বুধবার, মার্চ ২০

দামি সিগারেট হাতে মহিলারাই এখন বাজার কাঁপাচ্ছেন! কারণটা কি শুধুই নেশা, না অন্য কিছু…

চৈতালী চক্রবর্তী

পরনে কেতাদুরস্ত পোশাক। হাতে দামি সিগারেট। মোবাইল দেখতে দেখতে মাঝে মাঝেই ম্যানিকিওর করা হাত চলে যাচ্ছে মুখের কাছে। পেলব দু’টি ঠোঁটের মাঝে আলতো করে ধরে লম্বা একটা টান। একরাশ ধোঁয়ার রিং হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়ার আগেই খিলখিলিয়ে হেসে মেয়েটি তাঁর পুরুষ সঙ্গীকে বলল, ‘দেখলি কেমন দিলাম। একেই বলে টান’। অফিস চত্বরে হোক বা শপিং মলের সামনে, এটাই এখন কলকাতার চেনা ছবি।

‘আর সিগারেট খেয়ো না বাপু’ অথবা ‘সিগারেট এ বার ছাড়ো’ টাইপের বুলি আওড়ানো মা-মাসিমা থেকে একটু স্বাস্থ্য সচেতন যুবতী, যাঁরাই তাঁদের পরিবারের পুরুষ সদস্যকে (স্বামী বা হালে বয়ফ্রেন্ডও হতে পারে) সিগারেট ছাড়ার নিদান দেন, তাঁরাই এখন এই বং টাইপের মেয়েদের দেখে নাক সিঁটকান। এক বয়স্কা মহিলা তো বলেই ফেললেন, ‘উফ! কেমন মেয়ে, লাজ-লজ্জার মাথা খেয়ে ছেলেদের সঙ্গে দাঁড়িয়ে সিগারেট টানছে।’

তবে, দোষটা ওই বয়স্কা মহিলার নয়, দোষটা আধুনিক সমাজ ব্যবস্থার এবং তার সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা প্রজন্মের। সমীক্ষা বলছে, গোটা দেশেই এখন ছেলেদের থেকে মহিলা ধূমপায়ীর সংখ্যা অনেক বেশি। নিকোটিনের আমেজ কাজে উৎসাহ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে স্ট্রেস কমিয়ে দিতে পারে। আর এই কারণেই তাঁরা সিগারেটের দাসত্ব থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না। কম-বেশি প্রায় প্রত্যেক ধূমপায়ীই এই যুক্তি খাড়া করেন। তবে কিছু কিছু তরুণীর সিগারেট টানার পেছনে আছে স্লিম হওয়ার যুক্তি। যদিও এই যুক্তির কোনও সত্যতাই নেই। ১০০ জন ধূমপায়ীর ৯৩ জনই ধূমপানের মারাত্মক দিক সম্পর্কে অবহিত। তাও দিন দিন বাড়ছে সিগারেটে সুখটান দেওয়ার এই অভ্যাস।

কতটা ধূমপানে আসক্ত মহিলারা সেটা জানতে অ্যাসোচাম সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন   (Assocham Social Development Foundation) দেশের বড় শহরগুলিতে একটি সমীক্ষা চালায়। রাজধানী দিল্লি থেকে শুরু করে তিলোত্তমা কলকাতা, হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু, চেন্নাই, লখনউ, পুণে, মুম্বই, আমদাবাদ ও জয়পুরের প্রায় ২০০০ জন যুবতীর উপর এই পরীক্ষা করা হয়। তাঁদের প্রত্যেকেরই বয়স ২২ থেকে ৩০-এর মধ্যে। সমীক্ষায় দেখা যায়, ৪০ শতাংশ মহিলা বলছেন তাঁরা কম ধূমপান করেন (Light Smokers)। অথচ দিন তিনটের বেশি সিগারেট খান।  ১২ শতাংশ বলছেন তাঁরা সিগারেট খান মাঝেমধ্যে বা দিনে দু’টোর বেশি নয়। বাকিদের দাবি তাঁরা প্রায় ছেড়েই দিয়েছেন, আর তো মাত্র ক’টা দিন। অতএব, সুখটান দেননি বা দিচ্ছেন না এমনটা একদমই নয়।

এখন দেখে নেওয়া যাক সিগারেটে কী কী রয়েছে?

