মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৩

রাজভবন থেকে মাঝেরহাট যাওয়া কতটা জরুরি ছিল মহামহিম

শঙ্খদীপ দাস

মঙ্গলবার ভেঙে পড়া মাঝেরহাট ব্রিজে উদ্ধারকাজ যখন মাঝপথে, সেখানে পৌঁছে গেলেন রাজ্যপাল কেশরীনাথ ত্রিপাঠী।

তিনি অকুস্থলে পৌঁছতেই শশব্যস্ত পুলিশ কর্তারা। উদ্ধার কাজের ব্যস্ততা ফেলে কিছু পুলিশ কর্মী ব্যস্ত হয়ে পড়লেন গোটা এলাকা কর্ডন করে ফেলতে। রাজ্যপালের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা ছোটখাটো ব্যাপার নয়। ভাল মন্দ কিছু ঘটে গেলে..!

ততক্ষণে বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমে গিয়েছে। আকাশে মেঘ। দু-চার পশলা বৃষ্টি পড়ে চলেছে নাগাড়ে। মহামহিমের মাথায় মস্ত ছাতাও ধরতে হয়েছে তাই। প্রত্যক্ষদর্শীদের কথায়, ব্রিজটি যেখানে ভেঙে পড়েছে তার কাছাকাছি পৌঁছে যান রাজ্যপাল। উদ্ধার কাজ ঠিক মতো হচ্ছে কিনা, হতাহত কত, ভেঙে পড়া কংক্রিটের স্ল্যাবের নীচে কেউ আটকে রয়েছে কিনা সে সব পুলিশ কর্তাদের কাছে জানতে চান রাজ্যপাল। পরে বেরিয়ে আসার সময় সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, “পূর্ত দফতর এবং রেল উভয়েরই গাফিলতি রয়েছে।”

তা নিশ্চয়ই রয়েছে। কিন্তু মহামহিমের কাছে প্রশ্ন, এ কথাটা মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মাঝেরহাটে গিয়েই বলার ছিল? ধরে নেওয়া যাক, তিনি মাঝেরহাটে যাননি, এই মন্তব্য করেননি। বরং রাজভবনে বসে খবর নিয়েছেন প্রশাসনের থেকে। তার পর একটি বিবৃতি প্রকাশ করে দু:খ, খেদ, যন্ত্রণা, অসন্তোষ, ক্ষোভ যাবতীয় কিছু প্রকাশ করেছেন। কী ফারাক হত? তিনি সেখানে যাওয়ায় উদ্ধার কাজে কোনও প্রভাব পড়েনি এমন কথা কি তিনি দায়িত্ব নিয়ে বলতে পারেন? তা ছাড়া মাঝেরহাট ব্রিজ ভেঙে পড়ায় বেহালার সঙ্গে কলকাতার যোগাযোগ মঙ্গলবার এক প্রকার বেহাল হয়ে পড়ে। তীব্র যানজট শুরু হয়ে যায় দক্ষিণ কলকাতার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে। তার মাঝে রাজ্যপালের জন্য যান নিয়ন্ত্রণ করায় সাধারণ মানুষ কি আরও কিছুটা সমস্যায় পড়লেন না?

এক সময়ে উত্তরপ্রদেশের পোড় খাওয়া রাজনীতিক ছিলেন এই আইনজীবী। ইদানীং বাংলায় শাসক দল মাঝে মধ্যেই তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলেন তিনি রাজনীতি করছেন। মঙ্গলবার সেই প্রশ্নটাই যদি ফের উড়ে আসে? মাঝেরহাটে রাজনীতি করতে গিয়েছিলেন রাজ্যপাল!

রাজ্যপাল রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধান। এবং সেই সংবিধান অনুযায়ী রাজ্যপালের কোনও প্রশাসনিক অধিকার বা এক্তিয়ার নেই। মন্ত্রিসভার পরামর্শেই তিনি চলেন। এ দিন নবান্ন তাঁকে মাঝেরহাটে যাওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল, এমন খবরও নেই।

মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অবশ্য মঙ্গলবার কলকাতায় ছিলেন না। তিনি ছিলেন পাহাড়ে। প্রশাসনিক বৈঠকের জন্য দার্জিলিংয়ের রিচমন্ড হিলে ছিলেন তিনি। তবে মমতা কলকাতায় থাকলে তিনিও হয়তো পৌঁছে যেতেন মাঝেরহাটে। ঠিক যে ছবিটা দেখা গিয়েছিল আড়াই বছর আগে। পোস্তায় বিবেকানন্দ উড়ালপুল ভেঙে পড়ার পর সেখানে গভীর রাত পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থেকে উদ্ধার কাজে তদারকি করেন মুখ্যমন্ত্রী।

সে বারও প্রশ্ন উঠেছিল, মুখ্যমন্ত্রীর কি অকুস্থলে যাওয়া খুব দরকার ছিল? রাজ্যের পুলিশ, আমলাদের বিচার ক্ষমতা কি এতটাই দুর্বল যে মুখ্যমন্ত্রী ঘটনাস্থলে না পৌঁছলে ঠিকঠাক উদ্ধার কাজই হবে না!

বরং মঙ্গলবার উল্টো ছবিটাই দেখা গিয়েছে মাঝেরহাটে। রাজনৈতিক নেতারা পৌঁছনোর অনেক আগে সেখানে পৌঁছে গিয়েছেন পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমার-সহ রাজ্য পুলিশের বেশ কয়েকজন বড় কর্তা। এবং বিশাল বাহিনী।

আসলে লোক দেখানো রাজনীতির সমস্যাটা এতদিনে এ দেশের বর্তমান ব্যবস্থায় অনেক গভীর পর্যন্ত শিকড়বাকড় গজিয়ে ফেলেছে। বিপর্যয়ের সময় মানুষের পাশে দাঁড়ানো এক ব্যাপার। তাদের কাছে সাহায্যের হাত পৌঁছে দেওয়া জরুরি। রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের সে জন্য অবশ্যই ভূমিকা থাকা প্রয়োজন। বিশেষ করে জনপ্রতিনিধিদের। কিন্তু ব্রিজ ভেঙে পড়ার ঘটনায় যতক্ষণ না উদ্ধার কাজ শেষ হচ্ছে, তাদের কোনও কাজ থাকতে পারে না। পৃথিবীর কোনও উন্নত দেশে তা দেখা যায় না।

বরং মাঝেরহাটে যাঁরা আহত হয়েছেন তাঁদের রাজ্যপাল-মুখ্যমন্ত্রীকে বেশি দরকার হবে কাল থেকে। হাসপাতালে চিকিৎসার সব খরচ সরকার দেবে বলে জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। কিন্তু তার পর কেউ যদি স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে না পারেন, তা হলে রাজ্যপাল তাঁর বাড়িতে সে দিন যাবেন তো! তাঁর জন্য যথাসম্ভব করবেন তো! কলকাতা সেটাও দেখতে চাইবে কিন্তু।

Shares

Comments are closed.