তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

পৃথিবীর ছাদ কেমন হয়? কেমন করে হয়? ছাদ তো আমার বাড়ির মাথায় আছে, সিঁড়ি দিয়ে উঠতে হয়। পৃথিবীর ছাদে কোন সিঁড়ি দিয়ে ওঠে? কেমন করে পৃথিবীর মাথায় ছেয়ে থাকে সেই ছাদ? আমি তো পৃথিবীতে থাকি, মাথার ওপর আকাশ দেখতে পাই, ছাদ তো কই দেখতে পাই না…!
আর কে কে এমন ভাবত আমি জানি না, আমি তো ভাবতাম। আমার কাছে ‘পৃথিবীর ছাদ’ শব্দবন্ধটা ঘিরে এতটাই কৌতূহল ছিল। ছোটবেলার ভূগোল বইয়ের পাতায় জন্ম নেওয়া সেই কৌতূহল নিরসনও হয়েছিল পরে। সবচেয়ে বড়, অনেকটা উঁচু পাহাড়, যার মাথাটা টেবিলের মতো চাঁছা, সমান, যাকে বলে মালভূমি…. সেইটাই হল গিয়ে পামির।

ভারতের পরে পাকিস্তান, তারপর আফগানিস্তান, তারপর তাজিকিস্তান, তারও পর কিরঘিস্তান,তারপর কাজাখাস্তান। এই কাজাখাস্তান গিয়ে ফের কিরঘিজস্তান থেকে শুরু এই ছাদ। কিরঘিজস্তানের সীমানা ছাড়িয়ে তাজিকিস্তানেও এর বিস্তৃতি। উজবেকিস্তানেও খানিকটা ছুঁয়ে আছে ছাদের কোনা।

পৃথিবীর ছাদ

কৌতূহল আর অনুসন্ধানের শেষে হয়তো জন্ম নেয় স্বপ্ন। সত্যি বলতে, এ ছাদ ছোঁয়ার স্বপ্ন আমি কোনওদিনও তাড়া করিনি। স্বপ্ন দেখেছি, ভেবেছি, চেয়েছি… এই পর্যন্ত। কিন্তু কে না জানে, রোজ বেঁচে নেওয়া অভ্যেস করতে জানলে জীবনের এক একটা বাঁক আসলে সারপ্রাইজ ছাড়া আর কিছুই নয়।

কোনও সৎ, তীব্র ইচ্ছের পূরণ হওয়ার সম্ভাবনাও কখনও শেষ হয় না। কোনও এক অজ্ঞাত কারণে, আমার জীবনের ইচ্ছেরা তাদের পূরণের পথ বরাবরই খুঁজে পেয়েছে। কখনও সহজে, কখনও বা কঠিনে।

এই ইচ্ছেপূরণের পথও খুলে গেল খানিক চিচিং ফাঁকের মতো। পামিরের স্বপ্ন তাড়া করা একটা মানুষের সঙ্গে জুড়ে যাওয়ার সৌভাগ্য হল। জুড়ে যাওয়ার পরেই ঝুলে পড়া। আর শেষমেশ অনেকটা দীর্ঘ ও কঠিন পথ পেরিয়ে উড়ে যাওয়া, ২৭ জুলাই, ২০১৯।

প্রদীপ মহাপাত্র একজন মাউন্টেনিয়ার, একজন এক্সপ্লোরার। একজন ড্রিমারও বটে। প্রদীপদার স্বপ্ন, ছোটবেলায় পড়া সেই কবিতা, ‘দেখব এবার জগৎটাকে’।

সেই জগতেরই প্রথম ধাপ পামির। সেই পামিরেরই সঙ্গী আমরা। আমি, রূপা দে রায়, বাদল জানা।আমরা চারজনেই এই প্রথম দেশের বাইরে চলেছি। একেবারে অচেনা, অজানা এক অভিযানে। ‘আনটাচ্‌ড পামির অন হুইল্‌স’।

স্বপ্নের পথে উড়ান

এই রুটে আর কোনও ভারতীয় বাইক এক্সপিডিশন করেছেন কিনা জানা নেই। সে না থাক। এটা জানা আছে যে, আমাদের সকলের ছোটবেলার ফ্যাসিনেটিং স্বপ্নেরা সত্যি হতে শুরু করছে এই অভিযানের হাত ধরে।

পামির শব্দের অর্থ, ‘সূর্যের পা’। এই সূর্যের পা ছুঁতে যাওয়ার এক অপূর্ব মুহূর্তের মুখে, ফ্লাইটে বসে বড় করে শ্বাস ছাড়ার আগে একবার ঘুরে দেখেছি শেষের কয়েকটা মাস। দেখেছি, এই অভিযান দেখতে যতটা গ্ল্যামারাস, যতটা গরজাস, এর পেছনের পথটা ততটাই ক্ষতবিক্ষত। কত টেনশন, কত ভয়, কত হতাশা, কত প্রতীক্ষার শেষে আজকের দিনটা এসেছে।

এই ফ্লাইট দিল্লি থেকে আমাদের নিয়ে যাচ্ছে আলমাতি— কাজাখাস্তানের রাজধানী। সেখান থেকে আবার কাল ভোরের ফ্লাইটে পৌঁছব কিরঘিজস্তানের রাজধানী বিশকেক। সেখান থেকে বাইক হাতে পাব, অভিযান শুরু হবে পামিরের পায়ে পায়ে।

২৯.০৭.২০১৯

বিশকেকে পৌঁছে, মানে মানস এয়ারপোর্টে নেমে অসামান্য অনুভূতি হচ্ছিল! সেই মানস… এপিক হিরো মানসের ভূমি…!

মানস এয়ারপোর্ট, বিশকেক

এয়ারপোর্টের বাইরে হাসমুখে প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে ছিল ভ্লাদ। এই ভ্লাদের সঙ্গেই এত মাস ধরে দীর্ঘ প্ল্যানিং হয়েছে এক্সপিডিশন নিয়ে। পাতার পর পাতা চ্যাট হয়েছে। অসংখ্য মেল চালাচালি হয়েছে। বড্ড সুন্দর, বুদ্ধিদীপ্ত, দায়িত্ববান ছেলে এই ভ্লাদ। ভ্লাদ আমাদের বাইক ভাড়া দিচ্ছে।

ফ্রুন্‌জ নামের একটা জায়গায় একটা হস্টেল বুক করা ছিল। ছোট্ট একটা ঘরে দুটো দোতলা খাট মিষ্টিমতো। এসে, মালপত্র রেখেই ছুট ভ্লাদের সঙ্গে। সিমকার্ড কেনা, কারেন্সি বদলানোর মতো কাজকর্ম সেরে ভ্লাদের অফিসে মিটিং। আরও একবার সামনাসামনি বসে ঝালিয়ে নেওয়া অভিযানের খুঁটিনাটি রুটম্যাপ। ভ্লাদের দায়িত্ব ওইটুকুই। বাকিটা পথেই ঠিক করে নেব আমরা।

অপূর্ব সুন্দর শহর বিশকেক। এত শান্ত, পরিচ্ছন্ন, হাসিখুশি… মনকে বড় আরাম দেয়। পথেঘাটে কত ফুল, কত গাছ। কোনও বিজ্ঞাপন নেই, কোনও চিৎকার নেই। যানবাহন চলে ধীরে, হর্ন না বাজিয়ে।

মানুষজন নিজের মতো কর্মচঞ্চল। ঊর্ধ্বশ্বাস ব্যস্ততা এ শহরের বৈশিষ্ট্য নয়।
বিকেলের দিকে গ্যারেজে গিয়ে ভালো করে বুঝে নেওয়া হল আমাদের বাইক।
৩০.০৭.২০১৯

যাত্রা শুরু

১১টা নাগাদ বেরোলাম গ্যারেজ থেকে। তেল ভরে রওনা দিলাম। গন্তব্য বোকেনভায়েবো। ২৮০ কিলোমিটার দূরত্ব। প্রথমে শহর ছাড়তেই অনেকটা সময় লাগল। তারপর হাইওয়ে। ঘণ্টা দুয়েক পরে একটা ব্রেক। চায়ের দোকান নেই। ফলের দোকান। রাস্তার ধারে তরমুজ, আপেল, টোম্যাটো, খুবানি,আঙুর, পিচ নিয়ে বসেছেন স্থানীয় মহিলারা। পেট ভরে তরমুজ খাওয়া হল।

ফের চলতে চলতে পাহাড় দেখা দিল খানিক পরে। আমাদের পাশে পাশে ছুটছে চুই নদী। চুই নদীর ওপারেই কাজাখাস্তান। দু’দেশের সীমান্ত দিয়ে চু-কিত-কিত খেলতে খেলতে এগোচ্ছি আমরা। অ্যাট আ স্ট্রেচ লম্বা হাইওয়ে। ঘুম পেয়ে যায় টানা চালাতে। শহরের পথ ছেড়ে একটু কান্ট্রিসাইডে চলে আসার পরে নৈসর্গিক দৃশ্য অপূর্ব। চোখ ফেরানো যায় না।
তার মধ্যে চমকে দিয়ে মাঝে মাঝেই আসছে একটা করে গোরস্থান। কী তাদের সৌন্দর্য! কত যত্নে বানানো বেদি!

গোরস্থানে সাবধান!

পাহাড়ের কোলে একটু একটু করে ঢুকে চলেছি আমরা। নতুন নতুনভাবে ধরা দিচ্ছে পাহাড়। কখনও একেবারে খয়েরি, কখনও সবুজের ছিটে। কখনও আবার একেবারেই সবুজ।

ইসাক কুল পৌঁছলাম। ইসাক কুল হল কিরঘিজস্তানের একটা লেক। কুল মানে লেক। অপূর্ব সুন্দর। এত বড় যে সমুদ্রের মতো লাগে। প্যাংগঙের মতোই জলটা নীল বলে জানতাম। কিন্তু মেঘলা আকাশ নীলের মধ্যে ধূসর মিশিয়ে দিয়েছে। এক অন্যরকম রূপ।

মেঘে ছাওয়া ইসাক কুলের ধারে

ইসাক কুল পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম অ্যালপাইন লেক। মানে পাহাড়কোলে যত লেক আছে তার মধ্যে দ্বিতীয়। প্রথম হল বলিভিয়ার তিতিকাকা লেক। ইসাক কুলকে বলা হয় পার্ল অফ কিরঘিজস্তান।কিরঘিজস্তানের মুক্তো।

হাঁ করে সব দেখতে দেখতে চলেছি। একসময় হাঁ অবস্থায় স্থির হয়ে গেল মুখ। আকাশজোড়া রামধনু! আস্ত। একটু ভালো করে দেখতেই দেখি— একটা নয়, দুটো! দু-দুটো রামধনু দেখছি চোখের সামনে!

