মঙ্গলবার, এপ্রিল ২৩

সাপের সঙ্গেই ওঠাবসা, সাপের বিষ বেচেই রোজগার, দক্ষিণ ভারতের ইরুলা উপজাতিরা এখনও প্রচারের আড়ালে

চৈতালী চক্রবর্তী

কালো মাথাটা দুলিয়ে হাত তিনেক দূরেই ফনা উঁচিয়ে রয়েছে একটা গোখরো। তার হিস্ হিস্ শব্দে মেরুদণ্ড বেয়ে যেন ঠাণ্ডা স্রোত বয়ে যাচ্ছে। ভয় আর আতঙ্কের মাঝেও প্রাণীটির সৌন্দর্য আর ক্ষিপ্র গতি দৃষ্টি আকর্ষণ না করে পারে না। কথায় বলে, সাপের নাকি একটা সম্মোহনী শক্তি শক্তি রয়েছে, মন্ত্রমুগ্ধের মতো সে দিকে চেয়ে থাকতে হয়। হঠাৎই মাথাটা সুকৌশলে চেপে ধরে সাপটাকে তুলে নিল বছর ত্রিশের এক যুবক। নাম রাজেন্দ্রন। সাপটাকে দু’হাতে নানা ভঙ্গিমায় খেলিয়ে একটা মাটির পাত্রে রেখে ঢাকা দিয়ে দিল। বলল, ভারী জিনিসের শব্দে সাপ আতঙ্কিত হয়। সেটাই সুয়োগ তাদের বাগে আনার।

চেন্নাই লাগোয়া ছোট্ট গ্রাম ভাদেনেম্মাপল্লী। সেখানেই ছোটখাটো কাজ করে রাজেন্দ্রন। সেই জানায়, সাপ ধরার এমন চমকপ্রদ কৌশল আসলে তাদের মজ্জাগত। দক্ষিণের ইরুলা উপজাতির সদস্য সে। সাপের সঙ্গে তাদের একটা আত্মিক সম্পর্ক রয়েছে। সাপ ধরাই নেশা এবং পেশাও বটে। সুপ্রাচীনকাল থেকে সাপ ধরে আর সাপের বিষ বেচেই এই উপজাতি গোষ্ঠীর দিন গুজরান হয়। সাপের সঙ্গেই তাই হৃদয়ের বাঁধন। একটা পোশাকি নামও রয়েছে এই উপজাতি গোষ্ঠীর— ‘স্নেক মেন।’

ইরুলাদের নিয়ে চর্চা খুব কম। অথচ ভারত থেকে ইউরোপ, আফ্রিকার অনেক জায়গায় যে সাপের বিষ রফতানি হয়, তার বেশিরভাগটাই যোগান দেয় এই জনজাতির মানুষরা। ভারতে অন্তত ছ’টি সংস্থা সাপের বিষ থেকে অ্যান্টিভেনম তৈরি করে। বছরে প্রায় ১৫ লক্ষ ভায়াল অ্যান্টিভেনম তৈরি হয় ভারতে। এই ওষুধ তৈরির জন্য যে সাপের বিষ দরকার হয় তারও যোগান দেওয়ার দায়িত্বে থাকে এই ইরুলারাই।

কারা এই ইরুলা উপজাতি

তামিলনাড়ু ও কেরলের এই উপজাতি গোষ্ঠীর নাম ইরুলা। তামিনলাড়ুর উত্তর-পূর্ব উপকূল বরাবর এই উপজাতিদের বাস। প্রত্নতাত্ত্বিকরা এই ইরুলাদের সঙ্গে নেগ্রিটো জনজাতির মিল পেয়েছেন। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আদিম উপজাতি গোষ্ঠী নেগ্রিটো। বর্তমানে এদের বংশধরেরা ছড়িয়ে রয়েছে তামিলনাড়ু, আন্দামান ও নিকোবর দ্বীপপুঞ্জ, মালয়েশিয়া ও ফিলিপিন্সে।

