বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ১৪

রামধনু এক হেঁসেলের নাম, যেখানে রোজ খিদে মেটান দেড়শো অসহায় মানুষ

শ্যামশ্রী দাশগুপ্ত

রামপ্রসাদের ভিটের জন্য যে হালিশহরের পরিচিতি, সেই বর্ধিষ্ণু জনপদের পরিচয় বদলে দিয়েছে রাজনীতি। বোমা-গুলি-সন্ত্রাসের এই কালো মেঘ সরিয়েই রামধনুর সাতরঙের উঁকিঝুকিও সেই হালিশহরেই।

জোট বেঁধেছিল এই মফস্বল শহরের কয়েকজন যুবক। অনুভবে বদল আনতে তখন নাট্যোৎসব করতেন তাঁরা। ফাগুন দিনে বসন্তোৎসব। কিছু দিন যাওয়ার পর তাঁরা দেখলেন, অনেককে যেমন ছুঁতে পারছেন, অধরা থেকে যাচ্ছেন বাকি অনেকেই। ক্ষুধার গদ্যময় পৃথিবীতে সেটাই তো স্বাভাবিক। পথ পরিবর্তনের সেই সূচনা। শুরু রামধনু হেঁসেলের। এখন প্রতিদিন হালিশহর স্টেশন লাগোয়া এই হেঁসেলে রান্না হয় প্রায় দেড়শো জনের। পাত পড়ে প্রায় ১২০ জনের। এসে খাওয়ার ক্ষমতা নেই যাঁদের, এমন প্রায় ৩২ জনের মুখের কাছে দিয়ে আসা হয় খাবার। ফয়েল প্যাকে মুড়ে ভাত, ডাল, ভাজা, সবজি। সপ্তাহে একদিন মেনুতে থাকে মাছ। একদিন ডিম। অন্তত একবেলা পেট ভরে খেয়ে বেঁচে থাক দুঃস্থ, আর্ত, ঠিকানাহীন কিছু মানুষ। সবাই যে বয়স্ক তেমন নয়, যাঁরাই দু মুঠো ভাতের জন্য আসেন, কাউকেই ফেরায় না রামধনু।

রামধনু যাঁর ব্রেনচাইল্ড সেই সুদীপ্ত দাসের কথায়, “আমি ভেবেছিলাম ঠিকই, কিন্তু সবাই পাশে এসে না দাঁড়ালে সম্ভব হত না। আমাদের সংস্থার সদস্যদের কথাতো ছেড়েই দিলাম, জানেন, যে টোটোতে করে ৩২ টা প্যাকেট যায়, সেই টোটো চালক প্রতিদিন দুপুরে দু ঘণ্টা ধরে এই কাজটা করেন। কিন্তু পয়সা নেন না কোনও। যাঁরা রান্না করেন, কবে টাকা পাবেন একবারও জিজ্ঞাসা করেন না। এঁদের পাশে না পেলে কি চালাতে পারতাম রামধনু হেঁসেল?”

এ বছরের সেপ্টেম্বর মাসে এক বছর পূর্ণ হবে রামধনু হেঁসেলের। প্রথমদিকে হালিশহর স্টেশনের কাছে রামধনু হেঁসেল গন্তব্য ছিল কাছেপিঠের অসহায় মানুষদের। এখন চাকদা, কল্যাণী, সোদপুর এবং দমদম থেকেও অভুক্ত মানুষজন দুপুরবেলা চলে আসেন এখানে একমুঠো ভাতের আশায়। কারও পরিবারে কেউ নেই। ফুটপাথই ঠিকানা। কারও আবার আত্মজন থেকেও নেই। সেই তাঁদেরই আত্মীয় এখন রামধনুর সদস্যরা। তৃপ্তি করে দুপুরের ভাতটুকু খেয়ে তমালি সাউ, অর্চনা দাসরা বললেন, “ছেলেমেয়েরা দেখে না। খেতে দেয় না। আগে ভিক্ষে করে কোনওদিন খাবার জুটত, কোনওদিন জুটত না। এখন দুপুরে পেট ভরে ভাত খাই। সুদীপ্তর দয়ায় বেঁচে আছি। ওঁর মতো সন্তান যেন প্রতি মায়ের জন্মায়।”

এত গুলো মানুষের প্রতিদিনের ডাল ভাতের জোগাড় করতে মাসের খরচ প্রায় দেড় লক্ষ টাকা। কী করে চলে এই বিপুল কর্মকাণ্ড?

বছর ৩২ এর সুদীপ্ত বললেন, “আমরা বন্ধুরা মিলেই শুরু করেছিলাম। সবাই মিলে চাঁদা দিয়ে। গত এক বছর ধরে প্রতিদিন একটু একটু করে বেড়েছে পরিধি। আমাদের কর্মকাণ্ডের খবর পেয়ে এখন অনেকেই আমাদের দিকে বাড়িয়ে দিচ্ছেন সাহায্যের হাত। একজন করে অসহায় মানুষকে একবছর খাওয়ানোর দায়িত্ব নিয়েছেন পাওয়া গিয়েছে এমন মানুষও। আর আমাদের প্রায় চারশো সদস্যের চাঁদাতো রয়েইছে। সব মিলিয়ে চলছে।”

তিনিই জানালেন, পাশাপাশি এলাকা ছাড়াও অন্য জেলা থেকেও অসংখ্য মানুষ তাঁদের পারিবারিক নানা অনুষ্ঠান যেমন জন্মদিন, বিবাহ বার্ষিকী রামধনুতে এসে পালন করেন। সে দিনের খাওয়ার খরচ সেই পরিবারই বহন করে। এইভাবেই এগিয়ে চলেছে রামধনু হেঁসেল। অভুক্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার পাশাপাশি ২৫ জন দুঃস্থ ও প্রতিবন্ধী মানুষের স্বাস্থ্যবিমা করে দিয়েছে রামধনু, যাঁরা ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন হাসপাতালে ক্যাশলেস চিকিত্সা পাবেন। প্রিমিয়াম জমা করার দায়িত্ব নিয়েছে রামধনু।

অশান্তি আর সন্ত্রাসের চেনা আকাশে রামধনু রঙ যেন দিশা দেখাচ্ছে গোটা হালিশহরকে।

Comments are closed.