পথে জোড়া রামধনু

বিকেল পড়ে আসছে তখন। বিকেল মানে সন্ধে। কারণ এখানে সূর্য ডোবে প্রায় ন’টায়।

৩১.০৭.২০১৯

এদিন আমাদের বোকোনবায়েভোতেই থাকা, ঈগল হান্টিং দেখতে যাওয়া।
পামিরের নানা প্রান্তে প্রচুর যাযাবরের বাস। বা বলা ভালো, বাস ছিল। পাহাড়ি অঞ্চলের এই যাযাবরদের মূল জীবন ও জীবিকা হল শিকার। ওদের স্টেপল ফুড হল বিভিন্ন প্রাণীর মাংস। এই মাংস সংগ্রহ করার উদ্দেশ্যে ঈগল পুষত তারা। অনেক উঁচু অবধি আকাশে উড়ে পাহাড়ি শেয়াল, পাহাড়ি ছাগল, পাহাড়ি খরগোশ শিকার করে নিয়ে আসত। তার বদলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে দিতে হবে মাংসের ভাগ। এটাই চুক্তি।

পামির অঞ্চলে পাওয়া যায় সোনালি ডানার বিখ্যাত ঈগল। স্থানীয় ভাষায় নাম— কারাকুস। কেউ যদি ‘দুরন্ত ঈগল’ উপন্যাসটি পড়ে থাকেন তবে এই বিষয়টা আরও খোলসা হবে। এখন না আছে সেই যাযাবর জীবন, না আছে সেই সোনালি ঈগল। তারা এখন বিরল প্রজাতির। কিন্তু রয়ে গেছে সেই অভ্যেস, সেই সংস্কৃতি। যাপনে নয়, রোজগারে।

ঈগল হান্টিং

যাযাবরদের বংশধররা এখন শিকার করে খায় না কিন্তু ঈগল পুষে, তাকে দিয়ে শিকারের সেই খেলা দেখায় নানারকম। কোনওটাই যে খুব অত্যাচারের বা চাপের তা নয় কিন্তু একটা শিকারি পাখিকে পোষ মানিয়ে পুষে রাখার মতো অত্যাচার আর কী হয়! হাতে করে ঈগল নিয়ে খেলা দেখাল একটি ছেলে। ঈগলটির নাম কারাকুস। সে আবার ওই নামে ডাকলে সাড়াও দেয়। বয়স তার ২, ওজন ৫ কেজি। আমাদের এক্সাইটেড লাগছিল খুবই, একইসঙ্গে বেশ খারাপ লাগছিল। এটা বন্যপ্রাণ বিরোধী। কিন্তু সেইসঙ্গে এটাও ভাবছিলাম যে, ওদের রোজগারের অন্যতম একটা উপায় ওটাই। বড্ড যত্নও করে ওরা পাখিটাকে। রোজ এক কেজি করে মাংস খায় কারাকুস। খাওয়ার পরে যত্ন করে ঠোঁট মুছিয়ে দেওয়া হয় তার। কেবল পর্যটকদের সামনে চোখে বেঁধে রাখা হয় ‘তোমোগো’। গোরুর চামড়া দিয়ে তৈরি ঠুলি। যাতে অচেনা মানুষ দেখে সে খেপে না যায়।

কারাকুসের সঙ্গে

খানিকক্ষণ এভাবে খেলানোর পরে বের করে আনল আস্ত একটা খরগোশ। জ্যান্ত। ওটাকে ছেড়ে দেওয়া হবে মাঠে। আর উড়িয়ে দেওয়া হবে কারাকুসকে। লাইভ শিকার করে দেখাবে সে। আমরা হাঁ হাঁ করে উঠলাম। করতে হবে না শিকার, মারতে হবে না খরগোশটাকে।

মনটা খারাপই হয়ে গেল নতুন জিনিস দেখতে গিয়ে। এরকমটা হওয়ার কথা নয় একটা পাখির সঙ্গে। অথচ স্থানীয় যাযাবর সম্প্রদায়ের ওই মানুষগুলির রোজগারের বিকল্পই বা কী হতে পারে, জানি না।

০১.০৮.২০১৯
সকালে ঘুম ভেঙেই মনে পড়ল রূপকথার পাহাড়ে যাওয়ার দিন আজ। তাড়াতাড়ি তৈরি হয়ে বেরিয়ে পড়লাম। ব্রেকফাস্টও করিনি। এইজন্যই আগের রাতে ঘাঁটি গেড়েছিলাম স্কাজকা গ্রামে। কিরঘিজ ভাষায় ‘স্কাজকা’ শব্দের অর্থ রূপকথা।

অপূর্ব এক পথ পেরিয়ে পৌঁছলাম রূপকথার কোলে। এই পামির রিজিয়নের পাহাড়ের যা টেক্সচার, যা ফিচার, তার থেকে সম্পূর্ণ অন্যরকম একটা রহস্যময় চেহারা নিয়ে বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে বেড়ে উঠেছে এই রূপকথা। সাদা চোখে দেখলে আমাদের লালমাটির পাহাড়ের মতো। ছোটনাগপুর মালভূমির মতোই লাল কিন্তু মাটি নয়, পাথর আর বালি। আর রঙটাও কেমন সোনালি আর রাস্ট মেশানো। তাতে আবার সবুজ-কমলার কারুকাজ।

ফেয়ারিটেল মাউন্টেন

এই ফেয়ারিটেল মাউন্টেন নিয়ে ফ্যাসিনেশন তৈরির পেছনে রয়েছেন যে মানুষটি তাঁর নাম অ্যালবার্ট ড্রস। বিশ্ববিখ্যাত নেচার ফোটোগ্রাফার। নানা জায়গায় ঘুরে ঘুরে প্রকৃতির ছবি তোলেন। উনিই এক্সপ্লোর করেন কিরঘিজস্তানের এই অপূর্ব পাহাড়টা। তার আগে পাহাড়টা ছিল না তা নয়, তবে তা ছিল শুধুই স্থানীয় মানুষের উইকেন্ড ট্রিপ।

গোটা কিরঘিজস্তান দেশটাই আসলে ট্যুরিস্ট ও ট্র্যাভেলরদের কাছে অনাদৃত একটা জায়গা। কেউ আসেই না সেভাবে! বিদেশিরা যাও বা খুব অল্প সংখ্যায় আসেন, ভারতীয়রা তো নয়ই। সব জায়গাতেই অদ্ভুত বিস্ময়ের সম্মুখীন হচ্ছি আমরা। আর একটা মজার ব্যাপার, ইন্ডিয়া বলতে এখানে অনেকেই একজনকে চেনেন।

শাহরুখ নয়, সলমন নয়— তিনি মিঠুন চক্রবর্তী! ডিস্কো ডান্সার আর জিমি জিমি করে নেচে উঠছে এখানকার লোকজন!

০২.০৮.২০১৯

আমাদের গন্তব্য ছিল সং কুল। কুল মানে লেক, আগেই বলেছি। প্রায় তিন হাজার মিটার উচ্চতায় অসংখ্য পাহাড় দিয়ে ঘেরা এক তেপান্তরের মাঠ। সেই মাঠের কোলে নীল জলের বিশাল এক হ্রদ।মাঠের মাঝে ইয়র্টে (ছোট ছোট সাদা তাঁবু) থাকা। মাঠ পেরিয়ে লেকে পৌঁছনো অসম্ভব ব্যাপার একরকম। মাঠ মাঠ বলছি বটে, তবে তার আগে কিন্তু তেপান্তর কথাটাও বলেছি। এই মাঠে ইচ্ছে করলেই হারিয়ে যেতে পারে যে কেউ। এক মাথায় হারালে, আর এক মাথায় খবর পৌঁছবে না।

সং কুলের প্রান্তে

শহর ছাড়ার পর থেকেই মুগ্ধতা শুরু। দিগন্তবিস্তৃত সবুজ গিয়ে চুমু খেয়েছে পাথুরে পাহাড়ের পায়ে। পাহাড় আর গাছের সাজে এমন অপরূপ পথ কমই দেখেছি আগে।

প্রথমে অনেকটাই ঝকঝকে কালো রাস্তা নাগাড়ে চলেছে। তবে পাশের পাহাড়গুলোর ফিচার ক্ষণে ক্ষণে বদলাচ্ছে। এই এখুনি কমলা পাথরের ধূধূ পাহাড়, তো এই সবুজ তেকোনা গাছে মোড়া সুইজারল্যান্ড। কখনও আবার নিপাট চাষখেতে চরে বেড়াচ্ছে গোরু-ঘোড়া-ভেড়া। কোথাও আবার সবুজ বুগিয়ালে ম্যাজিকের মতো ভেসে বেড়াচ্ছে রোদ-ছায়া।

