নলিনী বেরা

‘‘আমি জানি আমার সহজ শৈশব
কেটেছে পুকুরপাড়ে, হিওচার গাছ আর
কেদারের বউ দুজনেই পাশাপাশি দেখেছে
আমাকে, ধবলীছাগল সুনা সাঁওতাল
দেখেছি বাঁদরার নাচ কেঁদরার ছো দিনমান—’’

তপন করমশাই বললেন, এ তো কবিতা! আচ্ছা, হিওচা কি হেলেনচা?
হতে পারে, সে হতে পারে। বললাম, শুধু কি হিওচা? ত্রিড়মিচা, ঘলঘসি, আঁটারি, চরচু, ডকা, কুচলা, ধ, আসন, শাল, পিয়াশাল, কেঁদ, করম, ভাদু, ভুডুরু, ভরন, কইম, বাদাম, বাদভেলা, কদম, গাবগুবি, গুটিমন, দুধিয়া, কুড়চি, সোনালি, জাড়া, জারুল, পড়াশ, পাকড়ু— কতরকম গাছ! গাছের চেয়েও বেশি দেখেছি মানুষ। কতরকম মানুষ! একেকটা মানুষ গাছের মতো! গাছের মতোই একেকজনের নাম— রাইবু, চামটু, গুড়গুড়িয়া, সামাই, সোমবারি, ঢালো, খেকরে, কুলাই, ছোটরাই, পিথো, কাঁদুরা, পিলচু, পিতাম, গুরা, বড়কাই, সুনি, ভুসকি, ধনু, গুরভা। অমন যে সনাতন দুড়ু— সেও গাছগাছড়ার মতোই ধীরে ধীরে হয়ে গেল ‘সুনা’! এ দিগরের সুনা সাঁওতাল! রামের ভাই লক্ষ্মণের মতো চেহারা। ফর্সা, শালপ্রাংশু। মাথার চুলগুলোও পিঙ্গল বর্ণের। মুখেও পিঙ্গল দাড়িগোঁফ। হাতে একজোড়া লোহার বালা, কানে মাকড়ি। এরকম চেহারার সুনা কোথায় যাত্রার আসরে ‘লক্ষ্মণের শক্তিশেল’-এ লক্ষ্মণ, ‘অভিমন্যু বধ’-এ অভিমন্যু, ‘কর্ণাজ্জুন’-এ কর্ণ সেজে আসর মাত করে ছাড়বে, কোথায় উপস্থিত দর্শকের দল হাততালি মেরে ‘ইনকোর’ দেবে ডবল-তেডবল, তা নয়— সে হল কিনা আমাদের ঘরে ভাত-কাপড়ে সারা বছরের ‘ভাতুয়া’!
করমশাই বললেন, ভাতুয়া মিন্‌স—
হ্যাঁ হ্যাঁ, সম্বচ্ছর খাটবে-খুটবে, তার বদলে দু’বেলা দু’মুঠো ভাত আর পরনের কাপড় পাবে। সুনার মা ঢালো বুড়িও আমাদের বাড়িতে কাজ করে। সকালে সে গোয়াল কাড়ে, মাথায় করে ঝুড়িতে ভরে গোরুর গু-গোবর রেখে আসে ‘খত্খানায়’। ‘খত্খানা’ হল গোবর জড়ো করে রাখার জায়গাবিশেষ। সারা বছরের গোবর যেখানে জমা থাকে। চাষের সময় সেই গোবর গাড়িতে তুলে ফেলা হয় দূর দূর ডাঙা-ডুঙোর জমিনে। গোহাল কাড়ার কাজ শেষ হলে ‘খলা-খামার’ ঝাঁট দেওয়ার কাজ শুরু করে দেয় সুনার মা। ঝেঁটিয়ে সাফা করে দিলে তবেই খামারে জল ঢেলে গোবর লেপে দিত আমাদের মা-কাকিমারা। কী জানি কেন, গোবর লেপার কাজটা ঢালোকে কোনওদিন করতে দিত না আমাদের মা-কাকিরা। সে না দিক— কোনও পালা-পরবের আগে বিল জমিনের কেঁচো মাটি সংগ্রহ করে বাঁশের মই বেয়ে উঠে আমাদের ঘরের দেওয়ালে ‘মাটিকাম’ করে দিত ঢালো। চুনকামের জায়গায় মাটিকাম। যে মাটি দিয়ে দেয়াল যত বেশি সাদা করা যায় সেই মাটির সন্ধানে সে অনেক দূরের বিল জমিনে, তপোবনের জঙ্গলে, সীতানালা খালধারে— এমনকি, ‘তিলকমাটি হুড়িতে’ যেতেও কসুর করত না।
কখনও কখনও সাদা ‘ছঁচমাটি’-র সঙ্গে সে নিয়ে আসত হলদে তিলকমাটি, লাল রঙের গিরিমাটি, আর তাই দিয়ে মাটিকাম করা দেয়ালের উপর লতাপাতা ফুল পাখি আঁকতে বসত। আমরা ছোটরা পা ছড়িয়ে, হাঁটুমুড়ে বসে, ঠায় দাঁড়িয়ে খুব মনোযোগ দিয়ে ছবি দেখতাম। চিত্রকরী প্রথমটায় আমাদের তেমন আমল দিত না। তবে আঁকা শেষে প্রতিবারই জিজ্ঞেস করত, কাহার ল্যাখেন দিখাঁইছে বল দেখিন বাবুরা?