ইরুলাদের নিজস্ব ভাষা ও সংস্কৃতি রয়েছে। মূলত ইরুলা ভাষাতেই তারা স্বচ্ছন্দ। তবে জনজাতির মধ্যে দ্রাবিড় ভাষার চলও রয়েছে। ‘ইরুলার’ শব্দ থেকে এই ইরুলা শব্দের উৎপত্তি। তামিল ও মালয়ালম ভাষায় ‘ইরুলার’ মানে হল কালো মানুষ। গায়ের রঙেই তাদের পরিচয়। সেখান থেকেই এই উপজাতির নাম। তামিলনাড়ুতে এই জনজাতির সংখ্যা দু’লক্ষের কাছাকাছি, কেরলে প্রায় ২৫,০০০। তবে ধীরে ধীরে এই জনজাতির সংখ্যা কমছে। তার মূল কারণ তাদের দারিদ্র।

তামিলনাড়ুর নীলগিরি, কোয়েম্বত্তূরে সবচেয়ে বেশি বসবাস করে ইরুলারা। কেরলের পালাক্কাড় জেলা ও আত্তাপ্যাডিতে ছড়িয়ে রয়েছে তারা। পাল্লাকাড়ের ইরুলাদের সাপ ধরা ছাড়াও পেশা চাষাবাদ। তা ছাড়া, শিকার ও জঙ্গল থেকে মধু সংগ্রহ করেও জীবনধারণ করে এই আদিবাসী সম্প্রদায়।

‘‘আমরা এখন সাপ ধরা অনেক কমিয়ে দিয়েছি,’’ জানাল রাজেন্দ্রন। এই কাজের জন্য তাদের সরকারি লাইসেন্সও রয়েছে। একবারে ৮০০ সাপ তারা ঝোলাবন্দি করে। ২১ দিন ধরে সাপগুলিকে ধরে রাখা হয়। তার মধ্যে চার বার বিষ বার করা হয়। পরে অবশ্য তাদের নিরাপদেই ছেড়ে দেয় তারা। ‘‘সেই ১০ বছর বয়স থেকেই সাপ ধরছি। বাবা, দাদারাও ধরত। শরীরে অনেক সাপের ছোবলের দাগ রয়েছে,’’ রাজেন্দ্রনের কথায়, ‘‘সাপেরা এমনিতে আক্রমণ করে না। ওরা বেঁচে থাকতেই চায়। মানুষের আতঙ্ক ওরা টের পায়, বিপদের আশঙ্কায় তাই আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে।’’

সাপেদের ভালোবাসে ইরুলা জনজাতি। তবে শুরুর দিকে সাপ মেরে চামড়া বেচাই ছিল তাদের কাজ। এমনটাই জানিয়েছেন রাজেন্দ্রন। তার পূর্বপুরুষরা এই কাজই করতেন। এক একটা চামড়ার জন্য লাভ হত ১০-৫০ টাকা। ইউরোপ ও মার্কিন মুলুকের নানা ফ্যাশন ইন্ডাস্ট্রিতে এই চামড়ার খুব চাহিদা ছিল। ১৯৭২ সালে বন্যপ্রাণি সংরক্ষণ আইনে শিকার, প্রাণিহত্যা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। ইরুলাদের ব্যবসাও তাই লাটে ওঠে। রুজিরোজকারের বিকল্প হিসেবে তাই সাপের বিষ বার করার কাজ শুরু করে তারা। এখনও ইরুলাদের একটা বড় অংশের পেশা সেটাই।

ভার্জিন দেবী কান্নাইমার পুজো করে ইরুলারা

গোখরো সাপের সঙ্গে নাকি সম্বন্ধ রয়েছে দেবী কান্নাইমার। তারই উপাসক ইরুলারা। সাপ ধরতে যাওয়ার আগে নিয়ম করে কান্নাইমার পুজো দিয়ে যায় এই উপজাতিরা। মাসে একবার বড় করে হয় দেবীর পুজো। মূল পুজারী মন্দিরে ঢুকে সাপের মতো শিষ দিতে শুরু করে, এই শিষেই নাকি খুশি হন দেবী।

