বুধবার, ডিসেম্বর ১১
TheWall
TheWall

তবু আছে

সায়ন্তনী বসু চৌধুরী

আজও ভোর ভোর আমার ঘুমটা ভেঙে গেল। না, সকালের সূচনালগ্নে সাংঘাতিক কোনও দুঃস্বপ্ন দেখে নয়। একটা চাপা চিন্তায়। আসলে দুশ্চিন্তা মেশানো একটা ভয় ইদানীং আমাকে পেয়ে বসেছে। মরে যাওয়ার ভয়। না না, একটু দাঁড়ান। বলছি যখন, কথাটা ভেঙেই বলি। আমার ভয়টা নিছকই মরে যাওয়ার ভয় নয়। মরব তো আমরা সবাই। হয় ক’দিন আগে, নয়তো ক’দিন পরে। অনিবার্য মরণে আমার কোনও ভয় নেই। তবে সে মৃত্যু কেমন হবে সেটাই বিবেচনার বিষয়। বেশ কিছুদিন হল শোওয়ার ঘরের শীতল অন্ধকারে একলা একলা মরে পড়ে থাকার ভয় আমাকে তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াচ্ছে। আমি কিন্তু ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখছি না, রীতিমত জেগে জেগে ভাবছি মৃত্যুর কথা। অর্ধেক জাগরণে অনুভব করছি মৃত্যুর সময় আমার একাকীত্বের কথা। আর ভয়টা অন্তিম সময়ের পিপাসার মতো আমার গলায়, মাথায়, মনে ক্রমাগত চেপে বসছে।

আমার স্ত্রী মধুরিমা এ বাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার পর গত সাড়ে পাঁচ বছরে যে কটা বদঅভ্যেস আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরেছে, তাদের কল্যাণেই আমি এখন গলা-বুক জ্বালা, মাথা ব্যথা আর গ্যাস্ট্রাইটিসের একজন বাধ্য পেশেন্ট। ওরা সবাই আমার শরীরে নিশ্চিন্তে বাসা বেঁধেছে। বলা বাহুল্য, আমি ওদের তাড়ানোর চেষ্টা করিনি। বরং মাত্রাতিরিক্ত চা, কফি, চিকেন রোল আর দাদাবৌদি’র বিরিয়ানি খেয়ে খেয়ে পরোক্ষভাবে প্রশ্রয় দিয়ে গেছি। মধুরিমা আমার সমবয়সি ছিল। ছ-সাত বছর প্রেম করে বিয়ে করেছিলাম আমরা। প্রথম দিকের গদগদ আহ্লাদী ভাবটা কেটে যেতেই রাশভারী আর শিক্ষিত ওই মেয়েটার ব্যক্তিত্বের কাছে আমি সারাক্ষণ কেমন যেন কুঁকড়ে থাকতাম। সে কিছু বললে চুপচাপ মেনে নিতাম, বাধা দিতাম না। এখন আমার কোনও স্থায়ী বন্ধন নেই। তাছাড়া চোখ রাঙানোর পাত্রীরা প্রত্যেকেই আমার হাঁটুর বয়সি। তাই ধোঁয়া আর রঙিন জল দুটোই আমি আগের চেয়ে আয়েশ করে খাই এবং বেশি পরিমাণে খাই। রাতে ঘুমোনোর আগে ফোনে কথা বলতে বলতেই আমার পেট আর বুকের মাঝ বরাবর সরলরেখা ধরে তীব্র একটা ব্যথা ওঠে। চোখের সামনে তখন অন্ধকার দেখি। দম বন্ধ হয়ে আসে। ফোনের অন্য প্রান্ত থেকে প্রেমিকার গলাটা চিন্তায় ভারী ভারী শোনায়। মাস তিন চারেকের আলাপ হলে মেয়েটা কান্নাকাটি করে। উদ্বিগ্ন কণ্ঠে বারবার জিজ্ঞেস করে,

-”তুমি ঠিক আছ তো? সত্যি করে বলো।”

