শনিবার, ডিসেম্বর ৭
TheWall
TheWall

যেমন বড় হৃদয়, তেমনই রসবোধ

তথাগত রায়

খবরটা শুনে আমার প্রথম যে কথাটা মাথায় এল, এক জন ‘বড় হৃদয়ের’ মানুষ আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন।

বিজেপির মার্গদর্শক মণ্ডলীর সদস্যা, ভারতরত্ন শ্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী বিজেপির ইতিহাসে ছিলেন সত্যিই এক মহীরুহ। অতি দীর্ঘ তাঁর সাংসদ-জীবন। দশ বারের লোকসভার সাংসদ ও দু’বারের রাজ্যসভার, ভাবলে অবাক হতে হয়!

১৯৫৭ সালের দ্বিতীয় লোকসভায় তিনি উত্তরপ্রদেশের বলরামপুর কেন্দ্র থেকে জিতে সাংসদ হয়েছিলেন। ইন্দিরা গান্ধীর জারি করা জরুরি অবস্থার সেই ভয়ংকর সময়ের পরে মোরারজি দেশাইয়ের নেতৃত্বাধীন প্রথম অকংগ্রেসি সরকারের তিনি ছিলেন বিদেশ মন্ত্রী। তিন-তিন বার দেশের প্রধানমন্ত্রীও হয়েছিলেন তিনি।

অদ্ভুত সহনশীল এক ব্যক্তিত্ব। উনি প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন পশ্চিমবঙ্গের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় রেলমন্ত্রী পদ থেকে ইস্তফা দিলেন। বলেছিলেন, এই মন্ত্রিসভার পদের মূল্য তাঁর কাছে তাঁর হাওয়াই চটির চেয়েও কম। এর প্রতিবাদে কিন্তু অটলজি পালটা কোনও প্রতিবাদ করেননি, সমালোচনাও করেননি। সম্পূর্ণ চুপ ছিলেন।

সেই মমতাই ফের যখন একই মন্ত্রিসভায় ফিরে যেতে চাইলেন, তখনও কিন্তু অটলজি সাদরেই তাঁকে গ্রহণ করেছিলেন। কোনও উষ্মা নয়, কোনও ক্ষোভ প্রকাশ নয়। হয়তো রেল মন্ত্রক আর ফিরিয়ে দেননি মমতাকে, কিন্তু সামান্য কিছু দিন দফতরবিহীন মন্ত্রী থাকার পরেই আবার গুরুত্বপূর্ণ কয়লা মন্ত্রক দেওয়া হয় মমতাকে। এতটাই বড় ছিল প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর হৃদয়।

কবি শঙ্খ ঘোষও বাজপেয়ীর কাছ থেকে একটি পুরস্কার নিতে অসম্মতি প্রকাশ করেছিলেন। কবির বক্তব্য ছিল, উনি সাম্প্রদায়িক। মনেপ্রাণে উদার ও সহিষ্ণু মানসিকতার এই মানুষটির এই মন্তব্যে খারাপ লাগারই কথা। কিন্তু তিনি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ সংযম বজায় রেখে সে বারেও কোনও মন্তব্য করেননি।

আমার সঙ্গে অটলজির মুখোমুখি দেখা হয়েছে মাত্র দু’বার। প্রথম বারের সাক্ষাতেই আমি ওঁর অসামান্য রসবোধ টের পেয়েছিলাম।

২০০২ সাল, দিল্লিতে বিজেপির ন্যাশনাল এগজ়িকিউটিভ পদের মিটিং হচ্ছে। অটলজি তখন প্রধানমন্ত্রী। বেঙ্কাইয়া নায়ডু তখন বিজেপির প্রেসিডেন্ট। মধ্যাহ্নভোজের বিরতির কিছু আগে এসে উনি হিন্দিতে বললেন, মধ্যাহ্নভোজের এখনও দেরি আছে। তার আগে বক্তৃতা দেবেন প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ী।

অটলজি কথা বলতে এসে প্রথমেই মজা করলেন। বললেন, মধ্যাহ্নভোজের দেরি আছে। তাই তত ক্ষণ পর্যন্ত আমাকে কথা বলেই যেতে হবে। এবং আপনাদেরও শুনতে হবে।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পদক চুরির পরে বাজপেয়ী এসেছিলেন শান্তিনিকেতনে। দ্বিতীয় বার ওঁর সঙ্গে আমার দেখা হয় সেখানেই। সামনেই ভোট ছিল। তাই রাজনৈতিক কথাবার্তাই হয়েছিল।

ভাবলে খুব খারাপ লাগে, সেই বারই অটলজিকে নিয়ে অদ্ভুত এক খবর করল সংবাদমাধ্যমের একাংশ।
সেই বার অটলজি ধুতির বদলে পাজামা পরে এসেছিলেন। আসলে হেলিকপ্টারে প্রবল হাওয়ায় ধুতি পরা থাকলে অসুবিধা হতে পারে ভেবেই তাঁর চিরাচরিত পোশাক বদল করেছিলেন উনি।

আর তাই নিয়ে সংবাদমাধ্যম লিখল, অটলজির এই পরিধানের আসল কারণ নাকি সংখ্যালঘু ভোট!
ভাবতে অবাক লাগে, দুঃখও হয়, অমন এক জন ব্যক্তিত্বকে নিয়েও কত অদ্ভুত ও হাস্যকর কথা কত অনায়াসে লিখে দিতে পারে সংবাদমাধ্যম।

লেখক ত্রিপুরার রাজ্যপাল।

Leave A Reply