কার মতো দেখতে লাগছে বাবুরা বল দেখি?
আমরাও কেন জানি সমস্বরে চেঁচিয়ে বলে উঠতাম, সোনার ল্যাখেন! অর্থাৎ সোনার মতো!
দুই
এহেন ঢালো, যে কিনা আমাদের ঘরের কাজ, ঘর সাজাতে এত ব্যস্ত, তার সঙ্গে আমাদের একটা সম্পর্ক গড়ে উঠবে, এ তো স্বাভাবিক কথা। বয়সে অনেক বড় হলেও আমরা তাকে দিদি ডাকতাম, ঢালোদিদি। দিদির ছেলে সম্পর্কে ‘ভাগ্না’। তাই সনাতন টুডুও আমাদের ‘সুনাভাগ্না’।
গোহাল কাড়া, খলা-খামার ঝাঁট দেওয়ার কাজ সেরে ঢালোদিদি কোঁচড়ে মুড়ি নিয়ে খেতে খেতেই আমাদের জমিনে ধান রোয়া, ঘাস নিড়ানো কি ধান কাটার কাজে বেরিয়ে পড়ত। আর হাল–জোয়াল কাঁধে আমাদেরই কোনও জমিনে এক চাষ কি দু’চাষ দিয়ে হয়তো ঘরে ফিরত সুনাভাগ্না।
দলিজ মজলিসে বসা আমাদের দাদা-কাকারা সুনাকে হাল–জোয়াল কাঁধে ফিরতে দেখে মুখ চাওয়াচাওয়ি করত।
কতদিন বলে একফোঁটা জল নেই! টিট্টিন্ডা পাখি ‘জল জল’ বলে আকাশ বিদীর্ণ করে ফেলল, গরুগোঠের মাঠে মুথাঘাস শ্যামাঘাস জ্বলেপুড়ে বিবর্ণ হয়ে গেছে কবেই, সরকারি কুয়োর জল নেমে গেছে পাতালে! জমিজিরেতের মাটি যখন ফুটিফাটা, পাথরের মতো শক্ত, লোহার একটা পেরেকও হাতুড়ি মেরে ঠোকা যাচ্ছে না ঠিকমতো, তখন সুনা সাঁওতাল লাঙল চষে এল কোত্থেকে?
কিন্তু ওই মুখ চাওয়াচাওয়িই সার! কেউ আগ বাড়িয়ে জানতে চাইত না। ও বাবা! সুনার মুখের উপর কথা বলবে কে! হাল–জোয়াল রেখে কোদাল কাঁধে সুনা ফের বেরিয়ে গেলে মুখর হয়ে উঠত দলিজটা। হয়তো মেজোকাকাই বলত, জল নেই, শিশির পর্যন্ত পড়ে না, জমিনে ‘বতর’ নেই, শুকনা ভুঁয়ে কোথায় চাষ দিয়ে এল সুনা? দখিনসোলের ডাঙাডুঙোরে নয় তো? সেখানে তো পেরেক ঠুকলেও ঠোকা যাবে না— লাঙলের ফলা ঢোকাল কী করে? শরীরে অসুরের শক্তি—
আমাদের জ্যাঠতুতো দাদা গ্রামের ফ্রি–প্রাইমারির টিচার, ইস্কুলে না গিয়ে হয়তো দলিজে বসেই ‘মান্থলি রিটার্ন’ লিখছে, লেখা হলেই জমা দিয়ে আসবে গোপীবল্লভপুর এস আই অফিসে, কাগজ থেকে মুখ না তুলেই বলল, সুনার ঠাকুরদা না তার ঠাকুরদার ঠাকুরদা— কার যেন ল্যাজ ছিল?
মেজোকাকা বলল, ল্যাজ যে কার ছিল সঠিক বলতে পারব না বাবা, তবে এই তো কিছুদিন আগে কচড়া না মহুল কুড়াতে গিয়ে ঢালোবুড়ি যে কাণ্ড করেছিল— আমাদের সকলেরই মনে আছে, তোমার মনে নেই সুরথ?
