শনিবার, জুলাই ২০

সাপে কাটা রোগীকে জীবন দিলেন শালবনির ডাক্তাররা, অন্য এলাকাও তাঁদেরই খোঁজে

  • 1.2K
  •  
  •  
    1.2K
    Shares

দ্য ওয়াল ব্যুরো: পেটের তাগিদে প্রতিদিন যেমন জঙ্গলে পাতা কুড়োতে যান, তেমনই গিয়েছিলেন শনিবারও। ভোর রাতে। সেখানেই বিষধর সাপ ছোবল মারে শালবনির ভটেরাম টুডুকে। প্রাণ বাঁচাতে বছর চব্বিশের যুবক ভটেরামকে তড়িঘড়ি পশ্চিম মেদিনীপুরের শালবনি হাসপাতালে নিয়ে যান স্ত্রী সীতা টুডু। পড়শিদের ক’জনও যান সঙ্গে। তখন সঙ্কটজনক অবস্থা ভটেরামের।

জরুরি বিভাগের দুই চিকিৎসক নবকুমার দাস এবং অভিষেক বেরা রোগীর পরিস্থিতি দেখেই বুঝে যান প্রাণ বাঁচাতে হলে তাঁকে তখনই মেদিনীপুর মেডিক্যালে পাঠানো উচিত। কারণ ভেন্টিলেশন পরিষেবা নেই শালবনি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে। কিন্তু ডাক্তারদের কর্মবিরতি যে সেখানেও। জরুরি বিভাগে কত ক্ষণে চিকিৎসা মিলবে এ সব সাত পাঁচ ভেবে নিজেরাই ঝুঁকি নেন ওই দুই চিকিৎসক। নিজেদের বুদ্ধি প্রয়োগ করেই তৈরি করে ফেলেন ম্যানুয়্যাল ভেন্টিলেশন। যদিও তাঁরা জানতেন, একটু এদিক-ওদিক হলেই পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে যেতে পারে। কিন্তু তাঁরা যে ডাক্তার! এত ভাবলে চলবে কী করে!

দুই ডাক্তারের ঘণ্টা তিনেকের আপ্রাণ চেষ্টায় বেঁচে যায় ভটেরাম।

এ ভাবেই তাঁরা দিনভর সাধ্যমতো পরিষেবা দিয়েছেন অন্য রোগীদেরও। ডাক্তার নবকুমার দাস এবং ডাক্তার অভিষেক বেরা বলেন, জুনিয়র ডাক্তারদের আন্দোলনের প্রতি আমাদের পূর্ণ সমর্থন রয়েছে। আবার রোগীদেরকেও তো অবহেলা করতে পারি না। রোগী যখন হাসপাতাল এসেছেন তখন তাঁকে চিকিৎসা দেওয়া আমাদের কর্তব্য। এখানে ভেন্টিলেশনে রাখার পরিকাঠামো নেই। তাই ম্যানুয়ালি ভেন্টিলেশন তৈরি করা হয়। তার মাধ্যমেই ঝুঁকি নিয়ে চিকিৎসা শুরু করে দেওয়া হয়েছিল। তার ফলে প্রাণ ফিরে পেয়েছেন ভটেরাম।”

স্বামীর প্রাণ ফিরিয়ে দেওয়া ডাক্তারদের ভগবান মানছেন ভটেরামের স্ত্রী। ঠিক যেমন, গত ছ’দিন ধরে চলতে থাকা এই আন্দোলনের আগেও রাজ্যের একটা বড় অংশের মানুষ এমনটাই ভাবতেন।

এনআরএসের জুনিয়র ডাক্তার পরিবহ মুখোপাধ্যায়ের উপর নৃশংস হামলার প্রতিবাদে, আন্দোলনে নৈতিক সমর্থন থাকলেও আজ স্রেফ পেশার মর্যাদা রাখতে জরুরি বিভাগে গিয়ে রোগী দেখলেন বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজের জুনিয়র ডাক্তারদের একাংশ। এনআরএস হাসপাতালের ডাক্তারদের পাশে দাঁড়াতে রাজ্যের সমস্ত মেডিক্যাল কলেজ ও বিভিন্ন হাসপাতালের ডাক্তাররা  গত এক সপ্তাহ ধরে কর্মবিরতি পালন করছেন। তাতে গত কাল পর্যন্ত সামিল ছিলেন বর্ধমানের জুনিয়র ডাক্তাররাও। তাই নিয়ে হাসপাতালে আসা রোগীদের পরিজনদের সঙ্গে বেশ কয়েক বার হাতাহাতিও হয়েছে তাঁদের। কিন্তু গতকাল থেকেই সেই জুনিয়র ডাক্তারদের একাংশই জরুরি বিভাগে গিয়ে রোগী দেখছেন। সিনিয়র ডাক্তাররা তো আছেনই।

