শনিবার, সেপ্টেম্বর ২১

প্রকাশিত হলো উত্তরবঙ্গের লিটল ম্যাগ ‘মুজনাই’-এর বিশেষ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর সংখ্যা

সৌমিলি সরকার

উত্তরবঙ্গের সাহিত্যচর্চার অন্যতম ধারক এবং বাহক সেখানকার লিটল ম্যাগাজিনগুলি। সারা বছর ধরে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে প্রচুর লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়। কোচবিহার জেলাও এর ব্যতিক্রম নয়।
কোচবিহার থেকে প্রকাশিত  ‘মুজনাই’ পত্রিকাটি  সম্পাদনা করেন শৌভিক রায়। পত্রিকাটির সাম্প্রতিক সংখ্যার বিষয় ‘ দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর’।
কলকাতার জোড়াসাঁকোতে ১৮১৭ সালেরিন ৫ই মে জন্মগ্রহণ করেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের প্রথম পুত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। রাজা রামমোহন রায়ের প্রতিষ্ঠিত অ্যাংলো- হিন্দু স্কুল, তারপর হিন্দু কলেজে পড়াশোনার পরে তিনি বাবার ব্যবসায়ে নিযুক্ত হলেন। ঈশোপনিষেদের একটি শ্লোক তাঁর চিন্তাধারায় আমূল পরিবর্তন এনেছিল। সারদাসুন্দরীর সঙ্গে কাটিয়েছেন বিবাহিত জীবন। ব্রাহ্ম আভা স্থাপন, তত্ত্ববোধিনী সভা স্থাপন, তত্ত্ববোধিনী পত্রিকা প্রকাশ, এসব কর্মকাণ্ড তো ছিলই। এর সঙ্গে ঈশ্বরের সন্ধানে তাঁর আত্মিক যাত্রা, প্রায় নিঃস্ব অবস্থা থেকে বাবার ব্যবসাকে আবার প্রতিষ্ঠা করা, জমিদারি সামলানো, জমিদারির আয় বাড়ানো — এসবকিছুই বিস্ময় তৈরি করে বইকি।
বিস্মিত হতে হয় সংসারী হয়েও পার্থিব বিষয়ে তাঁর অনাসক্তি দেখে। ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামেও তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। সিপাহী বিদ্রোহে তাঁর সদর্থক ভূমিকা, স্বায়ত্তশাসনের জন্য ব্রিটিশ পার্লামেন্টে দরখাস্ত পাঠানো, ব্রিটিশ ইন্ডিয়ান সোসাইটির সম্পাদক হিসেবে গ্রামবাসীদের ওপর থেকে চৌকিদারী ট্যাক্স ওঠানোর প্রচেষ্টা, এসবকিছুই তাঁর সমাজসেবা আর দেশপ্রেমের সাক্ষ্য বহন করে।
ভ্রমণের ক্ষেত্রেও তাঁর মতো ভারতপথিকের উদাহরণ খুঁজে পাওয়া কঠিন। এই দেশপ্রেমিক, অধ্যাত্মবাদী, দার্শনিক, ভারতপথিক, জমিদার, প্রজাবৎসল, নারীশিক্ষা প্রসারী দেবেন্দ্রনাথকে নিয়ে বিভিন্ন প্রবন্ধ আর কবিতায় ‘মুজনাই’ এর সংখ্যাটিকে সাজিয়েছেন সম্পাদক।

পত্রিকাটির প্রবন্ধগুলি একে একে মেলে ধরে এই মহাপ্রাণের বিভিন্ন দিক।
শ্যামলী সেনগুপ্ত লিখেছেন ‘মহাজীবনের এক চিলতে’  প্রবন্ধটি। এখানে পড়া যায় দেবেন্দ্রনাথ কী ভাবে মহর্ষি হয়ে উঠলেন তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ। কেমন ছিলেন পিতা দেবেন্দ্রনাথ? কনিষ্ঠ সন্তানকেই কি তিনি সবচেয়ে বেশী ভালবাসতেন? এমন সব বিষয় নিয়ে লিখেছেন গৌতম কুমার ভাদুড়ী। মনিদীপা নন্দী বিশ্বাসের লেখার বিষয় ‘মহর্ষির মনোবীক্ষা ও উত্তরণ’।

মূল্যবোধের এই অবক্ষয়ের সময়ে মহর্ষির ভূমিকা কতটা মূল্যাবান,  সুদীপ মজুমদারের লেখা তারই হদিশ দেয়। কুমকুম ঘোষের লেখাটি অন্য এক দেবেন্দ্রনাথের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় ঘটায়। অল্পবয়সে তিনি কতটা  ‘শৌখিন বাবু’ ছিলেন — এই লেখায় সেটাই দেখিয়েছেন লেখিকা। কী ভাবেই বা তিনি হয়ে উঠলেন একজন ঋষিকল্প মানুষ, সে বিষয়টিও এড়িয়ে যাননি লেখিকা। রীণা সাহার লেখাটি সংক্ষিপ্ত। কিন্তু, দেবেন্দ্রনাথের জীবনের দ্বন্দ্ব ও টানাপোড়েনকে নিপুণ ভাবে সাজিয়েছেন রীণা।প্রায় একই পরিসরে অংশুমান পালের লেখা পরিচয় করায় ‘পথিক দেবেন্দ্রনাথ’ এর সঙ্গে।
সোমা বোসের ‘খেরোর খাতা’ গল্পের  আঙ্গিকে লেখা। প্রবন্ধ থেকে এই লেখাটিতে পৌঁছে পাঠক, অন্য স্বাদ পান। ভিন্ন স্বাদ, তপতী সাহার লেখাতেও।
মুজনাইয়ের এই সংখ্যায় লিখেছেন আরও অনেকে। প্রবন্ধ নিবন্ধের সঙ্গে কবিতাকেও স্থান দিয়েছেন সম্পাদক। দেবেন্দ্রনাথকে নিয়ে কবিতা লিখেছেন নারায়ণ দত্ত, বেলা দে, শিবু মন্ডল, সুব্রত নন্দী, নিশীথ বরণ চৌধুরী, দেবযানী সিনহা এবং দীপ্তিমান মোদক। প্রচ্ছদ শিল্পী, তৃপ্তি দত্ত এবং দীপশিখা চক্রবর্তী।
বিষয় নির্বাচন, সম্পাদনা এবং প্রচ্ছদ মিলে পাঠকের সমীহ আদায় করে নেয় ” মুজনাই” এর এই সংখ্যা।
—————

Comments are closed.