পথের প্রান্তে, দেশের পতাকা নিয়ে

এক জার্মান কাপেলের সঙ্গে দেখা। দু’জনে দুটো কে টি এম বাইক নিয়ে এসেছেন। নিজেদের বাইক, জার্মানি থেকে উড়িয়ে এনেছে্ন। তাই নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন কিরঘিজস্তান, তাজিকিস্তান,উজবেকিস্তান, রাশিয়া। বয়স ৫৪-৫৫। ওঁদের ধুলো উড়িয়ে চলে যাওয়া দেখে ভাবি, এমনও জীবন হয়, এমনও স্বপ্ন হয়। এমনও হয় বেঁচে থাকা। এমন করেও ‘সংসার’ করে দুই প্রিয় মানুষ।
সং কুলে ওঠার শেষের দিকে প্রাণান্তকর চড়াই। থেকে থেকে গরম হয়ে যাচ্ছে গাড়ির ইঞ্জিন। আর পথভর্তি অসংখ্য পাথর। বাইকের চাকা বসে যাচ্ছে প্রায়। ঠেলে তুলতে হচ্ছে। একসময় আমি আর রূপাদি নেমে গেলাম। ওই পথে ডাবল ক্যারি করে বাইক তোলা অসম্ভব। তাই আমরা হেঁটে হেঁটে এগোতে লাগলাম। প্রদীপদা আর বাদলদা সাবধানে চালিয়ে আসতে লাগল।

হাঁটতে হাঁটতে শব্দ পেয়ে দেখি, একটা গাড়ি চালিয়ে আসছে একটা মেয়ে। সং কুলেই যাবে। লিফ্‌ট নিলাম আমি আর রূপাদি। মেয়ের নাম মার্রা। সে-ও জার্মান। বয়স বড় জোর ২৭-২৮ হবে। একা বেরিয়ে পড়েছে কিরঘিজস্তান ঘুরতে। এসে গাড়ি ভাড়া করেছে, রওনা দিয়েছে নিজের খুশিতে। গাড়িতে রাখা ছোট্ট টেন্ট, স্লিপিং ব্যাগ। যখন যেখানে ইচ্ছে রাত্রিবাস। যেমন ইচ্ছে যাওয়া।

কতটা সাহস, স্বপ্ন, মনের জোর থাকলে এভাবে একা বেরিয়ে পড়া যায়! ও পেশায় পেডিয়াট্রিক নার্স। সারা বছর কাজ করে, টাকা জমায়। তারপর একবার সময় করে বেরিয়ে পড়ে এক একটা দেশ। চিন, পেরু,অস্ট্রিয়া হয়ে গেছে। কিরঘিজস্তান হল। ভারতেও আসবে কোনও একদিন। নম্বর দিয়ে এসেছি। ভারতে এলে আমায় সঙ্গে করে ঘুরতে বলেছি।

সং কুলের সকাল

সং কুল আমরা যখন পৌঁছলাম, আচমকা মেঘ করে তুমুল ঠান্ডা নেমে এল চারপাশে। এখানে মেঘ বড় অদ্ভুত। এমনভাবে ঘনিয়ে আসে, দেখে মনে হয় এই বুঝি প্রলয় নেমে আসবে। কিন্তু কিছু পরেই সে মেঘের আড়াল সরিয়ে যখন সূর্য ওঠে তখন মনে হয় মেঘ-শীত বলে কিছু ছিলই না পৃথিবীতে!কালও তাই হল। মেঘ আর হাওয়ার দাপটে অস্থির হয়ে সং কুল পৌঁছেই কোনওরকমে হাতের সামনে একটা ইয়র্টে ঢুকে পড়লাম আমরা। তাড়াতাড়ি ফেদার চাপাতে হল গায়ে। খিদে পেয়েছিল খুব। খেতে চাইলাম, ‘বিশফেরমাক’ দিল। নুডুল্‌স আর মাংসর ঘ্যাঁট। তার খানিক পরেই ফের ঝকঝকে রোদ উঠে গেল। আমরা তেপান্তরে ঘুরতে বেরোলাম দলবেঁধে। কিন্তু হেঁটে শেষ করা গেল না সেই বিশাল প্রান্তর। এই করেই আটটা বেজে গেল প্রায়, আর ঠিক তখন ‘‘সুর্য যখন অস্তে চলে ঢুলি, মেঘে মেঘে আকাশ কুসুম তুলি…’’ অপূর্ব মায়াবি এক আলো উপহার পেলাম আমরা। সঙ্গে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে চুঁইয়ে পড়া একচিলতে রামধনু।

সবুজ বুগিয়াল

ফিরে এসে ডিনার সেরে নিলাম ঝটপট। জাঁকিয়ে ঠান্ডা পড়েছে সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে।
কারেন্ট নেই, নেটওয়ার্কও নেই। আমাদের কোনও কাজও নেই। গুটিসুটি ঢুকে পড়লাম ইয়র্টের ভেতরে পেতে রাখা ম্যাট্রেস-রেজাইয়ের স্তূপের মধ্যে।

০৩.০৮.২০১৯

সং কুলের মায়া কাটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম সকালে। অসম্ভব ঠান্ডা। বাইকের সিটের ওপর বরফ জমে রয়েছে। অনেক বাবা-বাছা করে স্টার্ট করানো হল তাদের।

বিকেলে একরকম বিস্ময় নিয়ে পৌঁছেছিলাম সং কুল। সকালের নরম আলোয় সে যেন আরও নেশাতুর। আবছা কুয়াশার সঙ্গে সূর্যের প্রথম রশ্মি মিশে সবুজ প্রান্তরে চরে বেড়ানো ঘোড়াদের পিঠ বেয়ে চুঁইয়ে পড়লে যে তা কতটা সুন্দর লাগে তা ওই সকালেই জানলাম।

আঁকাবাঁকা পথে

রাস্তা এ দিন বেশ খারাপ। কখনও রুক্ষ পাহাড়ি পথ, কখনও আবার আচমকা সবুজের সঙ্গে মুখোমুখি ধাক্কা। আর এসবের মধ্যে অসংখ্য মাউন্টেন পাস। মানে এই উঠছি গাঁকগাঁক করে আবার এই নামছি হুড়মুড়িয়ে। ছোট-বড় মিলিয়ে কত যে পাস পেরোতে হয়েছে, তার ইয়ত্তা নেই।

এ দিনের যাত্রা শুরু করার ঘণ্টাখানেক পর থেকে নারিন নদী এসে চাকায় জড়িয়ে গেল। প্রায় গোটা পথটাই নদী ঘেঁষে ঘেঁষে ছোটা। কখনও উঁচু, কখনও বা নিচু। জায়গাটাকে বলা হয় নারিন প্রভিন্স।পাহাড়ের কন্দর দিয়ে একের পর এক পাস পেরিয়ে চলা।সন্ধে হওয়ার মুখে ঢোকা গেল কাজারমান। ছোট্ট এক পাহাড়ি শহর। অন্ধকার নামলেই শান্ত পাড়া।

০৪.০৮.২০১৯

কাজারমান থেকে ওশের রাস্তা দীর্ঘ। অনেকটাই ভালো। শুরু করার কিছুক্ষণের মধ্যেই এক জায়গায় মৌমাছির চাষ চোখে পড়ল। সারি সারি রঙিন বাক্স বসানো। এই প্রথম নয় অবশ্য। কিরঘিজস্তানের পাহাড়ি এলাকায় আরও অনেক দেখেছি এই মৌ-চাষ। তবে এটা অনেক বড় ছিল। নেমে আড্ডা জমানো হল। সেই দুর্বোধ্য ভাষা। আমি তো আবার কিছু বুঝতে না পারলে বাংলায় চলে যাই…!

চাকভাঙা মধু খেতে দিল। ঘুরিয়ে দেখাল মৌমাছিদের সংসার। মধু কেমন করে বের করা হয় মৌচাক থেকে, সেটাও দেখাল। জানাল, মধু বের করে নেওয়ার পরে পড়ে থাকা প্যারাফিন এক এক কেজি ছ’ডলারে বিক্রি হয়। ইন্ডিয়া শুনেই খানিক ‘জিমি জিমি’ হল আবার।

এ যেন সুইৎজারল্যান্ড!

এ দিনের রুটে অনেক সবুজ ছিল। মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল কাশ্মীরে চলে এসেছি। ওশ পৌঁছনোর কিছুক্ষণ আগে লাঞ্চ সারা হল রাস্তার ধারে। ওশ পৌঁছতে পৌঁছতে সন্ধে। হোটেলে ঢুকতে ঢুকতে রাত।

০৫.০৮.২০১৯

ওশ শহরের প্রান্ত বাবরের একটা স্মারক আছে। বেরিয়ে পড়লাম তাই দেখতে। বাবর এসে থেকেছিলেন ওশের একটা পাহাড়ের চুড়োয়। সেই নিয়েই স্মারক আর কি। এমনি কিছুই না, উঁচু থেকে শহরটা দেখা যায়। আর একটা মিউজিয়াম মতো আছে। দেখে আসা হল সিঁড়ি ভেঙে ভেঙে।

নামার সময়ে প্রচণ্ড রোদে-গরমে ক্লান্ত। এখানে পানীয় জল পাওয়া মহা মুশকিল। এদের তেষ্টা মেটায় গরমে ফলের রস আর শীতে চা। ব্যস। জলটি এরা খায় না। কেউ যে খেতে পারে, তাও জানে না। জল চাইলে বড়জোর সোডা মেলে। তো যাই হোক, পাহাড়ের একটা ছোট দোকানে জল বোঝাচ্ছি প্রাণপণ। তখনও আমার শেখা হয়নি, জল মানে সু। শেষমেশ স্থানীয় কোল্ড ড্রিঙ্ক পাওয়া গেল। হার্বস দেওয়া আইস টি টাইপের কিছু একটা।

পামির হাইওয়ে

এই দিন প্রথম পামির হাইওয়ে ধরলাম আমরা। যাত্রা শুরু আসল পামিরের দিকে। রাস্তা অত্যন্ত সুন্দর। তেমনি চোখভরানো সৌন্দর্য। পাহাড়ের এতরকম বৈচিত্র্য, ভাবা যায় না। এমনিতে পামির মালভূমির কোর এরিয়া খুবই রুক্ষ। কিন্তু আশপাশটা অসম্ভব সবুজ।

বেরোতে অনেক দেরি হলেও, একরকম শাপে বর হল আমাদের। আগেই বলেছি, এখানে সূর্য অস্ত যায় রাত সাড়ে আটটা-ন’টা। ফলে আমরা সারিমোগুল পৌঁছনোর আগে পুরো বিকেলের আলোটা পেলাম। পাহাড়গুলোকে যেন সাজিয়ে দিল সেই অনন্য আলোর রশ্মি, যে আলোয় শুধু কনেকে নয়, সারাপৃথিবীকেই ‘কনে’-র মতো সুন্দর দেখায়।