সুরথ বলল, মনে নেই আবার! ভালুক আঁচড়ানোর দাগ ঢালোবুড়ির শরীরে এখনও বিদ্যমান।
অতঃপর মজলিস সুরথকে তুলোধুনা করে ছাড়ল, খুব যাহোক মনে আছে তোমার সুরথ! আঁচড়াল কে কাকে, ঢালোবুড়ি ভালুককে না ভালুক আঁচড়াল ঢালোবুড়িকে?
হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিক কথা, ন্যায্য কথা, ঢালোই আঁচড়ে দিয়েছিল ভালুকটাকে।
শুরু হয়ে গেল ঢালোবুড়ির ভালুক আঁচড়ানোর গল্প।
তিন
সুনার মাকে নিয়ে দলিজের মজলিস যখন গল্পে গুজবে সরগরম তখন আমাদের সুনাভাগ্না হয়তো কোদাল কুপিয়ে বহুত মেহনতে পাকুড়তলার চষামাটিকে আরওই নরম করছে। আর মাঝে মাঝে কোদালের বাঁটে ঠেস দিয়ে ত্রিভঙ্গ ভঙ্গিমায় দাঁড়িয়ে চারদিকে দেখছে, এই তেরো মৌজায় আর কোথাও কেউ তার মতো মাটি কোপাচ্ছে কিনা, হালের বলদ জুতে পাথরের মতো শক্ত মাটিতে লাঙল চষছে কিনা। কেউ নেই। হয়তো করণতলার ওদিকে কতগুলো ছাগল ঘাড় নিচু করে আলের নীচে খররৌদ্রের ঝাঁঝ বাঁচিয়ে চুপিসারে গজিয়ে ওঠা মুথাঘাস শ্যামাঘাস ছিঁড়ে খাচ্ছে, ছাগলচরানি মুনকু কি অমৃতা কি গুজরি করণগাছের ছায়ায় বসে মাটিতে খোঁড়া গর্তের ভিতর গুটি চালাচালি খেলছে, চরন্তি একদঙ্গল গোরুর কাছে দুটি–একটি সাদা বক গোরুর গা থেকে খুঁটে খাচ্ছে ‘কেতর’। মাছ নেই মৎস্য নেই, পুকুর–পুষ্করিণী শুষ্ক, কুমারডুবি দলার একেবারে মাঝখান ছাড়া কোথাও এতটুকু জল নেই, হয়তো সেখানে নলখাগড়ার দঁকের সবচেয়ে লম্বা নলগাছটির মাথায় বসে জলের দিকে একদৃষ্টিতে চেয়ে আছে মাছের লোভী ‘মাছরাঁকা’— যদি দু-একটা চানাচুনো মাছ বুড়বুড়ি কেটে কখনও উপরে উঠে আসে! দুটি মোষ— নিশ্চয়ই হারুচাষির— পেট পর্যন্ত পাঁকে ডুবিয়ে আয়েশ করছে। কেউ নেই। হয়তো বুড়বুড়ি ঝরনায় কি সীতানালাখালের কাদাঘোলা জলে কিছু মেয়েলোক স্নানে ব্যস্ত—
না না, এ দিগরে আর কেউ নেই, খালি সুনা, সুনাই প্রথম, একেবারে এক নম্বর! সে নিজে ফার্স্ট, আমাদের গোটা পরিবারটাকে ফার্স্ট, এমনকি খড়িকামাথানি ব্লক অফিসের বাৎসরিক কৃষি প্রতিযোগিতায় আমাদেরই খেতের বেগুন, ঝিঙা, চিচিঙ্গাকে ফার্স্ট করার বাসনায় সে মরিয়া। হয়তো ঝুঁকে পড়ে আরও জোরে জোরে কোদাল কোপাতে লেগে পড়ল সুনা। ধীরে ধীরে বেলাও মরে এল, কিয়াঝরিয়ার বালিপোত জমিনের উপর পড়ন্ত রোদের ঝিরিঝিরি খেলাও শেষ হল, মাঠ থেকে, বিল থেকে, খেতখামার থেকে গোরু–ছাগল, গোরুচরানি, ছাগলচরানির দলও আস্তে আস্তে উঠে এল, আজ যেন বেলাটা বড় দ্রুত ডুবল, আলো থাকলে আর একটু কোপানো যেত— এরকম ভাবতে ভাবতে হয়তো আমাদের সুনাভাগ্নাও কোদাল কাঁধে ঘরে ফিরল।
স্নানটা সেরে এসেছিল বুড়বুড়ি ঝরনায় কি সীতানালাখালের কাদাগোলা জলেই, এবার হাত-পা ধুয়ে খেতে বসল। সন্ধে হলেই আমাদের মাটির ঘরে যত রাজ্যের অন্ধকার এসে বাসা বাঁধে, কি হেরিকেন কি ডিবরির আলোয় অন্ধকার দূরীভূত হতে চায় না। মাঠেঘাটে যে আর একটু আলোর প্রত্যাশী, আর একটু আলো থাকলে বড় ভালো হত যার— সে কিনা ঘরে এসে সবচেয়ে অন্ধকারময় জায়গাটুকু বেছে নিয়ে খেতে বসল! মা–কাকিমারা তার গামলায় ভাত ঢেলে দিতে এসে একটা জলন্ত হেরিকেন কি ডিবরিও রেখে গেল। আলো রেখে যেতে না যেতেই হাত বাড়িয়ে সুনা হেরিকেন কি ডিবরির পলতেটাকে এত ছোট করে নিল যে আলো প্রায় নিভু নিভু! না থাকারই মতো!
