রবিবার, সেপ্টেম্বর ২২

সুন্দরবনের সাপেদের বাঁচাতে প্রাণ হাতে ঘুরে বেড়ান ৬৫র নীলকণ্ঠ

নকিবউদ্দিন গাজি, দক্ষিণ ২৪ পরগনা : পরিবার আছে। ছেলে মেয়ে স্ত্রী, সবাই আছেন পরিবারে। তবুও তাঁকে ধরে রাখা যায় না সেই গণ্ডিতে। বরং গোটা সুন্দরবনই তাঁর পরিবার। ভাল থাকুক গরান- গেওয়া- হেঁতাল, ভালো থাকুক জলে কুমির, ডাঙায় বাঘ। ভালো থাকুক জল-জঙ্গল থেকে ঘর-উঠোনে ঘুরে ফিরে চলে আসা কেউটে, গোখরো, শাঁখামুটি- এই তাঁর ভাবনা। আর এই ভাবনাই তাঁকে ঘরছাড়া করে বারবার।

পোশাকি নাম সুপ্রভাত দাস। কিন্তু রায়দিঘির দক্ষিণ পাড়ার এই বাসিন্দাকে গোটা তল্লাট চেনে নীলকণ্ঠবাবু নামে। “সাপ দেখলে মারবেন না। দয়া করে আমাকে একটা ফোন করুন। আমি ঠিক পৌঁছে যাব আপনাদের ঘরে।” এই বার্তা নিয়ে গোটা সুন্দরবন চষে বেড়ান তিনি। তাঁর কথায়, “সুন্দরবন শেষ করে ফেলছে মানুষ। জঙ্গল কেটে বিপদের মুখে ফেলে দিচ্ছে প্রাণীদেরও। ঘর বাড়িতে ঢুকে পড়ছে সাপ। ভয়ে আতঙ্কে তখন পিটিয়ে মারছে তাদের। ওদের গোটা প্রজাতি ভয়ানক বিপদের মুখে। তাই আমি ওদের বাঁচানোর চেষ্টা করি নিজের মতো করে।”

দুই মেয়ে, এক ছেলে তাঁর। বড় মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। ছেলে কলকাতায় একটি বেসরকারি সংস্থায় কাজ করে। নিজের অল্প জমি রয়েছে। সেখানে চাষ আবাদ করেই কোনওমতে চলে যায় সংসার। আর বাকি সময় চোরা শিকারিদের কবল থেকে সুন্দরবনকে কী করে রক্ষা করবেন, কেটে যায় সেই ভাবনায়।

নীল রঙের জামা আর নীল রঙের প্যান্ট। এই তাঁর কাজের পোশাক। কাজ মানে, সাপ ধরতে বা গাছ কাটা রুখতে যাওয়ার পোশাক। মাঝে মাঝেই ফোন আসে দূর গ্রাম থেকে। সাপ ধরতে হবে। কখনও কখনও ডেকে পাঠায় বন দফতরও। নীল জামা প্যান্ট পরে নিজের হাতে তৈরি সাপ ধরা যন্ত্র ও জাল নিয়ে সাইকেলে চেপে বেরিয়ে পড়েন তিনি। গন্তব্যে পৌঁছে সাপেদের উদ্ধার করে ফিরিয়ে দেন প্রকৃতির কোলে। একেবারে সুন্দরবনের গহিন জঙ্গলে। রায়দিঘির রেঞ্জ অফিসার অশোক কুমার নস্কর বলেন, “উনি আমাদের বড় ভরসা। অনেক জায়গায় আমাদের কর্মীরা পৌঁছনোর আগেই নীলকণ্ঠবাবু পৌঁছে যান। সাপ ধরে এনে আমাদের হাতে তুলে দেন। কোনও কিছুর বিনিময়ে নয়, শুধুমাত্র প্রকৃতিকে ভালবেসে এই বয়সেও যে কাজ তিনি করে যাচ্ছেন তা সত্যিই প্রশংসার দাবি রাখে।”

আরও পড়ুন- ছোবল খেয়েছেন কতবার! বাবা সুরেশ তাও ক্লান্তিহীন ভাবে ওদের উদ্ধার করেন, সংখ্যাটা ৫২ হাজার

নীলকণ্ঠবাবুর স্ত্রী জানান, এই সাপ ধরতে গিয়ে বিপদেও কম পড়েননি। বেশ কয়েকবার সাপের ছোবলে প্রাণ সংশয়ও হয়েছে। তাই তাঁরা বারবার বারণ করেন এ সব কাজ আর না করতে। কিন্তু আটকানো যায়নি তাঁকে। গত ১৭ বছর ধরে সুন্দরবনের জলে জঙ্গলে সাপ ধরে বেড়ান ৬৫ বছরের নীলকণ্ঠবাবু। তাঁর এ হেন নামও নাকি তাই।

নীলকণ্ঠবাবু জানালেন, এ পর্যন্ত না হলেও প্রায় চারশোরও কাছাকাছি নানা বিষাক্ত সাপ ধরেছেন তিনি। এরমধ্যে যেমন রয়েছে গোখরো, কেউটে, তেমনই রয়েছে চিতি, কালাজ, চন্দ্রবোড়াও। বললেন, “টিভি দেখে নিজেই বানিয়ে নিয়েছি সাপ ধরা যন্ত্র। তাই অনেক সহজ হয়ে গেছে সাপ ধরা।”

একাধিক বার বন দফতর থেকে চাকরিরও প্রস্তাব এসেছে। কিন্তু ফিরিয়ে দিয়েছেন। “যে কাজ ভালবেসে করি, তার বিনিময়ে টাকা নেওয়া যায়?”

মুখের হাসি ছড়িয়ে পড়ে চোখেও।

Comments are closed.