শনিবার, মার্চ ২৩

হাসি হাসি বাজাও বাঁশি মুখ দিয়ে, আর নাকেও

দ্য ওয়াল ব্যুরো, পুরুলিয়া : কখনও গভীর রাতে, কখনও ভোরের আলো ফোটার সময় ভেসে আসে তাঁর বাঁশির সুর। সেই চেনা সুর শুনে অভ্যস্ত গোটা তল্লাটের মানুষ। সেই কোন ছোটবেলায়, হাতে উঠেছিল আড়বাঁশি। সুরে ভেসেই পার করে ফেলেছেন জীবনের ৬৫টা বছর। এই বাঁশি নিয়েই অদ্ভুত খেলা তাঁর। হাতের বাঁশি মুখ থেকে সরিয়ে কখনও ধরেন নাকের সামনে। তারপর নাক দিয়েই বাজিয়ে চলেন, যতক্ষণ প্রাণে চায়।

অযোধ্যা পাহাড়ের কোল ঘেঁষা ছোট্ট গ্রাম রেরেংটার। এ গ্রামেই বেড়ে ওঠা চন্দ্রমোহন সিং মুড়ার। বাবা ছিলেন ছৌ শিল্পী। তাই শিল্পের আঙিনাতেই জন্ম ও বড় হওয়া। কিন্তু নাচ নয়, প্রথম থেকেই চন্দ্রমোহনের পছন্দ ছিল বাঁশি। কখনও আড়বাঁশি, কখনও মুরলীবাঁশি নিয়ে সুরের সাধনা যখন মোটের উপর সফল তখন একদিন নতুন পথে হাঁটা শুরু। তাঁর কথায়, “ ছোট থেকেই বাঁশি নিয়ে নাড়াচাড়া করতাম দিনভর। একদিন হঠাৎই মনে হলো, সবাই তো মুখ দিয়ে বাঁশি বাজায়, দেখি তো নাক গিয়ে বাঁশি বাজাতে পারি কি না?”

সেই শুরু। দিনের পর দিন কঠোর অনুশীলনে আয়ত্বে এনে ফেললেন এই দুরূহ প্রক্রিয়া। এখন মুখ আর নাকে সমানভবে বাঁশি বাজান তিনি। শুধু দেশ নয়, বিদেশেও বহুবার ঘুরে এসেছেন চন্দ্রমোহন। ছৌ, কীর্তন, ঝুমুর দলের শিল্পী হয়ে। দর্শক শ্রোতারা অবাক হয়ে শুনেছেন আর দেখেছেন তাঁকে। তিনি বলেন, “ইংল্যান্ডে গেছি। জাপান ও জার্মানিতেও গেছি। দলের সঙ্গে বাজাতে বসে কখনও বাঁশি বাজিয়েছি মুখ দিয়ে, কখনও আবার নাক গিয়ে। অবাক হয়েছেন সবাই। তবে আমার এখন আর আলাদা কিছু মনে হয় না। মুখ দিয়ে যেমন বাঁশি বাজাই, তেমন নাক দিয়েও।”

জমি জমা কিছু রয়েছে। সেখানে চাষ হয়। তবে মূলত বাঁশি বাজিয়েই দিন চলে চন্দ্রমোহন সিং মুড়ার। বাড়িতে রয়েছেন স্ত্রী ও দুই কন্যা। বড় দুই মেয়েরও বিয়ে হয়ে গেছে। সর্বত্র অনুষ্ঠান করে যেটুকু আয় হয়, তাতেই চলে যায় চার জনের সংসার । জানালেন শিল্পী নিজেই।

দেশে-বিদেশে ঘুরে বেড়ান, কিন্তু ঘরে থাকলে পাহাড়তলির গ্রামগুলিই তাঁর প্রিয় গন্তব্য। বাঁশিতে সুর তুলতে তুলতেই হেঁটে বেড়ান জঙ্গলে পাহাড়ে। প্রচারের আলো থেকে শত যোজন দূরে। বাংলার লোক সংস্কৃতিকে ধরে রাখার সংকল্প নিয়ে।

Shares

Comments are closed.