অন্ধকারে একটা অতবড় মানুষ খায় কী করে, পোকা-টোকাও তো উড়ে এসে জুড়ে বসতে পারে ভাতের গামলায়। আমরা ছোটরা তাই যেতে-আসতে আলোর পলতেটাকে উসকে বড় করে দিই। একদণ্ডও যায় না, সুনা ফের তাকে মিচকে ছোট করে নেয়। আমরাও আশেপাশে ঘুরঘুর করি— একটা কিছু ছুতো খুঁজে ওদিক দিয়ে যেতে গিয়ে ঝুঁকে পড়ে পলতেটাকে আবার হয়তো উসকে বড় করে দিলাম। রাগ করল না সুনাভাগ্না, পরক্ষণেই ঠান্ডা মাথায় বেড়ে ওঠা আলোর শিষটুকুকে কমিয়ে করে নিল ছোট, একেবারে মিনমিনে।
চার
সেবার আশ্বিনের গোড়ায় চাষাবাদের কাজ শেষ হল। যেটুকু পড়ে থাকল সে বড়জোর ওই ‘কাড়হান’ বা ঘাস নিড়ানোর কাজ। ডাঙাডুঙোর জমিনে দেওয়া হল ‘বিদা’— বিদা হল একসার লোহার কাঁটা, অনেকটা চিরুনির দাঁড়ার মতো। সবুজ বোয়ালি আসা জমিনের উপর যদি বিদা চালানো হয় তো ছোট ছোট ঘাস, আগাছা কাঁটায় জড়িয়ে উঠে আসে।
কাড়হান কি বিদা ফেলার কাজও শেষ। বেলবরণ, সপ্তমী, অষ্টমী, নবমীর মহাউৎসবও উদযাপিত। দশমীর দিন ঠাঁই ঠাঁই করে এসে পড়ল সাঁওতালদের ‘দাঁশাই’ উৎসব। সেদিন সুনাকে আর পায় কে! মুখে ছাই আর কালিঝুলি মেখে সে ‘সঙের’ সাজছিল, হাতে ‘ভুয়াঙ’ নিয়ে গ্রামের কুলহি রাস্তায় বেরিয়ে পড়ল। ভুয়াঙ—লাউয়ের একরকম বাদ্যযন্ত্র, লম্বাটে লাউয়ের ভিতরের শাঁসটুকু কুরে নিয়ে তার জুড়ে জুড়ে ‘ভুয়াঙ’।
সেই বাজিয়ে আগে আগে হেঁটে চলেছে সুনা, তার পিছনে রাজ্যের কচিকাঁচা। এক একবার ভুয়াঙ বাজে আর সমস্ত কচিকাঁচার দলও সমস্বরে ‘হুরি’ করে— ভুঙ–চুঙ–সারেঙ!
ভুঙ চুঙ সারেঙ! সুনার ভুয়াঙে বোল ওঠে।
ছেলেরাও মুখে বলে, ভুঙ–চুঙ–সারেঙ!
আবার ভুয়াঙ! আবারও ছেলের দল— ভুঙ–চুঙ–সারেঙ!
বাড়ির বউঝিরা সুনার ঝোলায় চালডাল পিঠেপুলি ঢেলে দেয় আর তার ঢং দেখে ঘোমটার আঁচলা দাঁতে কামড়ে হাসে। কে জানে হয়তো তারাও মনে মনে বলে কিনা— ভুঙ–চুঙ–সারেঙ। আমিও কতবার ওই সমস্ত রুন্ডু–উরুন্ডু ছেলেছোকরার সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলে উঠেছি, ভুঙ–চুঙ–সারেঙ!
ঘাড় ঘুরিয়ে আমাকে দেখতে পেয়ে সুনাভাগ্নাই বলে উঠেছে, তরহা কেনে? অর্থাৎ তুমি কেন?
