মঙ্গলবার, সেপ্টেম্বর ১৭

ভাগ্যিস দেখলেন ‘পুলিশকাকু’, পাঁচ বছর পরে মায়ের কাছে ফিরল হারানো মেয়ে

বিমল বসু, বসিরহাট : মাঝে কেটে গেছে পাঁচটা বছর। মেয়ের মুখ যে আর কোনও দিন দেখতে পাবেন সে আশা শেষ হয়ে গেছিল কবেই। পুনর্মিলনে তাই বাঁধ ভাঙল চোখে। মা মেয়ে দুজনেরই। অজান্তেই তখন মন ভিজছে দুঁদে-কড়া পুলিশকর্তাদেরও।

আসানসোলের বাসিন্দা কিঙ্কর বাদ্যকর ও মিনা বাদ্যকরের বড় মেয়ে চন্দনা। কয়েক বছর আগে আসানসোলেরই বাসিন্দা কাজল মণ্ডলের সঙ্গে বিয়ে হয় চন্দনার। বিয়ের কিছুদিন পরে চন্দনার স্বামী ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। স্বামীর মৃত্যুর পরে অসুস্থ হয়ে পড়েন চন্দনা। একদিন বাজারে বেরিয়ে আর বাড়ি ফিরে আসেননি। মিনাদেবী বলেন, ‘‘অনেক খোঁজ করেছি মেয়ের। পুলিশেও জানিয়েছি। কিন্তু হদিস পাইনি। তারপরে ওকে ফিরে পাওয়ার আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম।’’

এ দিকে চন্দনা ঘুরতে ঘুরতে একদিন বসিরহাটের হিঙ্গলগঞ্জের কানাইকাটি গ্রামে চলে আসেন। বাড়ি এবং পরিবারের বিষয়ে কিছু জানাতে পারেননি। এরপরে এখানেই একজনের বাড়িতে পরিচারিকার কাজে লেগে যান তিনি। অভিযোগ, চন্দনাকে কাজের বিনিময়ে শুধু খাবারই দেওয়া হত। আর কিছুই নয়। মাঝেমধ্যে তাকে মারধরও করা হত। চন্দনা একদিন অসুস্থ হয়ে পড়লে তাঁকে কলকাতায় ছেড়ে দিয়ে আসা হয়।

কলকাতা থেকে ঘুরতে ঘুরতে ফের হিঙ্গলগঞ্জে চলে আসেন চন্দনা। এ বারে দুলদুলি গ্রামের এক চা বিক্রেতা তাঁকে বাড়িতে আশ্রয় দেন। তাঁরই চেষ্টায় স্থানীয় দু’নম্বর সাহেবখালি গ্রামের এক যুবক উদয় মণ্ডলের সঙ্গে তিন মাস আগে চন্দনার বিয়ে দেওয়া হয়। চেন্নাইতে কাজ করেন উদয়। স্ত্রীকে নিয়ে সেখানে যাওয়ার পথে একটা স্টেশনে নেমে পড়ে ফের হারিয়ে যান চন্দনা।

এই পুরো গল্পটাই শোনা‌লেন বসিরহাটের এসডিপিও অভিজিৎ সিনহা মহাপাত্র। অভিজিতবাবু বলেন, ‘‘একজন ল-ক্লার্ক অসুস্থ ওই তরুণীকে আমার কাছে নিয়ে আসেন। আমি তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করি। একটু সুস্থ হলে ওর কাছ থেকে বাড়ির ঠিকানা সংগ্রহ করে ওর স্বামী এবং মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করি। আইনি প্রক্রিয়া শেষে ওকে বাড়ি পাঠানোর ব্যবস্থা করা হল। হারিয়ে যাওয়া মেয়েকে তাঁর পরিবারের হাতে তুলে দিতে পেরে খুবই খুশি আমরা।’’

চন্দনার স্বামী উদয় বলেন, ‘‘ট্রেনে বাথরুমে গিয়েছিলাম। ফিরে দেখি স্ত্রী নেই। অনেক খোঁজ করে না পেয়ে শেষপর্যন্ত বাড়ি ফিরে আসি। পাঁচ দিন আগে সন্ধ্যায় বসিরহাটের ভ্যাবলা স্টেশনে তাঁকে অসুস্থ অবস্থায় ঘোরাঘুরি করতে দেখে একজনের সন্দেহ হয়। তিনিই ওঁকে নিয়ে এসডিপিও স্যারের কাছে যান। ওঁর চেষ্টাতেই আবার স্ত্রীকে ফিরে পেলাম।’’

এ দিন চন্দনা বলেন, ‘‘আমার এমনই কপাল যে মাঝেমধ্যে কেমন অসুস্থ হয়ে পড়ি। ওই সময় কিছু মনে থাকে না। আগের স্বামীর মৃত্যুর পর মাকে হারিয়ে ফেলি। দ্বিতীয়বার বিয়ের পর স্বামীকেও হারিয়ে ফেলেছিলাম। পুলিশ কাকুর জন্য সবাইকে আবার ফিরে পেলাম।’’

মেয়ের সঙ্গে এ বার নতুন জামাই পেয়ে আপ্লুত চন্দনার মা মিনা। বারবারই বলছেন ‘‘পুলিশের কাছে আমি কৃতজ্ঞ।’’

Comments are closed.