রবিবার, জুন ১৬

রোগীরা বলছেন, আমরা অসহায়, ডাক্তাররা বলছেন, আমাদেরও পিঠ ঠেকে গেছে

দ্য ওয়াল ব্যুরো : ডাক্তারদের আন্দোলনের জেরে বুধবার সকাল থেকেই কার্যত শিকেয় ওঠে রাজ্যের চিকিৎসা পরিষেবা। হাসপাতাল ও বিভিন্ন মেডিক্যাল কলেজ সকাল থেকে সরগরম বিক্ষোভ- আন্দোলনে। চিকিৎসার জন্য আসা মানুষজন পরিষেবা না পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। একাধিক ক্ষেত্রে জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে তাঁদের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময়ে সংঘাতের পরিস্থিতি তৈরি হয়। কিছু ক্ষেত্রে রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় রাজ্যের বিভিন্ন হাসপাতাল চত্বর। বর্ধমান হাসপাতালে রোগীর পরিজনদের সঙ্গে জুনিয়র ডাক্তারদের সংঘর্ষে জখম হন বেশ কয়েকজন। এঁদের মধ্যে রয়েছেন এক জুনিয়র ডাক্তার ও দুই পুলিশ কর্মীও।

ডাক্তারদের বক্তব্য, অসুস্থ মানুষকে চিকিৎসা দেওয়াই তাঁদের কাজ। কিন্তু সেই কাজ করতে গিয়ে বারবার যদি হামলার মুখে পড়তে হয় তাহলে তাঁরা নিজেদের কাজ করবেন কী করে ? দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে বলেই  আন্দোলনে নামতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা।

এ দিন সকালে আউটডোরে চিকিৎসা না পেয়ে মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজের সামনে তখন অবরোধ কর্মসূচি চালাচ্ছেন রোগীর পরিজনরা। ঠিক সেই সময়েই ওই হাসপাতাল চত্বরে নিজের কোয়ার্টার্স থেকে বেরিয়ে কলকাতায় কাজে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন কলকাতা মেডিক্যাল কলেজের বিভাগীয় প্রধান স্বরূপ চক্রবর্তী। মেদিনীপুর মেডিকেল কলেজের প্রধান গেট দিয়ে ডাক্তারের গাড়ি বেরোনোর সময় সেই গাড়ি ঘিরে ফেলেন রোগীর পরিজনেরা। মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেই তাঁকে ফেরত যেতে হবে, এই দাবিতে শুরু হয় বিক্ষোভ।

পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে বুঝতে পেরে কোনও মতে তাঁকে উদ্ধার করে হাসপাতালেরই একটি ওয়ার্ডে নিয়ে যাওয়া হয়। স্বরূপবাবুর স্ত্রী মেদিনীপুর মেডিক্যালের নার্সিং স্টাফ। তাই এখানকার কোয়ার্টার্সেই অনেকসময় থাকেন স্বরূপবাবু। এ দিনের ঘটনায় রীতিমতো বিধ্বস্ত তিনি। এনআরএস মেডিক্যালে জুনিয়র ডাক্তারকে মারধরের প্রতিবাদে অচল হয়ে পড়েছে মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে। আজ ইমারজেন্সি খোলা থাকলেও কোনও কাজ হয়নি  আউটডোরে। রোগীর পরিজনদের অভিযোগ, ভর্তি রয়েছেন যাঁরা তাঁদেরও কোনও চিকিৎসা হচ্ছে না। সিনিয়র চিকিৎসকরা এলেও পরিষেবা পাচ্ছেন না রোগীরা। মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে শিশু বিভাগ, মাতৃমা, মেল ফিমেল মেডিসিন ওয়ার্ডে গতকাল মারা গিয়েছে দুই শিশু সহ ৭ জন। দেহগুলি ওয়ার্ডেই পড়ে রয়েছে এখনও। অভিযোগ, ডেথ সার্টিফিকেট লেখার মতো চিকিৎসকও ওয়ার্ডে না আসায় মৃতদেহ সৎকারের জন্য নিয়ে যেতে পারছেন না পরিজনেরা।

একদিকে জুনিয়র ডাক্তার, অন্যদিকে রোগীর পরিজন, জোড়া বিক্ষোভে সকাল থেকেই চরম উত্তেজনা দেখা দেয় মেদিনীপুর মেডিকেল কলেজ চত্বরে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নামানো হয় র‍্যাফ। কোতোয়ালি থানার পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চালাচ্ছে।

