রীথাম বলেছেন, ‘‘এই ঘটনা একেবারেই কাকতালীয় নয়। এর পিছনে রয়েছে অন্য কারণ। তবে শুধু শারীরিক নয়, নানা বিষয় এর জন্য দায়ী হতে পারে। সেই কারণগুলোই খোঁজার চেষ্টা চলছে।’’

সদ্যোজাত থেকে দশ বছর বয়সী যমজের সংখ্যা গ্রামে ৭৯ জোড়া। দু’জোড়া ট্রিপলেটও রয়েছে। স্থানীয় একটি স্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী সমীরা ও ফেমিনা। জানিয়েছে, তাদের ক্লাসেই আট জোড়া যমজ মেয়ে রয়েছে। সকলে তাদেরই বয়সী। গোটা ক্লাসেই থিকথিক করছে একই রকম দেখতে মুখের সারি। শিক্ষিকারাও নাকি মাঝে মাঝে বিভ্রান্ত হয়ে যান।

শুধু ক্লাস নয়, সমীরা ও ফেমিনার স্কুলে মোট যমজ পড়ুয়ার সংখ্যা ২৪ জোড়া। আরও মজার বিষয় হল, যমজ পড়ুয়াদের ক্লাস নিতেও আসেন যমজ শিক্ষক-শিক্ষিকারা।

২০০০ সালে কোদিনহির বাসিন্দা মজিদকে বিয়ে করে গ্রামে সংসার পাতেন সামসাদ বেগম। এখন তাঁর বয়স ৪১। বললেন, ১৪ বছর আগে যমজ মেয়ের জন্ম দিয়েছিলেন তিনি। ইশহানা ও সাহানা। এখন তারা নবম শ্রেণিতে পড়ে। ইশহানা ও সাহানা আইডেন্টিক্যাল টুইন না হলেও, তাদের চেহারায় বিস্তর মিল। তাদের স্কুলেও রয়েছে একাধিক যমজ পড়ুয়া।

‘‘প্রথম প্রথম যমজ সন্তান জন্মানোর পর আমরা বিষয়টা নিয়ে অতটাও মাথা ঘামাতাম না। পরে সবেই বলতে শুরু করল আমাদের গ্রাম নাকি যমজদের গ্রাম। এখানে ঘরে ঘরেই যমজ সন্তান প্রসব করেন মায়েরা। কেন এমন হচ্ছে সেটা এখনও আমাদের কাছে বিস্ময়,’’ গবেষকদের এমনটাই জানিয়েছেন সামসাদ। একই দাবি মজিদেরও। তাঁর কথায়, ‘‘আমাদের পরিবারে গত পাঁচ পুরুষ ধরে যমজ সন্তান জন্মায়নি। আমার বাবারা ছিলেন যমজ ভাই। আমারও যমজ মেয়ে। বংশপরম্পরায় ধারাটা শুরু হল বলে মনে হচ্ছে।’’

বছর একাত্তরের সরকারি কর্মচারী সুকুমারন। দু’পুরুষ ধরে বাস কোদিনহিতে। অবসরের পর সংসারের খুঁটিনাটিতেই মন দিয়েছেন। একমাত্র মেয়ে প্রসীনার বিয়ে হয়েছে বিভুঁইয়ে। জানিয়েছেন, স্বামীর সঙ্গে প্রসীনা এখন কাতারে থাকে। বিয়ের পর সেখানে গিয়ে যমজ মেয়ের জন্ম দিয়েছে সে। সুকুমারনের কথায়, ‘‘বছরে মাত্র একবার গ্রামে আসে মেয়ে। ভাবতেই পারিনি বিদেশে গিয়েও যমজ সন্তানের জন্ম দেবে সে। কী করে এটা সম্ভব হল!’’

কোথায় রয়েছে রহস্যের বীজ

‘‘২০০৮ সালে আমরা একটা ছোট কমিটি তৈরি করি। যেখানে যমজদের নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা শুরু হয়। তাঁদের ডিএনএ-র নমুনা বিদেশে পাঠানো শুরু হয়। তখন গ্রামে যমজের সংখ্যা ছিল ২৮০ জোড়া। এখন সেটা বেড়ে হয়েছে ৪০০ জোড়া,’’ সংবাদ মাধ্যমকে জানিয়েছেন ‘টুইনস অ্যান্ড কিনস অ্যাসোসিয়েশন’ কর্ণধার পি ভাস্করন। বলেছেন, চিন বা ব্রাজিলের মতো কৃত্রিম চিকিৎসা এখানে হয় না। স্বাভাবিকভাবেই সন্তানের জন্ম দেন মায়েরা। তাহলে রহস্যটা কোথায়?

