শনিবার, মার্চ ২৩

অবনী ও অসহায়তা

কত দিনে স্বাবলম্বী হয় তারা? যখন আর মা-এর আঁচলে থাকতে হয় না?

বাহাদুর বাঘ বিশেষজ্ঞরা বলেন, মোটামুটি এক বছর। সুতরাং যবৎমলের জঙ্গলে দু’টি বাঘের ছানা মা-হারা হয়ে এখন জীবনযুদ্ধ চালাচ্ছে। বেঁচে থাকার লড়াই। অন্তত তেরো জন দু’পেয়েকে হত্যা করার অভিযোগে অভিযুক্ত, তাদের মা অবনীদেবী সম্প্রতি সর্বোচ্চ আদালতের অনুমতিক্রমে এক দু’পেয়ে শিকারীর বন্দুকের গুলিতে তাদের চোখের সামনেই প্রাণ হারিয়েছে।

অবনীর অকালমৃত্যু অবশ্য জঙ্গলের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে আওয়াজ তুলেছে গোটা দেশেই। যদি সে মানুষ মেরেও থাকে, (ময়নাতদন্তের রিপোর্ট আবার বলছে, মৃত্যুর সময়ে অবনী অন্তত সাত দিন অভুক্ত ছিল) কেন তাকে ঘুমপাড়ানি গুলিতে কাবু করে খাঁচাবন্দি করা হল না, কেন বুলেটের পর বুলেট তার দিকে তাক করা হল, মানুষ বাঁচাতে অবনীকে এ ভাবে খুন করার চেয়ে বড় অন্যায় কিছু হতে পারে না- এমন হাজারো প্রশ্ন উঠছে।

কেন্দ্রীয় মন্ত্রী বলছেন, এক্ষুনি বরখাস্ত করা হোক মহারাষ্ট্রের বনমন্ত্রীকে। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী দু’দিক রক্ষার চেষ্টা করছেন। বিরোধী দলের সভাপতি মহাশয় আবার মহাত্মা গান্ধীকে টেনে এনে টুইট ছুঁড়েছেন, একটা জাতির মহত্ত্বের নির্ধারক প্রাণীজগতের প্রতি তার মমতা।

অভিযুক্ত বনমন্ত্রী ও শিকারী- দু’জনেই বলছেন, বাস্তব পরিস্থিতি না বুঝেই বড্ড চেঁচামেচি হচ্ছে। ঘুম পাড়ানোর উপায় থাকলে ঘুমই পাড়ানো হত- চিরঘুমের দরকার ছিল না।

শিকারী যখন এত জোর দিয়ে তাঁর কাজের সপক্ষে বলছেন, আমরা যারা বন্যপ্রাণীকে কাবু করার কায়দা-কৌশল কিছুই বুঝি না— বিশ্লেষণের মধ্যে দিয়ে কি নস্যাৎ করে দিতে পারি? সুতরাং, এই বিষয়টি নিয়ে কোনও ‘ডেফিনিটিভ’ মন্তব্য পরিহার করাই শ্রেয়।

মধ্য-দক্ষিণ ভারতের এই ঘটনার ৭২ ঘণ্টার মধ্যেই অবশ্য দুধওয়ার জঙ্গলের এক বাঘিনীকে মরতে হয়েছে থেঁতলে, গ্রামবাসীদের উন্মত্ত রাগের জেরে, ট্রাকটরের তলায় পিষে।

হয়তো রাগ পড়ে যাওয়ার পরে এই গ্রামবাসীরাই এক সময়ে অনুশোচনা করবেন, নৃশংসভাবে প্রাণীটাকে না মারলেই হত। বাংলার বাঘগোরার মানুষ যেমন এখন বলছেন, একটা তরুণ বাঘকে মাস কয়েক আগে পিটিয়ে মেরে তাঁরা ঠিক করেননি।

ঠিক-ভুল, ন্যায়-অন্যায়, মানবিকতা-অমানবিকতার এই চুলচেরা বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে আমরা কিন্তু পৌঁছে যাই একটা বৃহত্তর সমস্যায়, যেটা হল মানুষ-বন্যপ্রাণী সংঘাত।

‘ট্রি টপস’ নামে বইটির একটা পুরনো বিলিতি সংস্করণের ব্যাক কভারে লেখক জিম করবেটের একটি অনবদ্য ছবি পাঠকের মনে পড়ে কি? করবেট সাহেবের মমতামাখা স্মিতহাস্য মুখ। হাতের চেটোয় একটা ছোট্ট পাখি। পরম নিশ্চিন্তে বসে আছে।

বরাবরই প্রকৃতি-প্রেমী, পশুপ্রেমী এ হেন করবেট সাহেবকেও কিন্তু বন্দুক কাঁধে গাড়োয়াল-কুমায়ুনের পাহাড়ে পাহাড়ে ছুটে বেড়াতে হয়েছে মানুষখেকোদের হাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে। কখনও তাঁর শিকার বেঙ্গল টাইগার, কখনও আবার চিতাবাঘ।

এই শতকের গোড়ায় যে সমস্যা ছিল, তা এতটুকু কমেনি, বরং বেড়েছে পরিবেষ্টিত অভয়ারণ্য হওয়া সত্ত্বেও। বন-সংরক্ষণের প্রাতিষ্ঠানিক প্রচেষ্টার মধ্যেও অনেক অনেক ফস্কা গেরো। জঙ্গল কমেছে, প্রাণীজগৎ বিপন্ন হচ্ছে। খাদ্য নেই বলে লোকালয়ে হামলা বাড়ছে- স্কুলের ভাঁড়ার ঘরের দরজা ভেঙে মিড ডে মিলের চাল লুঠ করছে দলমা পাহাড় থেকে মেদিনীপুরে নেমে আসা হাতির দল। ধান, বাড়িঘর হারিয়ে ক্ষুব্ধ জনতা তাদের মারতে চায়, রাজনৈতিক দলের স্থানীয় নেতারাও ভোটের স্বার্থে মানুষের ক্ষোভে ঘি ঢালেন।

সব মিলিয়ে একটা ভয়ঙ্কর পরিস্থিতি। কী ভাবে এই সমস্যার সমাধান হবে তার উত্তর কারও কাছে নেই।

অবনীর এই করুণ মৃত্যুর পরে তার স্মৃতিতে যদি আমরা একান্তই আন্তরিক হই, তবে আমাদের এই সঙ্কট থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য সঠিক ভাবে উদ্যোগী হওয়া উচিত।

Shares

Comments are closed.