শনিবার, অক্টোবর ১৯

সারদা, নারদ গেল পেছনে, ফার্স্ট বেঞ্চে মেরুকরণ মন্ত্র

শঙ্খদীপ দাস

 

সারদা, নারদ, রোজভ্যালি তদন্ত বসল সেকেন্ড বেঞ্চে!

উনিশের ভোট আসছে, তার আগে বাংলায় মেরুকরণের রাজনীতিকেই ফার্স্ট বেঞ্চে বসালেন বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ! তার উপাদান কী কী? বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ বন্ধ করো, গর্ব ও ঐতিহ্যের সঙ্গে সরস্বতী পুজো করো। দুর্গাপুজোর বিসর্জনে বাধা দিলে সচিবালয়ের ‘ইট সে ইট’ বাজিয়ে দাও!

পর্যবেক্ষকদের অনেকের মতে, মুখে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললেও বাংলায় মেরুকরণের রাজনীতির জমি অনেক আগে থেকেই চষে রেখেছে তৃণমূল সরকার। এবং অতীতে বামেরাও। তা ছাড়া তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাথমিক লক্ষ্যই হল সংখ্যালঘু ভোট ব্যাঙ্ককে অটুট রাখা। সে জন্য ইমাম ভাতা দেওয়া থেকে শুরু করে চেষ্টার কোনও কসুর রাখেনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরকার।

এমনিতেই হিন্দি, হিন্দু, হিন্দুস্তানের রাজনীতি করে সঙ্ঘ পরিবার ও বিজেপি। ফলে এ হেন উর্বর জমিতে শনিবার সংখ্যাগুরুকে সংগঠিত করার বীজটাই ছড়িয়ে দিতে চাইলেন অমিত শাহ। লক্ষ্য, উনিশের ভোটে বাংলার ভোটের লড়াইকে তৃণমূল বনাম বিজেপি ডায়রেক্ট ফাইটে পরিণত করা। সে জন্য হাতিয়ার করা সংখ্যাগুরুর স্বাভিমান ও ভিতরের অসন্তোষকে।

বিজেপি যে এমনটাই করবে, তা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো পোড় খাওয়া রাজনীতিক আগে বুঝতে পারেননি তা নয়। বরং সে জন্য দিদি অনেক আগেই ভেবেছেন। এবং ভেবে চিন্তে ভিন্ন এক মেরুকরণের কৌশল নিয়েছেন তিনি। বাংলা ও বাঙালি আবেগের নামে ভোটের মেরুকরণ ঘটানো। তার প্রথম পদক্ষেপ হিসাবে দেড় বছর আগেই পশ্চিমবঙ্গের নাম পরিবর্তন করে ‘বাংলা’ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি। সেই প্রস্তাব কেন্দ্রে বিজেপি সরকার আরও কিছুদিন ঝুলিয়ে রাখলে তৃণমূলের পক্ষে সহজই হতো। কিন্তু কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের তরফে রাজ্যের নাম বাংলা করায় ছাড়পত্রের ইঙ্গিতই দেওয়া হচ্ছে।

দ্বিতীয়ত, বাংলার গ্রামে গঞ্জে তৃণমূল এ বার এই বার্তাও ছড়িয়ে দিতে চাইছে যে উনিশের ভোটের পর প্রধানমন্ত্রী হওয়ার দৌড়ে রয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও। এখনও পর্যন্ত যা পরিস্থিতি তাতে উনিশের ভোটের পর দেশে তৃতীয় বৃহত্তম শক্তি হবে তৃণমূল। ফলে উনিশের ভোটে ভগ্ন জনাদেশ হলে মমতার প্রধানমন্ত্রী হয়ে ওঠার সম্ভাবনা উজ্জ্বল। প্রথমবার দেশের প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন একজন বাঙালি-এই আবেগকেও ভোটে কাজে লাগাতে সক্রিয় তৃণমূল।

এবং এরই মধ্যে এসে পড়েছে অসমে জাতীয় পঞ্জিকরণের বিষয়টি। আর তা প্রকাশ হওয়া মাত্রই অসমে বাঙালি খেদানোর চক্রান্ত চলছে বলে হই হই করে নেমে পড়েছে তৃণমূল। উদ্দেশ্য সেই এক।

বস্তুত সেই কারণেই শনিবার মেয়ো রোডে বিজেপি যুব মোর্চার স্বাভিমান সমাবেশ থেকে অমিত শাহ বার বার স্পষ্ট করে দিয়েছেন বিজেপি বাঙালি-বিরোধী নয়। এবং তা আরও স্পষ্ট করে বোঝাতে বলেছেন, এ বাংলা হল শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের বাংলা। দেশে উনিশটি রাজ্যে ক্ষমতায় রয়েছে বিজেপি। কিন্তু শ্যামাপ্রসাদের বাংলায় বিজেপি যদি ক্ষমতায় আসতে না পারে তা হলে কোনও জয়ই জয় নয়।

এবং এ কথা বলার সঙ্গে সঙ্গে সুড়সুড়ি দিতে চেয়েছেন সংখ্যাগুরুর ভাবাবেগে। বলেছেন, মুসলিম তুষ্টিকরণের জন্য বেআইনি ভাবে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশেও আপত্তি করছেন না মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। অথচ বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীরাই বাংলায় সন্ত্রাস ও জঙ্গি কার্যকলাপ করছে। বাংলার মানুষের রুটি রুজি কেড়ে নিচ্ছে অনুপ্রবেশকারীরা। বক্তৃতা প্রসঙ্গে বার বার চৈতন্য মহাপ্রভু, রামকৃষ্ণ দেবের কথা এনেছেন বিজেপি সভাপতি। সেই সঙ্গে হাওড়ার স্কুলে সরস্বতী পুজো বন্ধ করে দেওয়া বা দুর্গাপ্রতিমার বিসর্জনের প্রসঙ্গ টেনে এনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে সংখ্যাগুরু হিন্দুদের আবেগ উস্কে দেওয়ার চেষ্টা করেছেন।

উনিশের ভোট আসতে আরও আট মাস বাকি। সন্দেহ নেই, তার আগে আগামী দিনে এই দুই মেরুকরণের চেষ্টা তীব্র থেকে তীব্রতর হবে। আমি বাঙালি বনাম সংখ্যাগুরুর মেরুকরণ।

যে জিতবে সেই সিকন্দর। শুধু প্রশ্ন একটাই মেরুকরণের রাজনীতির এই জাঁতাকলে পড়ে বাম ও কংগ্রেস তাদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে পারবে তো! প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির জায়গাটা বাংলায় এখন একদম ফাঁকা রয়েছে। একদম ফাঁকা।

 

Leave A Reply