বীরাষ্টমী থেকে ভোগ বিতরণ, অষ্টমীর সকালে লোকের ঢল বাগবাজার সর্বজনীনে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    চৈতালী চক্রবর্তী

    থিক থিক করছে ভিড়। সেই কাকভোর থেকেই সারি সারি লোক ‘দুর্গানগর’ মাঠে। বাগবাজার সর্বজনীন মাঠের নাম যে এখন ‘দুর্গানগর’ সেটা কমবেশি সবারই জানা। রাতের পরিক্রমা সেরে উত্তর কলকাতার অনেকেই বাগবাজারে মায়ের মুখ দেখেই ঘরে ফিরছেন। আবার সকাল হতেই ‘বীরাষ্টমী উৎসব’-এর কসরত দেখতে মাঠে ভিড় জমিয়েছেন অনেকেই। সুতরাং, দুয়ে মিলে ভিড়টা নেহাত কম নয়। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেটা বেড়েছে বই কমেনি।

    উত্তর কলকাতার অনেক বাসিন্দাই অষ্টমীর সকালের পুষ্পাঞ্জলিটা দুর্গানগরেই সেরে নেন। কারণটা কিছুই নয়, প্রাচীন পুজো, তার উপর উত্তর কলকাতার আবেগ জড়িয়ে রয়েছে এই পুজোর পরতে পরতে। ঢাকের বোল থেকে প্রতিমার ডাকের সাজে। একজন দর্শনার্থীকে বলতে শোনা গেল, “এটাই কী সেই পুজো যা না দেখলে বাঙালির মন ভরে না?” অনেকটা তাই। এ বছর শতবর্ষে পৌঁছল বাগবাজার সর্বজনীন। থিমের চাকচিক্য থেকে শতহাত দূরে কলকাত্তাইয়া বাঙালির সাবেকিয়ানাকে এখনও স্তম্ভের মতো খাড়া করে রেখেছে এই পুজো। একশো বছরে পা দিয়ে আবেগটা তাই বোধকরি মাত্রা ছাড়িয়েছে।

    প্রতি বছরই প্যান্ডেলে কিছু নতুনত্ব থাকে। ম্যানেজিং কমিটির অন্যতম প্রধান ও সেন্টিনারি কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক শেখর রঞ্জন ভদ্র চৌধুরী আগেই বলেছিলেন, প্যান্ডেলের সাজে যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। কখনও দক্ষিণী মন্দিরের আদল আবার কখনও রাজ্যেরই কোনও নামী মঠ বা মন্দিরের ছাঁচে মণ্ডপ গড়েন শিল্পীরা। তবে প্রতিমার সাজে ব্যতিক্রম নেই। সেই একচালের বিরাট দেবী মূর্তি দুধসাদা জড়ি-চুমকির ডাকের সাজে মোহময়ী। সবুজ রঙা মহিষাসুরের বুকে ত্রিশূল গেঁথে স্মিত হাস্যে দেবী সর্বতাপহন্তা অভয়প্রদায়িনী।

    প্যান্ডেলের ভিতরে প্রতিবারের মতো এ বারেও শোভা বাড়াচ্ছে বিশাল ঝাড়বাতি। মন্দিরে প্রবেশের ঠিক ডান দিকে একটেরে জমিতেই বীরাষ্টমীর আয়োজন। নানা সমিতির কচিকাঁচারা জিমন্যাস্টিক, লাঠি খেলা-সহ শারীরিক কসরত দেখাচ্ছে। সেই নেতাজীর সময় থেকেই এই বীরাষ্টমী উৎসব যা বাগবাজার সর্বজনীনের অন্যতম মূল আকর্ষণ। সলিসিটর দুর্গাচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনুরোধে তখন নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু এই পুজোর সভাপতি। তার আগে অবশ্য নানা জায়গা ঘুরে পুজো থিতু হয়েছে এই দুর্গানগর মাঠে।

    আরও পড়ুন: স্বাধীনতার ইতিহাস লিখেছে এই পুজো, পথ দেখিয়েছিলেন নেতাজী, শতবর্ষে পৌঁছেও বনেদিয়ানার ঠাস বুনোটে ভরপুর বাগবাজার সর্বজনীন

    সেই সময় দেশজুড়ে বিদেশী দ্রব্য বর্জনের পালা চলছে। উত্তর কলকাতার আনাচ কানাচেও তখন স্বদেশী বিপ্লবের ছোঁয়া। সব বাঙালিকে এক ছাদের তলায় আনতেই নেতাজী চালু করলেন ‘বীরাষ্টমী উৎসব’। পুজোর সঙ্গে শুরু হল প্রদর্শনী ও শারীরিক কসরত। প্রদর্শনীতে স্বদেশী শিল্পের জোয়ার। দেশজ দ্রব্যের মেলা বসে গেল প্রদর্শনীর মাঠ জুড়ে। পাশাপাশি, বীরাষ্টমীতে বিপ্লবীদের লাঠি খেলা, জিমন্যাস্টিক-সহ নানা শারীরিক শক্তি প্রদর্শনের জোয়ারে ভেসে গেল বাঙালি। সেই ধারা এখনও রয়েছে পুজোতে। অষ্টমীর সকালের ভিড়টা তাই অন্যান্য দিনের তুলনায় কিঞ্চিৎ বেশি।