জিনের মধ্যেই কি লুকিয়ে রয়েছে সেই হেঁয়ালি? KUFOS-এর বিজ্ঞানী ই প্রীথামের মতে, ‘‘আমরা প্রথমে ভেবেছিলাম গোটা ব্যাপারটা হয়তো সম্পূর্ণ জিনগত। তবে এখন দেখছি সেটা নয়। নানা ধর্ম, নানা খাদ্যাভ্যাস ও সংস্কৃতির মানুষ রয়েছেন গ্রামে। সকলের ক্ষেত্রেই একই রকম ঘটনা ঘটা সম্ভব নয়।’’  প্রীথামের দাবি, গ্রামের জল, খাদ্য, বাতাস সবেতেই লুকিয়ে রয়েছে রহস্য। গ্রামের মানুষ যে জল খান তাতে থাকতে পারে এমন রাসায়নিক যা শিশুর জন্মের সঙ্গে সম্পর্কিত। অথবা বিশেষ কোনও খাবার যা গ্রামের মানুষ খেয়ে আসছেন, সেখান থেকেও এমনটা হওয়া আশ্চর্য নয়। তবে এই অনুমানগুলো এখনও প্রাথমিক স্তরে বলেই জানিয়েছেন তিনি। ধাঁধার উত্তর পেতে আরও অনেক মাথা ঘামাতে হবে বিজ্ঞানীদের।

স্থানীয় চিকিৎসক ডঃ কৃষ্ণণ শ্রীবিজু জানিয়েছেন, ৪০০ জোড়া যমজ বলা হয়েছে সরকারি সূত্রে। তবে যমজের সংখ্যা উত্তরোত্তর বেড়েই চলেছে। যমজ সন্তানের জন্ম দিয়েই চলেছেন মায়েরা। এর যেন বিরাম নেই।

রক্তের নমুনা সংগ্রহ করছেন বিজ্ঞানীরা

গ্রামবাসীরা বলেন ঈশ্বরের নিজের গ্রাম

নাইজেরিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত ইগবো-ওরা। এই শহরটিকেও বলা হয় যমজদের শহর। এখানেও যমজদের সংখ্যা নজরকাড়া। অস্বাভাবিক যমজ শিশুর জন্মের জন্য ইগবো ওরাকে বলা হয় ‘Twin Capital Of The World।’ একই নজির দেখা গেছে ব্রাজিলের Cândido Godói শহরে। এখানে জনসংখ্যার ১০ শতাংশই যমজ। ব্রাজিল ও নাইজেরিয়ার মতোই যমজদের সংখ্যা বিচারে কেরলের কোদিনহি গ্রাম রয়েছে সামনের সারিতেই।

বিজ্ঞানের জটিলতা এখানকার গ্রামবাসীরা বোঝেন না। এই বৈচিত্রই তাঁদের পরিচয়। এখানেই তাঁরা সকলের থেকে আলাদা। অটো চালিয়ে দিনে দু’পয়সা রোজগার অভিলাষের। দু’জোড়া যমজ ছেলেমেয়ের বাবা তিনি। কী ভাবে সংসার চলে তিনিই জানেন। বলেছেন, ‘‘ঈশ্বরের আশীর্বাদ আমাদের এই গ্রাম। সন্তানেরাও জন্মাচ্ছে ঈশ্বরের কৃপাতেই। দারিদ্র আমাদের নিত্যসঙ্গী। বিজ্ঞানের গবেষণা চলছে ঠিকই, কিন্তু গ্রামের মানুষগুলোর রুজি-রোজগারের দিকে সরকার যদি গুরুত্ব দেন তাহলে আমাদের অনেক সুবিধা হয়।’’

রহস্যের উন্মোচন চান না গ্রামবাসীরা, শুধু চান সন্তানেরা পেট ভরে দু’বেলা খেতে পাক।

আরও পড়ুন:

সমুদ্রেই সংসার, দশ বছর ধরে ৪৮টি দেশ ঘুরে সমুদ্রেই ভেসে চলেছে এই পরিবার

সমুদ্রেই সংসার, দশ বছর ধরে ৪৮টি দেশ ঘুরে সমুদ্রেই ভেসে চলেছে এই পরিবার

Shares

Comments are closed.