আর একটু পুরনোরা আমাকে খিস্তি দিয়ে ফোন কেটে দেয়। আমি হাসতে হাসতে একটা মাথার বালিশ পুলটিসের মতো বুকের নীচে চেপে উপুড় হয়ে শুই। ব্যথার প্রাবল্যে চোখের কোণ থেকে দু–তিন ফোঁটা জল গড়িয়ে ময়লা হয়ে আসা বালিশের ওপর পড়ে। তারপর একটা সময় পা টিপে টিপে ঘুম এসে আমার যাবতীয় ক্লান্তি আর ব্যথা মুছে দেয়। এই আমার অভ্যেস। পাঁচ পাঁচটা বছরের অভ্যেস। কিন্তু দেবব্রত মারা যাওয়ার দিন থেকে আমার সমস্ত অভ্যেস কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন রাত করেই বাড়ি ফিরছি, খাওয়া হলে নিয়ম করে পেগ তৈরি করছি, কারও না কারও ফোন আসছে, কথা জমে ওঠার মুহূর্তে আমার ব্যথাও উঠছে, অভ্যেসবশত বালিশ জড়িয়ে আমি উপুড় হয়ে শুচ্ছি, কিন্তু ঘুম আর আসছে না। বদলে আসছে চিন্তা আর ভয়। একা একা মরার ভয়। মরে যাওয়ার আগে কাউকে ডাকতে না পারার ভয়। বন্ধ ঘরে মরে পচে দুর্গন্ধ হয়ে সারা পাড়ায় ছড়িয়ে পড়ার ভয়। একদিন সকালবেলায় হঠাৎ খবরের কাগজের প্রথম পাতার কোণে ছবি হয়ে জায়গা পাওয়ার ভয়।

***

-”কী হে, আছ কেমন?”

-”বিন্দাস! তা তোমার খবর কী বস? আজকাল তো অনলাইনে দেখাই যায় না!”

-”এই তো, চলে যাচ্ছে। অনলাইনে আজকাল কমই আসি। কাজের চাপে জীবনটাই অফলাইন হয়ে যাচ্ছে।  ‘স্ট্রাগল ফর এক্সিসটেন্স’ গুরুদেব! ও তুমি বুঝবে না।”

-”যাহ্ কেলো! বুঝব না কেনো রে ভাই? আমাকে কি স্ট্রাগল করতে হয় না, না আমার এক্সিসটেন্স নেই?”

-”হা হা হা হা!”

একগাদা হলুদ রঙের হাসিমুখ পাঠিয়ে দিয়ে হঠাৎই অফলাইন হয়ে গিয়েছিল দেবব্রত। তার ইঙ্গিতটা দিব্যি বুঝেছিলাম আমি। বৌ–বাচ্চাহীন একখানা ফুরফুরে জীবন আমার। ফুলের পাপড়ির মতো হাল্কা এবং রঙিন। সংসারের জোয়াল কাঁধে নিয়ে কোনওমতে ধুঁকতে ধুঁকতে হেঁটে চলা অল্পবয়সি ছেলেদের আমার মতো লোকের ওপর একটু আধটু হিংসে হওয়াটা স্বাভাবিক। ওসব আমি গায়ে মাখি না। মধুর সঙ্গে আমার বিয়েটা যখন টিকে ছিল তখন ঝাড়া হাত–পায়ের পুরুষ দেখলে আমারও কি অমন হিংসে হত না? বাজার ঘেঁটে ঘেঁটে চারাপোনা, কাটাপোনা, বিউলির ডালের বড়ি, মুরগির লেগ পিস, নতুন আলু, পাঁঠার টেংরি, কুকমী কোম্পানির গুঁড়ো মশলা, হরীতকী, আমলকী, ঝুলন্ত সিংহাসনে বসে থাকা লোকনাথ বাবার জন্য মিছরি ইত্যাদি জোগাড় করে আনতে আনতেই আমার রবিবারগুলো ভুস ভুস করে লাফিয়ে উঠে বাষ্প হয়ে শূন্যে মিলিয়ে যেত। ঘেমে–নেয়ে বাড়ি ফিরতে না ফিরতেই বৌ মুখ ঝামটা দিত।

-”তোমার কি আঠেরো মাসে বছর নাকি গো? জন্মকুঁড়ে একখানা! বেছে বেছে তোমাকেই আমার ঘাড়ে চাপাল ভগবান!”

