রবিবার, সেপ্টেম্বর ২৩

কোথায় গেল বায়োস্কোপ-ওয়ালারা!

দ্য ওয়াল ব্যুরো: সময়টা পঞ্চাশ থেকে  সত্তরের দশক। গ্রামগঞ্জে মফস্বলে  দেখা যেত তাঁদের।  তাঁদের গলার আওয়াজ পেয়ে জানালা ফাঁক করে দেখে নিয়েই মা দিদিমাকে বাচ্চারা  আবদার করতো। পাঁচ পয়সা কি দশ পয়সা চাইতো। বাবা জ্যাঠারা ঘরে থাকলে দিতো রাম বকুনি। কিন্তু না থাকলে ? আর পায় কে। জানালার বাইরে ততক্ষনে অবাঙালি উচ্চারণে  বেসুরো গলায় বিজ্ঞাপনী জিঙ্গল  শুরু হয়ে গেছে “আজাও বাবু ..হাওড়া কা ব্রিজ দেখো.. দেখো মাহেশ কা রথ…দিলীপ কুমারকো  দেখো মীনাবাঈকে সাথ”
মোটামুটি জোর জবরদস্তি অন্তমিল ঘটিয়ে আশপাশের বাড়ি থেকে ছেলে ছোকরা থেকে ঘোমটা পরা গ্রাম্য নববধূকেও টেনে আনতেন তাঁরা। হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা নয়, ওরা বায়োস্কোপ-ওয়ালা। বর্ষা বাদ দিয়ে বছর ভোর দেখা যেতো ওঁদের। ছোটো একটি বাক্স স্ট্যান্ডে দাঁড় করানো। তার তিন দিকের দেওয়ালে এরোপ্লেনের জানালার মতো ছোট ছোটো জানালা। জানালা গুলোর আবার দড়ি বাঁধা ঢাকনা আছে। নগদ পয়সা দাও, ঢাকনা খোলার অধিকার নাও। ঢাকনা খুলে চোখ রাখো। ছোট্ট জানালার ভেতরে তখন একের পর এক রঙিন ছবির ম্যানুয়াল স্লাইড শো চলছে বায়োস্কোপওয়ালার হাতের হ্যান্ডেলের ঘূর্ণনে। সঙ্গে  চলেছে ক্লান্তিহীন ভয়েস ওভার। প্রতিটি ছবির বর্ননা, সুরে ও তালে। কখনো কব্জিতে বাঁধা ঘুঙুর আঙুলের সঙ্গে  বোল উঠছে বাক্সের ছাদে।
তাল কাটলে বা ভুলে গেলে ঝুঁকে ওপর থেকে দেখে নেওয়া সেই মুহূর্তে  কোন ছবিটা চলছে।তারপর  আবার মাথামুণ্ডহীন শব্দ নিয়ে সাযুজ্যহীন কড়ারঙের অগুনতি ছবির চলন্ত সিরিজে ফিরে যাওয়া। মিনিট পাঁচেকের স্লট। শো শেষ। কচিকাঁচারা তো থ। কি ঘটে গেল যেন। পৃথিবীতে এত সুন্দর দেখতে জায়গা আছে? একেই বলে ট্রেন ? এটাই কোলকাতা শহর? এটাই হাওড়া ব্রিজ। গ্রামের মেয়ে বৌয়েরা একে অপরের গায়ে ঢলে পরে বলতো দিলীপকুমার লোকটার ঠোঁটটা কি  টুকটুকে লাল দেখেছিস? উঠতি বয়েসের ছোকরারা ইয়ারি রসিকতায় ফিশফিশ করে বলতো মধুবালার পেটটা যেন একতাল মাখন।
বোকা বাক্স এসে যাওয়ার পর চলমান বিনোদন বাক্সগুলি  আজ আর নেই। শুনেছি বাংলাদেশের কোথাও কোথাও এখনও টিকে আছেন কয়েকজন বায়োস্কোপ-ওয়ালা।

বায়োস্কোপওয়ালা নেফাজ আলি

বাংলাদেশের বায়োস্কোপওয়ালা নেফাজ আলি।  বায়োস্কোপ দেখাচ্ছেন ৬৩ বছর ধরে। সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার কালিকাপুর গ্রামে তাঁর বাড়ি। নেফাজ আলির ভাষায়, ‘এই বায়োস্কোপের বয়স ১৩৩ বছর। চাচাজানের কাছে ছিল ৭০ বছর; আমার কাছে আছে ৬৩ বছর ধরে। আজও বায়োস্কোপওয়ালা নেফাজ আলি সন্তানের মতোই  আগলে রেখেছেন বাক্সটি। এই বায়োস্কোপ দেখানোর রোজগারে আজও সংসার চলে তাঁর।
স্যাটেলাইট স্ক্রিনিং-এর যুগে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে বায়োস্কোপ-ওয়ালারা। যে ক’জন আছেন, তাঁরাও তাঁদের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে ক্রমশ পিছিয়ে পড়ছেন। নির্বাক হয়ে দেখছি আমরা তাঁদের নিভে যাওয়া।
Shares

Leave A Reply