শনিবার, মার্চ ২৩

মেডিক্যাল কলেজের অভূতপূর্ব পদক্ষেপ! সাড়ে ১৭ লক্ষ টাকার ওষুধে বাঁচল ১২ বছরের রুদ্র

দ্য ওয়াল ব্যুরো: সাড়ে সতেরো লক্ষ টাকা! ১২ বছরের ছেলেটির প্রাণ বাঁচাতে এই পরিমাণ টাকাই প্রয়োজন ছিল। যার বিনিময়ে ইঞ্জেকশন কিনে, পুশ করতে হবে শরীরে। নইলে কেবল রক্তক্ষরণেই মারা যাবে সে। আশার আলো প্রায় ছিলই না মধ্যবিত্ত দম্পতি বিশ্বজিৎ ও সুপ্রীতা সাহার চোখে। তবু বেঁচে গেল তাঁদের সন্তান রুদ্রজিৎ। সৌজন্যে, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ এবং পশ্চিমবঙ্গ স্বাস্থ্য দফতর।

কোথাও কেটে-ছড়ে গেলে রক্ত সহজে বন্ধ হয় না তার। ডাক্তারি পরিভাষায় তার নাম হিমোফিলিয়া। মাত্র পাঁচ বছর বয়স থেকেই দুরারোগ্য এই অসুখে আক্রান্ত সে। মাঝে মাঝেই রক্তে প্রয়োগ করতে হয় ‘ফ্যাক্টর এইট’। সাময়িক স্বস্তি মেলে। কিন্তু এই বার সমস্যা হল বড়। গত মাসের ২৬ তারিখ থেকে প্রস্রাবের সঙ্গে রক্ত পড়তে শুরু করল ১২ বছরের রুদ্রজিতের। বন্ধ আর হয় না। প্রতিবারের মতো মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি করে, ফ্যাক্টর এইট পুশ করেও হল না সমাধান।

ছ’হাজার ইউনিট ফ্যাক্টর এইট পুশ করার পরে জানা গেল, তার শরীর ফ্যাক্টর এইট রেসিস্ট করে ফেলেছে। অর্থাৎ ফ্যাক্টর এইট আর কোনও কাজ করবে না। এই অবস্থায় রোগীর প্রয়োজন একটি দামি ওষুধ ফিভা। এতটাই দামি, যে এক এক দিনের প্রয়োজনীয় আটটি ডোজ় প্রয়োগ করতে খরচ হবে আড়াই লাখ টাকা করে! কম করে সাত দিনের কোর্স চালাতে হবে। অর্থাৎ মোট খরচ সাড়ে সতেরো লক্ষ টাকা! এ ছাড়া বাঁচার অন্য উপায় দেখাতে পারেননি চিকিৎসকেরা।

এই অবস্থায়, প্রথম দিন স্টক থেকেই আড়াই লক্ষ টাকা মূল্যের চার হাজার ইউনিট ফিভা রুদ্রজিতের জন্য বরাদ্দ করেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের সুপার ডক্টর ইন্দ্রনীল বিশ্বাস। কিন্তু টানা সাত দিন এতটা দামি ওষুধ এক জন রোগীর জন্য দেওয়া হাসপাতালের পক্ষে সম্ভব ছিল না বলে জানালেন তিনি। ইন্দ্রনীলবাবু বলেন, “এ জন্য স্বাস্থ্য দফতরের অনুমতি প্রয়োজন। আমি ওঁদের বলি, সরাসরি স্বাস্থ্য দফতরে আবেদন করতে। ওঁরা চিঠি লেখেন, আমি ফরোয়ার্ড করে দিই। স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের মাধ্যমে ওই দিনই দফতরে চিঠি জমা করেন ওঁরা। অনুমতি আসতে সময় লাগেনি এর পরে। এখন ভাল আছে রুদ্র।”

রুদ্রজিতের মা সুপ্রীতাদেবী জানালেন, ছোটবেলা থেকেই মেডিক্যাল কলেজে চিকিৎসা চলছে তাঁর ছেলের। তবে এই বারের মতো রক্তপাত আগে কখনও হয়নি। কিডনি থেকে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা, যা প্রস্রাবের মাধ্যমে শরীরের বাইরে আসছিল। “প্রতি বারের মতোই ফ্যাক্টর এইট দিলেন ডাক্তাররা। কিন্তু তিন দিন পরেও কমছিল না ব্লিডিং। তখনই আমরা জানলাম, ফিভা দরকার ওর। কিন্তু ফিভার দাম জানার পরেই দুনিয়া অন্ধকার হয়ে গিয়েছিল। ভেবেছিলাম ছেলেটাকে বুঝি….”– গলা ধরে আসে তাঁর।

মেডিক্যাল কলেজের সুপারের কাছে অনুরোধ করেন, বেলঘরিয়ার বাসিন্দা অসহায় বাবা-মা। প্রথম দিনের ফিভা নিজের উদ্যোগেই দিয়ে দেন উনি। পরামর্শ দেন, বাকি ওষুধের জন্য স্বাস্থ্য দফতরে আবেদন করতে। সেই মতো আবেদন করে, সুপারের সই-সহ, এলাকার কাউন্সিলর প্রণব ঘোষের সঙ্গে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের কাছে পৌঁছন বিশ্বজিৎ বাবু। এর পরে কয়েক ঘণ্টা লাগে কেবল, সমস্যার সমাধান হতে।

“উনি ছিলেন বলেই আমার ছেলেটা বেঁচে গেল। ওই দিনই স্বাস্থ্য দফতরে পৌঁছয় আমাদের আবেদন। মঞ্জুরও হয়ে যায়। ইতিমধ্যে দ্বিতীয় দিনের ফিভার ব্যবস্থাও হাসপাতালের তরফে করে দেন সুপার ইন্দ্রনীল বিশ্বাস। তার পরেও স্বাস্থ্য দফতরের নির্দেশে আরও পাঁচ দিন টানা চলল ফিভা। এখন ও ভাল আছে, ডাক্তাররা বলেছেন বিপদ কেটেছে। কিন্তু আরও ফিভা দরকার ওর।”– বললেন মা সুপ্রীতা।

চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যকে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, সরকারি হাসপাতালে যে কোনও অসুখেই বিনামূল্য চিকিৎসা পাওয়া সম্ভব। “এটা ওর অধিকার। বর্তমান সরকার প্রতিটা রোগীর জন্য বিনামূল্যে চিকিৎসা নিশ্চিত করেছে। সেই অধিকারেই ও এই ওষুধটা পেয়েছে হাসপাতাল থেকে।”– বলেন তিনি। কিন্তু এরকম রোগীর সংখ্যা তো নেহাৎ কম নয়। সকলের জন্যই কি এই পরিষেবা সম্ভব হবে? প্রশ্নের উত্তরে চন্দ্রিমা জানান, “সকলের জন্যই চেষ্টা করা হবে সরকারি ভাবে।”

Shares

Comments are closed.