শেষের দিকে মধুর সঙ্গে তর্ক করতে আমার আর ভালো লাগত না। বাজারের ব্যাগটা আলগোছে রান্নাঘরের মেঝেতে ছুড়ে দিতে দিতে চাপা স্বরে বলতাম, “শাল্লা…” যাতে সে শুনতে না পায়।

ভাগ্যিস অনেক চেষ্টার পরেও আমাদের মাঝে কোনও তৃতীয় প্রাণ এল না! তাই সংসারের দু’দিকে নড়বড়ে দুটি খুঁটি সেজে লোক দেখানোর জন্য দাঁড়িয়ে না থেকে আমরা দু’জন দুই পাশে সরে গেলাম। ঘরটা আমাদের চোখের সামনেই হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। কোর্টে দাঁড়িয়ে মধুরিমা অবশ্য আমাকেই দোষ দিয়েছিলো। একটা ফুটফুটে বাচ্চার বড্ড শখ ছিল তার। সে বিশ্বাস করত একটা বাচ্চা জন্মালে আমাদের মধ্যে টান আরও বাড়বে। মধুরিমা কেঁদে ফেলে বলেছিল আমি তার সেই শখ পূরণ করিনি। আমি জানতাম, শুধু বাচ্চা নয়, মাসতুতো বোনের বিয়ের হারের মতো একটা সীতাহার, মুক্তো সেটিংয়ের একটা চোকার, উটিতে দিন সাতেকের জন্য রোম্যান্টিক ট্যুর এবং আরও কিছু অপূর্ণ ইচ্ছে নিয়ে মধুরিমা আমার থেকে দূরে সরে গিয়েছিল। বারোটা বছর আমার কাছে থেকে কোনও সুখই পায়নি মেয়েটা। স্বাভাবিকভাবেই ওর মনে ক্ষোভ জমেছিল। তবে আমার বিশেষ গ্লানি ছিল না। আজও নেই। বিয়ে নামক শিকলটি থেকে আমি যে অবশেষে মুক্তি পেয়েছি, সেই অনেক।

পেশায় আমি মাস্টার। উত্তর কলকাতার একটা নামকরা মেয়েদের স্কুলে ইলেভেন–টুয়েলভে ইংরিজি পড়াই। নিচু ক্লাসগুলোতে ইংরিজির সঙ্গে সময় সময় ভূগোল, ইতিহাস, বাংলা এবং বিজ্ঞানও পড়াতে হয়। নিচু ক্লাসের ছাত্রীদের নিষ্পাপ মুখগুলো দেখে বুঝি, ইংরিজির মাস্টারেরা যে খুব একটা চরিত্রবান হয় না, সে কথা তারা জানে না অথবা শোনেনি কোনওদিন। ওসব জানে কলেজ পেরোনো প্রস্ফুটিত ফুলেরা; পাপড়ি মেলার আগে পর্যন্ত আমার সঙ্গে ঘর বাঁধার স্বপ্নে যারা বিভোর ছিল, তারা। রাজ্য সরকারের নির্দেশ মেনে দশটা–পাঁচটার কাজ করি বটে, কিন্তু সপ্তাহের ছ’টা দিনই আমি দেরি করে বাড়ি ফিরি। কর্পোরেটে চাকুরিরতরা যেমন ফেরে আর কী! আমার অবচেতনে কি কোনওদিন কর্পোরেট সেক্টরে চাকরি করার স্বপ্ন ছিল? জানি না। গুরুত্ব দিয়ে ভাবিইনি কখনও। দেবব্রতই মাঝে মাঝে আমার সেই ভাবনাটা উস্কে দিত।

-সরকারি স্কুলের মাস্টার না হয়ে ইঞ্জিনিয়র হলেও তো পারতে!

ছেলেটার সঙ্গে আমার যে কোথায় কবে আলাপ হয়েছিল কিছুতেই মনে করতে পারি না। তবে সাগ্নিক দেশে এলেই দেবব্রতর সঙ্গে আমার দেখা হত। প্রতি বর্ষায় সাগ্নিকের বাড়িতে বুড়ো সন্ন্যাসীকে ঘিরে আমাদের জমাটি আড্ডা বসত। সেইখানে দেবব্রত আসত। নিপুণ হাতে কাচের টেবিলের ওপর পেগ সাজাতে সাজাতে গলাটা একটু চড়িয়ে বলত,

-”নির্বাণদা, আজ ইলিশটা একটু কড়া করে হোক।”

