বৃহস্পতিবার, ডিসেম্বর ১২
TheWall
TheWall

আর্যাবর্তে উঠছে হাত, গেরুয়া কি কুপোকাৎ?

শঙ্খদীপ দাস

শুক্রবার বিকেলে পাঁচ রাজ্যে ভোট গ্রহণ প্রক্রিয়া শেষ হয়েছে। তার পরই এক্সিট পোল তথা বুথ ফেরত সমীক্ষা প্রকাশ হতে শুরু করেছে চ্যানেলে চ্যানেলে। কী বলছে তারা?

মোটামুটি ভাবে সব ক’টি বুথ ফেরত সমীক্ষা থেকে যদি একটি গড় ট্রেন্ড বের করা যায়, তা হলে দেখা যাচ্ছে রাজস্থানে সমূহ বিপর্যয় হতে পারে বিজেপি-র। বসুন্ধরা রাজেকে তখত থেকে সরিয়ে অনায়াসে ক্ষমতা দখল করতে পারে কংগ্রেস।

রাজস্থানের বুথ ফেরত সমীক্ষার সঙ্গে বিজেপি-র অভ্যন্তরীণ সমীক্ষার বিশেষ ফারাক নেই। সেখানে হারের মুখ দেখতে হবে ধরেই নিয়েছিলেন অমিত শাহরা। কিন্তু উদ্বেগ তো সেখানেই শেষ হচ্ছে না। তামাম বুথ ফেরত সমীক্ষার ইঙ্গিত মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তীসগড়েও নরেন্দ্র মোদী-অমিত শাহকে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের মুখে ফেলে দিয়েছেন রাহুল গান্ধী। এমনকী কোনও কোনও সমীক্ষার ইঙ্গিত রাজস্থানের মতই ছত্তীসগড় ও মধ্যপ্রদেশেও বিজেপি-কে গদিচ্যুত করে দিতে পারে কংগ্রেস।

তা হলে?

এমনিতে বুথ ফেরত সমীক্ষার ইঙ্গিত সব সময়েই যে প্রকৃত ফলাফলের সঙ্গে মিলে যায় তা নয়। অনেক সময়ে তা মেলে না। কিন্তু সমীক্ষার পূর্বানুমান হুবহু মিলে যাওয়ার নজিরও তো এতোদিনে কম নয়! তা ছাড়া বিশেষজ্ঞরা বলেন, সব কটি বুথ ফেরত সমীক্ষার একটা গড় করলে মোটামুটি ভাবে আন্দাজ করা যায় জনমতের পাল্লা কার দিকে ভারী। এবং এ বারও যদি সেই ধারণাই মেনে নেওয়া হয়, তা হলে পরিষ্কার বলা যায়, উনিশের ভোটের আগে আর্যাবর্ত তথা হিন্দিবলয়ে অশনিংসকেত দেখছে বিজেপি।

কেন?

গত লোকসভা ভোটের ফলাফলের দিকে তাকালেই তার স্পষ্ট ব্যাখ্যা পাওয়া যেতে পারে। পাঁচ বছর আগে রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ এবং ছত্তীসগড়ের বিধানসভা ভোটে এক কথায় সুইপ করেছিল বিজেপি। লোকসভা ভোট হয় তার ঠিক পর পরই। তার পর চোদ্দর নির্বাচনে এই তিন রাজ্য মিলিয়ে ৬৫ টি লোকসভা আসনের মধ্যে ৬২ টি আসনই জিতে নিয়েছিল বিজেপি। রাজস্থানে ২৫ টি লোকসভা আসনের মধ্যে ২৫টিতেই জিতেছিলেন মোদী বাহিনী। মধ্যপ্রদেশে ২৯ টির মধ্যে ২৭ টি এবং ছত্তীসগড়ে ১১ টির মধ্যে ১০ টি আসনে জয়ের ধ্বজা তুলেছিল বিজেপি।

ফলে এ বার ভোটে রাজস্থানে ক্ষমতা হারানোর সংকেত উদ্বেগজনক বইকি। মরুরাজ্যে লোকসভার আসন অনেক কমে যেতে পারে বিজেপি-র। একই ভাবে বুথ ফেরত সমীক্ষা সত্যি প্রমাণ হলে লোকসভা ভোটেও মধ্যপ্রদেশ ও ছত্তীসগড়ে মোদী-শাহদের পায়ের তলার মাটি সরে যেতে পারে।

উল্লেখযোগ্য হল, হিন্দিবলয়ের যে কটি রাজ্যে বিজেপি-র সঙ্গে কংগ্রেসের সরাসরি লড়াই রয়েছে, তার মধ্যে এই তিন রাজ্য অন্যতম। এখানে মোদী-শাহ দুর্বল হওয়ার অর্থ হাত তথা রাহুল গান্ধী শক্তিশালী হওয়া। লোকসভা ভোটের আগে তাঁর নেতৃত্ব জাতীয় রাজনীতিতে আরও মজবুত হওয়া।

রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজস্থান, মধ্যপ্রদেশ এবং ছত্তীসগড়ে বিজেপি কংগ্রেসের কাছে চাপে পড়ে যাওয়ার বার্তা গেলে হিন্দিবলয়ের অন্য রাজ্যগুলিতে তার প্রভাব পড়তে বাধ্য। হিসাব করলে দেখা যাবে, হিন্দিবলয়ের ১১টি রাজ্য মিলিয়ে লোকসভার মোট ২২৬টি আসন রয়েছে। চোদ্দর ভোটে এর মধ্যে ১৯২ টি আসনই জিতে নিয়েছিলেন নরেন্দ্র মোদী। এই ১১ টি রাজ্যের মধ্যে রয়েছে,- ঝাড়খণ্ড, বিহার, ছত্তীসগড়, মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান, উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড, হিমাচল, হরিয়ানা, দিল্লি এবং চণ্ডীগড়।

এমনিতেই উত্তরপ্রদেশে সপা-বসপা-কংগ্রেসের মহাজোট হলে সেখানে ভরাডুবির আশঙ্কা রয়েছে বিজেপি-র। তার উপর ঝাড়খণ্ড, হরিয়ানা, বিহারে বিজেপি বা তাদের জোট সরকার আগের থেকে অনেকটাই জনপ্রিয়তা খুইয়েছে। এর পর যদি এই তিন রাজ্যেও ভরাডুবি হয় তা হলে হিন্দিবলয়েই বিজেপি-র আসন কমে যেতে পারে একশোরও বেশি।

তাৎপর্যপূর্ণ হল, হিন্দিবলয়ের এই ক্ষতপূরণ দেশের অন্য এলাকা থেকে করা খুব একটা সহজ নয়। কারণ, দক্ষিণের রাজ্যগুলিতে লোকসভার যে ১৩২টি আসন রয়েছে সেখানে বিজেপি আগের তুলনায় আসন বাড়ানোর জায়গায় নেই বলেই অনেকের মত। সেই সম্ভাবনা আপাত ভাবে দেখাও যাচ্ছে না। আবার ওড়িশা, বাংলা থেকে বিজেপি আসন বাড়ানোর আশা দেখছে ঠিকই। কিন্তু পূর্ব উপকূলে আসন বাড়লেও পশ্চিম উপকূলের রাজ্য মহারাষ্ট্র, গোয়া, গুজরাতে চোদ্দর ভোটের তুলনায় আসন খোয়ানোর আশঙ্কা রয়েছে বিজেপি-র।

বাংলা, ওড়িশা, অসম ও উত্তর-পূর্বের রাজ্য গুলি মিলিয়ে লোকসভার মোট ৮৮ টি আসন রয়েছে। এর মধ্যে গত ভোটে মাত্র ১১ টি আসন জিতেছিল বিজেপি। ফলে এখানে আসন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু মহারাষ্ট্র, গুজরাত, গোয়া, দমন মিলিয়ে পশ্চিমের মোট ৭৮ টি আসনের মধ্যে গত ভোটে ৭২টিতেই জিতেছিল বিজেপি। অর্থাত প্রায় সম্পৃক্ত অবস্থায় পৌঁছে গিয়েছিল। এ বার সেখানে আসন কমা অনিবার্য। গুজরাতের বিধানসভা ভোটেই তার ইঙ্গিত পাওয়া গিয়েছে। ফলে পূর্ব-পশ্চিমে বাড়া-কমা মিলিয়ে হাতে উদ্বৃত্ত কিছু থাকছে না।

এর পর পড়ে থাকে শুধু পঞ্জাব এবং জম্মু কাশ্মীরের ১৯টি লোকসভা আসন। সেখানেও বিজেপি-র এ বার আসন বাড়ার তুলনায় কমে যাওয়ার আশঙ্কাই প্রবল।
চুম্বকে বিজেপি-র একমাত্র বল ভরসার জায়গা বলতে ছিল হিন্দিবলয় তথা আর্যাবর্তে দুর্গ ধরে রাখা। কিন্তু সেখানেই ভিতে ধস নামে তা হলে অশনিসংকেত নয়।
তবে এ সব বিশ্লেষণই হচ্ছে বুথ ফেরত সমীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে। প্রকৃত ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করে থাকতে হবে ১১ ডিসেম্বর পর্যন্ত।

আরও পড়ুন..

চাণক্যেরও ভবিষ্যদ্বাণী, রাজস্থান-মধ্যপ্রদেশ-ছত্তীসগড় তিন রাজ্যেই হারতে চলেছে বিজেপি

Comments are closed.