মঙ্গলবার, নভেম্বর ১৯

শিক্ষার মান, নিরাপত্তা আর যত্নে স্বাতন্ত্র্যের ছাপ রাখে ব্যারাকপুরের স্টেম ওয়ার্ল্ড স্কুল

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

গাড়ি এসে হর্ন বাজাল আপনার ফ্ল্যাটের দোরগোড়ায়। ছুট্টে গিয়ে তুলে দিয়ে এলেন আপনার ছোট্টসোনাকে। কপালে চুমু আঁকলেন, হাত নেড়ে টা টা করলেন। আপনার খুদেও দিব্যি চলে গেল স্কুল। এর পর অপেক্ষা কয়েক ঘণ্টার, ফের তাকে দেখতে পাওয়ার। এই সময়টায় হয়তো আপনি ঘরেই কাজ সারেন নিজের, কিংবা অফিস যেতে হয় আপনাকে।

কিন্তু এই গোটা সময়টা কি ১০০ শতাংশ নিশ্চিন্তে কাটাতে পারেন আপনি? কী করে পারবেন?

ঘটনা ১: স্কুলের ভিতরের শৌচালয়ে, চার বছরের ছাত্রীকে ধর্ষণের অভিযোগ শিক্ষকের বিরুদ্ধে।
ঘটনা ২: স্কুল চত্বরেই সহপাঠীর হাতে খুন ছাত্র।
ঘটনা ৩: স্কুলগাড়িতে ছাত্রীর যৌন হেনস্থায় অভিযুক্ত খালাসি।

এই সমস্ত ঘটনা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রায়ই সংবাদ মাধ্যমের শিরোনাম হয়ে উঠলে কী করেই বা নিশ্চিন্ত হবেন আপনি?
তবে ‘স্টেম ওয়ার্ল্ড স্কুল’ কর্তৃপক্ষ বলছেন, স্কুলের ভিতরে এবং স্কুলে যাতায়াতের পথে পড়ুয়াদের নিরাপত্তা ১০০ শতাংশ নিশ্চিত করা ততটাও কঠিন নয়। তাঁদের দাবি, তেমনটাই করে উঠতে পেরেছেন তাঁরা।


ব্যারাকপুরে অবস্থিত এই স্কুলের অ্যাডমিন হেড কুণাল দত্ত জানালেন, প্লে-গ্রুপ থেকে ক্লাস নাইন পর্যন্ত পঠনপাঠনের ব্যবস্থা রয়েছে আইসিএসই বোর্ডের এই স্কুলে। তবে পঠনপাঠনের পদ্ধতি থেকে শুরু করে এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাকটিভিটি—সবেতেই স্বাতন্ত্র্যের ছাপ রেখেছে স্টেম।


যেমন এই নিরাপত্তার বিষয়টিই ধরা যাক। সারা স্কুলের আনাচকানাচে সিসিটিভির নজরদারি তো আছেই, সেই সঙ্গে এই স্কুল বিল্ডিং ১০০ শতাংশ ভূকম্প-রোধী বলে দাবি কর্তৃপক্ষের। আগুন থেকেও সুরক্ষিত স্কুলটি। স্মোক অ্যালার্মেরও ব্যবস্থা রয়েছে স্কুলের যে কোনও কোণায়। আছে বিশেষ ঘোষণার ব্যবস্থা, যাতে স্কুলের কোনও একটি জায়গা থেকে কোনও বার্তা দিলে, তা সারা স্কুলে পৌঁছয়।


শুধু তাই নয়। কুণালবাবু জানালেন, স্কুলের শিক্ষক থেকে শুরু করে শিক্ষাকর্মী, অশিক্ষক কর্মচারী, এমনকী নিরাপত্তারক্ষীরাও মহিলা। কুণালবাবুকে নিয়ে স্টেম স্কুলে মাত্র তিন জন পুরুষকর্মী আছেন প্রশাসনিক বিভাগে। স্কুলে ২৪ ঘণ্টার জন্য থাকেন নার্স। নিকটতম হাসপাতালে যোগাযোগ করা রয়েছে, যে কোনও প্রয়োজনে তুরন্ত মিলবে অ্যাম্বুল্যান্স ও অন্য পরিষেবা।


এ তো গেল স্কুলের ভিতরে থাকা অবস্থায় ছাত্রছাত্রীদের নিরাপত্তার দিকটি। কিন্তু যাতায়াতের সময়েও যাতে নিরাপত্তার কোনও অভাব না হয়, সে বিষয়ে বিশেষ সচেষ্ট স্টেম কর্তৃপক্ষ।

