শুক্রবার, জানুয়ারি ১৮

৩০০ বছর ধরে গ্রামের সব ঘরবাড়ি, ব্যাঙ্ক দরজাহীন, ‘চুরি’ শব্দটাই অজানা, মহারাষ্ট্রের এই গ্রাম আজও রহস্যে মোড়া

চৈতালী চক্রবর্তী

দরজায় তালা না দিয়ে বাইরে যাওয়ার কথা কখনও ভেবেছেন? বা ভাবুন তো যদি আপনার বাড়িতে কোনও দরজাই না থাকে?  আজকালকার দিনে এমন কথা ভাবলেই শিউরে উঠতে হয়। বরং দরজা, জানলা ভালো করে সেঁটেও আমাদের স্বস্তি নেই। জানেন কি, আমাদের দেশেই এমন একটা গ্রাম রয়েছে যেখানকার মানুষজন দরজায় তালা লাগানোর কথা কোনওদিনই ভাবেননি। এমনকি গ্রামের কোনও বাড়িতে দরজার কপাটই নেই। ২৪ ঘণ্টা জানলাও খোলা থাকে হাট করে।

‘চুরি’ শব্দটাই অজানা এই গ্রামে। ছোট্ট গ্রাম, কিন্তু বিস্ময় ঘিরে রয়েছে এর আনাচ কানাচে। মহারাষ্ট্রের আহমেদনগর থেকে ৩৫ কিলোমিটার দূরে এই গ্রামের নাম শনি-শিঙ্গনাপুর। গ্রামের নামের সঙ্গেই জড়িয়ে রয়েছে এর ইতিহাস। শনি দেবতার ভক্ত এই গ্রামের অধিবাসীদের বিশ্বাস তাঁদের রক্ষাকর্তা স্বয়ং শনি দেব। তাঁরই আশীর্বাদ দৃঢ় নিরাপত্তাবেষ্টনী হয়ে রক্ষা করছে গোটা গ্রামকে। তাই গ্রামের ত্রিসীমানায় ঢুকতে নাকি ভয় পায় দুষ্কৃতীরা। গত ৩০০ বছর ধরে এই গ্রামের প্রতিটি বাড়ি তাই দরজাহীন। জানলার কাঠামো থাকলেও তাতে কপাট নেই। শুধু বাড়িঘর নয়, দোকানপাট, অফিস, হোটেল-রেস্তোরাঁ, এমনকি থানাতেও কোনও দরজা নেই। ব্যাঙ্কের দরজা থাকলেও তাতে তালা লাগানো হয় না। গ্রামের বর্ষীয়ানদের বিশ্বাস, দরজায় তালা লাগানো মানে শনিদেবের অধিষ্ঠানকে অবিশ্বাস করা। যে দিন দরজায় তালা লাগবে, শনি দেবের আশীর্বাদ, অভিশাপ হয়ে নেমে আসবে গ্রামবাসীদের উপর।

নাভাসা জেলার এই গ্রাম অবশ্য এখন পুরোদস্তর শহর। আয়তনে প্রায় ৮২ বর্গ কিলোমিটার। ভাষা মারাঠি। প্রায় চার হাজার মানুষের বাস। শনি দেবের মহিমার কথা এখানকার গ্রামবাসীদের মুখে মুখে ফেরে। গ্রামের মাঝেই শনি দেবের বিশাল পাথরের মূর্তি। প্রায় দেড় মিটার লম্বা সেই পাথর নানা রকম সোনা, গয়না দিয়ে সাজানো হয়। সেই মূর্তিও রয়েছে খোলা জায়গাতেই।

স্থানীয়দের কথায়, “যদি কেউ অসৎ হওয়ার চেষ্টা করে, তাহলে সে দেবতার রোষ থেকে রেহাই পাবে না। এই গ্রামে কেউ অপরাধ করে না, সবাই ইষ্ট দেবতার নির্দেশ মেনে চলে।” গ্রামে কোনও বাড়িতে যদি দরজায় পাল্লা লাগানো হয়, তাহলে সৌভাগ্য, দুর্ভাগ্যে বদলে যাবে, মন্তব্য আরও এক স্থানীয়ের। তাঁর কথায়, “নিরাপত্তা নিয়ে আমাদের চিন্তা করার কোনও কারণ নেই। কারণ দেবতাই আমাদের রক্ষা করেন। আর যদি দরজায় তালা লাগানোর কথা ভাবি তাহলে কোনও না কোনও দুর্ঘটনা ঘটবেই, ব্যবসায় ক্ষতি হবে।”