আমি ফেসবুকে বরাবরই অ্যাক্টিভ থাকি। দেবব্রত রিকোয়েস্ট পাঠানোর মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই আমি অ্যাকসেপ্ট করেছিলাম। ছেলেটা যে শুধুই ভালো চাকরি করত তাই নয়, তার মগজে অসীম জ্ঞানের ভাণ্ডার পোরা ছিল। কমবেশি সব ব্যাপারেই কী করে যেন আগামাথা সমস্তটা জেনে যেত সে। ক্যান্সারের ওষুধ আবিষ্কার, বাঙালির চাঁদে অভিযান, বৃষ্টির জল সংরক্ষণ থেকে শুরু করে পিডোফিলিয়া প্যারাফিলিয়া যে কোনও একটা প্রসঙ্গ তুলে ধরলেই দেবব্রত সান্যাল বিনা দ্বিধায় পার্টিসিপেট করত এবং বক্তৃতা দিয়ে বাকি সকলের বোলতি বন্ধ করে দেবার ক্ষমতা রাখত। আমার সঙ্গে ব্যাটার একটু বেশিই জমত, কারণ আমরা দু’জনেই সাহিত্য ভালবাসতাম। উৎপল দত্ত পড়তাম এবং ভবাকে নিয়ে আলোচনা করে একটা গোটা দিন হাসিমুখে কাটিয়ে দিতে পারতাম। দেবুকে আমি বড্ড ভালবাসতাম। আসলে এখনও বাসি।

দুই

-”আমাদের দেবব্রতটা আচমকাই পাস্ট টেন্স হয়ে গেল রে নির্বাণ।”

সদ্য ঘুম ভেঙেই সাগ্নিকের মেসেজটা পেয়ে আমার মাথাটা বোঁ করে ঘুরে গেল। দেবব্রত? ঝট করে তার প্রোফাইলটায় ঢুকে পড়লাম। কাঁপা কাঁপা হাতে পেজটা স্ক্রল করতে করতে ইনফো সেকশন পেরিয়েই থমকে গেলাম। মাথার মধ্যে থেকে কে একটা বলে উঠল এ….এ..এই তো! অঙ্গিরা সান্যালের একটা ছোট্ট পোস্ট রয়েছে দেবব্রতর টাইমলাইনে। ভোর সাড়ে চারটেয় করা পোস্ট।

-”মাই হাজব্যান্ড দেবব্রত ইজ নো মোর!”

অঙ্গিরার লেখা শব্দগুলোর নীচে অনেকে কমেন্ট করেছে। “ভাবতেই পারছি না।” “সে কী!” “দেবু কোথাও যায়নি অঙ্গিরা, সে তোমার কাছেই আছে।” ইত্যাদি ইত্যাদি। আমিও কিছু একটা লেখার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু হাত সরছিল না। আঙুলগুলো পোলিও রোগীর পায়ের মতো একে অন্যের সঙ্গে জড়াজড়ি করে ফোনের স্পর্শকাতর কিপ্যাডের ওপর হোঁচট খাচ্ছিল। আবোল–তাবোল ক’টা শব্দ টাইপ করেও মুছে দিয়েছিলাম আমি। চোখের সামনে দেবব্রতর মুখটা বারবার ভেসে আসছিল। অঙ্গিরার মুখটাও দু–একবার মনে পড়ছিল। মেয়েটার বয়স একেবারেই কম। একত্রিশ কি বত্রিশ হবে। এখনও ছেলেপুলে হয়নি। যতদূর জানি, ওদের দুজনের মধ্যে গভীর প্রেম ছিল। স্বামীর ফেসবুক প্রোফাইলে ওই পোস্টটা লেখার সময় অঙ্গিরার কি একবারও হাত কাঁপেনি? দেবব্রতর শরীরের গন্ধটা কি একবারও মনে পড়ে যায়নি ওর? মেয়েটা নিশ্চয়ই কাঁদতে কাঁদতে লিখেছিল কথাগুলো। আচ্ছা, আমি যদি হঠাৎ করে মারা যাই, মধু কি আমার জন্য কোনও পোস্ট লিখবে? কিন্তু আমি মারা গেলে মধুরিমা জানবেই বা কী করে? এসব ভাবতে ভাবতেই সাগ্নিকের মেসেজের রিপ্লাইতে লিখেছিলাম,

-”মালটার এত তাড়া ছিল? জানতাম না রে।”