ওইসব রুন্ডু–উরুন্ডু লেখাপড়া না জানা ন্যাঙটাভুটুঙ ছেলের দলে আমি কেন? তার মতে আমার স্থান যে অনেক উচ্চে!
এ পর্যন্ত শুনে করমশাই কেমন অবিশ্বাসের সুরে জিজ্ঞেস করলেন, ভুয়াঙ কীরকম বাজে বললেন?
বললাম, কেন, ভুঙ–চুঙ–সারেঙ—
দু’হাতের দুইটা তর্জনী জড়ো করে নেড়ে নেড়ে যেন মুখস্ত করে করমশাইও বললেন, ভুঙ–চুঙ–সারেঙ!
আমরা দুজনেই হেসে উঠলাম।
পাঁচ
‘দাঁশাই’ যেতে না যেতেই তো এসে পড়ল ‘বাঁধনা পরব’। পরবের মতো পরব। এ সময় খেতভর্তি সবুজ ধান দ্রুত হলুদ হচ্ছিল। ধানের ডগা নত হয়ে আসছিল শিষের ভারে। ধানগাছের গোড়া থেকে জল সরে যাচ্ছিল ক্রমশ। ধানাহুলু মাছ— সে তো কবেই দেবীভাসানের সময় ভেসে গিয়ে এতদিনে নিশ্চিহ্ন। এখন শুধু চ্যাঙ–গোড়ুই, বড়জোর কিছু মাগুর মাছ— হঠাৎ হঠাৎ খলবল করে লাফিয়ে উঠছে। ধানফুলের গুঁড়োয় ধানগাছের গোড়ার জল আর দেখা যাচ্ছে না।
শুরু হল ‘ছঁচ’ দেওয়ার কাজ। ঢালোদিদি মাথায় কাপড় ছেঁড়ার ফেট্টি বেঁধে এবেলা ওবেলা আমাদের মাটির দেওয়ালে ‘ছঁচ’ দিচ্ছিল। ‘ছঁচ’ বা মাটিকামের কাজ শেষ হয়ে গেলে শুরু হবে ছবি আঁকার কাজ। এ বছর দেওয়ালে কী কী ছবি আঁকবে, ঢালোদিদি ‘ছঁচ’ দিতে দিতেই হয়তো মনে মনে ভেবে রাখছিল। তারপর তো সেই জিজ্ঞাসার পুনরাবৃত্তি— কাহার ল্যাখেন দিখাঁইছে বল দেখিন বাবুরা? আমরাও বলব, সোনার ল্যাখেন। সেইমতোই তৈরি হচ্ছি, সব মুখস্ত করছি।
অমাবস্যার দিন সকালবেলা মা বলল, সুনার তো বাঁধনার ছুটি, যা, ওবেলার জন্য কতক বুড়ো ঢ্যাঁড়শ গাছ জোগাড় করে রাখ।
বলা মাত্র আমিও মহা উৎসাহে এর-তার বাগান ঢুঁড়ে বুড়ো ঢ্যাঁড়শ গাছ সংগ্রহে মেতে গেলাম। বর্ষার ঢ্যাঁড়শ গাছ ফল দিতে দিতে এখন সব বুড়ো, রসও কম। তবু রসালো দেখে দা দিয়ে কেটে কতক বুড়ো ঢ্যাঁড়শ গাছ উঠোনে জড়ো করলাম, টুকরো টুকরো করে কেটে শিলনোড়ায় ছেঁচে রস নিঙড়োলাম, রস হল আধ বালতি। কোত্থেকে ন’কাকি দৌড়ে এসে বলল, কতটা হল, কই দেখি? বলেই তার ডান হাতের পাঁচ আঙুল ঢ্যাঁড়শের রসে চুবিয়ে পরীক্ষা করে দেখল কতটা হড়হড়ে হয়েছে, কাজ চলবে কি চলবে না। ঢ্যাঁড়শের রসের সঙ্গে চালের গুঁড়ি মিশিয়ে গোবরলেপা উঠোনে আঁকা হবে আলপনা, আলপনা আঁকবে ন’কাকি নিজে।
পরীক্ষায় আমাকে পুরোপুরি ‘পাস’ করিয়ে ন’কাকি বউদিদের সঙ্গে বসল ‘আঁওলা’ কুটতে। আঁওলা হল একধরনের মূল, জঙ্গলে পাওয়া যায়, ঢালোদিদিই এনে দিয়েছে জঙ্গল থেকে। পটেটো চিপসের মতো কুচি কুচি করে এবেলা কেটে রাখা শুধু— বাকি কাজ তো ওবেলা। রাতের দিকে।
বিকেল হতে না হতেই মা–কাকিমারা ঘরের নাচদুয়ার থেকে গোরুর গোহাল পর্যন্ত গোবর লেপে করে তুলল ঝকঝকে। ন’কাকি এখন ভারী ব্যস্ত, আধ বালতি সেই রসের সঙ্গে চালের গুঁড়ি মিশিয়ে সদ্য গোবরলেপা উঠোনে আলপনা আঁকল। ডান হাতের পাঁচ আঙুল ডুবিয়ে হড়হড়ে গুঁড়িজল ছিটিয়ে আঁকা হল চৌকো চৌকো রম্বস ট্রাপিজিয়ামের মতো আলপনা। আলপনার চৌখুপিতে দেওয়া হল সিঁদুর টিপ, তার উপর রাখা হল গোল গোল গুঁড়ি প্রদীপ, প্রদীপের সঙ্গে হাতে পাকানো কাপাস তুলোর সলতে।
ভিতরের দলিজ থেকে হাঁক পেড়ে মা বলল, তাড়াতাড়ি ঘাস ছড়া খোকা, বেলা যে পড়ে এল, গোরু গোঠে এসে গেল বাবা!