মুর্শিদাবাদ মেডিক্যালেও জুনিয়র ডাক্তারদের একাংশ ধর্না জারি রেখেই শুরু করলেন রোগী দেখার কাজ। পালা করে জুনিয়র ডাক্তারদের একাংশ বাইরে বসে রোগী দেখলেন রবিবার। তীব্র গরম, ভিড় অগ্রাহ্য করে চালিয়ে গেলেন কাজ তাঁরা বলেন, ‘‘আমরা বারবার বলেছি রোগীদের বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন নয়। এই লড়াইতে রোগী এবং ডাক্তার একই পক্ষ। আমরা জুনিয়র ডাক্তাররা কর্মবিরতি শুরু করেছিলাম এনআরএসের হামলার প্রতিবাদে। সেটা জারি রেখেই আজ রোগীদের পরিষেবা দিচ্ছি আমরা।’’ এমনকী চলেছে জরুরি অস্ত্রোপচারও।

বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে কর্মবিরতি চালিয়ে যাচ্ছেন জুনিয়র ডাক্তারদের। জরুরি বিভাগে পরিষেবা দিচ্ছেন হাতেগোনা সিনিয়র ডাক্তার। তবে ব্লাড ব্যাঙ্কের রক্তের  চাহিদা মেটাতে এগিয়ে এলেন আন্দোলনরত জুনিয়র ডাক্তাররা।  বিক্ষোভস্থলে বসেই মেডিক্যাল  কলেজের  ব্লাড ব্যাঙ্কে ৫৩ ইউনিট রক্ত দিয়ে সহযোগিতা করলেন জুনিয়র ডাক্তাররা।

তবে এই ইতিবাচক ছবিগুলির পাশাপাশিই রয়েছে পরিবহর উপর হামলার প্রতিবাদে জেলায় জেলায় ডাক্তারদের আন্দোলনে রোগীদের ভোগান্তির চিত্রও।

এ দিনও সকাল থেকে কর্মবিরতি পালন করছেন মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জুনিয়র ডাক্তাররা। রবিবার আউটডোর এমনিই বন্ধ। জরুরি বিভাগে পরিষেবা দিয়েছেন হাতেগোনা সিনিয়র চিকিৎসক। ভর্তি নেওয়া হয়েছে কেবলমাত্র ব্লক হাসপাতাল থেকে রেফার হয়ে আসা বা জরুরিবিভাগে আসা একেবারে সঙ্কটজনক রোগীদের।  কিছুটা ভাল অবস্থা বীরভূমের হাসপাতালগুলি। এই জেলার সরকারি হাসপাতালগুলিতে পরিষেবা নিয়ে রোগীদের অভাব অভিযোগ অন্য জায়গার তুলনায় কম।

গত এক সপ্তাহ ধরে সরকারি হাসপাতালগুলিতে থেকে চিকিৎসা না পেয়ে ফিরতে হওয়ায় রোগীদের ভিড়ও কমে গেছে অনেকটাই। বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের সুপার উৎপল দাঁ বলেন, ‘‘রোগীর ভিড়ে যে হাসপাতাল সবসময় গমগম করে তাই এখন শুনশান। চিনতে পারছি না।’’

চিকিৎসা না পেয়ে ফিরে যাচ্ছেন যাঁরা তাঁদের অনেককেই বলতে শোনা গেল, ‘‘আমরা ডাক্তারদের আন্দোলনকে সমর্থন করি। কিন্তু তাঁরা আমাদের দিকে না তাকালে আমরাই বা যাব কোথায়, বলুন তো?’’

আরও পড়ুন…

রোগীমৃত্যু, হেনস্থা, ক্ষমা চাওয়া– ওয়ার্ডের ভিতরে মিটে যেত সবই, তবু ট্রাকে করে এসে ডাক্তার পেটাল কয়েকশো গুন্ডা!

Comments are closed.