শনিবার, মার্চ ২৩

থোড়া বহুত

কথায় বলে, কুছ নেহি তো থোড়া থোড়া।

পুরোদস্তুর যদি নাও হয়, খানিকটা তো বটেই।

বাপ কা বেটা, সিপাহি কা ঘোড়া, কুছ নেহি তো থোড়া থোড়া।

কিন্তু এই সে দিন বারাসত স্টেডিয়ামে এক বর্ষণসিক্ত সন্ধ্যায় ছেলে রাজদীপ খেলার শেষে যখন বাপ রঘুর (নন্দী) বুকে মাথা রেখে সশব্দে কাঁদছেন, যাকে আনন্দাশ্রু বলা যায়, কিংবা আবেগাশ্রু— সেই মুহূর্তটা কিন্তু উপরের এই প্রবচনকে দশ গোল দিল।

বাপই ব্যাটাকে শিখিয়েছেন ফুটবল কোচিং। বাবাই ছেলের মধ্যে বপন করেছেন ফুটবল-বোধের বীজ। এরিয়ানের কোচ হিসাবে সেই বাপের শেখানো বিদ্যাকে কাজে লাগিয়ে উল্টে বাপের দল মহামেডান স্পোর্টিংকেই ঘায়েল করা কম শ্লাঘার ব্যাপার নয়। কম আনন্দেরও নয়। ছেলের পিঠ চাপড়ে পরাজিত বাপ তাই বললেন, “আমি সব দলের কোচদের, তাঁদের সাফল্যকে সম্মান করি। একই ভাবে সম্মান করি ছেলেকেও।” জয়ী ছেলেও চোখটোখ মুছে রাশি রাশি বুমের সামনে ঘোষণা করলেন, “এই সাফল্য আমি বাবা ও মা-কে উৎসর্গ করলাম।”

শুধু রাজদীপের সাফল্যই নয়, এই প্রবচনটি ছেলেদের কৃতিত্বকে ‘থোড়া থোড়ার’ মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলেও অনেক ক্ষেত্রেই দেখা গেছে বাপকে ছাপিয়ে গেছেন সন্তানেরা। কোনও বিশেষ বা নির্দিষ্ট উদাহরণের মধ্যে না যাওয়াই বোধহয় সঙ্গত, কারণ ‘সাবজেক্টিভ’ বিচার বা মূল্যায়নের তারতম্য অহেতুক বিতর্ক তৈরি করতে পারে। কিন্তু সাহিত্য-সংস্কৃতি বলুন, বা অভিনয়, খেলাধুলো বা সঙ্গীত জগত– এমন দৃষ্টান্ত ভূরিভূরি।

আবার ব্যতিক্রম আছে উল্টো দিকেও। লেখকের সন্তান বড় লেখক হলেন না, শিল্পীর সন্তান কৃতী শিল্পী কিংবা খেলোয়াড়ের সন্তান চৌখস খেলোয়াড় হলেন না, সে তো একরকম ব্যাপার। কিন্তু যাঁরা সঙ্গীত সাধনায় সেতার না বাজিয়ে, বা সাহিত্যসাধনায় কলম না ধরে একটা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন? সেখানে সন্তান যদি বাপের প্রজ্ঞা, বুদ্ধি, বিচক্ষণতা, মানবিকতা বোধ, সহমর্মিতা অর্জন না করেন, তবে সমাজের, দেশের ও দশের ক্ষতি হয়।

কারণ, প্রতিষ্ঠান কোনো ব্যক্তি নয়। সমষ্টি। অনেক ব্যক্তির মান সম্মান, স্বপ্ন, প্রত্যাশার সমাহার। দুঃখের বিষয়, প্রবচনের পর্যবেক্ষণকে ডাহা ভুল প্রমাণিত করে এমন ঘটনা আকছার ঘটে, যেখানে বাপের গড়া একটা ইনস্টিটিউশন উত্তরাধিকারীর হাতে পড়ে তার সারবত্তাটাকেই হারিয়ে ফেলে। কালক্রমে, ভেতরে ভেতরে পোকা ধরা গাছের গুঁড়ির মতো হঠাৎ একদিন হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে। কারণ, ঘুণ অতি বিষম বস্তু।

সোনার চামচ নিয়ে মুখে নিয়ে জন্মানো এই সব সন্তানের দল হয়তো বোঝেন না, উত্তরাধিকারও একটা নৈতিক দায়িত্ব। পুরুষানুক্রমে সম্পত্তি অর্জন করা যায়। মানবিক গুণগুলো নয়। ওগুলো নিজের মধ্যে থাকতে হয়। সহজাত ভাবে।

Shares

Leave A Reply