এসব কাজে আমার আগ্রহ ভারী। একছুটে গোহাল থেকে এক আঁটি ঘাস এনে আলপনার উপর গুঁড়ির প্রদীপ বাঁচিয়ে সাবধানে ছড়িয়ে দিলাম। আর একটু বাদেই জ্বেলে দেওয়া হবে প্রদীপগুলো, একে একে আলোয় আলোময় হয়ে যাবে আমাদের ঘর–দুয়ার।
আলপনা এঁকে আঁচলে জলহাত মুছছিল ন’কাকি। বলল, কেমন দেখতে লাগছে রে নলিন?
মুহূর্তে দুষ্টুমি করে হেসে বলে উঠলাম, সোনার ল্যাখেন। ন’কাকিও হেসে কপট রাগ দেখিয়ে আমাকে মারতে এল।
একটু বাদেই গোঠ থেকে ফিরে আলপনার উপর ছড়ানো ঘাস খেতে খেতে গোরুগুলো গোহালে ঢুকল। গোরু ঢুকল আর নাচদুয়ারে জলন্ত প্রদীপগুলোর পাহারায় ঠায় দাঁড়িয়ে থাকলাম আমরা, কেননা এইবার গুঁড়ির প্রদীপ চুরি হবে— এইবার—
গ্রামে–ঘরে যে সমস্ত কুমারী মেয়ের গায়ে ছুলি, তারা এসময় গুঁড়ির প্রদীপ চুরি করে গায়ে মাখলে গায়ে–পিঠের ছুলির দাগ পুরোপুরি সেরে যায়। আমাদের গ্রামের রমনা, তরুবালার গায়ে তো ছুলির দাগের অন্ত নেই!
যে যার নাচদুয়ারে যখন গুঁড়ির প্রদীপ পাহারায় আমরা ভারী ব্যস্ত, কার ঘরের কতগুলো প্রদীপ কত তাড়াতাড়ি নিভল তাই নিয়ে আলোচনা–সমালোচনায় আমরা মুখর, রসনা কি তরুবালা কাদের গুঁড়িপ্রদীপ আজ কীভাবে চুরি করে গায়ে মাখল তাই নিয়ে ঠাট্টা-মশকরায় মত্ত, যখন অমাবস্যার আকাশে একটি-দুটি করে সব তারা ফুটে উঠল—
মা এসে বলল, হেরিকেনটা নিয়ে একটু বুলানে চ খোকা।
‘বুলান’? তার মানে বহন্তি জলের খোঁজ। বললাম, এই সন্ধেবেলা বুলানে কেন মা?
একটা নতুন ঝুড়ি দেখিয়ে মা বলল, আঁওলাগুলো রেখে আসি চ।
সারা দুপুর ধরে পটেটো চিপসের মতো চাকা চাকা করে কাটা হল যে বন আঁওলার মূল— তাই এবার সারারাত ধরে বুলানের বহন্তি জলে ভিজবে, ভিজলে তার তিতকুটে ভাবটা কেটে যাবে, পরের দিন সকালে কাঁচা হোক সিদ্ধ হোক, বাঁওলামূল খাওয়াই আমাদের নিয়ম, খেতে অবশ্য মন্দ লাগে না।
মায়ের সঙ্গে বুলানে গেলাম।
দখিন সোলের সোঁতাভর্তি এখন ধান আর ধান। দূরে দূরে ধানখেতের আলের উপর কি খেতমধ্যে দুটি–একটি মহুল কি ভাদুগাছ। মুনিয়া বারিক কি মোহন কামারের উঠোনে মাদল বাজিয়ে ‘ঢ্যাঙুয়ান’ বা ‘ধেনুয়ান’-এর দলের মহড়া চলছে এখান থেকেই শুনতে পাচ্ছি, আর একটু বাদেই তো ‘গেরু জাগরণে’ এসে পড়বে ঢ্যাঙুয়ানের দল, যে দলে থাকবে সবচেয়ে ‘হাউসি’ আমাদের সুনাভাগ্না।
মাকে তাড়া দিলাম, উঠে এসো মা, উঠে এসো।
মা কেমন যেন অন্যমনস্ক, বুলানের খলবলে জলে পায়ের পাতা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তো আছেই। গ্রামের কুলহি রাস্তায় এখন তালপটকা বিড়িপটকার ধুলমাদুল শব্দ, দু–একটা হাওয়াইবাজি উড়ে এসে বুলানের জলে পড়ল।
মাকে হাত ধরে টেনে তুললাম, ঘরে চলো মা, ঘরে চলো!