সারিমোগুল ঢোকার আগেই দেখা দিল লেনিন পিক। পামিরের অন্যতম উচ্চ শৃঙ্গ। বিকেলের রাঙা আলোয় মোহময়ী রূপ তার। এখানে সুয্যিমামার আশ্চর্য এক চরিত্র। সারাদিন হাঁই হাঁই করে জ্বলেন তিনি। আর পাটে বসার সময়ে আচমকা ঠান্ডা ঢেলে দেন পাহাড়চুড়োয়।

পথের শেষ নেই

সারিমোগুলেও ব্যতিক্রম হল না। আমরা পৌঁছলাম যখন, আটটা বাজে। মলিন আলো আর কড়া শীতের সমাহারে জমে উঠেছে মালভূমির সন্ধে। তিলেক গেস্ট হাউসে ঢুকে জবুথবু আশ্রয় ফেদারে। তারপর ডিনার, তারপর ঘুম।

০৬.০৮.২০১৯

সকাল সকাল বেরিয়ে পড়া হল পামিরের উদ্দেশে। এই দিনই বর্ডার পেরিয়ে তাজিকিস্তান ঢুকেছি আমরা।

এখানে একটা কথা বলি। পামির মালভূমি কিন্তু পৃথিবীর ছাদ নয়, একে ‘বলা হয়’ পৃথিবীর ছাদ। এটা পামিরের ভৌগোলিক উপাধি। তাই বিশাল খোলা ছাদের মতো কিছু দেখতে পাওয়া যাবে, এমনটা নয়। সুবিস্তীর্ণ জায়গা জুড়ে রাজত্ব করা এই মালভূমি আদতে কোনও পর্বতমালার চেয়ে কম নয়। কী উচ্চতায়, কী বিস্তারে, এ অনায়াসে পাল্লা দেবে হিমালয়ের সঙ্গে।

পামির মালভূমির মূল আকর্ষণ হল পামির নট। পামির গ্রন্থি। একটা নির্দিষ্ট পয়েন্ট থেকে শুরু হয়েছে একাধিক পর্বতমালার রেঞ্জ। হিমালয়, তিয়েনশান, কারাকোরাম, কুনলুন, সুলেমান, হিন্দুরাজ এবং হিন্দুকুশ পর্বতমালার উৎপত্তি এই পামির থেকেই। যদিও এই বিষয়টা দেখা বা বোঝা যায় না সামনে থেকে। স্যাটেলাইট ইমেজে ধরা পড়ে এই ছবি।

পামিরের বেশিরভাগটাই পড়েছে তাজিকিস্তানের গোরনো-বাদাখশান আর আফগানিস্তানের বাদাখশান প্রদেশে। এর উত্তর ভাগের তিয়েনশান পর্বতমালার অংশ পড়েছে কিরঘিজস্তানের আলাই ভ্যালিতে। দক্ষিণ ভাগে হিন্দুকুশের অংশ। সেটা পড়েছে ওয়াখান করিডোরে, যার বেশিরভাগই পেয়েছে আফগানিস্তান। তবে সামান্য অংশ পাকিস্তানেও পড়েছে। আমরা যে মুরঘেব এ দিন পৌঁছব— সেই মুরঘেবেই রয়েছে পামির নট।

সারিমোগুল থেকে বেরোনোর খানিক পরেই পথের সামনে এসে দাঁড়াল তিনটি বাচ্চা, একটি গাধা এবং একটি কুকুর। তাদের দাবি, পাশেই তাদের ইয়র্ট। সেখানে চা খেতে যাই যদি একটু…। এরা আদতে যাযাবর। পশুপালন করে। সঞ্চয় করে শীতের জন্য। ডাক ফেরানো গেল না। চললাম পিছু পিছু। আড়ম্বরহীন অথচ আন্তরিক ছোট্ট এক সংসার। বাচ্চাগুলির মধ্যে যেটি একটু বড়, সে-ই বাড়ির বড়মেয়ে। বিষাদে আর চিন্তায় আচ্ছন্ন অথচ অপরূপ মিষ্টি এক মুখ তার। এই বয়সেই যেন বড্ড দায়িত্ব নিয়ে ফেলেছে সে। উচ্ছলতা পার করে বারবার চোখ কাড়ছে তার ছোট্ট, ক্লিষ্ট মুখ।

পরিবারের খুদে সদস্যরা

পাঁউরুটি, ঘরে বানানো পাতলা মাখন আর চা খেতে হল। আর গল্প হল দেদার। এ গল্পে ভাষার দূরত্ব ফিকে। এটা চাই বা ওটা দাও বোঝাতে ভাষা একটা কঠিন চ্যালেঞ্জ হলেও ভালোবাসা বোঝাতে আর বুঝতে গেলে মোটেও নির্দিষ্ট কোনও ভাষা জানতে হয় না এখনও পর্যন্ত।

এর পরে যে পর্বটার মুখোমুখি হলাম সেই পর্বে অবশ্য ভালোবেসে সীমান্ত পেরোনো গেল না। এক বাজে অফিসারের পাল্লায় পড়ে গেলাম কিরঘিজ বর্ডারে। আমাদের সমস্ত কাগজপত্র ঠিকঠাক থাকার পরেও বলা হল একটা গাড়ির কাগজে নাকি কীসব ভুল আছে। মুশকিল হচ্ছে, কী ভুল সেটা বুঝছি না, সবই রাশিয়ান ভাষায় লেখা। উনি কী বলছেন সেটাও বুঝছি না ভালো করে। ফোনে নেটওয়ার্ক নেই বর্ডার এলাকায়। তবু অতিকষ্টে একটা কল করা হল ডেনিসকে, যে আমাদের গাড়ির সব কাগজ রেডি করে দিয়েছিল। ডেনিসের সঙ্গে অফিসারের কথাও বলানো হল। কিন্তু সমস্যার সমাধান হল না।
আমাদের উনি বললেন, তোমরা ফিরে যাও।

একটা সময় পরে বোঝা গেল— উনি ঘুষ খাবেন। আমরা যতরকম যুক্তিই দিই না কেন, উনি ঘুষ না খেয়ে ক্লিয়ারেন্স দেবেন না। কিরঘিজ বর্ডারে যে এই সমস্যা আছে তা আমরা আগেই পড়েছিলাম কিছু ব্লগে। তাই সতর্কও ছিলাম। কিন্তু এভাবে সরাসরি বাধা পাব, বুঝিনি। ঘুষ দিতে হল অনেকটা। মনমেজাজ খুবই তেতো হয়ে গেল। অতগুলো টাকার জন্য তো বটেই, তার ওপর অসহায়ভাবে অন্যায়কে সমর্থন করার জন্যও। নাও দিতে পারতাম ঘুষ। কিন্তু তা হলে এখানেই এক্সপিডিশন শেষ করতে হত।পামির আর ছোঁয়া হত না।

কিরঘিজ বর্ডার পেরিয়ে নো ম্যানস ল্যান্ড, তারপর তাজিকিস্তানে ঢোকার বর্ডার। এই বর্ডারের অভিজ্ঞতা আবার একদম আলাদা। হাশিখুশি এবং উষ্ণ অভ্যর্থনা। ইন্ডিয়ান শুনে বাড়তি অভ্যর্থনা। মিঠুন চক্রবর্তীর নাম নিয়ে একদফা নাচ-গানই হয়ে গেল প্রায়।

নির্বিঘ্নে ঢুকে পড়লাম তাজিকিস্তান। আর তারপরেই ম্যাজিকের মতো বদলে গেল পাহাড়ের ফিচার।সবুজ কমে এল, ঢেউ মিলিয়ে গেল। রুক্ষ, কমলা, ধারালো পাহাড়ের রাজ্যে পৌঁছে গেলাম আমরা। পাস পেরোতে হল দুটো। বেশ উঁচু উঁচু পাস। সেই সঙ্গে রাস্তাও বেশ খারাপ। শেষের দিকটা পথ যেন আর শেষই হয় না।

পথের ধারে

ঝপ করে অন্ধকার নেমে গেল একসময়। ঘড়িতে তখন ন’টা। আমরা মুরঘেব ঢুকলাম শীতে আর অন্ধকারে পথ ভুল করা কুকুরছানার মতো। ছোট্ট একটুকু জায়গা। হাতেগোনে ক’টা বাড়িঘর। কনকনে হাওয়া। বেশি খোঁজাখুঁজি না করে একটা হোম স্টে-তে ঢুকে পড়া গেল।

খানিক পরে এসে পৌঁছল ডিমভাজা, সসেজ ভাজা আর একথালা টোম্যাটো-পেঁয়াজ ভাজা। খিদেপেটে আর ঘুমচোখে সবই অমৃত। খেয়েদেয়ে কনকনে ঠান্ডা বিছানাগুলো গরম করতে ঢুকে পড়া হল চুপচাপ।

০৭.০৮.২০১৯

হাড়কাঁপানো ঠান্ডা। লেপের তলায় ঘুমভাঙা আহ্লাদে ঝপাং করে শীতের ঝাপটা লাগল ঘর থেকে বেরোতেই। উঠেই প্রতিদিনের মতো রেডি হওয়া, যেটা সব চেয়ে অসহ্য কাজ।

মুরঘেব খুব ছোট্ট শহর। মানে শহর বলে আর কি। আমাদের শহরের সংজ্ঞার তুলনায় এ নিতান্তই কয়েকটি বাড়িঘর ছাড়া কিছু নয়। এই মুরঘেবই আসল ‘পামির নট’। কিন্তু ওই যে, আগেই বললাম, সবটাই এত বিশাল যে পড়া ও জানা জিনিসগুলো চোখের সামনে ছবির মতো দেখা যায় না মোটেই।