    পুজো মণ্ডপকে ঘিরেই বসে বিরাট মেলা। দু’পাশে সারি সারি স্টল। অষ্টমীর নিরামিষ খাওয়ার রীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে দিব্যি ফিশ ফ্রাই-কবিরাজি সাঁটাচ্ছে ভোজনরসিক বাঙালি। নিমেষের মধ্যে ঝুড়ি ঝুড়ি কবিরাজি শেষও হয়ে যাচ্ছে। আবার একঝুড়ি গরম খাবারের উপর প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়ে কচাকচ মুরগী-মাটনের সদ্ব্যবহার হচ্ছে। সঙ্গে দেদাড় কোল্ডড্রিঙ্কস আর আইশ ক্রিম। প্রতিমা দর্শনের সঙ্গে পেট পুজোর আয়োজনও বিরাট।

    দ্য ওয়াল পুজো ম্যাগাজিন ১৪২৫ পড়তে ক্লিক করুন

    পুজো কমিটির সদস্যদের থেকে কার্ড জোগাড় করতে পারলে দুপুরের ভুরিভোজের আয়োজনও জমাটি। মাঠের পাশেই ঐকতান কমিউনিটি হলে খাবারের এলাহি আয়োজন। সেখানেও ভিড় দেখার মতো। আসলে পুজো মানেই মহিলাদের একপ্রকার অঘোষিত ছুটি। সারাদিন অফিস সামলে বা ঘরেই গোটা পরিবারের হেঁসেল ঠেলতে ঠেলতে যাঁরা ক্লান্ত, পুজোর চারটে দিন তাঁদের পোয়াবারো। রান্নাঘরে তালা চাবি দিয়ে পাড়ার মণ্ডপেই হোক বা কোনও নামী পুজোর প্যান্ডেলে ভিআইপি কার্ডের সৌজন্যেই হোক, পেটপুজোর কোনও কমতি নেই। ঐকতান হলটা একপ্রকার ভরে গেছে। গরম খিচুড়ির সঙ্গে বেগুনি ও লাবড়া শেষ হতেই পাতে পড়বে ফুলকপি আলুর রসা। তার পর বাসন্তী পোলাওয়ের সঙ্গে ঝাল ঝাল ধোকার তরকারি এবং ছানার মালাই শেষে মিষ্টির পালা। চাটনী, পায়েসের পর বাঙালির অতি প্রাচীন এবং অতি আদরের বোঁদে।

    পুজো প্যান্ডেলে চোখ টানে বঙ্গললনাদের সাজসজ্জা। লালপাড় সাদা শাড়ির ভিড় একটু কম। পরিবর্তে লম্বা ঝুল কুর্তি, পালাজোর ভিড় বেশি। সঙ্গে জাঙ্ক জুয়েলারি। বাহারি লিনেন এবং শিফনও রয়েছে। হালফিলের সালোয়ার চোখে পড়ে দু’একটা। এ বারের পুজোর সাজে শাড়ির সঙ্গে দক্ষিণী স্টাইলে অনেকেরই মাথায় চূড়ো করা খোঁপায় ফুলের মালা। সঙ্গে ভারী গয়না। হাঁটু ঝুল ডিজাইনার ফ্রকেও আজকালকার গৃহবধূরা বেশ সাহসী।

    বেলা বাড়ছে, অষ্টমীর ভিড় কমছে। পরের ভিড়টা হবে সন্ধের। পুজো কমিটির সদস্যেরা জানালেন, রাত আটটার পর থেকে ভিড়টা বেশ বাড়ে। আর এ বার যেহেতু শতবর্ষের পুজো তাই দূর দূর থেকে অনেকেই ভিড় জমাচ্ছেন প্যান্ডেলে। আর তো মাত্র দু’টো দিন। তারপরই বিসর্জনের পালা। শরতের মেঘেরা তল্পিতল্পা গুটিয়ে আবার ফিরে যাবে যে যার দেশে। আগমনীর গন্ধ মিলিয়ে ফাঁকা মাঠে নেমে আসবে শূন্যতা। তাই হোক না একটু সাজ বেশিই! দেশী হোক বা পশ্চিমী, মানানসই হোক বা বেমানান পরোয়া নেই। সঙ্গে চলুক পেটপুজো। পুষ্টি আর ডায়েটকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে ‘বলো দুগ্গা মা-ই কী! জয়!’

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More