শনিবার, ডিসেম্বর ১৪
TheWall
TheWall

কোজাগরী পূর্ণিমায় বর্ধমানের আনগুনায় যেন ভর করেন সরস্বতী, হাতে লেখা সেই পত্রিকায় লিখেছিলেন নজরুল,সুনীল-সত্যজিৎও

দ্য ওয়াল ব্যুরো, পূর্ব বর্ধমান : এক সময় মনের খোরাক জোগাতো মুদ্রণ যন্ত্র। ছাপা বইই ছিল বাইরেটাকে দেখার জানলা। কালে কালে টেলিফোন, টেলিভিশন, মোবাইল, শেষমেষ অ্যান্ড্রয়েড ফোন। হাতের মুঠোয় গোটা দুনিয়া। হোয়াটস অ্যাপ, ফেসবুক, টুইটার- আরও কত কি ! এত সব বদল কিন্তু কোনও ছায়া ফেলতে পারেনি এখানে। সময় যেন থমকে গেছে বর্ধমানের আনগুনায়।

আজও কোজাগরী পূর্ণিমায় আনগুনা গ্রাম থেকে প্রকাশিত হয় হাতে লেখা এই সাহিত্য পত্রিকা। ব্যতিক্রমী সে পত্রিকার নাম ‘প্রভাত সাহিত্য পত্রিকা’। সেই ১৯৪৭ সাল থেকে প্রকাশিত হয়ে আসছে এই পত্রিকা। রায়নার প্রত্যন্ত অখ্যাত গ্রামের এই পত্রিকা কিন্তু যথেষ্ট কদর জেলা ছাড়িয়ে রাজ্যের সাহিত্যিক মহলেও। আগামীকালের জন্য কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে বেশ কয়েকদিন আগে থেকেই।

হাতে লেখা এই সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশনার মূল উদ্যোক্তা আনগুনা গ্রামের প্রভাত সংঘের সদস্যরা। তাঁদের উদ্যোগেই প্রকাশিত হয়ে আসছে পত্রিকাটি। কয়েক প্রজন্ম বজায় রেখেছে এই ধারা। নামীদামি প্রকাশনা সংস্থা  প্রতিবছরই ঝাঁ চকচকে শারদ ম্যাগাজিন প্রকাশ করে থাকে। জৌলুসে তাদের টেক্কা দিতে না পারলেও, আনগুনা গ্রামের হাতে লেখা এই সাহিত্য পত্রিকার কদর ও খ্যাতি কিন্তু অটুট রয়েছে তাঁর স্বকীয়তা আর আন্তরিকতার কারণেই।

কেমন এই সাহিত্য পত্রিকা, যা নিয়ে এত হইচই ! আট ইঞ্চি বাই বারো ইঞ্চি মাপের ‘প্রভাত সাহিত্য পত্রিকার’ পৃষ্ঠা সংখ্যা দু’শোরও বেশি। তাতে মন ভরানো রঙ।  নামজাদা কবি ও সাহিত্যিক থেকে শুরু করে একেবারে নবাগতদের লেখা কবিতা ও গল্প সবই ঠাঁই পায় এই সাহিত্য পত্রিকায়। পত্রিকা প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত আনগুনা গ্রামের বাসিন্দারা জানালেন, সালটা ছিল ১৯৪৭। তখনও স্বাধীনতার সূর্য ওঠেনি। সেই বছর আনগুনা গ্রামের কয়েকজন সাহিত্যপ্রেমী মানুষ প্রথম এই পত্রিকা প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। তারপর থেকে একই ধারায় চলে আসছে এই সাহিত্য পত্রিকার প্রকাশ। এখন আনগুনা গ্রামের ঐতিহ্যের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে ‘প্রভাত সাহিত্য পত্রিকা’। প্রথা মেনে এখনও প্রতি বছর কোজাগরী লক্ষ্মী পুজোর দিন সন্ধেবেলায় গ্রামের মন্দিরে লক্ষ্মীদেবীকে সাক্ষী রেখে আনুষ্ঠানিক ভাবে প্রকাশিত হয় শারদীয়া প্রভাত সাহিত্য পত্রিকা।

রাজ্যের শষ্যগোলা বলে পরিচিত পূর্ব বর্ধমান। কৃষি সম্বৃদ্ধ এই গ্রামের বাসিন্দাদের আরাধ্য দেবী হলেন লক্ষ্মী। কোজাগরী পূর্ণিমায় গ্রামের প্রতিটি বাড়িতে পুজো হয় তাঁর। গ্রামের মূল মন্দিরেও হয় লক্ষ্মীপুজোর আয়োজন। সেই লক্ষ্মীর সঙ্গেই  কোজাগরীর রাতে সরস্বতীর আরাধনা।

পত্রিকা প্রকাশনার সঙ্গে যুক্ত আনগুনা গ্রামের বাসিন্দা অমিত রায় বলেন, “কাজী নজরুল ইসলাম, কবি কালিদাস রায়, কুমুদরঞ্জন মল্লিক, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়, নবনীতা দেবসেন, সত্যজিৎ রায় কত খ্যাতনামা লেখক ও সাহিত্যিকদের লেখনীতে একসময় সম্বৃদ্ধ হয়েছে প্রভাত সাহিত্য পত্রিকা। আগে এই সমস্ত লেখকের নিজের হাতে লেখা পাণ্ডুলিপিও প্রকাশিত হয়েছে এই সাহিত্য পত্রিকায়। বিখ্যাতদের পাশাপাশি জায়গা করে নিয়েছেন বহু অখ্যাত অথচ মেধাবী লেখক।”

লক্ষ্মী পুজোর অনেক আগে থেকেই শুরু হয়ে গেছে এ বছরের প্রভাত সাহিত্য পত্রিকা প্রকাশনার কাজ। উদ্যোক্তারা  জানালেন, লেখক ও সাহিত্যিকরা যে লেখা পাঠান তা কোনও ছাপাখানায় পাঠানো হয় না। পত্রিকা প্রকাশনার দায়িত্বে থাকা সদস্যরা নির্দিষ্ট মাপে কাটা আর্টপেপারের উপর সেগুলি নিজেরাই লেখেন। শুধু লেখাই নয়, দৃষ্টিনন্দন করে তুলতে রং ও তুলির ব্যবহারও হয় পাশাপাশি।

এত বছর ধরে এই ভাবেই প্রকাশিত হয়ে আসা সাহিত্য পত্রিকাগুলি এখনও সজত্নে সাজানো রয়েছে ক্লাবের আলমারিতে। সদস্যরাই দেখভাল করেন তার।

গ্রামের এই প্রজন্ম উজ্জ্বল বারিক, সুস্মিতা হাজরা, সৌভিক নায়েকরা বলেন, “ডিজিটাল প্রিন্টিংয়ের হাত ধরে মুদ্রণ শিল্পে যতই উন্নতি ঘটুক না কেন আমাদের হাতে লেখা সাহিত্য পত্রিকার আভিজাত্যই আলাদা। বাংলার সনাতন সাহিত্য চর্চার ভাবনাকে সমাদৃত করে রেখেছে ‘প্রভাত সাহিত্য পত্রিকা’। একে এ ভাবেই রাখতে চাই আমরা।”

পড়ুন দ্য ওয়ালের পুজো ম্যাগাজিনের বিশেষ একটি লেখা 

তাহু ফল, ঐশ-রোষ ও পিগমি সমাজ

Comments are closed.