আগের দিন মুরঘেব ঢুকতে অন্ধকার হয়ে গেছিল। ভালো করে কিছু বোঝা যায়নি। সকালে দু’চোখ ভরে দেখলাম— চতুর্দিকে পাহাড়ে ঘেরা একটুকরো গালিচার মতো উজ্জ্বল এক ‘শহর’।

যাই হোক, ব্রেকফাস্টে স্যুপ এল। কিন্তু তাতে এত বাঁধাকপি যে একটু জিরে-আদা বেটে দিলেই দিব্যি বাঁধাকপির তরকারি হয়ে যেত। খেয়েদেয়ে বেরোনো হল। তেল ভরা হল। মেশিন নেই, ড্রাম থেকে প্লাস্টিকের বোতলে করে তুলে ট্যাঙ্কে ভরা।

শনশন হাওয়া আর কনকন ঠান্ডায় চললাম এগিয়ে। রাস্তা খুব খারাপ নয়। আর ঠান্ডায় এমনি একটু জবুথবু লাগলেও রাইডিংয়ের জন্য তা রোদের থেকে বেটার অপশন। ক্লান্তি অনেক কম হয়।

পথের বাঁকে

পথের দু’পাশে ধূধূ প্রান্তর পেরিয়ে পাহাড়ের প্রহরা। মাঝে মাঝে ছোট ছোট অ্যালপাইন লেকে এসে জমেছে পৃথিবীর সমস্ত নীল রং। কখনও কখনও বেঁটে বেঁটে সাদা বাড়ি। ঝকঝকে আকাশে ফ্যাটফ্যাট করে ভাসছে ক্যান্ডিফ্লস মেঘ। এসবের মধ্যে দিয়ে নিজের মতো বয়ে গেছে পামির হাইওয়ে। পামিরস্কায়া। ‘স্কায়া’ মানে সড়ক। সেই স্বপ্নের সড়কে ছুটছি আমরা। এ পথ আসলে ছুটে পেরোনোর নয়। এ পথ হেঁটে, গড়িয়ে, থেমে পার করার পথ। এক দিকে তাকিয়ে অন্য দিকের সৌন্দর্য মিস করে ফেলার মতো এমন দুর্ভাগ্য আর কী হয়! কিন্তু টাকা, সময় আর স্বপ্নের মেলবন্ধন ঘটাতে গেলে এ ছাড়া আর উপায় কই! খানিক পরে এক জায়গায় থামা হল। নদীর পাশে, সবুজ মাঠ। পথের ধারে অনেক লরি দাঁড়িয়ে সেখানে। পাশেই একটা বেঁটে বাড়িতে চায়ের দোকান। বোঝা গেল, লরিচালকেরা সেখানেই ব্রেক নেন। ঢুকে পড়লাম আমরাও। ছোট ছোট টেবিল ঘিরে মাটিতে বসে সকলে, আর পাতে রাখা— মাছভাজা!

পাতে পড়ল মাছভাজা

এতদিন ধরে শুধু পাঁউরুটি-ডিম-সসেজ-মিট খাওয়া মুখের সামনে গরম গরম এবং কুড়কুড়ে ট্রাউট মাছ ভাজা! এর পরে কী হল সেটা বলাই বাহুল্য। সেইসঙ্গে দুর্বোধ্য ভাষায় আড্ডাও হল লরিচালকদের সঙ্গে। তাঁরা খুবই উত্তেজিত হয়ে নানা প্রশ্ন করছেন, আমি নির্বিকার বাংলায় উত্তর দিয়ে যাচ্ছি।

আড্ডা-খাওয়া সেরে ফের চলা, ফের থামা। একগাদা কচিকাঁচা খেলছে গ্রামের ধারে, রাস্তায়। এখানে তো থামতেই হয়। অবাক বিস্ময়ে আমাদের দেখে-টেখে কে একজন ছুটে গিয়ে খবর দিল, পাশেই একটা বাড়িতে। দু-চারজন বেরিয়ে এসে ডাকাডাকি করতে লাগলেন আমাদের। চা খাওয়ার ডাক। বাড়িভর্তি লোকজন, গোটা একটা যৌথ পরিবারের বাস। চৌকিতে বসিয়ে, দস্তরিখানা (যে কাপড় পেতে তার ওপর খেতে দেওয়া হয়) পেতে চা, কফি, পাঁউরুটি, দই, মাখন, লজেন্স… এসব চলে এল। খাওয়ার আগে আমরা একটু জল খেতে চাই, সে আর বোঝাতে পারি না। একটি মেয়ে বেরিয়ে এল, সে কলেজে পড়ছে দুশনবে-তে। ইংরেজি বোঝে। জল এনে দিল। সে পড়াশোনা শেষ করে পুলিশ হতে চায়। তার চেহারায় ও হাবেভাবে ভবিষ্যতের পুলিশের স্পষ্ট ছাপ থাকলেও অমন ভুবনভোলানো হাসি নিয়ে যে সে কী করবে তা আমি ভেবে পাচ্ছি না।

অচেনা কিন্তু খুব চেনা পরিবার

মনে মনে প্রাণভরা শুভেচ্ছা জানিয়ে এলাম রুগেয়াকে। প্রত্যন্ত পামিরের একচিলতে গ্রামের, রক্ষণশীল মুসলিম পরিবারের মেয়ে হয়ে যে দেশের প্রশাসন সামলানোর স্বপ্ন পোষে তাকে আর কী-ই বা দেওয়ার আছে আমাদের মতো এক দিনের অতিথিদের! পথ পথের মতো এগিয়ে যায়। মুহূর্তরা মুহূর্তের মতো বয়ে যায়। তার মাঝেই আমরা একটু একটু করে জমাই এসব নুড়ি-বালি। স্বচ্ছ নুড়ি চোখের তারায় তুলে ধরে দেখি দুনিয়ার অন্য প্রান্ত। হাসি-কান্না- কষ্ট-প্রেম— সব যেন একটা আয়নার সামনে দাঁড়ায়। আমার মতোই সব। একই। অবিকল। অবিচল। খোরোগ পৌঁছনোর আগের পথটুকু বড্ড সুন্দর। সবুজ। একটা নদীও পড়ে শহরে ঢোকার আগে। বিকেলের মুখে মুখে খোরোগ পৌঁছলাম। বড্ড গরম। ০৮.০৮.২০১৯ এই দিন গন্তব্য কলাইখুম। রাস্তার দূরত্ব কম। কিন্তু সে রাস্তা খুবই খারাপ। ‘কত আর খারাপ হবে’, এই ভেবে বেরোতে একটু বেলাই হল আমাদের। ক্লান্তিও ছিল সকলেরই। কিন্তু তখনও জানতাম না, এই রাস্তা আদতেই কতটা খারাপ হতে পারে যে ওইটুকু দূরত্ব পেরোতে আমাদের এত ভুগতে হবে। রাস্তা অসম্ভব খারাপ। ২০ থেকে বড় জোর ৩০, এর বেশি আর স্পিডই উঠছে না গাড়ির! খানিকটা অ্যাসফল্ট রাস্তা পেলেও, কয়েক মিটারেই শেষ। এই দিনের গোটা পথটাই আফগানিস্তানের গা ঘেঁষে। মাঝে রয়েছে কেবল ‘আমু দরিয়া’ নদী। খোরোগ পর্যন্ত এই নদীর নামই গুন্ট নদী। খোরোগের পর থেকে নাম বদলেছে। পাঞ্জ। পামির নদীও বলা হয় একে। ‘আমু দরিয়া’ নামটা আফগান নাম। নদীটা চওড়ায় কোথাও ১০ মিটার তো কোথাও ৫০ মিটার আর স্রোতের বেগ তীব্র। জুলাই-আগস্টেই এত জল থাকে। শীতে কমে এবং জমে যায়। তো সেই নদীকে বাঁহাতে রেখে আমাদের এ দিনের পথ চলা। নদীর ওপারেই চাষজমি, বাড়ি, রাস্তা, গাছ, মানুষ, ঘোড়া আফগানিস্তানের। ব্রিজও আছে নদীর ওপর। আর্মি বা চেকপোস্ট সেভাবে চোখে পড়ে না। বরং চোখে পড়ে, পামির হাইডেল প্রোজেক্টের বিদ্যুতের তার ওপারে পৌঁছে যাচ্ছে। এটা সম্ভবত ‘গর্ন বাদাখশান’-এর নিজস্ব চুক্তি।

এপারে-ওপারে ঢিল ছুড়ে

এখনকার আফগানিস্তানের একটি প্রদেশ এবং তাজিকিস্তানের দক্ষিণ-পূর্ব অংশের প্রদেশগুলি নিয়ে এই গর্ন বাদাখশান নামের স্বায়ত্তশাসিত এলাকা গঠিত। এখানকার শাসন ও বিচারব্যবস্থা এখনও বাকি রাষ্ট্রের কাঠামোর সঙ্গে খাপ খায় না। এটা বিচ্ছিন্ন এবং স্বতন্ত্র। আলাদা করে কখনও বাদাখশান এক্সপ্লোর করার সুযোগ পেলে প্রচুর মণিমুক্তো মিলবে বলে বিশ্বাস আমার। আরও খানিকটা চলার পরে, প্রায় রাত ন’টা হবে, আচমকাই একটা সাইনবোর্ড চোখে পড়ল। হোম স্টে আছে। রাস্তা থেকে বাঁদিকে নেমে গেছে উঠোনের মতো। গাড়ির আলো দেখে, শব্দ শুনে একটি ছেলেও এগিয়ে এল। রুম ঠিক করা হল সঙ্গে সঙ্গে। কলাইখুম জনপদে পৌঁছনোর পাঁচ কিলোমিটার আগেই থেকে গেলাম। আমাদের দেহাতি বাড়ির মতো একটা ব্যাপার। একপ্রান্তে খান কয়েক ঘর, ঘরের বাইরে টয়লেট। অনেকটা হেঁটে এসে বিশাল এক খোলা দাওয়া, তাতে খাট পাতা বড় বড়। সেখানেই খাওয়ার ব্যবস্থা। খাটগুলো তিন দিক ঘেরা এক-দেড় ফুট উঁচু করে। সেখানে তাকিয়া রাখা। মাথার ওপর ঝুপুড় হয়ে রয়েছে আপেল গাছ। হাত বাড়ালেই পেড়ে খাওয়া যায়। খাব কী, তার আগেই চোখ জুড়িয়ে আসে ক্লান্তিতে, আরামে, হাওয়ায়। আফগান হাওয়া আমু দরিয়া পার করে এসে ছুঁয়ে দিচ্ছে আমাদের। বারবার। জলের-হাওয়ার পাসপোর্ট লাগে না এখনও, কী আশ্চর্য! ০৯.০৮.২০১৯ ভোর ভোর উঠেই পড়লাম সবাই। এ দিনের পথও ছিল দীর্ঘ। অনেকটা দীর্ঘ। তাই আগে বেরোনোই ভালো। তার ওপর গতদিনের অভিজ্ঞতা ভালো ছিল না। পৌঁছতে দেরি হয়ে যাচ্ছিল। সব দিক ভেবে বেরিয়ে পড়া হল বেশ ভোরে। ব্রেকফাস্ট করারও সুযোগ হয়নি। খুব খারাপ রাস্তায় ঘণ্টাখানেক চালিয়ে, মেটাল রোড পাওয়া গেল অবশেষে। এতদিন যে পথে চালিয়েছি সেই তুলনায় এই পথ যেন কালো মাখনের মতো। মসৃণ, নির্বিবাদী, সোজা। আগেই জানতাম রাস্তা ভালো থাকবে, সেজন্যই ৪০০ কিলোমিটারের পথ এক দিনে পার করা হবে বলে আগে থেকেই ঠিক করা হয়েছিল।

