রবিবার, অক্টোবর ২০

বাঘা বাইনের ঢাকের বোল মন টানে না আর, অন্ধকার কল্যাণগড়

শান্তনু হালদার, উত্তর ২৪ পরগনা : সকাল সন্ধ্যায় প্রতিটি বাড়িতেই তখন শুধু ঢ্যাং কুড়কুড় ঢ্যাং। আকাশে সাদা মেঘ, ভেলা ভাসাক বা না ভাসাক, কাশফুলে দোলা লাগুক বা না লাগুক, আশেপাশের মানুষ বুঝতে পারতেন পুজো এসেছে।

কল্যাণগড় নট্টপাড়ার প্রতিটি বাড়িতেই তখন ব্যস্ততা। একদিকে চলছে অনুশীলন, অন্যদিকে সপ্তাহদুয়েকের জন্য বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার প্রস্তুতি। বাড়ির সব পুরুষরাই পারি দেবেন ভিন রাজ্যে বা এ রাজ্যেরই নানা প্রান্তে। পুজো প্রাঙ্গনে ঢাক বাজাতে হবে যে। প্রায় গোটা বছরের আয়ের এইতো মরসুম।

সাধনার এই মুকুটেই পালক জুড়ল তখন, যখন এখানে এসে গুপি গাইন বাঘা বাইন সিনেমায় ঢাক বাজানোর জন্য ক্ষীরোদ নট্টকে নিয়ে গিয়েছিলেন সত্যজিৎ রায়। ছবির সাফল্যে কল্যাণগড়ের নট্টপাড়ার খ্যাতিও ছড়িয়ে পড়েছিল গোটা ভারতে। “ঢাক পাড়ায় সে সব ছিল স্বর্ণযুগ। পুজো এলেই ঢাক বাজানোর বায়না। রাজ্যতো বটেই, এমনকী ডাক আসত ভিনরাজ্যেও। এখন পুরোটাই অন্ধকার। কেউ ডাকে না আর।” বলছেন বাসিন্দারা।

গুপি গাইন ছবিতে ঢাক বাজিয়ে জাতীয় পুরস্কার পেয়েছিলেন ক্ষীরোদ নট্ট। তাঁর পরের প্রজন্মের কেউ টোটো চালান। কেউ টানেন ভ্যান। পঙ্কজ নট্ট বলেন, ‘পুজোর সংখ্যা অনেক বেড়েছে, বেড়েছে পুজোর বাজেটও, কিন্তু আমাদের আর প্রায় কেউই ডাকে না। টোটো চালাই। সরকার থেকে মাসে এক হাজার টাকা করে ভাতা পাই। তাই দিয়েই কোনওমতে সংসার চলে!”

তবুও পুজো এলেই ছটফট করে মন। টানে ঢাকের বোল। পুরনো ঢাক বের করেই শুরু হয় ঝাড়পোঁচ। যদি কেউ বায়না করতে আসে সেই আশায়। আর্থিক কষ্টতো রয়েইছে, পাশাপাশি রয়েছে শিল্পীর যন্ত্রণা। প্রতি বছর পুজো এলে সেই কষ্টটাই বেড়ে যায় আরও।

দীর্ঘদিন ধরে বাড়ির পুরুষদের এই কষ্ট দেখতে দেখতে এ বার এগিয়ে এসেছেন বাড়ির মহিলারা। এই শিল্পকে বাঁচাতে এতদিন ধরে যে বোল তাঁরা কানে শুনে এসেছেন তা হাতে ফুটিয়ে তুলতে কাঁধে তুলে নিয়েছেন ঢাক। সারাদিনের কাজের ফাঁকে সময় করে বোল তুলছেন। এলাকার ঢাকবাদক সজল নন্দীর সহযোগিতায় তৈরি হয়েছে মহিলা ঢাকিদের দল। বাংলার এই ঢাক শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখার শেষ চেষ্টায় একরকম মরিয়া তাঁরা। বায়না যে বিশেষ হয়েছে তা নয়, তবুও শিল্পের ঋণশোধের দায়িত্ব যে শিল্পীরও।

Comments are closed.