বৃহস্পতিবার, অক্টোবর ১৭

জীবনের সঙ্গে মঞ্চকে মিলিয়ে দেওয়াই চ্যালেঞ্জ টোটোচালক মনোরঞ্জনের

শ্য়াম দাস, পশ্চিম বর্ধমান : টোটো চালিয়ে যেটুকু রোজগার, তার পুরোটাই তিনি তুলে দেন স্ত্রীর হাতে। সংসারের সঙ্গে সেটুকুই তাঁর সম্পর্ক। বাকি সময়টা নিয়ে নেয় থিয়েটার। শখের থিয়েটার করতে করতে কবে থেকেই তিনি যেন আদ্যন্ত থিয়েটার পার্সোনালিটি। নিজের ভাত জোগাড় করতে হবে। জোগাড় করে আনতে হবে তাঁর উপর নির্ভরশীল মা, বাবা, ভাই ও স্ত্রীর অন্ন বস্ত্র। তাই নিয়ম করে সকাল হলেই বেরিয়ে পড়েন টোটোটা নিয়ে। সারাদিন টোটো চালিয়ে সন্ধে হলেই মনের তাগিদে মহড়ায় হাজির হয়ে যান মনোরঞ্জন।

বারাবনির বছর ৩০ এর যুবক মনোরঞ্জন। প্রায় ন’বছর ধরে পশ্চিম বর্ধমানের নাট্যদল ‘নাট্যসেনা’র সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছেন তিনি। ছোটবেলায় পাড়ার নাটকে অভিনয় করতেন। একটু বড় হতেই তল্লাটে নাটকের চর্চা করা দাদাদের কাছে ডাক পেয়ে মঞ্চের কুশীলব। সেই থেকেই ‘নাট্যসেনা’র অন্যতম সৈন্য মনোরঞ্জন। বাবা নবগোপাল সেন নাটক লিখতেন। কবিতা লিখতেন। তাঁর কাছেই হাতেখড়ি।  বাবা অসুস্থ হওয়ার পর থেকেই সংসারের হাল ধরতে হয় মনোরঞ্জনকে। ক্লাস এইটের বেশি পড়াশোনা করতে পারেননি। তাতে কী ?

শুধুমাত্র নাটকে অভিনয় করেই মনোরঞ্জন থেমে থাকতে পারেননি ৷ ২০১৮ সালে প্রখ্যাত সাহিত্যিক নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ভাড়াটে চাই’ গল্প অবলম্বনে রচনা করে ফেলেন নাটক ‘শুভারম্ভ’ ৷ আর এই নাটকের মাধ্যমেই শুরু হয় মনোরঞ্জনের স্বপ্নের উড়ান ৷ শিল্পাঞ্চলের রুখু মাটিতেও তাঁর রচনা ও নির্দেশনায় ৫০ টি শো পূর্ণ করতে চলেছে নাট্যসেনার ‘শুভারম্ভ’৷  রয়েছে আরও ২০ টি শো এর ডাক ৷ পশ্চিমবঙ্গ নাট্য অ্যাকাদেমি আয়োজিত নাট্য মেলাতে যেমন এই নাটক অভিনীত হয়েছে, তেমনই পূর্ব ভারতের জোনাল কালচারাল সেন্টারেও মঞ্চস্থ হয়েছে ‘শুভারম্ভ’ ৷ হাসির সুরে বাঁধা হলেও এ নাটকের পরতে পরতে রয়েছে জীবনের বার্তা৷

রমণীমোহন সাংস্কৃতিক চর্চা কেন্দ্রে সংস্কৃতি চর্চা টিকিয়ে রাখতে আপ্রাণ লড়াই চালায় ভাইপো গাবলুর (মনোরঞ্জন) নেতৃত্বে পাড়ার বখাটে ছেলের দল ৷ কিন্তু তিতিবিরক্ত কাকা রমণীমোহন বখাটে ছেলেদের আড্ডা বন্ধ করে ঘরটি ভাড়া দিতে চান ৷ শেষ পর্যন্ত ওই ছেলের দলের কাছে উপকৃত গ্রামের মাষ্টারের চেষ্টায় জিতে যায় গাবলু তপসেরা ৷ সংলাপের মুন্সিয়ানায় টানা ৫৬ মিনিট দর্শকরাও যেন জড়িয়ে পড়েন নাটকের সঙ্গে ৷ নিজেরাও মনে মনে হয়ে ওঠেন নাটকের এক একটি চরিত্র৷

প্রথম নাটকেই দর্শকদের মন ছুঁয়ে দিয়েছেন। তাই প্রত্যাশা বাড়ছে। এই চাপ নিয়েই নাট্যসেনার পরবর্তী নাটক রচনায় হাত লাগিয়েছেন মনোরঞ্জন। বললেন, ‘‘জীবনটাই তো একটা অভিজ্ঞতা। তাতেই জারিত হয় চলার পথ। প্রত্যেকের। আমিও এর বাইরে নই। আমার সৃষ্টিতে আবার যদি জীবনকে, অভিজ্ঞতাকে খুঁজে পান দর্শকরা, সেটাই হবে আমার প্রাপ্তি।’’

দিনভর টোটো চালিয়ে, তারপর নাট্যকর্মী হিসেবে প্রতিষ্ঠার লড়াই। কী ভাবে মেলান দুটোকে? এ বারও অকপট মনোরঞ্জন। ‘‘ওটা আমার পেশা। ওই কাজ শেষ করে তবেই মনের তৃপ্তির খোঁজে বের হই। মন আর শরীর, দুই মিলিয়েই তো আমি।’’

আর দাঁড়ান না। টোটো ঘরে তুলে তবেই যে মিলবে ছুটি। দোমোহনি বাজারে ছুটতে হবে। নাটকের মহড়ায়।

Comments are closed.