‘‘হামরা তো যাতে ছিলি কুলহি ন কুলহি যে বাবু হো
তোরই গিরিহায় ডাকিয়ে ঘুরালো—’’

একটু রাত করে খেয়েদেয়ে শুয়ে পড়েছি আর ‘ঢ্যাঙুয়ানের দল’ মাদল বাজিয়ে আমাদের উঠোনমধ্যে এসে গেল, আমরা ঘরসুদ্ধ সবাই ঘুম থেকে জেগে উঠোনে জড়ো হলাম। তারাভরা অমাবস্যার রাত, একটু শীত শীত ভাব, মেঘপাতালের তারাদের মতো আজ মর্ত্যভূমিতে, অন্তত এ তল্লাটের প্রতিটি গৃহস্থের গোহালঘরে তেলের প্রদীপ জ্বলছে। একটু আগে উঠে গিয়ে আমাদের গোহালঘরেও জ্বলন্ত প্রদীপের সলতেটাকে উসকে দিয়ে এসেছি,। এখন সেই গোহালঘরের দিকেই হাত বাড়িয়ে অবলা লম্বকর্ণ জীবগুলোকে শুনিয়ে শুনিয়েই গান গাইছে ঢ্যাঙুয়ানের দল— আমরা তো কুলহি রাস্তা ধরেই যাচ্ছিলাম, তোরই তো মালিক আমাদের ডেকে আনল…
দলের মধ্যে সবচেয়ে ‘হাউসি’ আমাদের সুনাভাগ্নাও উপস্থিত; সে আচমকা আমাকে কাঁধে তুলে ঘুরে ঘুরে গাইতে লাগল—

‘‘আরে— সবু দিন তো মাগে ভালা ভাটো ভিখারি যে
নলিনবাবু হো—
আজি তো মাগে ধেঙ্গুয়ান—’’

সবদিন তো ভাট–ভিখারিরা ভিক্ষা চায়, আজ ধেঙুয়ানরা চাইছে। ভাত নয়, পয়সাও নয়— পাঁচ-সাত গণ্ডা ‘ছাঁকা’ কি ‘খাপরা পিঠে’ আর এক-আধ বোতল মহুয়ার মদ। গুঁড়িতে গুড় মিশিয়ে তেলে ছেঁকে ‘ছাঁকা পিঠে’ আর ‘খাপরা’ হলো সরা পিঠে। দাবিদাওয়া মিটে গেলে গোরুর গোহাল, গোরুর মালিক, তস্য পরিবার মায় তারাভরা গোটা অমাবস্যার রাতকে জাগিয়ে ‘কুলকুলি মেরে’ ঢ্যাঙুয়ানের দল আবার রাস্তা ধরলে আমিও চুপিসারে হাঁটতে লাগলাম।
অসাবধানে ধরা পড়তেই সুনাভাগ্নার সেই ধমক— তরহা কেনে? অর্থাৎ এইসব রুন্ডু-উরুন্ডু লেখাপড়া না জানা ঢ্যাঙুয়ানের দলে আমি কেন?
অতএব ঘাড় হেঁট করে ফিরে আসি। দোর্দণ্ডপ্রতাপ সুনা সাঁওতালের নিষেধ অমান্য করি আমার সাধ্য কি!