পাবলিক টয়লেটেও নেই দরজা। লজ্জা আড়াল করার জন্য রয়েছে পাথরের স্ল্যাব। সেটাই দরজার বাইরে লাগিয়ে দিতে হয়।

৩০০ বছরের জনশ্রুতি

শনি দেবের এই পাথরের মূর্তি নিয়েও গ্রামে অনেক রকম কথা প্রচলিত রয়েছে। বর্ষীয়াণরা বলেন, একবার নাকি ভয়ানক প্রাকৃতিক দুর্যোগের কবলে পড়েছিল গ্রাম। তখন গ্রামের নাম ছিল শিঙ্গনাপুর। বন্যা ভাসিয়ে নিয়ে গিয়েছিল অধিকাংশ ঘরবাড়িকে। ফুঁসে উঠেছিল গ্রামের ভিতর দিয়ে বয়ে চলা পানাশালা নদী। মৃত্যু আর হাহাকার অভিশাপ হয়ে নেমে এসেছিল গোটা গ্রামে। সেই সময়েই নাকি বন্যার জলের সঙ্গে নদী পথে ভেসে এসেছিল একটি বিরাট বড় কালো পাথর। এই পাথর দেখে ভয় পেয়ে যান গ্রামবাসীরা। লাঠি দিয়ে এই পাথরের গায়ে আঘাত করতেই নাকি রক্তের ধারা বইতে শুরু করে। সেই রাতেই গ্রামবাসীরা স্বপ্নাদেশ পান। দেবতা স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেন, “তোমাদের কোনও ভয় নেই, আমি তোমাদের রক্ষা করবো।” সেই থেকেই শনি দেবতার পুজোর প্রচলন হয় গ্রামে। দেবতার প্রতি অন্ধ বিশ্বাসে গ্রামের সমস্ত বাড়িঘরের দরজা, জানলার কপাট ভেঙে দেওয়া হয়। মনে করা হয়, দরজা না থাকলেই দেবতা প্রবেশ করতে পারবেন প্রতিটি ঘরে। নতুন করে গ্রামের নাম হয় শনি-শিঙ্গনাপুর।

গ্রামের মাঝে বড় মন্দির তৈরি হয়, তবে তার কোনও ছাদ আর দেওয়াল নেই। শুধু রেলিং দিয়ে ঘেরা মন্দিরের মাঝে বেদি তৈরি করে বসানো হয়েছে সেই প্রাচীন পাথর। ২৪ ঘণ্টাই পুজো হয় মন্দিরে। তেল, ঘি দিয়ে প্রদীপ জ্বালানো হয়, তেল দিয়ে স্নান করানো হয় মূর্তিকে। মন্দির ঘিরে ফি বছরই বিরাট মেলা বসে, ভক্তদের ভিড় উপচে পড়ে।

২০১৬ সালে বম্বে হাইকোর্টের নির্দেশে মহিলাদেরও অবাধ প্রবেশ মন্দিরে

শনি-শিঙ্গনাপুর একদিকে তীর্থক্ষেত্র, অন্যদিকে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্রও বটে। প্রতিদিন প্রায় ৪০,০০০ তীর্থযাত্রীরা ভিড় জমান এই গ্রামে। সবচেয়ে বড় পুজো হয় অমাবস্যা ও পূর্ণিমাতে।

দক্ষিণের শবরীমালা মন্দিরের মতো প্রাচীন প্রথা মেনে এই মন্দিরে একসময় মহিলাদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ছিল। প্রায় তিনশো বছরের ঐতিহ্য ভেঙে মন্দিরের অন্দরমহলে প্রবেশ করেছিলেন এক মহিলা। উপাসনা স্থল ‘অপবিত্র’ করার অভিযোগ তুলে তুমুল ভৎর্সনা করা হয় তাঁকে। শুধু তাই নয়, পবিত্রতা ফিরিয়ে আনতে দুধ, তেল দিয়ে ধোয়া হয় মন্দির প্রাঙ্গণ। এর পরই ‘ভূমাতা রণরঙ্গিনী ব্রিগেড’ নামে একটি মহিলা সংগঠন এই প্রথার বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। মন্দির চত্বরে শুরু হয় প্রতিবাদ মিছিল। মহিলা সংগঠনকে ঠেকাতে বিক্ষোভে সামিল হয় শিবসেনা, হিন্দুসেনার মহিলা কর্মী-সহ বহু স্থানীয় বাসিন্দা। পুলিশের বাধা পেয়ে রাস্তায় শুয়ে স্লোগান দিতে থাকেন বিক্ষোভকারীরা। বিক্ষোভ, অবরোধে রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় গোটা গ্রাম। দীর্ঘ আন্দোলনের পর ২০১৬ সালের ৩০ মার্চ বম্বে হাইকোর্টের নির্দেশে মন্দিরে মহিলাদের প্রবেশে ছাড়পত্র দেয় মহারাষ্ট্র সরকার।

