কাশ্মীর কোন পথে?

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    অক্টোবরের শেষ দিনটি পেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের মানচিত্রে আরও দুটি কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল যুক্ত হল। জম্মু-কাশ্মীর এবং লাদাখ। বিগত অগস্ট মাসের পাঁচ তারিখে কেন্দ্রীয় সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল জম্মু-কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদা আর রাখা হবে না। ফলে সংবিধানের তিনশো সত্তর ধারা ও পঁয়ত্রিশ এ অনুচ্ছেদ বিলোপ করা হয়। সরকারের বক্তব্য, কাশ্মীরের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করার জন্য ও সন্ত্রাসবাদ প্রতিহত করার লক্ষ্যেই ওই সিদ্ধান্ত। একইসঙ্গে বলা হয়, কাশ্মীর যে ভারতের অখণ্ড অংশ এবং দেশের বাকি অংশের সঙ্গে তার কোনও ফারাক থাকবে না তাও ওই সিদ্ধান্তের উদ্দেশ্য। কাশ্মীরে এরপর উন্নয়ন হবে, ব্যবসায় লগ্নি হবে, স্থানীয়রা চাকরি পাবেন ইত্যাদি।

    ওই সিদ্ধান্ত ঘোষণার পরে পরেই কাশ্মীরকে প্রায় মুড়ে দেওয়া হয় সেনাপ্রহরায়। বিভিন্ন জায়গায় একশো চুয়াল্লিশ ধারা ও কার্ফু জারি করা হয়। স্কুল -কলেজ, অফিস, দোকানপাট, বাজার, ব্যাঙ্ক, পেট্রল পাম্প বন্ধ হয়ে যায়। রাজনৈতিক নেতাদের অন্তরীণ করে রাখা হয়। বন্ধ করে দেওয়া হয় মোবাইলের ব্যবহার ও ইন্টারনেট সংযোগ। এভাবে বিভিন্ন স্তরে যে সমস্ত নিষেধাজ্ঞা বলবৎ করা হয়েছিল, প্রায় তিন মাস কেটে যাওয়ার পরেও কাশ্মীর সেখান থেকে রেহাই পায়নি। মাঝখানে মোবাইল পরিষেবা আংশিক ফিরিয়ে আনা হয়েছিল। কাশ্মীরে যাতে পর্যটকরা যান সেজন্যও সরকারি তরফে উৎসাহ ও আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল। যদিও তার সামনে আবার প্রশ্নচিহ্ন এসে দাঁড়িয়েছে। তার বিশেষ কারণও তৈরি হয়েছে গত কয়েক মাসে।

    পাকিস্তান বারবার আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক মহলে কাশ্মীর সমস্যাকে উপস্থিত করার চেষ্টা করেছে। ভারতও বারবারই কড়া ভাষায় জবাব দিয়ে জানিয়েছে কাশ্মীর ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়, সেখানে পাকিস্তান তো বটেই, অন্য কোনও পক্ষেরই নাক গলানোর সুযোগ নেই। কাশ্মীর সীমান্তের নানা জায়গায় পাকিস্তান সংঘর্ষবিরতি লঙ্ঘন করায় দু ‘পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি বিনিময় হয়ে চলেছে। জঙ্গি অনুপ্রবেশের চেষ্টাও সমানে চলছে। হতাহতের ঘটনারও বিরাম নেই। এর সঙ্গে রয়েছে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের ক্ষোভ। স্বাভাবিক জীবনযাত্রা থেকে দীর্ঘসময় ধরে বঞ্চিত হয়ে তাঁরা যখনই সুযোগ পাচ্ছেন তখনই তাঁদের অসন্তোষ প্রকাশ করছেন। সরকারি সিদ্ধান্তে তাঁরা যে অখুশি তা আর গোপন নেই।

    এরমধ্যেই আরও কয়েকটি ঘটনা ঘটে গিয়েছে। এতদিন মনে করা হত যে কাশ্মীরে বিচ্ছিন্নতাবাদ ও সন্ত্রাসবাদের যে সমস্যা তার ভুক্তভোগী কাশ্মীরিরাই। সেনা ও জঙ্গিদের লড়াইয়ের খবরও নতুন কিছু নয়। কিন্তু গত কয়েক মাসে বাইরের রাজ্য থেকে যাঁরা কাশ্মীরে নানা কাজে বা ব্যবসার জন্য গিয়েছেন তাঁদের ওপর জঙ্গি হামলা আশঙ্কার মেঘকে আরও গাঢ় করে তুলছে।

