সোমবার, এপ্রিল ২২

যাদবপুরে আবার বিক্ষোভ, ইতিহাস বিভাগের প্রবেশিকায় অস্বচ্ছতার অভিযোগ

দ্য ওয়াল ব্যুরো: বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের। দীর্ঘ লড়াই এবং অনশনের পরে ফিরিয়ে আনা হয়েছে আর্টস ফ্যাকাল্টির ছ’টি বিভাগে প্রবেশিকা পরীক্ষার সিদ্ধান্ত। সেই মতো শুরুও হয় ভর্তি পদ্ধতি। কিন্তু এবার অভিযোগ, সেই ভর্তি পদ্ধতিতেই নাকি অস্বচ্ছতা রয়েছে। অভিযোগের প্রতিবাদে বুধবার মাঝরাতে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে অবস্থানেও বসেন পড়ুয়ারা।

ঠিক কী হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে?

সমস্যার শুরুয়াত ইতিহাস বিভাগের মেধাতালিকা প্রকাশের পরে। অভিযোগ উঠেছে, উচ্চমাধ্যমিকে ৯৫ শতাংশ বা তার বেশি নম্বর পাওয়া ১০০ জনেরও বেশি পড়ুয়া প্রবেশিকায় দশেরও কম নম্বর পেয়েছেন। অভিযোগ, ২১৬ জনের মেধাতালিকায় ১২০ জনের সঙ্গেই এমন হয়েছে। কর্তৃপক্ষের দাবি, এ বিষয়ে ‘অভিযোগ’ পেয়েছেন তাঁরা। তাই অ্যাডমিশন কমিটির বৈঠক ডাকা হয়। সিদ্ধান্ত হয়, ইতিহাসের প্রবেশিকা পরীক্ষার উত্তরপত্রগুলি আবার মূল্যায়ণ করা হবে। এবং বাকি পাঁচটি বিষয়েও সমস্ত খাতার নম্বর পুনরায় যোগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বস্তুত, দিন কয়েক আগে এক ছাত্রী রেজিস্ট্রারের কাছে অভিযোগ করেন যে, তিনি উচ্চ মাধ্যমিকে ইংরেজিতে যে নম্বর পেয়েছিলেন মেধাতালিকায় তার চেয়ে কম নম্বরের উল্লেখ রয়েছে৷ এই নম্বর-বিভ্রাট শুধরে নেওয়ার পরে তাঁর ব়্যাঙ্ক ১১০ থেকে এগিয়ে আসে ৬০-এ৷ কিন্তু এটি সম্পূর্ণ ভাবে টেকনিক্যাল ত্রুটি ছিল। মূল্যায়ণের পদ্ধতি ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি।

এই ঘটনার পরেই ইতিহাস বিভাগ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন কর্তৃপক্ষ৷ অভিযোগ তোলেন, প্রশ্নপত্রের সব ক’টি উত্তর না লিখলে সেই খাতা দেখেননি ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপকেরা। ফলে বহু পড়ুয়ার বিস্ময়জনক ভাবে কম নম্বর এসেছে মেধাতালিকায়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের অভিযোগ, কর্তৃপক্ষের কথামতোই অ্যাডমিশন কমিটির পরিচালনার দায়িত্ব সম্পূর্ণ ভাবে রেজিস্ট্রার ও সংশ্লিষ্ট ফ্যাকাল্টির ডিনের উপর ছিল। এখন, আর্টস ফ্যাকাল্টির যিনি ডিন, শুভাশিস বিশ্বাস, তিনিই ইতিহাস বিভাগের প্রধান। পড়ুয়াদের প্রশ্ন, ডিনের নিজের বিভাগেই প্রবেশিকার খাতা দেখায় এমন অসঙ্গতি হয় কী করে। এই দায় কি অ্যাডমিশন কমিটির সদস্য হিসেবে তাঁর উপরেও বর্তায় না? খাতা দেখার পদ্ধতিতে মডারেশনের (অর্থাৎ একই খাতা একাধিক অধ্যাপক দেখবেন) দাবি থাকা সত্ত্বেও তা মানা হল না কেন। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, এই ঝামেলা চলাকালীনই বুধবার রাতে ডিন এবং বিভাগীয় প্রধান—এই দুই পদ থেকেই ইস্তফা দিয়েছেন শুভাশিস বিশ্বাস।