যাইহোক, সেই দিন থেকেই আমি ভয়টা পেতে শুরু করেছি। স্কুলে যাবার পথে, স্টাফরুমে বসে, ক্লাস সেভেনের মেয়েদের প্যারাগ্রাফ লেখাতে লেখাতে, শাওয়ারের নীচে দাঁড়িয়ে বাইরের ও ভেতরের বৃষ্টিতে ভিজে যেতে যেতে, বাসের জানালা দিয়ে নীল রঙের আইশ্যাডো মাখা কোনও এক উদ্ভিন্নযৌবনার চোখ দেখতে দেখতে বারবার দেবব্রতর কথা মনে পড়ে আমার। তার প্রোফাইলে লেখা ছিল, এইটটি ওয়ানের তেইশে জুলাই। একাশি সালে জন্মেছিল ছেলেটা! আমার চেয়ে পাক্কা আট বছরের ছোট ছিল দেবব্রত! স্ট্রেস কি এতটাই ঝাঁঝরা করে দিয়েছিল ওকে? মিনিট পাঁচেকের বুকে ব্যথায় একেবারে মরেই গেল শালা?

***

মাস খানেক আগে দেবুর সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল আমার। অনেক মাস পর সেদিন আমাকে ফোন করেছিল সে। খানিকক্ষণ কথা বলে খেয়াল করেছিলাম, সাগ্নিকের বাড়িতে যে হাসিখুশি দিলখোলা ছেলেটা সারাক্ষণ বাংলা, ইংরিজি, শব্দের উৎপত্তি, অপিনিহিতি, অভিশ্রুতি ইত্যাদি নিয়ে বকে যেত, সেই ছেলেটাই কেমন যেন চুপ মেরে গেছে। কথায় কথায় জিজ্ঞেস করেছিলাম,

-”তোর উপন্যাসটা কদ্দূর?”

নীরবতা ভেঙে বিদ্রূপ করে হেসে উঠেছিল দেবু।

-”নির্বাণদা, কেন লোভ দেখাও মাইরি! অনেক কষ্টে সরিয়ে এনেছি নিজেকে। আর মনে করিও না।”

আমি আহত হয়েছিলাম,

-”লেখা ছেড়ে দিয়েছিস? সে কী!”

প্রথম দিকে দেবুর সঙ্গে আমার বেশ ভালোই যোগাযোগ ছিল। আমার প্রতিটা কবিতা, প্রতিটা গদ্য নিয়ে নিরপেক্ষ মতামত দিত সে। পছন্দ না হলে সোজা ফোন করে গালাগালি দিত।

-”কী খেয়ে লিখতে বসেছ? গাঁজা না আফিম?”

বেশ ভারী ভারী ক’টা দু’ অক্ষর চার অক্ষর আওড়ানোর পর শান্ত হয়ে বলত,

-”তোমার থেকে অনেক বেশি আশা করি গুরু। নিজের ইমেজটা নষ্ট কোরো না।”

তিন

একজন স্কুলমাস্টারের জীবন ঠিক কেমন হওয়া উচিত? মাঝারি গড়ন, পরনে ধুতি আর শার্ট, হাতে ছাতা, চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা, মাথায় তেল চকচকে পাতা চুল আর কাঁধে শান্তিনিকেতনের ঝোলা ব্যাগ? ত্রিশ–চল্লিশ বছর আগের সেই চেনা খোলসটা ছেড়ে বেরিয়ে এসেই বোধহয় লোকগুলো সমাজের চোখে অন্যরকম হয়ে গেছে। নিজেকে দিয়েই বুঝেছি। অনেকেই লাজুক হেসে আমার কানে কানে বলে গেছে,

-”আপনি ঠিক টিপিক্যাল টিচার টাইপের নন জানেন তো!”

তবে আমার লেখা পড়ে দেবু বলত,

-”বাইরেটা আধুনিক হলে কী হবে, ভেতরে তুমি এখনও সেকেলে নির্বাণদা।”