নেট সার্ফিংয়ে যাঁরা অভ্যস্ত তাঁদের কাছে এই তথ্যগুলো নতুন নয়। তবুও জেনে নিন একটা টান দেওয়ার পরে ঠিক কী কী ঢুকছে আপনার শরীরে। সিগারেটের উপাদানে আছে আর্সেনিক, টয়লেট ক্লিনারে ব্যবহৃত অ্যামোনিয়া, কীটনাশক ডিডিটি, নেলপলিশ রিমুভার অ্যাসিটোন, ব্যাটারিতে ব্যবহৃত ক্যাডমিয়াম, নিকোটিন-সহ আরও প্রায় ৭০০০ বিষ! বেপরোয়া মনোভাব নিয়ে সিগারেট খাচ্ছি গোছের ‘অ্যাটিটিউট’ নিয়ে যাঁরা ফেলুদা স্টাইলে ধোঁয়া ছাড়েন তাঁরা শুনছেন তো?

সিগারেট  ও তামাক সেবনকারীদের নিয়ে এক ন্যাশনাল সার্ভেতে জানা গেছে, কলকাতায় ধুমপায়ীর সংখ্যা সবথেকে বেশি। কলকাতায় ৪৯% এবং দেশের বাকি অংশে ৪৩%।আর এই ৪৯ শতাংশের মধ্যে অনেকটাই জুড়ে রয়েছেন মহিলারা।

কী ভাবে বাড়ছে মহিলা ধূমপায়ীর সংখ্যা?

  • সমীক্ষা বলছে, ভারতে  প্রায় ৯ কোটি পুরুষ ও ১.৩ কোটি মহিলা ধূমপান করেন।
  • কলেজছাত্রীদের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা ক্রমশ বাড়ছে। এদের মধ্যে ২৭% প্রতি  দিন ৫–১০টি সিগারেট টানেন।
  • ১৯৮০ সালে ৫৩ লক্ষ মহিলা ধূমপায়ী ছিলেন। ২০১২ সালে সংখ্যাটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১.২৭ কোটিতে। ক্রমশ বাড়ছে মহিলা ধূমপায়ীর সংখ্যা।
  • ১৯৮০ থেকে ২০১২ সালের মধ্যে পুরুষ ধূমপায়ীর সংখ্যা ৩৩.৮% থেকে কমেছে ২৩%। অথচ প্রতি ২০ জন মহিলার মধ্যে একজন অর্থাৎ প্রায় ৬% বেড়েছে মহিলা ধূমপায়ীর সংখ্যা।

মহিলাদের উপর সিগারেটের প্রভাব

এটা বলাই বাহুল্য, কারণ সিগারেটের কু-প্রভাব সম্পর্কে আলাদা করে বলার কিছু নেই। তবে যেহেতু মহিলাদের শরীরের গঠন পুরুষদের থেকে অনেক আলাদা তাই ক্ষতির পরিমাণটাও অনেক বেশি। এবং রোগও ধরে যায় চটজলদি। এমনটাই জানাচ্ছেন চিকিৎসকেরা।

  • প্রথমত বিদ্রোহ ঘোষণা করে শরীরের সব চাইতে গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ হৃৎপিণ্ড। রক্ত সঞ্চালন কমে গিয়ে বাড়ে হৃদরোগের সম্ভাবনা।
  • ফুসফুসের রোগ, হাঁপানি তো আছেই, সামান্য জ্বরও লাগাম ছাড়িয়ে বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।
  • ঋতুস্রাব হয়  অনিয়মিত, অকালেই মেনোপজ এবং নানা স্ত্রীরোগের সমস্যা দেখা দেয়।
  • গর্ভপাত থেকে বন্ধ্যাত্ব ধূমপানের মারাত্মক ক্ষতিকর দিক। Pelvic Inflammatory Disease (PID) হওয়ার সম্ভাবনাও দেখা দেয়।
  • ধূমপানে বাড়ে পেরিফেরাল ভাস্কুলার ডিজিজের আশঙ্কা। অর্থাৎ পা-সহ শরীরের বিভিন্ন অংশের রক্তবাহী ধমনিতে কোলেস্টেরলের প্রলেপ জমে রক্ত চলাচল কমে যায়। সব থেকে বেশি সমস্যা হয় পায়ে। ধূমপায়ীদের এই অসুখের আশঙ্কা অন্যদের থেকে ১৬ গুণ বেশি। মধ্য বয়সে পেরিফেরাল ভাস্কুলার ডিজিজ জনিত পায়ের ব্যথার রোগীদের ৯৫% ধূমপায়ী।

