বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৭

বাবা বলেছিল সাগর থেকে ইলিশ নিয়ে ফিরলে সাইকেল কিনে দেবে

নকিবউদ্দিন গাজি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা : বাংলাদেশের জাহাজ থেকে ছুড়ে দেওয়া লাইফ জ্যাকেটটা কোনও মতে আঁকড়ে ধরতে পেরেছিলেন। তাতেই মৃত্যুর কিনারা থেকে ফিরে এসেছেন কানু দাস। সে খবর এখন লোকের মুখে মুখে। এই আলো কিন্তু ঢাকতে পারেনি কাকদ্বীপের নারায়ণপুর গ্রামের সবটুকু অন্ধকার। সেখানে এখন ঘরে ঘরে কান্না, দীর্ঘশ্বাস, সঙ্গে অলৌকিক কিছুর অপেক্ষা। সমুদ্রে ভাসতে ভাসতে যদি কানুর মতোই ফিরে আসেন অন্য মৎস্যজীবীরাও। গ্রামের দেবী মনসার থানে তাই দিনরাত হত্যে দিয়ে পড়ে রয়েছেন আপনজন।

রবিবার ট্রলারডুবির খবর আসার পর থেকেই ঘরে ঘরে কান্নার রোল এই গ্রামে। ঘরের মানুষ নিখোঁজ। তাই কেউ কাঁদছে বাবার জন্য, কেউ স্বামীর জন্য। কেউ সন্তানকে দেখার জন্য পাগল।

গ্রামের স্কুলে ক্লাস ফাইভে পড়ে তৃষা মণ্ডল। তার বাবা গোপাল মণ্ডল সমুদ্রে যাওয়ার আগে বলে গিয়েছিল ইলিশ মাছ নিয়ে ফিরতে পারলেই সাইকেল কিনে দেবে তাকে। আর হেঁটে হেঁটে গ্রামের কাদা রাস্তা ডিঙিয়ে স্কুলে যেতে হবে না। বাবার কথা বলতেই বাঁধভাঙা জল তৃষার চোখে। তার কথায় “ যাওয়ার আগে বাবা বলল, ছোট বোনটাকে মারবি না কিন্তু। ওকে দেখে রাখবি। আমি মাছ নিয়ে ফিরতে পারলেই এ বার তোকে সাইকেল কিনে দেব।” যাওয়ার আগে স্ত্রীকেও বলে গিয়েছিলেন দুই মেয়ে তৃষা আর মৌসুমীকে দেখে রাখতে।

নিখোঁজ নিমাই দাসের পরিবার

টালির ছাউনি, ত্রিপল দিয়ে ঘেরা এক চিলতে বাড়িতে অসুস্থ বাবা, স্ত্রী ছেলে মেয়েদের রেখে উপার্জনের জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়ে গভীর সমুদ্রে পাড়ি দিয়েছিলেন নিমাই দাসও। রবিবারের পর থেকে আর খোঁজ মেলেনি তাঁরও। এফবি নয়ন নামের ট্রলারটি সমুদ্রের ঢেউয়ের ধাক্কায় ভেঙেচুরে ডুবে যাওয়ার পর থেকেই ঘরের মানুষের কথা ভেবে নাওয়া খাওয়া ভুলেছিল পরিবারটি। কিন্তু ট্রলারের মাঝি কানুদার বেঁচে ফেরার খবরে একটু যেন আশার ঝিলিক। তবে কী তাদেরও ঘরের মানুষদের ঘরে ফেরার সম্ভাবনা আছে? আশা আশঙ্কার দোলাচলে গোটা পরিবার।

মনসার থানে আর্তি

গ্রামের মনসার থানে এখন শুধুই কান্না আর আর্তি। দেবী মনসার কাছে মানত রাখছেন তাঁরা। যে দশ মৎস্যজীবী এই গ্রাম থেকে গিয়ে হারিয়ে গিয়েছেন, সবাই ফিরে আসুক কানুবাবুর মতো।

রবিবার খারাপ আবহাওয়ায় বাংলাদেশের হাড়িভাঙা চরের কাছে বঙ্গোপসাগরে ডুবে যায় চারটি ট্রলার। ৩৪ জন মৎস্যজীবীকে উদ্ধার করা সম্ভব হলেও এখনও নিখোঁজ ২৬ জন।

আরও পড়ুন

বরাতের জোরে নিজে বাঁচলেন, ভাগ্নে তো রয়ে গেল জলে, বোনের সামনে কোন মুখে দাঁড়াবেন কানু?

Comments are closed.