ইতিহাস বিভাগের শিক্ষকেরা জানাচ্ছেন, খাতা দেখার পদ্ধতি কী হবে, সেই সংক্রান্ত কোনও নতুন নির্দেশ তাঁদের কাছে ছিলই না। ফলে, এত বছর ধরে তাঁরা যে ভাবে প্রবেশিকা পরীক্ষার খাতা দেখেছেন, সে ভাবেই দেখা হয়েছে এই বছরও। এমনকী স্বচ্ছতা নিয়ে যাতে কোনও প্রশ্ন না ওঠে, তা নিশ্চিত করতে এই বছর কোনও অধ্যাপক খাতা নিয়ে যাননি বাড়িতে। ক্লাসের শেষে অতিরিক্ত সময় বিভাগে থেকেই সময়ে শেষ করেছেন ৩৪৪টি খাতা দেখা। নির্দিষ্ট সময়ে বার করেছেন মেধাতালিকাও। কিন্তু তার পরেও তাতে কোনও অসঙ্গতি রয়েছে, এমন অভিযোগ তাঁদের কাছে আসেনি। কোনও পড়ুয়া কম নম্বর পাওয়ার অভিযোগ তুলেছে বলেও জানা যায়নি। তাঁদের দাবি, তাঁরা আচমকাই নোটিস মারফত জেনেছেন, আবার দেখা হবে খাতা।

ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপকদের বিবৃতি

বোর্ডের পরীক্ষায় পাওয়া নম্বরের সঙ্গে প্রবেশিকার নম্বরে বড় ফারাক থাকার যে অভিযোগ উঠেছে, সে প্রসঙ্গে ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মেরুনা মুর্মু জানান, এটা খুব অবাক হওয়ার মতো কিছু নয়। এমনটা হতে পারে। তাঁর কথায়, “সিলেবাসের প্রশ্নোত্তর মুখস্থ করে এমসিকিউ পদ্ধতিতে পরীক্ষা দিয়ে, বোর্ডের পরীক্ষায় ভূরি ভূরি নম্বর পাওয়া যে মোটেই একটি পড়ুয়ার ইতিহাসবোধ তৈরি করে না, তারই প্রমাণ এই ঘটনা। আর এই ইতিহাসবোধটুকু বুঝে নেওয়ার মতো করেই তৈরি হয় বিভাগীয় প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র। প্রবেশিকার দাবিতে এত বেশি করে আমাদের সরব হওয়ার কারণটাও এটাই। আজ যদি প্রশ্ন ওঠে, বোর্ডে এত নম্বর পেলে প্রবেশিকায় কেন পেল না, তা হলে আমাদের বুঝতে হবে, প্রবেশিকা পরীক্ষার কোনও গুরুত্বই কেউ বুঝছেন না। আমরা আবার সেই তিমিরেই ফিরে যাচ্ছি।”

যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্টস ফ্যাকাল্টির ছ’টি বিভাগের ভর্তি প্রক্রিয়া আজ, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার হওয়ার কথা ছিল৷ কিন্তু, মেধা তালিকাকে ঘিরে জটিলতার কারণে ইতিহাস বিভাগের এই ভর্তি প্রক্রিয়া স্থগিত করে দেওয়া হয়েছে বলে জানানো হয়েছে একটি বিজ্ঞপ্তিতে৷ ফের কবে তা চালু হবে, তা নিয়ে কিছু জানানো হয়নি কর্তৃপক্ষের তরফে।

এই অবস্থায় অধ্যাপকদের অভিযোগ, তাঁদের সঙ্গে সরাসরি কোনও যোগাযোগই করছেন না কর্তৃপক্ষ। যথেষ্ট যত্ন নিয়ে খাতা দেখার পরেও এত অসঙ্গতির অভিযোগ যখন উঠছে, তখন তা নিয়ে তাঁদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় বসতে পারতেন কর্তৃপক্ষ। কিন্তু কিছু জানার আগেই আচমকা নোটিস পাচ্ছেন পূনর্মূল্যায়ণের বা ভর্তি প্রক্রিয়া রোখার। তাঁদের বিভাগীয় প্রধান তথা ফ্যাকাল্টির ডিন এবং অ্যাডমিশন কমিটির সদস্য শুভাশিস বিশ্বাসও কাল পদত্যাগ করার আগে পর্যন্ত এ বিষয়ে কিছুই জানাননি বিভাগের অধ্যাপকদের।

পড়ুয়াদের অভিযোগ, লড়াই করে ছিনিয়ে আনা প্রবেশিকা পরীক্ষার দাবিতে কালি লাগানোর জন্যই এমনটা করা হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে নতুন করে খাতা দেখার দাবি তুলেছেন তাঁরাও।

 

Shares

Leave A Reply