হাওড়া লিলুয়ার বাসিন্দা লাল্টু মল্লিকের ছয় মাসের কন্যাসন্তান মিন্নাতের হার্টে ফুটো রয়েছে। বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার খরচ অনেক। তাই একরত্তি মেয়েকে নিয়ে আজ হাওড়া হাসপাতালে আসেন ডাক্তার দেখাতে। আউটডোরে টিকিট কেটে অপেক্ষা করেন গরমের মধ্যে। কিন্তু ঘণ্টা পর ঘণ্টা অপেক্ষা করেও ডাক্তার দেখাতে পারেননি। এনআরএস কাণ্ডের জেরে আজ হাওড়া হাসপাতালে আউটডোর বিভাগে চিকিৎসা হয়নি। ফলে লাল্টু মল্লিকের মতো বহু রোগী ও রোগীর আত্মীয়রা দুর্ভোগে পড়েন।

এনআরএসে ডাক্তার নিগ্রহের প্রতিবাদে পুরুলিয়া গভর্মেন্ট মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালেও আন্দোলনে নামেন চিকিৎসকরা। তবে রোগীদের সমস্যার কথা মাথায় রেখে এক ঘণ্টার টোকেন স্ট্রাইক করেন তাঁরা। সকাল সাড়ে ১০ থেকে সাড়ে ১১ টা পর্যন্ত পরিষেবা বন্ধ ছিল। রোগীদের কথা মাথায় রেখেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন চিকিৎসকেরা, জানিয়েছেন আইএমএ পুরুলিয়া জেলা শাখা।

জুনিয়র ডাক্তারদের লাগাতার কর্মবিরতির ও অবস্থানের ফলে বাঁকুড়া সম্মিলনী মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে চরম অব্যবস্থা অব্যাহত। হাসপাতালে ভর্তি থাকা রোগীরা ঠিক মতো চিকিৎসা পরিষেবা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ। এরই প্রতিবাদে ফের বুধবার সকালে হাসপাতালের সামনের রাস্তায় পথ অবরোধ করেন রোগীর আত্মীয়রা। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় রোগীর আত্মীয়রা পথ অবরোধ করলে পুলিশ লাঠিচার্জ করে অবরোধ তুলে দেয় বলে অভিযোগ।

চরম দুর্ভোগে জলপাইগুড়ি হাসপাতালে আসা রোগীরাও। জহুরি তালমা থেকে সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে অসুস্থ রোগী নিয়ে এসেছিলেন মঞ্জু সরকার। বললেন, “আমার আত্মীয় প্রচন্ড অসুস্থ। আজই ডাক্তার দেখানো জরুরি। আমি জানতাম না হাসপাতালে এলে ডাক্তারবাবু দেখবেন না। এখন খুব সমস্যায় পড়ে গেলাম।”

ডুয়ার্সের ক্রান্তি থেকে ছোট নাতনিকে নিয়ে জলপাইগুড়ি সুপার স্পেশালিটি হাসপাতালে এসেছিলেন করুণা দাস। হাসপাতালে এসে এই পরিস্থিতি দেখে চরম বিপাকে পড়েন। বলেন “দিন মজুরি বন্ধ করে সাতসকালে ছোট বাচ্চাকে নিয়ে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূর থেকে এলাম। ১৫০ টাকা খরচ হোল। কিন্তু কাজ হোল না।”

উত্তরবঙ্গ মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে সকালের দিকে জরুরি বিভাগ খোলা ছিল। আউটডোর বন্ধ থাকায় মানুষজন সেখানেই ভিড় করেন। পরে জরুরি বিভাগের পরিষেবাও বন্ধ করে দেওয়া হয়। ফলে চূড়ান্ত নাকাল হন হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসা মানুষজন। এ নিয়ে দফায় দফায় উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয় জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে। একাধিকবার ঘোরালো হয়ে ওঠে পরিস্থিতি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, অত্যন্ত আশঙ্কাজনক কয়েকজনকে ভর্তি নিয়েছেন তাঁরা। বাকিদের ফিরিয়ে দেওয়া হয়। শিলিগুড়ি হাসপাতালেও এ দিন চিকিৎসার জন্য এসে ফিরে যেতে হয় রোগীদের।

 

Comments are closed.