আমি লিখি। বিরাট কিছু না হলেও প্রতিটা কাগজেই কিছু না কিছু লিখেছি। কেউ সেসব মনে রেখেছে কিনা জানি না। লেখা আমার কাছে অক্সিজেনের মতো। তবে রবিঠাকুরের প্রেম, গান্ধীজির মতিভ্রম এসব নিয়ে আবোল–তাবোল লিখে গালগালিও কম কুড়োই না। আসলে লোককে চটিয়ে দিয়ে মজা দেখতে আমার হেব্বি লাগে। দেবু সেকথা জানত। তাই ফেসবুকের লম্বা–চওড়া পোস্ট দেখে কোনওদিন হামলে পড়ত না সে। সে মন্তব্য করত জাতের লেখায়। সময় সময় ছেলেটার মেধা দেখে আমি চমকে উঠতাম। কথা বলার সময় দেবুর ছ’ ফুট দুই ইঞ্চির শরীরটা সামনের দিকে বেশ কিছুটা ঝুঁকে থাকত। তাকে দেখে মনে হত ফলভারে বৃক্ষ যেন নুয়ে পড়েছে। খুব ইচ্ছে ছিল ছেলেটাকে সঙ্গে নিয়ে একটা প্রকাশনা সংস্থা খুলব। বাংলা, হিন্দি, ইংরিজির অন্য ধাঁচের লেখাগুলো আমরাই প্রকাশ করব। কিন্তু ছ–সাত মাস আগে থেকে দেবব্রত নামের আলোটা ক্রমাগত আবছা হয়ে আসছিল। মগজ নিংড়ে সিরিয়াস লেখা লিখেও আমি তার কোনও মন্তব্য পাচ্ছিলাম না। যে ছেলে সপ্তাহে তিন–চারদিন টেলিফোনেই তুমুল আড্ডা দিত, মাসে একবারও তার গলা শুনতে পাচ্ছিলাম না আমি। অস্বস্তি হচ্ছিল। মেসেজ করে কোনও উত্তর পাচ্ছিলাম না। দেবুর প্রোফাইলটায় ঘুরঘুর করছিলাম। সেটা একটা তালাবন্ধ একতলা বাড়ির মতো পড়েছিল। আর টুকরোটাকরা ব্যস্ততা, খুচরো পাপ, নতুন প্রেম এসবের মাঝেই আমার জীবনে নেমে আসছিল পুরু হতাশা।

***

আজকাল ঘুমোনোর আগে দেবুর চোখদুটো আমার খুব মনে পড়ে। কী উজ্জ্বল কী গভীর চোখজোড়া! সরাসরি তাকালে মনে হত সমস্ত মেধা বুঝি তার দুটো চোখের মণিতে পুঁতে রেখেছে কেউ। ব্যথার সময় বুকে বালিশ চেপে ভাবি ছেলেটার চোখের ভেতরেই কি সব মায়া লুকোনো ছিল? দেবব্রত চেইন স্মোকার ছিল। আমি সিগারেট খাওয়া ছেড়ে দিয়েছি শুনে অবাক হয়ে বলেছিল,

-”জিন্দা আছ কী করে গুরু?”

অথচ সেই ছেলেটাই লেখালিখি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে দিব্যি বেঁচে ছিল!

বহুদিন আগে শুনেছিলাম, মেধাবী মানুষদের মধ্যে নাকি কিছু কমন ফ্যাক্টর থাকে। আমি নিজেকে মেধাবী বলে দাবি করি না; কিন্তু দেবুর আর আমার মাঝে দু–দুটো কমন ফ্যাক্টর ছিল। ব্যথা আর লেখা। যদিও সে ব্যাটা মরার আগে বেইমানি করে লেখা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিয়েছিল, তবুও প্রতি রাতে গ্যাস্ট্রাইটিসের ব্যথার সময় দেবুর কথা আমার মনে পড়ে, আর মনে পড়ে আমার অসমাপ্ত লেখাগুলোর কথা। ঠান্ডা, অন্ধকার শোওয়ার ঘরে সাত বাই ছয়ের বিছানায় একলা শুয়ে থাকতে থাকতে বাঁপাশের খালি জায়গাটায় আমি মধুরিমাকে দেখতে পাই। ব্যথার চোটে শ্বাস আটকে এলে শিরদাঁড়া দিয়ে একটা ঠান্ডা স্রোত দ্রুতগতিতে ওঠানামা করতে থাকে। মনে হয় মৃত্যু এসে নিঃশব্দে আমার পিঠে হাত রেখে দাঁড়িয়েছে। দেওয়ালের পাঁজরে বসানো খোলা জানালা দিয়ে দমকা হাওয়ার মতো দেবব্রতর ডাক ভেসে আসে,

-”নির্বাণদা, তোমার হল? চলো চলো, লেট হয়ে যাচ্ছে।”

উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে আমি দেখি বিছানায় শুয়ে শুয়েই মধুরিমা ফেসবুকের টাইমলাইনে একটা স্ট্যাটাস লিখে দিচ্ছে,

-সে আর নেই, তবুও কোথাও যেন আছে।

চিত্রকর : মৃণাল শীল 

Comments are closed.