শনিবার, জুলাই ২০

যুব দিবসে উৎসবের আবহ মিশন হাসপাতালে, বিশেষ স্বীকৃতি রক্তদাতাদের, দেখুন ভিডিও

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

এক একটা রক্তকণিকাও গুরুত্বপূর্ণ।

এই বার্তাটুকুই সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল মীর আলম শেখের জীবনে। পেশায় এক জন ছাতা-সারাই মিস্ত্রি আলম যখন জেনেছিলেন তাঁর দুই ছেলেই রক্তের কঠিন অসুখ হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত, তখনও বোঝেননি এই অসুখের গুরুত্ব। শুধু বুঝেছিলেন, আর পাঁচটা বাচ্চার মতো হেসেখেলে নয়, বিছানায় শুয়েই বাড়বে তাদের বয়স। এর ব্যতিক্রম চাইলে, খরচ করতে হবে জলের মতো টাকা। টাকার বিনিময়ে রক্ত দিতে হবে দু’জনকে, নিয়মিত।

আলমের পক্ষে সম্ভব ছিল না তাঁর সামান্য পেশায় দুই ছেলের চিকিৎসার ব্যবস্থা করার। অসম্ভবকে সম্ভব করল মিশন হাসপাতাল। দুর্গাপুরের এই হাসপাতালেই ব্যবস্থা হয় ফ্যাক্টর ইনফিউশন থেরাপির। ন্যূনতম আর্থিক মূল্যের বিনিময়ে। আজ বদলে গিয়েছে আলমের জীবন। চিকিৎসা পেয়ে আপাতত সুস্থ তাঁর দুই সন্তান।

দুর্গাপুরেরই এক ফুচকা বিক্রেতা কাজল দিশাহারা হয়ে গিয়েছিলেন তাঁর ১২ বছরের মেয়ের ব্লাড ক্যানসার ধরা পড়ার পরে। কেমোথেরাপির খরচ বহন করা সম্ভব ছিল না কাজলের পক্ষে। আবারও পাশে দাঁড়িয়েছে মিশন হাসপাতালের হেমাটোলজি বিভাগ। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে, নিখরচায় কেমোথেরাপির ব্যবস্থা হয়েছে ১২ বছরের কিশোরীর। নতুন করে মেয়ের জীবন ফিরে পাওয়ার আশা দেখেছেন কাজল।

এই দু’টি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। দুর্গাপুর মিশন হাসপাতালের যত্নে এভাবেই জীবন ফিরে পাচ্ছে বহু শিশু। রক্তের দুরারোগ্য অসুখ যাদের জীবন কেড়ে নিতে চেয়েছে, তাদের জন্য নিরন্তর লড়ে যাচ্ছে হাসপাতালের হেমাটোলজি বিভাগ এবং ট্রান্সফিউশন মেডিসিন বিভাগ। প্রায় বিনামূল্যে বা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছে তারা। এবং সেটাও অত্যাধুনিক পদ্ধতিতে ও নতুন নতুন যন্ত্রপাতির ব্যবহারে।

মিশন হাসপাতালে বিভিন্ন রক্তের রোগ যেমন ব্লাড ক্যানসারের চিকিৎসার জন্য রয়েছে হেমাটোলজি ও হেমাটো-অঙ্কোলজি বিভাগ। এখানে খুব জটিল রক্তের রোগের বিশ্বমানের চিকিৎসা করার ব্যবস্থা রয়েছে। এমনকী জিন ঘটিত রোগ প্রতিরোধের জন্য এই ডিপার্টমেন্টে গর্ভবতী মায়েদের টেস্ট করার ব্যবস্থা আছে। আজকাল এই সমস্ত রোগের প্রতিরোধে বিয়ের আগেও টেস্ট করিয়ে নেন অনেকে। সেই টেস্টের ব্যবস্থাও আছে এখানে। মিশন হাসপাতালে বোন ম্যারো ট্র্যান্সপ্লান্টও করা হয়।

কিন্তু, এখানেই শেষ নয়। চিকিৎসকদের সর্বোচ্চ চেষ্টা এবং সর্বশ্রেষ্ঠ চিকিৎসা পরিষেবার পরেও কিছু থাকে। এ কথা বলছেন খোদ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই। তাঁরা বলছেন, “এই বাচ্চাগুলিকে সুস্থ করার যতটা দায়িত্ব চিকিৎসকদের, ততটাই সমাজের। সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে ওদের পাশে থাকার জন্য। ওদের সুস্থ জীবনের অধিকার যে সমাজেরও দায়িত্ব, তা আমাদের সকলকে বুঝতে হবে।” ঠিক সেই কারণেই সমাজের জন্য তাঁদের বার্তা, ‘প্রতিটি রক্তকণিকা গুরুত্বপূর্ণ।’

এই বার্তা নিয়েই আজ ১২ জানুয়ারি, জাতীয় যুব দিবসে, হাসপাতালের বিশেষ বাচ্চাদের নিয়ে একটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় দুর্গাপুর মিশন হাসপাতালের তরফে। হেসে, খেলে, আনন্দ করে ওই একটা দিন উদযাপন করল তারা। অংশগ্রহণ করল ‘বসে আঁকো’ প্রতিযোগিতায়। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন অভিভাবকেরাও। তাঁরা ভাগ করে নেন তাঁদের যন্ত্রণা, আশঙ্কার কথা। ছিলেন চিকিৎসকেরা, যাঁরা আশ্বাসের প্রলেপ দেন সেই ক্ষতে। আলোচনা করেন এই ধরনের অসুখের সমস্ত দিকগুলি নিয়ে।

শুধু তা-ই নয়। । অনুষ্ঠানে ডাকা হয়েছিল সেই সমস্ত রক্তদাতাদেরও, যাঁরা কোনও না কোনও সময়ে এই হাসপাতালে লড়তে থাকা ছোট্ট শিশুদের চিকিৎসার জন্য স্বেচ্ছায় রক্তদান করেছেন। এই সামাজিক দায়িত্ববোধের স্বীকৃতি দিল মিশন হাসপাতাল। হাসপাতালের চেয়ারম্যান সত্যজিৎ বসু জানান, বিবেকানন্দের জন্মদিন উপলক্ষে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই এই স্বীকৃতির আয়োজন। “স্বামীজি যুবসমাজকে উদ্বুদ্ধ করেছিলেন, সমাজের কল্যাণে ইতিবাচক ভূমিকা নেওয়ার জন্য। এই রক্তদাতা যুবকেরা তাঁর সেই আশাই পূরণ করেছে। রক্তদান খুব জরুরি এক সামাজিক কাজ। কারণ, প্রতিটা রক্তকণিকা গুরুত্বপূর্ণ।”– বলেন তিনি।

দেখে নিন, এই কাজের কয়েক ঝলক।

Comments are closed.