নেশার থেকেও বেশি মাথা চাড়া দিচ্ছে মানসিক সমস্যা

যে ভাবে বাড়ছে মহিলা ধূমপায়ীর সংখ্যা তাতে নেশার থেকেও বেশি রয়েছে অন্য একটি কারণ। সেটা পুরোপুরিই মানসিক। এমনটাই মত মনোবিজ্ঞানীদের। হালফিলের লাইফস্টাইলে ‘প্যাশন’ শব্দটার একটা অন্য মানেই বার করে ফেলেছে জেন এক্স ও ওয়াই। এই প্যাশন হল নিজের জাহির করার। নামী সংস্থায় চাকরি বা গাড়ি হাঁকিয়ে শপিং করা তরুণীর কাছে প্যাশনের অর্থ সাহেবিয়ানাকে উস্কে দেওয়া। সেটা মদের গ্লাস হাতেই হোক বা সিগারেটে সুখটান দেওয়ার মধ্যেই হোক। মেয়েরাও ছেলেদের থেকে কমতি নয় এটা দেখাতে গিয়েই সবার মাঝে দাঁড়িয়ে একটা সিগারেট এবং দামি লাইটার ব্যাগ থেকে বার করার মধ্যেই আনন্দ খুঁজে পাচ্ছে মেয়েরা। এটাই তাদের কাছে স্বাধীনতা।

দ্বিতীয়ত, কলেজ ছাত্রী (হালে স্কুল পড়ুয়ারাও) আমি বড় হয়ে গেছি টাইপের যুক্তি খাড়া করতে ধূমপানে আসক্ত হয়ে পড়ছে। অনেক কলেজ ছাত্রীকেই বলতে শোনা যায়, ‘কলেজে পড়েও সিগারেট, গাঁজা খেলাম না তো কী খেলাম!’

তৃতীয় কারণ হতে পারে, স্টাইল স্টেটমেন্ট। সুন্দরী স্বাস্থ্যসচেতন মহিলাকে দেখা গিয়েছে রোদচশমা পড়ে গাড়ি থেকে নেমে সিগারেট ধরাচ্ছেন। অর্থাৎ ফ্যাশনেবল পোশাক সেই সঙ্গে দামি সিগারেট, আশপাশের লোকের নজর পড়বেই। ভিড়ের মধ্যেও একটু আলাদা থাকার প্রচেষ্টা।

সম্প্রতি এক অফিস পার্টিতে গিয়ে এক মহিলা সহকর্মীকে এক মুখ ধোঁয়া ছেড়ে বলতে শুনলাম, ‘আরে! সবই চেখে দেখা ভাল।’ সায় দিলেন পাশে দাঁড়ানো আরও কয়েকজন পুরুষ সহকর্মীও। তা ভাল, সব অভ্যাস আয়ত্বে থাকাই ভাল। তবে অবশ্যই রয়ে সয়ে এবং বুঝেশুনে। স্বয়ং নীলকণ্ঠের মতো স্বেচ্ছায় বিষপান করার মতো শারীরিক গঠন তো মানুষের থাকে না (মহিলাদের আরও নয়), তাই যে কোনও বিষ (সিগারেট, বিড়ি, গুটখা তার মধ্যে অন্যতম) এড়িয়ে চলাই বোধকরি বুদ্ধিমানের কাজ। কারণ, ‘আমি সিগারেট খাচ্ছি, না সিগারেট আমাকে’ এই কথার সত্যতা যদি জানাই থাকে তাহলে আর কেন। বরং বলা ভাল, অনেক তো হল। এ বার না হয় সিগারেটটা ছেড়েই দিন। কী ভাবছেন মেয়েরা?

Shares

Comments are closed.