এ দিন একটা অ্যাক্সিডেন্টের মুখোমুখি হলাম আমরা। রাস্তার পাশে ছোট খাত কাটা জল যাওয়ার জন্য, সেখানে পড়ে গেল চলন্ত চাকা। প্রায় ৯০ গতিতে। প্রচণ্ড ক্লান্তিতে মুহূর্তের ভগ্নাংশে হয়তো নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল চোখের পাতা। আর সেই ভুলেরই মাশুল দিতে হল। পাহাড়ে যেমন হয়। পড়ে গিয়ে ১৫-২০ ফুট ছেঁচড়ে বাইকটা থামল ওই ড্রেনেই, যেটা রাস্তার পাশ দিয়ে চলেছে। আমরাও ততটা ছেঁচড়ে গিয়ে ডানদিকের পাথুরে অংশে ছিটকে পড়লাম। রক্তাক্ত। আড়ষ্ট। সামনে একটা লোকাল গাড়ি দাঁড়িয়ে ছিল, ছুটে এলেন সবাই।
এত দিনের এত খারাপ পথ পার করে এসে, এত দুর্গমকে ঠিকঠাক নেগোশিয়েট করে এসে, সহজতম,মসৃণতম পথে ভুল হয়ে গেল আমাদের। বাদলদার হাতের জয়েন্টে একটা ফ্র্যাকচার হল, আমার পা কেটেকুটে বড় ক্ষত।

বাঁকে বাঁকে ধরা দেয় নতুন পাত

পরে ভেবে দেখেছি, এত বড় অভিযানের নিরিখে দেখলে এটা অল্পের ওপর দিয়েই গেছে বলা যায়। যাঁরা লং রুটে বা পাহাড়ে বাইক চালান তাঁরা জানেন, একটানা মসৃণ রাস্তা অনেক সময়েই মনোযোগের বিঘ্ন ঘটায়। ক্লান্তি আসে। খারাপ রাস্তায় বরং নার্ভ অনেক বেশি সতর্ক থাকে। যাই হোক, ওই অবস্থাতেই চললাম আমরা। আরও ৩০০ কিলোমিটার বাকি তখনও। রাস্তা যদিও খুব ভালো। শেষমেশ বিকেল বিকেল দুশনবে পৌঁছে গেলাম। দুশনবে ঢোকার আগে বেশ অনেকটা রাস্তা অসম্ভব সুন্দর। একটা লেকও পড়ে বিশাল। কিন্তু বলাই বাহুল্য, তখন আর আমরা ঠিক সুন্দরগুলো এনজয় করতে পারছি না আর কি। কতক্ষণে পৌঁছব, সেটাই চিন্তা। একটা হস্টেলে গিয়ে ওঠা হল। খেলাম। ওষুধ খেলাম। ঘুমোলাম। পরের দিন ওখানেই বিশ্রাম। ১১.০৮.২০১৯ প্রদীপদা এর আগে আমায় অনেকবার বলেছে কথায় কথায়, বা বলা উচিত শিখিয়েছে— ‘‘ধর তোরা দারুণ একটা পিক ক্লাইম্ব করে এলি কিন্তু তোর টিমের কারও একটা বড় ইনজুরি হয়ে গেল। তা হলে কি সেটাকে সফল সামিট বলা যায়? বা ধর, তোরা পিক ছোঁয়ার কয়েকশো মিটার আগে নেমে এলি প্রতিটা মেম্বারকে সুস্থ নিয়ে। তা হলে কি সেই এক্সপিডিশনকে ব্যর্থ বলা যায়? সাকসেসের সংজ্ঞা কে ঠিক করে দেবে? উচ্চতা, না জীবন? অথচ দ্যাখ, খাতায়-কলমে প্রথম অভিযানটা ‘সাকসেসফুল’ লেখা হবে আর দ্বিতীয়টা ‘আনসাকসেসফুল’। কিন্তু আমি মনে করি একটা অভিযানের শেষে যখন সকলে সুস্থভাবে ফিরে আসে, সেটার চেয়ে বড় সাফল্য আর কিছু হয় না।’’

এই সুস্থতা আর সাফল্যের প্রত্যাশা খানিকটা ভেঙেচুরে দিয়েছে গতদিনের অ্যাক্সিডেন্ট। প্রদীপদা মেনেই নিতে পারছে না, এরকম একটা কাণ্ড ঘটে গেল এক্সপিডিশনে। পরে যাতে আর কোনও অসুবিধা না হয়, সেই সতর্কতার লাল ফিতেই আরও টান টান করে বেঁধে নিলাম সকলে।

প্রকৃতির রঙে

অনেকটা ভোরে বেরিয়ে পড়লাম আমরা। এ দিনও রাস্তা ছিল ৪০০ কিলোমিটার। গন্তব্য ইসফারা।কিন্তু ঠিক হয়েছিল, সন্ধেয় আলো থাকতে থাকতে যদি ইসফারা পৌঁছই তা হলে আর ২৫ কিলোমিটার এগিয়ে বাটকেন চলে যাব। ইসফারা আর বাটকেনের মাঝে তাজিক আর কিরঘিজ বর্ডার। বর্ডার পার করা থাকলে কাজ এগিয়ে থাকবে। এ দিন ইদ ছিল। এখানে ইদ দু’দিনের। রাস্তায় অনেক লোকজন। দোকানপাট সব বন্ধ। যদিও ‘অনেক’ লোকজনটা আমাদের পাড়ার মোড়ের জটলার চেয়ে বেশি নয় আর দোকানপাটের সংখ্যাও খুবই নগণ্য। গোড়া থেকেই সুন্দর চলছিলাম আমরা। রাস্তা মসৃণ, মেঘলা আবহাওয়া। আগের দিন রেস্ট হওয়ায় শরীরও ঝরঝরে সকলের। প্রায় ১০০ কিলোমিটার পার করে ফেলা গেল ঘণ্টা দেড়েক সময়ে। বাদলদারও চালাতে তেমন অসুবিধা হয়নি। কিন্তু প্রতিবার বাইকে বসার সময়ে নিজের ডান হাতটাকে বাঁ হাত দিয়ে তুলে হ্যান্ডেলে রাখছে। তারপরে চালাচ্ছে। কতটা ব্যথা সহ্য করছে, বোঝাই যাচ্ছে। ইসফারা পৌঁছে গেলাম বেশ বিকেল বিকেল। কিন্তু সিদ্ধান্ত হল, বর্ডার পেরিয়ে বাটকেন চলে যাওয়া হবে আজই। এগিয়ে থাকলে সুবিধা। তবে বর্ডার পেরোতে গিয়ে আমাদের বিশাল ঝক্কি হয়ে গেল। তাজিক বর্ডার সহজে পেরিয়ে চলে এলেও কিরঘিজ় বর্ডারে ঢুকতে গিয়ে ঝামেলায় পড়ে গেলাম। আমরা অন্য একটা বর্ডার দিয়ে বেরিয়েছিলাম কিরঘিজ়স্তান থেকে। আর ঢোকার সময়ে অন্য বর্ডার দিয়ে ঢুকছি। সম্ভবত দুটো চেকপোস্টের মধ্যে কো-অর্ডিনেশনের অভাবে বাদলদার ডেটা মিসিং হয়ে গেছিল।

পামিরের পাহাড়

শেষমেশ অন্ধকার নামার মুখে সমস্ত ঝামেলা থেকে মুক্তি পেয়ে চলে এলাম বাটকেন। সন্ধে হয়ে গিয়েছে তখন। এইটুকু ছোট্ট একটা জায়গা, তাও ইদের জন্য বন্ধ সব। কোথাও আর কিছু হোটেল খুঁজে পাই না। অবশেষে একটা হোম স্টে-তে ঢুকে পড়লাম। তারা আবার শুধু থাকতে দেবে, খেতে দেবে না। ইদের জন্য তাদের খাবার সার্ভিস বন্ধ।আমরা ভাবলাম, নিজেদের জন্য তো রান্না কিছু করবেই, সেখান থেকেই দিতে বলব। কাকুতিমিনতি করলে ঠিক দিয়ে দেবে। কারণ ৪৩০ কিলোমিটার পার করে এসে, একবার রুমে ঢুকে পড়ার পরে, আবার বেরিয়ে খেতে যাওয়ার মতো অবস্থা নেই কারও। আমি তো দাঁড়াতেই পারছি না ডান পায়ে। এই সময়টা মনে হয়েছিল, পা কেটে বাদ দিতে হবে। রুমে ঢুকে অনেকক্ষণ পা উঁচু করে শুয়ে থেকে ফোলা একটু কমল। টনটনে ব্যথা। নতুন করে রক্তও পড়েছে। ড্রেসিং এবং আরও যা দরকার করা হল। রাতে ওদের খাওয়ার কথা বলা হল, বলল যা আছে তাই খাবে। আমরা প্রচণ্ড ভালো ছেলের মতো ঢক করে ঘাড় নেড়ে পেলাম আলুভাজার সঙ্গে মাংসের টুকরো ভাজা মেশানো। পাঁউরুটি দিয়ে তাই সাঁটানো হল। ওষুধপত্র খেয়ে ঘুমোনো হল।

