শুক্রবার, সেপ্টেম্বর ২০

বাহাত্তরেও হাতে ধরা রাজার লাগাম, টগবগ শুনলেই কেতুগ্রাম বোঝে বাদশা আসছেন

  • 117
  •  
  •  
    117
    Shares

কৌশিক দত্ত, কাটোয়া : টগবগ শব্দে রক্তের স্রোত যেন দ্বিগুণ জোরে বয়। এখনও। এই ৭২ বছরেও। পিঠে উঠে বসলেই রাজকীয় আমেজ। ইতিহাসের রাজা বাদশা কেউ কেতুগ্রামের মেঠো পথের ধুলো উড়িয়ে আদৌ কখনও গেছেন কি না, জানা নেই তাঁর। তবে রাজার পিঠে চড়ে বসলে এখন তিনিই বাদশা।

গোটা কেতুগ্রাম বাদশা নামেই চেনেন ৭২ বছরের বৃদ্ধ জামাল শেখকে। মোটর সাইকেলই হোক, আর বাস- সবই তাঁর না পসন্দের তালিকায়। হাট-বাজার, ডাক্তার-ওষুধ, পঞ্চায়েত অফিস, সব কাজই তিনি সারেন তাঁর বাহনের পিঠে সওয়ার হয়ে। একাধিকবার গ্রামের ছেলেদের মোটরবাইকের সঙ্গে টক্কর নিয়েও প্রমাণ করে দিয়েছেন  তিনিই শের।

স্ত্রী গত হয়েছেন কয়েক বছর আগেই। এখন তিন ছেলে, ছেলের বউ, নাতি নাতনি নিয়ে ভরা সংসার। আর সর্বক্ষণের সঙ্গী রাজা।

স্মৃতিচারণ করতে করতেই শৈশবে ফিরে গেলেন বৃদ্ধ। ‘‘একবার এক আত্মীয় এসেছিলেন বাড়িতে। ঘোড়ায় চেপে। দিনকয়েক আমাদের বাড়িতেই ছিলেন তিনি। তখন আমার বারো কি তেরো বছর বয়স। সেই ঘোড়ার দেখভালের দায়িত্ব পড়ল আমার উপর। আমিই দানাপানি দিতাম তাকে। ঘোড়ায় চড়াও শিখে গেলাম। তারপর সেই আত্মীয় চলে গেলেন। নেশাটা আমার মধ্যে চারিয়ে দিয়ে।’’

বাবার কাছে আব্দার করেছিলেন ঘোড়া কিনে দেওয়ার জন্য। বদলে জুটেছিল বেদম মার। হেসে ফেললেন জামাল শেখ। এরপর সংসারে চরম অর্থাভাবে শখকে দমিয়ে রেখেই কাজের খোঁজে যুবক জামাল। এক আত্মীয়ের সুপারিশে কাজ মেলে বিহারের বিস্কুট কারখানায়। ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত কাজ করেছেন সেখানেই। তারপর ফিরে আসেন বাড়ি। শৈশবের শখ মাথায় নড়েচড়ে বসে আবার।

যেমন ভাবা তেমনি কাজ। চোদ্দ হাজার টাকার বিনিময়ে কিনে ফেলেন এক সতেজ ঘোড়া। নাম রাখেন রাজা। সেই রাজার পিঠে চড়েই এরপর নতুনভাবে শুরু পুরনো জীবন। কাজকর্মে বাড়ির বাইরে বেরোতে হলে রাজাই ভরসা হয়ে যায় তাঁর। আর কখনও কোনও যানে ওঠেননি তিনি।

দিন এগিয়েছে। বয়স বেড়েছে রাজারও। তাই কিছুদিন আগে আবার একটি রেসের ঘোড়া কিনে এনেছেন জামাল শেখ। এখন জোরকদমে চলছে তার অনুশীলন।

গুড় ও ছোলার দাম অনেকটাই। তাতে অবশ্য দমে নেই জামাল শেখ। ছেলেরা দাঁড়িয়ে গেছে। চাষবাস করে বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই এখন দিন কাটে জামাল শেখের। তাতে দুই ঘোড়ার গুড় ছোলা আসে অনায়াসেই। তাঁর ছেলেরা বলেন, ‘‘এখানকার সমস্ত প্রয়োজনীয় কাজতো বাবা ঘোড়ায় চেপে সারেনই, এমনকি বীরভূম, মুর্শিদাবাদে আত্মীয়ের বাড়িতেও চলে যান ঘোড়ায় চেপে। মাঝে মাঝে দুশ্চিন্তা তো হয়ই।’’ তবে জামাল শেখ নিশ্চিন্ত, বেইমানি করবে না তাঁর রাজা। প্রতিবেশী আজফর শেখ বলেন, ‘‘সেই ছোট্ট থেকেই দেখছি জামাল চাচাকে ঘোড়ায় চড়তে।এখন বৃদ্ধ বয়সে ঘোড়ায় চাপতে না পারলে অসুস্থ হয়ে পড়বেন চাচা।’’

বাড়িতে এখন মোটরবাইক রয়েছে ছেলেদের। কিন্তু ছেলেদের শত অনুরোধেও জামাল শেখ কোনওদিন চেপে দেখেননি।  পনেরো বছরের নাতি সাহিল শেখও নাকি দাদুর ধাত পেয়েছে। তারও ঘোড়ায় চড়ার শখ। তাতে দারুণ খুশি জামাল শেখ। নিজে হাতেই নাতিকে শেখাচ্ছেন লাগাম টানা। সাহিলও এখন দেখভাল করে রাজা ও সদ্য আনা ঘোড়াটার। ‘‘মোটরবাইককে হার মানিয়ে দেয় রাজা। দাদুর মতো আমিও ঘোড়ায় চেপেই ঘুরব।’’ অকপট সাহিল।

Comments are closed.