এই উপজাতির সংখ্যা বর্তমানে সবচেয়ে বেশি কেরলের কোয়েম্বত্তূরে। তারা মনে করে তাদের পূর্বপুরুষ কোয়ান পাত্তুর নামে এক ঋষি। এই কোয়ান পাত্তুরের নামেই কোয়েম্বত্তূর নামের উৎপত্তি। এই ঋষিও সাপের পুজারী ছিলেন। তাঁর ছিল একাধিক স্ত্রী  এবং অনেক সন্তান। তাঁদের থেকেই ইরুলাদের জন্ম।

পালিয়ে বিয়ে করাটাই রেওয়াজ ইরুলাদের

বিয়ের জন্য দিতে হয় মোটা টাকা পণ। না হলে পালিয়ে বিয়ে করাটাই রেওয়াজ। বেশিরভাগ ইরুলারা সেটাই করে থাকে। বিয়ের সময় মেয়েরা গলায় পরে ট্রাডিশনাল তালি (নেকলেস)। যুগলের জোর হাতের উপর জল ঢেলে (ধারা) সম্পন্ন হয় বিয়ে।  প্রথম প্রসবের পর ইরুলা মহিলা তিন মাসের জন্য অচ্ছুত হয়ে যায়, তাকে সন্তান-সহ পরিবারের বাকিদের থেকে আলাদা করে রাখা হয়।

ঋতুস্রাব নিয়েও নানা সংস্কার রয়েছে ইরুলাদের। কোনও কিশোরী প্রথমবার রজঃস্বলা হলে তাকে সাতদিনের জন্য বাড়ির বাইরে একটি ছাউনি বানিয়ে রাখা হয়। সেখানে কিশোরীর যে কোনও একজন বন্ধু ও তার মায়েরই প্রবেশের অনুমতি থাকে। পরিবারের পুরুষ সদস্যেরা মেয়েটির মুখ দেখা মানেই সেটা পাপ। সাতদিন পরে নদীতে স্নান করিয়ে, মেয়েটির সমস্ত জামাকাপড় পুড়িয়ে দেওয়া হয়। এই প্রথাকে ইরুলা সমাজে বলা হয়, ‘কায়দাকাতাছিরি’।

ফ্লোরিডার এভারগ্লেডস ন্যাশনাল পার্কে

আদিবাসী সমাজের নানা সংস্কার, রেওয়াজ এখন অনেকটাই মানতে নারাজ ইরুলাদের বর্তমান প্রজন্ম, এমনটাই জানিয়েছে রাজেন্দ্রন। সাপ ধরার পেশা থেকেও সরে আসছে তারা। এর একমাত্র কারণ হচ্ছে, সমাজের মূল ধারায় এখনও নাকি ইরুলাদের কোনও ঠাঁই নেই। জাতপাতের ভেদাভেদ এখনও তাদের সমাজের তথাকথিত উচ্চশ্রেণি থেকে অনেকটাই আলাদা করে রেখেছে।অথচ বিদেশে ইরুলাদের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। ফ্লোরিডার এভারগ্লেডস ন্যাশনাল পার্কে বার্মিজ পাইথন ধরতে তামিলনাড়ু থেকে দুই ইরুলা যুবককে উড়িয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। ফ্লোরিডা ইউনিভার্সিটিতে ইরুলাদের সাপ ধরার কৌশল নিয়ে রীতিমতো চর্চা হয়।

তবে, ইরুলারা এখনও ভরসা রেখেছে তাদের দেবী কান্নাইমার উপরে। একদিন এই দারিদ্র ঘুচবে, তারাও সমাজে যথাযোগ্য সম্মান পাবে, এমনটাই বিশ্বাস ইরুলাদের।

Shares

Comments are closed.