১২.০৮.২০১৯ এ দিনের বেস্ট পার্ট ছিল— প্রায় গোটা রাস্তাটা উজবেকিস্তানের সীমান্ত ছুঁয়ে ছুঁয়ে যাওয়া। একেবারে লাগোয়া। মাঝের যে নো ম্যানস ল্যান্ড, সেটাও বড়ই সংক্ষিপ্ত। বাড়িঘর, গাছ, মানুষ, পথ দেখা যাচ্ছে একেবারে কাছে। সীমান্ত বরাবর খুঁটি পোঁতা আছে বটে, তবে তা বেঁটে বেঁটে খুটি, জাল দিয়ে জোড়া। কাঁটাতার বা দেওয়ালের চিহ্নই নেই। নেই তেমন প্রহরাও। আমি হাতে গুগল ম্যাপ খুলে রেখেছিলাম, রাস্তাটা মেলাতে মেলাতে যাচ্ছিলাম। কখনও কখনও তো উজবেকিস্তানের সীমানার ভিতর দিয়েও যাচ্ছিল রাস্তাটা! মানে কোনও কোনও বাঁক সীমান্তের ওপর দিয়ে বয়ে গিয়েছে আর কি।

এই যে দেশান্তরকে ছুঁয়ে ফেলা বিনা আয়াসে, এ যে আমায় কী শিহরিত করে! এক একটা জায়গা এমন আসছিল, একেবারে সীমান্তঘেঁষা পথের ধারে যে গাছগুলোর ছায়া পড়েছে, তাজিকিস্তানের রাস্তায় পড়েছে, সে গাছগুলোর গোড়া উজবেকিস্তানের মাটিতে গেঁথে রয়েছে। তোমার মাটি, আমার ছায়া— এর চেয়ে সুন্দর ও সহজ সহাবস্থান আর কী হতে পারে!

একসময় সীমান্ত থেকে সরে এল রাস্তা। ওশ শহরে ঢুকব এবার। আচমকা এক ঝটিতি মন খারাপ। সুতীব্র অভিমান। তবে এটাও ঠিক,এ ভাবে সমস্তটা পেতে গেলে অনেক টাকা চাই। আর ভুলতে হবে ক্যালেন্ডারের হিসেব। সে আমি একদিন ভুলবই। আর টাকাও ঠিক হবে কিছু না কিছু করে। একদিন আমি ফেরার টিকিট না কেটে বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়বই। ঠিক পড়ব। ১৩.০৮.২০১৯

সমস্ত সেরা অংশ পার করে ফেলেছি। পামিরের পথে অভিযাত্রা শেষ। শহরে ফেরার পথ ধরা হয়ে গেছে। সে পথে একটা দুর্ঘটনাও ঘটানো হয়ে গেছে। এবার সেখানে পৌঁছনো বাকি, যেখান থেকে শুরু করেছিলাম অভিযান। এরকম একটা সময়ে আমাদের পথে পড়ল তক্তগুল। নারিন নদীর একটা বিশাল রিজ়ার্ভার। কিরঘিজ় কবি তক্তগুল স্যাটিলগানভের নামে নাম তার। পার্ল অফ কিরঘিজস্তান যাকে বলে, সেই ইসাক কুল লেক দেখা হয়ে গেছে। সং কুল লেকের বিশালতায় মুগ্ধ হওয়া হয়ে গিয়েছে। কারা কুল লেকের অপূর্ব নীলিমা চোখে মাখা হয়ে গিয়েছে। ধারণা করতে পারিনি, তক্তগুল সেই সব কিছুকে ছাপিয়ে যাবে। এ দিন ব্রেকফাস্ট করে ওশ থেকে রওনা দেওয়ার ১০০ কিলোমিটার পরে পড়ল জালাল-আবাদ শহর।তারপরে সে শহরের পথ ছেড়ে আমরা ধরে নিলাম নারিন নদীর কোলঘেঁষা পথ। একদিকে রুক্ষ পাহাড়,অন্যদিকে দুরন্ত নদী, মাঝখানে একফালি কালো পথ বেয়ে আমাদের ছুটে চলা।

নারিন নদীর নীল

এ দিন গত দু’দিনের তুলনায় আমাদের ব্যথা-বেদনা একটু কম। বা বলা ভাল, সয়ে গেছে। রাস্তাও একেবারে ঝকঝকে। আমরা সুন্দর চলেছি। কেবল কষ্টকর ছিল অস্বাভাবিক রোদ আর গরম। খুবই ক্লান্ত হয়ে পড়ছিলাম থেকে থেকে। বিকেল হওয়ার মুখে যখন সূর্যের তেজ নরম হয়ে আসছে, হাওয়ার স্পর্শ শীতল হয়ে আসছে, যখন পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে কনেদেখা আলোয় হাতের স্নিগ্ধ পাতা সেঁকে নিচ্ছে প্রকৃতি, তখনই আমাদের সামনে ধরা দিল তক্তগুল।

তক্তগুল রিজার্ভার

কী অপরূপ, কী বিশাল, কী গভীর! এক অসীম সৌন্দর্য নিয়ে বিরাজ করছে সুস্থির, সুবিশাল এক নীল! সূর্যের রশ্মি গায়ে মেখে তাকে ঘিরে রয়েছে রাশি রাশি পাহাড়। যেন অমূল্য কোনও সম্পদের চারপাশে বসানো গম্ভীর এক প্রহরা! আরও একবার নতজানু হয়ে গেলাম আমরা। না হলে তো প্রকৃতির কাছে পৌঁছনো যায় না। কিন্তু এই তক্তগুল যেন পুরোপুরি নুইয়ে দিল আমাদের। এমন অপার্থিবকে স্বচক্ষে দেখছি! সত্যি! খুব কাছ পর্যন্ত যাওয়া যায় না। এই লেকের ধার ঘেঁষে যথেচ্ছ তাঁবু ফেলার দুর্মতিও এখনও পর্যন্ত এ দেশে হয়নি। পর্যটন ব্যবসা নিয়ে আরও বেশি করে ভাবনাচিন্তা শুরু করলে ভবিষ্যতে হয়তো হবে।

১৪.০৮.২০১৯
সমস্ত অভিযানের কিছু নির্দিষ্ট মুহূর্ত থাকে। বিশেষ কিছু নয়, পরিচিত ও সাধারণ, সকলের জন্যই হয়তো একই, কিন্তু সুনির্দিষ্ট। বাইক এক্সপিডিশনের ক্ষেত্রে প্রতিদিন সকালে স্টার্ট দেওয়ার সময়টা তারই একটা।

অচেনা কোনও জনপদের আধো ভোরবেলায়, শিরশিরি শীতে চনমনিয়ে যখন বাইকটা প্রথম শব্দ করে ওঠে রাজকীয় গরিমায়, আস্তে আস্তে তার শান্ত ইঞ্জিনটা জেগে ওঠে, পেট্রোলের আলতো গন্ধ ছেড়ে ধোঁয়াটা বেরোয়, তখন আমাদেরও চোখের প্রান্তে লেগে থাকা শেষ ঘুমের রেশটুকু মিলিয়ে যায়।প্রত্যেক দিনই একই শব্দ, একই ধোঁয়া, একই গন্ধ। তবু রোজ নতুন করে ভালো লাগে।

আজ ভোরে বাইক স্টার্টের সেই মুহূর্তটা, সেই শব্দটা মনে করিয়ে দিল, কাল সকাল থেকে আর এই শব্দ শোনা হবে না। আজই শেষ।

ঝিরিঝিরি সবুজে

তক্তগুলের সকাল বড় সুন্দর, বড় মায়াবি। পুরোপুরি জ্বলে ওঠার আগে আলসে সূর্য যখন সবুজ গাছেদের পাতায় উঁকি দেয়, আর তাকে ছুঁতে ঝিরঝির করে ছুটে আসে হাওয়া, তখন যে পৃথিবীর স্নিগ্ধতম দৃশ্যপট তৈরি হয় তা এ দিনই জানলাম।

খুব ঠান্ডা লাগতে লাগল পাহাড়ি পথে ওঠা শুরু হতেই। শেষ কয়েক দিন আমরা গরমে অভ্যস্তহয়েছিলাম। আজ আবার হঠাৎই ঠান্ডা। শুধু পাহাড়ি পথ বলে নয়, মেঘও করে ছিল খুব। এতটাই ঠান্ডা যে রাস্তায় বাইক থামিয়ে ফ্লিস চাপাতে হল গায়ে।

খানিক পরে কফি ব্রেক। সবুজ প্রান্তরে ছোট্ট ছোট্ট সাদা ইয়র্ট। বাইরে প্রজাপতির মতো উড়ছে কিছু বাচ্চা। বাচ্চাগুলোর ভারি ফুর্তি হয়েছে চারটি ভিনগ্রহের প্রাণী দেখে।
কফি খেয়ে ফের বেরিয়ে পড়া। বড় সুন্দর পথ। মেঘের আবছায়ায় অন্য এক মায়া নিয়ে ধরা দেয়। বিষণ্ণ হয়ে ওঠে চারপাশ। ভাবতে ভালো লাগে, আমাদের ঘরে ফেরার দিনে পাহাড় মনখারাপ করে আছে হয়তো।