কুণালবাবু জানালেন, মোট ৬২০ পডুয়ার মধ্যে ৪২২ জনই স্কুলের বাসে যাতায়াত করে। দমদম থেকে কাঁচড়াপাড়া পর্যন্ত রয়েছে এই বাস পরিষেবা। মোট ১৬টি বাসের প্রতিটিতে রয়েছে জিপিআরএস যন্ত্র। যার মাধ্যমে স্কুলে বসেই বাসের গতিবিধির উপর সম্পূর্ণ নজরদারি চালানো হয়।

প্রতিটি বাসে এক জন করে মহিলা অ্যাটেন্ডেন্ট থাকেন, যিনি পড়ুয়াদের সুবিধা-অসুবিধার খেয়াল রাখেন। এছাড়াও বাসে আছে ‘প্যানিক বাটন’ কোনও বিপদে পড়লে যা ব্যবহার করতে পারে পড়ুয়ারা।

যে সব বাচ্চা বাসে ফেরে না, তাদের নিতে আসার জন্য স্কুলের তরফে দেওয়া কার্ড ও পরিচয়পত্র সঙ্গে রাখা আবশ্যিক। এমনকী মা অথবা বাবা এলেও, কার্ড না দেখালে ছাড়া হয় না বাচ্চাকে।

স্কুলে একটি ক্যাফেটেরিয়া রয়েছে, বাচ্চাদের খাওয়াদাওয়ার জন্য। কিন্তু সেখানেও বিশেষ সিস্টেম রয়েছে, নিরাপত্তার স্বার্থেই। কুণালবাবু জানালেন, ক্যাফেটেরিয়া থেকে খাবার কেনার জন্য বাচ্চাদের হাত দিয়ে কোনও টাকাপয়সার লেনদেন অনুমোদিত নয়। অভিভাবকেরা ক্যাফেটেরিয়া থেকে ১০/২০/৩০ টাকার কুপন আগে থেকে কিনে বাচ্চাদের হাতে দিতে পারেন। সেই কুপনের বিনিময়েই ক্যাফেটেরিয়া থেকে পডুয়ারা খাবার কিনতে পারবে, এমনই নিয়ম স্কুলের। নিচু ক্লাসের হোক বা উঁচু ক্লাসের, নিয়ম সব পড়ুয়ার জন্য একই। এছাড়াও পড়ুয়াদের কাছে পৌঁছনোর আগে পরীক্ষা করা হয় খাবারের গুণমান, যাতে কোনও অসুস্থতা না ঘটে।

শহরের উপকণ্ঠে, ব্যারাকপুরের কাছে বিশাল এলাকা নিয়ে স্থাপিত হয়েছে এই সমস্ত সুযোগ-সুবিধাসহ আন্তর্জাতিক স্কুলটি। ইউএসএ অ্যাফিলিয়েটেড এই ‘স্টেম ওয়ার্ল্ড স্কুল’-এ খুদেরা আন্তর্জাতিক মানের পড়াশোনা তো শিখবেই, সেই সঙ্গে শিখবে নাচ-গান-হাতের কাজ। খেলবে ফুটবল, বাস্কেটবল। এমনকী শিখবে ঘোড়ায় চড়ার মতো ‘আউট অফ বক্স’ স্পোর্টসও! তবে প্রতিটি ক্ষেত্রেই থাকে প্রশিক্ষকদের নজরদারি। ছোটদের জন্য যে ১২টি রাইড সমন্বিত পার্ক রয়েছে, সেখানেও সারা ক্ষণ উপস্থিত থাকেন কোনও না কোনও অশিক্ষক কর্মচারী।

আরও পড়ুন: স্কুল মানেই ইঁদুরদৌড় নয়, বরং পড়ার ফাঁকে ঘোড়দৌড়ে মেতে উঠুক খুদেরা

আপাতত দমদম থেকে কাঁচরাপাড়া পর্যন্ত এলাকার ছেলেমেয়েরা পড়ছে ব্যারাকপুরের ওয়্যারলেস মোড়ের কাছে অবস্থিত এই স্টেম স্কুলে।

কুণালবাবু জানাচ্ছেন, এককালীন ২৭ হাজার টাকা দিয়ে ভর্তি হওয়ার পরে প্রতি তিন মাসে লাগে পাঁচ হাজার টাকা করে। এ ছাড়া প্রতি মাসের টিউশন ফিজ় ২০০০ টাকা করে। এর বাইরে আছে স্কুলবাসের ফিজ়, যা দূরত্ব অনুযায়ী নির্ধারিত। সব মিলিয়ে মাসে হাজার চার-পাঁচ টাকায় পড়াশোনা করা যাবে এই বিশ্বমানের স্কুলে।

অনেকেই মনে করছেন, মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানেরাও পড়তে পারবেন এই স্কুলে। বিশ্বমানের স্কুল মানেই যে আকাশছোঁয়া ফিজ়—এই ধারণাকেও বদলাচ্ছে স্টেম ওয়ার্ল্ড স্কুল।

Comments are closed.