এর পরেও অবশ্য বিতর্কের অবসান হয়নি। মন্দিরে মহিলাদের প্রবেশাধিকার নিয়ে বিতর্কিত মন্তব্য করেন দ্বারকা-সারদাপীঠের শঙ্করাচার্য স্বামী স্বরুপানন্দ। সাংবাদিকদের সামনে তিনি জানান, শনির উপাসনা নাকি মেয়েদের জীবনে দুর্ভাগ্যের সূচনা করে। মেয়েরা মন্দিরে ঢুকলে তাঁরা ধর্ষণের শিকার হবেন। এই মন্তব্যের পরই নিন্দার ঝড় ওঠে নানা মহলে। স্বরুপানন্দের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলে বিভিন্ন মহিলা সংগঠন, তাঁকে ক্ষমা চাইতে বলে সোচ্চার হন সিপিএম নেত্রী বৃন্দা কারাটও।

অচেনা অতিথিদের রেঁধে খাওয়ান গ্রামের মহিলারা

ছোট্ট দু’টি ঘর নিয়ে গ্রামের এক প্রান্তে বাস গীতাবাই সুরেশ মাহেলার। স্বামী গত হয়েছেন বেশ কয়েক বছর হল। দুই ছেলে ও বৌ নিয়ে সংসার। ঘরের প্রতিটি কোণায় দারিদ্রের ছাপ স্পষ্ট। অথচ এই বাড়ির অতিথিপরায়ণতার কথা লোকের মুখে মুখে ফেরে। গীতাবাইয়ের কথায়, “আমার স্বামী অতিথি সেবা করতে ভালোবাসতেন। ঘরের চৌকাঠে যেই পা রাখুন, তাঁদের নিজের হাতে রান্না করে খাওয়াতেন, সে যখনই হোক। তিনি মনে করতেন ক্ষুধার্ত অতিথিকে শুধু জলে সন্তুষ্ট করা যায় না।” স্বামীর রীতি মেনে এখনও সেই ধারা বজায় রেখেছেন গীতাবাই। অভাব সেখানে বাধা হয়ে দাঁড়ায় না।

শুধু গীতাবাই নন, গ্রামের অধিকাংশ বাড়িতেই এই রেওয়াজ রয়েছে। অচেনা, অজানা পর্যটকদের সেখানে অগাধ প্রবেশ। বাড়ির দরজা থেকে খালি মুখে ফিরে যান না কেউই। সামান্য হলেও নিজের হাতে রেঁধে মহিলারা অতিথিদের সেবা করেন।

বর্তমানে গ্রামের জনসংখ্যা চার হাজারের কাছাকাছি। অধিবাসীদের প্রায় সকলেরই পেশা চাষাবাদ। মূলত আখের ফলন এই গ্রামে বেশি। তা ছাড়া, গম ও অন্যান্য দানাশস্যের চাষও হয়। প্রতিদিন প্রায় ৭০০ টন চিনি তৈরি হয় কারখানায়।

তালা ছাড়াই চলছে ব্যাঙ্ক

২০১১ সালের জানুয়ারিতে ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাঙ্কের একট শাখা খোলা হয় শনি-শিঙ্গনাপুরে। কাঁচের দরজা থাকলেও তাতে কোনও তালা লাগানো হয়নি। ব্যাঙ্ক কর্তাদেরও বিশ্বাস তালা ছাড়াই সুরক্ষিত থাকবে ব্যাঙ্ক। গ্রাম ও তার আশপাশের এলাকা মিলিয়ে ব্যাঙ্কের গ্রাহক সংখ্যা প্রায় হাজার দশেক। টাকা পয়সা সব স্ট্রংরুমে রাখা থাকলেও মূল দরজায় কোনও তালা নেই। তাও দরজা রাখা হয়েছে যাতে কোনও পশু ভিতরে ঢুকে পড়তে না পারে।

“এমন বাঁধনছাড়া ব্যাঙ্ক নিয়ে অন্যান্য শহরের লোকজনের কৌতুহলের শেষ নেই। মজার বিষয় হল, ২০১১ সাল থেকে এখনও পর্যন্ত ব্যাঙ্কে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনাই ঘটেনি,” এমনটাই জানিয়েছেন ব্যাঙ্কের ম্যানেজার মঙ্গেশ রাখশে।