আলা বেল পাস

আলা বেল পাস ক্রস করলাম। এই পাসে উঠছিলাম বলেই শীত বাড়ছিল। পাসের পরে নামা শুরু। আর যত নামতে শুরু করলাম, কিরঘিজস্তানটা যেন আর্জেন্টিনা হয়ে যেতে শুরু করল। স্কুলের ভূগোল বইয়ে আর্জেন্টিনার পম্পাস তৃণভূমি। যেন মনে হতে লাগল, বিশ্বের সেই বৃহত্তম তৃণভূমি পম্পাসেই পৌঁছে গেছি। সীমাহীন বিস্তৃত ঘাসজমি। দিগন্তে জেগে আছে রাশি রাশি সবুজ পাহাড়। মাঝখান দিয়ে ছুটেছে রাস্তা, সে রাস্তায় ছুটছি আমরা। চারপাশ এত বেশিরকমের সুন্দর যেন ক্যালেন্ডারের পাতা উড়ছে!
ক্ষণে ক্ষণে বায়না করি গাড়ি থামানোর। দেখব, ছবি তুলব। এমনিতেই আমার বদনাম আছে, সময় নষ্ট করার। আমি নাকি খুবই ‘হাঁ-করা’ মেয়ে।

একটা ক্যালেন্ডারের পাতার সামনেই দাঁড়ানো হল। অপূর্ব ল্যান্ডস্কেপ। সবুজের নানারকম শেড বিছিয়ে গেছে মাঠ জুড়ে। গোরু-ঘোড়া-ভেড়া একসঙ্গে চরে বেড়াছে। কয়েকটা সাদা ইয়র্ট আর ওয়াগন বাড়ি একলা দাঁড়িয়ে।

ওয়াগন বাড়ি

ওয়াগন বাড়ি ব্যাপারটা কিরঘিজস্তানের কান্ট্রি সাইডে ভর্তি। একটা ছোট কামরার মতো বাক্স। চাকা লাগানো। দেখে মনে হবে বাতিল কোনও গাড়ি। তার ভেতরে পার্টিশন করে দিব্যি আলাদা আলাদা ঘরের মতো করা আছে। ট্রেনের সিঁড়ির মতো সিঁড়ি রাখা সামনে। সম্ভবত, আগে, এদের পূর্বপুরুষেরা যখন সত্যিকারের নোম্যাড ছিলেন, জায়গায় জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন, তখন এরকম চাকা লাগানো ঘরে থাকতেন। ঘরসুদ্ধুই হয়তো চলে যেতেন এক জায়গা থেকে আর এক জায়গায়।

অপূর্ব, অভূতপূর্ব দৃশ্যদের পার করে, পাহাড়ের আঁকাবাঁকা পথে নেমে, শহরের দিকে এগোতে লাগলাম আমরা। সেই প্রথম দিনে ছোঁয়া চুই নদী ফের বাইকের পায়ে পায়ে জড়াল। বিকেলের দিকে এত হাওয়া দিচ্ছিল, মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল উলটে যাবে বাইক!

বিশকেক ঢুকছি। সেই বিশকেক, যেখান থেকে শুরু হয়েছিল যাত্রা। পাহাড়-পথ পার করে কোনও শহর ঢোকার আগের যে সময়টা, সেটার নির্দিষ্ট ফিচার আছে কিছু। রাস্তা সোজা হয়ে যায়, গাছেরা বদলে যায়, পাহাড়ের রং ও টেক্সচার বদলে যায়, গাড়ি বেড়ে যায়— এই সব। এটা যত হতে লাগল, তত যেন চিনচিন করে বাড়তে লাগল মনখারাপ। আর একটুকু সময়, তারপরেই সব শেষ!

আসলে একটা মেশানো অনুভূতি হচ্ছিল। অ্যাক্সিডেন্টটা হওয়ার পর থেকে আমাদের এক ও একমাত্র লক্ষ্য ছিল আর কোনওরকম সমস্যা ছাড়া যাতে ভালোয় ভালোয় বিশকেকে পৌঁছতে পারি। সেই লক্ষ্য ক্রমেই কাছে আসছিল, তার একটা তৃপ্তি ছিল। শরীরের চোটগুলো বিশ্রাম পাবে, আর এতটা করে চালাতে হবে না, তার একটা নিশ্চিন্তি ছিল। আর সব কিছুর ওপরে একটা কষ্ট ছিল বিচ্ছেদের। বাইকদুটোর ওপরে যে কী মায়া পড়ে গেছে!

গ্যারেজে ফেরা

সেই চেনা গ্যারেজে পৌঁছে গেলাম। এগিয়ে এল ডেনিসরা সবাই। ওরাও খুব খুশি, রীতিমতো উচ্ছ্বসিত। বারবার করে বলল, আমরা যে সবটা করে ফেলব, ভাবতে পারেনি ওরা। ভেবেছিল, মাঝপথ থেকে ফিরে আসব। বলছিল, তোমরা ইন্ডিয়ানরা কী করে ফেললে, তোমরা নিজেরাও জান না। খুব ভালো লাগছিল শুনতে।

ওদের বাইক এক্সপিডিশনে আসলে নির্দিষ্ট সংখ্যক বাইক থাকে এক একটা টিমে। সঙ্গে সাপোর্ট ভ্যান, যাতে ডাক্তার, মেকানিক, লিয়াজ়োঁ অফিসার সকলে থাকেন। সবরকম সাহায্য মেলে সেই ভ্যানে। বিভিন্ন দেশের অভিযাত্রীরা এসে দল বাঁধেন। প্যাকেজ হিসেবে টাকা নেওয়া হয়। তারপরে থাকা, খাওয়া— সব এজেন্সির তরফ থেকে ঠিক করা। বাইকার শুধু নির্দিষ্ট বাইকে এসে ওঠেন, তারপর

ওদেরই ঠিক করে দেওয়া রুটে চলেন। থামেন। থাকেন কারও এতটুকু অসুবিধা হলে সাপোর্ট ভ্যান সবরকম সাহায্য করে।

সেই জায়গায় আমরা নিজেরা বাইক নিয়ে, কোনও সাপোর্ট ছাড়া, কোনও প্রি-বুকিং ছাড়া এত বড় এবংকঠিন রুট ডাবল ক্যারি করে চালিয়ে শেষ করে ফেলেছি ঠিকমতো— এটা ওদের কাছে রীতিমতো বিস্ময়। আর সে বিস্ময়ের একটা প্রধানতম উপাদান হল— ইন্ডিয়া! কারণ এর আগে কখনও ইন্ডিয়ান দেখেইনি ওরা! জানতই না, ইন্ডিয়ানরাও বাইক নিয়ে কখনও পামিরে এক্সপিডিশন করতে আসবে!

১৫.০৮.২০১৯

স্বাধীনতা দিবস যে আজ, সেটা মাথাতেই ছিল না। থাকার কথাও নয়। দিন, তারিখ, বার, সময়— সবহিসেবই আবছা হয়ে যায় অভিযানের দিনগুলোয়। তার ওপর দেশ থেকে এত দূরে আছি। তারপরেও সকাল সকাল স্নান সেরে, ক্রিম মেখে, ফর্সা জামা পরে, পতাকা উত্তোলনের সৌভাগ্য হল। সৌজন্যে কিরঘিজস্তানের বিশকেকের ভারতীয় দূতাবাস।

শেষ কবে ১৫ আগস্ট এরকমভাবে পতাকা উত্তোলন করে, জাতীয় সংগীত গেয়ে চোখ মুছেছিলাম, মনে নেই। তবে আজকের দিনটা, দেশ থেকে এত দূরে যেভাবে দেশ-আত্ম-বোধ অনুভব করলাম, তা অনেক দিন মনে থাকবে।

এই আত্ম, এই বোধের কোনও সীমান্ত হয় নাদেশের সীমান্ত বলে যেটা জানি সেটার অস্তিত্ব মানচিত্রের বাইরে নেই। কোথাও নেই। প্রকৃতিতে নেই, মানুষেও নেই এই সীমান্তহীন অনুভূতিটুকুইআমার স্বাধীনতা।

নীলের ডাকে

নিয়ম মেনেই অভিযান শেষ হয়ে যায়, যেমন সব নটে গাছই একদিন মুড়োয়। কিন্তু এই অভিযান যেন শেষ হয়েও শেষ না হওয়া একটা ছোটগল্পের মতো ছিল। আমরা নিজের দেশে, নিজের শহরে ফিরেও অনুভব করেছিলাম, এখনও করছি, আমাদের হৃদয়ের খানিকটা করে অংশ রেখে এসেছি পামিরে। সে দেশের মানুষের ভালোবাসা, গাছেদের হাওয়া, সূর্যাস্তের শীত— এসব কিছু ছেড়ে এসেছি ব্যস্ততার পরিচিত যাপনে। কিন্তু ঘোর কাটেনি এখনও। সে ঘোরের মায়া যেন কেউ জোর করে ছিঁড়ছে একটু একটু
করে। কষ্ট হচ্ছে।

ফেরার সময়ে জলে ভরে এসেছে চোখ, মন আনচান করে উঠেছে কী এক অচেনা বিচ্ছেদে। প্রথমবার দেশের বাইরে এসে যে এমন করে জড়িয়ে যাব অনন্য ভালবাসায়, ভাবিনি। ভাবিনি, সীমান্তের কাঁটাতার পালকের আদরের মতো ঠেকবে তিন-চারটে দেশ পার করে।

ফেলে আসা পৃথিবীর ছাদ

এ লেখা যখন লিখছি, সে পরবাসে তখন গড়ানে পথে হাঁটছে বিকেল। নিশ্চয় মেঘের পাতলা চাদরে মুড়ে আছে চারপাশ। একটু পরেই অন্ধকার আর শীত চুঁইয়ে পড়বে পপলার গাছের পাতায় পাতায়। তাদেরও কি মনখারাপ, আমাদের মতোই? ফেরার যত কষ্ট, ফিরিয়ে দেওয়ার কষ্টও কি ততটাই?

ভালো থেকো কিরঘিজস্তান, ভালো থেকো তাজিকিস্তান। ভালো থেকো পামির পাহাড়।
ভালো রেখো আমাদের স্মৃতি।