    ফল ব্যবসায়ী, ট্রাক চালকদের নিশানা করেছে জঙ্গিরা। অতি সম্প্রতি এই রাজ্যের মুর্শিদাবাদ জেলার পাঁচ শ্রমিককেও গুলিতে ঝাঁঝরা করে দিয়েছে তারা। যাঁদের প্রাণ গিয়েছে তাঁরা কাশ্মীর সমস্যায় কোনও ভাবে দোষী ছিলেন একথা তো বলা যাবে না। সুতরাং এই আক্রমণ যে কাপুরুষোচিত ও নির্দয় তা নিয়ে ভাবনার কোনও অবকাশ নেই।

    সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন হল, কাশ্মীরে রক্তপাত ও হানাহানির যে সুদীর্ঘ ইতিহাস, এই ঘটনা কি সেখানে সংযোজন মাত্র? না কি সরকারের উদ্দেশে তা কোনও হুমকির নামান্তর। কাশ্মীরে আগেও বাইরের বাসিন্দাদের ওপর হামলা হয়েছে। বাসে বোমা বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। তবে মনে রাখা দরকার, সে সময় তিনশো সত্তর ধারা রদ হয়নি, নিষেধাজ্ঞার ঘেরাও ছিল না, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না অস্বাভাবিক তা নিয়ে কোনও কথা ওঠেনি।
    এই ঘটনা বিশেষ তাৎপর্য দাবি করে এই কারণে, যে সময়ে এই হামলা হয়েছে ঠিক তখনই ইউরোপীয় ইউনিয়নের এক প্রতিনিধিদলের সদস্যরা কাশ্মীর সফরে ছিলেন। তিনশো সত্তর ধারা রদ করার পরেও কাশ্মীরের পরিস্থিতি যে বিন্দুমাত্র বদলায়নি তার নিদর্শন হিসাবে একটি বড় ঘটনাকে সামনে আনতে চেয়েছে সন্ত্রাসবাদীরা।
    ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যরা কাশ্মীরে এসে কী দেখলেন, শুনলেন এবং বুঝলেন তা আপাতত আন্দাজের বাইরেই রয়েছে। ইতিমধ্যেই প্রশ্ন উঠেছে, সরকার বিদেশিদের কাশ্মীরে যেতে দিচ্ছে অথচ দেশের কোনও নেতা বা সরকারের বিরোধী পক্ষের কেউ সেখানে যেতে চাইলেই বাধা দিচ্ছে কেন। কাশ্মীরের অবস্থা স্বাভাবিক প্রমাণ করতে সরকারের উদ্যোগ ও প্রচার কিছুমাত্র কম নয়। দেশের সাধারণ পর্যটকদের কাশ্মীর ভ্রমণে আহ্বান জানানোও তারই অঙ্গ ছিল। তা তো ধাক্কা খেলই। মাঝে মাঝে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেও ফল মেলেনি। সেখানকার অচলাবস্থা কেটে ওঠার কোনও ইঙ্গিতও নেই। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট সরকারের কাছে জানতে চেয়েছে, আর কতদিন নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে কাশ্মীরে। বিধিনিষেধ উঠবে কবে। প্রশ্ন গুরুতর, সন্দেহ নেই। তার চেয়েও বড় প্রশ্ন, কাশ্মীরকে ঘিরে যা কিছু সরকারি সিদ্ধান্ত ও পদক্ষেপ তা কি কাশ্মীর সমস্যাকে সমাধানের কোনও পথের দিকে নিয়ে যাবে। সংকট যদি আরও জটিল আকার ধারণ করে তা হলে যাদের মঙ্গলের কথা উচ্চারিত হচ্ছে সেই কাশ্মীরবাসীদেরই ক্ষতি হবে সবচেয়ে বেশি। দেশের কোনও অঞ্চল উপদ্রুত হয়ে থাকুক তা কোনও ভাবেই কাম্য নয়। প্রয়োজনে বিকল্প পথের সন্ধান সমাধানে সহায়ক হতে পারে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More