২০১৫ সালে প্রথম থানা তৈরি হয় গ্রামে

দৈবশক্তিই রক্ষা করে গ্রামকে। তাহলে আর থানা-পুলিশের দরকার কি!  এই বিশ্বাসই বদ্ধমূল গ্রামবাসীদের মধ্যে। নিরাপত্তা নিয়ে তাই বিশেষ কোনও তাপ-উত্তাপ নেই। তবে, পর্যটকদের ভিড় সামলাতে সরকারি নির্দেশে ২০১৫ সালে প্রথম থানা তৈরি হয় গ্রামে। পুলিশ কর্মীদের দায়িত্ব শুধু বাইরে থেকে আসা পর্যটকদের নিরাপত্তা দেওয়া। কারণ, ২০১০ ও ২০১১ সালে শনি-শিঙ্গনাপুরে আসা দু’জন পর্যটক অভিযোগ করেন, তাঁদের গাড়ি থেকে মোটা অঙ্কের টাকা কেউ বা কারা আত্মসাৎ করে নিয়েছে। যদিও গ্রামবাসীদের বিশ্বাস, ওই কাজ গ্রামের কেউ করেননি, কারণ প্রত্যেকেই দেবতার কোপের কথা জানেন। জনশ্রুতি রয়েছে, গ্রামবাসীদের কেউ চুরি বা অপরাধমূলক কাজে জড়ালে শনি দেবের প্রভাবে হয় অন্ধত্ব গ্রাস করবে তাঁদের, না হলে কোনও মারাত্মক ব্যধি হবে, অথবা শনির সাড়ে সাতি নেমে আসবে তাঁদের পরিবারের উপর।

সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কি বদলে যাচ্ছে গ্রামের ঐতিহ্য?

বর্ষীয়ানদের আক্ষেপ, সময় বদলাচ্ছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে দৈবশক্তির উপর মানুষ বিশ্বাস হারাচ্ছে। গ্রামবাসীদের একাংশ নাকি বর্তমানে তাদের নিরাপত্তা নিয়ে বিশেষ চিন্তিত। কয়েকটি বাড়ি ছাড়া, এমনিতে গ্রামের সব বাড়িই একতলা। ভিতরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রাখা থাকে টাকাপয়সা, গয়না। বাড়ি খালি করে বাইরে গেলেও তার ব্যতিক্রম হয় না। শোনা যায়, দৈবশক্তিকে অগ্রাহ্য করে গ্রামেরই এক ব্যক্তি নাকি তাঁর পরিবারের নিরাপত্তার জন্য বাড়ির দরজায় কাঠের পাল্লা লাগিয়েছিলেন। পর দিন সকালেই সড়ক দুর্ঘটনায় তাঁর মৃত্যু হয়।

নিরাপত্তার আগল না থাকলেও বিশ্বাসের ভিতটা যে এখনও অনেকটাই মজবুত সেটা একবাক্যে স্বীকার করেন গ্রামবাসীরা। অপরাধ এখানে ব্রাত্য, অপরাধী বলে কেউ নেই। মিলেমিশে থাকাটাই এখানে রেওয়াজ। সত্যিই দৈবশক্তিই এই গ্রামের রক্ষাকর্তা কিনা সেটা জানা নেই, তবে মানুষের একে অপরের প্রতি বিশ্বাস এবং পারস্পরিক সহযোগিতাই এই গ্রামের মূল নিরাপত্তা বেষ্টনী। সম্পর্কের শিকড় এতটাই গভীরে যে বেনোজল সেখানে প্রবেশ করতে পারে না। সততা আর বিশ্বাসই যে নিরাপত্তার প্রাচীর গড়ে তুলতে পারে তারই শিক্ষা দেয় এই গ্রাম, তাই আলাদা করে এখানে রক্ষকের প্রয়োজন পড়ে না। এটাই শনি-শিঙ্গনাপুরের একমাত্র রহস্য।

আরও পড়ুন:

সাপের সঙ্গেই ওঠাবসা, সাপের বিষ বেচেই রোজগার, দক্ষিণ ভারতের ইরুলা উপজাতিরা এখনও প্রচারের আড়ালে

সাপের সঙ্গেই ওঠাবসা, সাপের বিষ বেচেই রোজগার, দক্ষিণ ভারতের ইরুলা উপজাতিরা এখনও প্রচারের আড়ালে

Shares

Comments are closed.