এ পুজোয় বিদ্যাসাগরের ছোঁয়া, তবু অবাধ দেবীদর্শনে ব্রাত্য দেবীরাই

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো, বর্ধমান : তিনি সর্ব তাপহন্তা, তিনি শক্তিরূপিনী, অভয়দায়িনী। কন্যারূপে, মাতৃরূপে তাঁর আরাধনায় আর কয়েক দিন পরেই মেতে উঠবে বাংলা। মেতে উঠবে রাজ্যের সীমানার বাইরে ছড়িয়ে থাকা গোটা বাঙালি সমাজ। অথচ সেই আঙিনায় ব্রাত্য থেকে যাবেন চকদিঘির সিংহরায় পরিবারের মহিলারা। কানাত দিয়ে ঢাকা পথে তাঁরা নাকি শুধু দিনান্তে দেবী দর্শন করতে যান। এমনটাই প্রথা।

    এক সময় পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নিয়মিত যাতায়াত ছিল জামালপুরের এই জমিদার বাড়িতে। বাগান ঘেরা এই বাড়িতে একটি জলাশয়ের ধারে নাকি তাঁর থাকার জন্য তৈরি করা হয়েছিল হাওয়াখানা ঘর। এখনও সেই ঘরটি হাওয়া মহল নামে পরিচিত। কিন্তু নারী স্বাধীনতার জন্য বিদ্যাসাগরের লড়াই ছুঁয়ে যায়নি এ বাড়ির অন্দরমহলকে।

    ঐতিহ্য পরম্পরা মেনে এই জমিদারবাড়ির বিশাল মন্দিরে ২৮৪ বছর ধরে পূজিত হয়ে আসছেন দেবী দুর্গা। পরিবার সূত্রে জানা গিয়েছে, চকদিঘির জমিদারদের পূর্বপুরুষরা ছিলেন রাজপুত ক্ষত্রিয়। ইতিহাস খ্যাত বুন্দেলখণ্ডের শাসকদের বংশধররা জমিদারি চালাতেন এখানে। দুর্গাচরণ রায়ের “দেবগণের মর্ত্যে  আগমন” বইয়ে উল্লেখ  রয়েছে  চকদিঘির জমিদারদের কথা। সেখান থেকেই জানা যায় রাজস্থান থেকে চকদিঘিতে  এসে প্রথম ছাউনি ফেলে বসবাস শুরু করেছিলেন নল সিং। পরবর্তী কালে রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের কাছ থেকে জমিদারি লাভের পর অগাধ ঐশ্বর্য ও খ্যাতি  লাভ করেছিলেন তিনি। এই জমিদার বংশ খ্যাতির শীর্ষে পৌঁছেছিল সারদাপ্রসাদ সিংহরায়ের হাত ধরে। এই প্রজাবৎসল জমিদার শিক্ষা বিস্তারের জন্য চকদিঘিতে তৈরি করেছিলেন বিদ্যালয়। যে বিদ্যালয়ের উদ্বোধন করেছিলেন স্বয়ং ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। এছাড়াও চকদিঘি হাসপাতাল এবং আজকের মেমারি চকদিঘি সড়কপথ সবই তৈরি হয়ছিল সারদাপ্রসাদ সিংহরায়ের উদ্যোগে। জমিদার বংশের পরবর্তী প্রজন্ম ললিতমোহন সিংহরায়, লীলামোহন সিংহরায়, কমলাপ্রসাদ সিংহরায়রাও সারদাপ্রসাদের পথই অনুসরণ করে জমিদারি চালিয়েছিলেন। বর্তমান বংশধর  অম্বরীশ সিংহরায় একই ভাবে পূর্ব পুরুষদের ঐতিহ্য   বজায় রেখে চলেছেন।

    জমিদারদের কাছাড়ি বাড়ির সামনেই রয়েছে দুর্গা পুজোর স্থায়ী মণ্ডপ। বৈদিক মতে হয় এখানকার দুর্গা আরাধনা। একচালার কাঠামোয় ডাকের সাজে প্রতিমা। দেবী মূর্তির দু’পাশে  থাকে জয়া ও বিজয়া। প্রতিপদ থেকে  শুরু হয় পুজো। পুজোয় অন্য ফল যাই থাক,  কাজু- কিসমিস- পেস্তা- আখরোট  ও মেওয়া চাই ই চাই।  নৈবেদ্যে  দেওয়া হয় চিনির সন্দেশ, ছোট ও বড় মুণ্ডি, ডোনা, নবাত, রশকরা, মুড়কি।

    চকদিঘির জমিদার বাড়ির পুজোর জোগাড়ের পুরোটাই করেন পুরুষরা। নিষিদ্ধ বাড়ির মহিলাদের অংশগ্রহণ।  অম্বরীশবাবু বলেন, “পারিবারিক প্রথা মেনেই পুজোর সময় আমাদের বাড়ির বউরা পর্দার পেছনে থাকেন। জমিদার বাড়ির মেয়ে বউদের  মুখ যাতে অন্য কেউ দেখতে না পায় তাই এই ব্যবস্থা।” তিনি জানান, অন্দরমহল থেকে পরিবারের মহিলারা মন্দিরে পুজো দিতে কিংবা ঠাকুর দেখতে আসার সময় এখনও কেউ যাতে তাঁদের দেখতে না পান তার জন্য তাঁদের পথের দু’পাশে কাপড় দিয়ে ‘কানাত’ টাঙানো হয়।

    শুধুমাত্র আভিজাত্য বজায় রাখতেই এখনও এই ভবিতব্য মেনে চলছেন চকদিঘির সিংহরায় পরিবারের দুর্গারা।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More