কিন্তু ‘বুঢ়ি বাঁধনা’ বা ভাইফোঁটার দিন কে শোনে কার মানা। বিলজঙ্গল ঢুঁড়ে লম্বা লম্বা বানাঘাস, কুলগাছ দা দিয়ে কেটে আনলাম, আমাদের ঘরের নাচদুয়ারে ‘পইড়ান’ গাড়ব। ‘পইরান’ হল বেনাঘাসের বিনুনি চুলের মতো পাকিয়ে অনেকটা মাটি খুঁড়ে সেই বিনুনির গোড়া পার্শ্ববর্তী কোনও শক্ত গাছের শিকড়ে অথবা অন্য কোনও ভারী জিনিসের সঙ্গে বেঁধে দিতে হয় মাটি চাপা। মাটির উপরে বড়জোর এক হাত কি দেড় হাত, বাকি সব মাটির ভিতর! বিকেলবেলা গোরু খেলিয়ে ফেরার সময় ঢ্যাঙুয়ানের দল গায়ের জোরে ‘পইড়ান’ তুলবে আস্ত। যদি না পারে তো দিতে হবে জরিমানা, আর পারে যদি তো ঢ্যাঙুয়ানদের খাওয়াতে হবে রসেবশে।
কায়দা–কসরত করে পইড়ান পুঁতে তার ডগায় গুঁজে দিলাম লাল গাঁদাফুল। একটা চিরকুটে নিজের নাম লিখে বেঁধেও রাখলাম— ‘অমুকের পইড়ান’। শোনা যাচ্ছে আমাদের গ্রামের জন্মেজয়ের ‘পইড়ান’ এ বছর ‘টপ’। একজন কেন, একশো সুনা সাঁওতালও তাকে টলাতে পারবে না এ বছর। এত লম্বা লম্বা বেনাঘাস পেল কোত্থেকে জন্মেজয়?
বিকেলবেলা ‘গোরু খুঁটানো’ দেখতে গেলাম গোঠটাঁড়ের মাঠে। খুঁটিতে বাঁধা এক একটা বলদ, তাদের কপালে ঝোলানো ধানশিষের ‘পাটিমোড়’, গলায় গাঁদাফুলের মালা, গায়ে নানা রঙের চকরাবকরা। ঝুরঝুরে ধানের শিষগুলো কপাল বেয়ে চোখের উপর এসে পড়লে গোরুগুলো অস্থির হচ্ছিল, বোধকরি চিবুনোর বাসনায় মাঝে মাঝে লম্বা কালচে জিভ বের করে কপালের দিকে ঠেলে দিচ্ছে, কিন্তু নাগাল না পেয়ে আরওই অস্থির হচ্ছিল। একসময় ‘অহিরে’ বলে প্রচণ্ড হাঁক দিয়ে ধুলোর ঝড় তুলে মাদল বাজিয়ে ‘গোরু খেলানো পাটি’ অর্থাৎ সুনা সাঁওতালের দল এসে গেল—
‘‘অহিরে… সবুদিন তো চরাঁই ভালা
বিরি–মুগো খেতে যে বাবু হো
আজি তোরো দেখিব বলিয়ানি—
আজি কারও রণে ভালা হারি যদি যাও গো
তোরো ছালে বরদা খুঁটাবো—’’

দিড়িদাঙ, খেটেতাঙ, দিড়িদাঙ! মাদলের বোল আর মুখে কুলকুলি! দু’হাতে মেলে ধরা গোরুর চামড়া— সুনা সাঁওতাল ঝাঁপিয়ে পড়ল খুঁটোয় বাঁধা বলদটার উপর। বলদটাও শিঙের গুঁতোয় সুনাকে শূন্যে তুলে আছড়ে দিল মাটিতে। মাটিতে পড়ে খানিকটা ইচ্ছে করেই গড়াগড়ি খেল আমাদের সুনাভগ্না, আর তাই দেখে দর্শকদের সে কী হাস্য–পরিহাস! গোটা গোরু খেলানোর মাঠ জুড়ে হাসির হল্লা পড়ে যাবে না? সেও তো দু’দণ্ড, পরক্ষণেই বীরবিক্রমে উঠে পড়ল। সুনার তখন সে কী বলীয়ান চেহারা! চোখ থেকে ঠিকরে পড়ছে আগুন! মুখে যেন বিড়বিড় করে বলছে, মুগ-বিরি-কলাইয়ের খেতে তোকে এতদিন চরিয়েছি, খাইয়েদাইয়ে তোকে বলীয়ান করেছি— আজ তোর তেজ দেখব, যদি আজকের যুদ্ধে তুই হেরে যাস তবে তোর চামড়া দিয়েই গোরু খেলাব।
ধন্য ধন্য পড়ে গেল চারধারে। ধন্য ধন্য আবার পড়ল ‘পইড়ান’ তোলার সময়। গাঁদাফুল গোঁজা আমার পইরান তো কোন ছার, জন্মেজয়ের অত লম্বা ‘পইড়ান’-ও পড় পড় করে তুলে আমাকে ছেড়ে দিয়ে গেল বাসস্ট্যান্ডে। আমিও বাসে চড়ে শহরে এসে গেলাম। আর সেই থেকে তো—
ছয়
তপন করমশাই এতক্ষণ মন দিয়ে শুনছিলেন, শেষ হতেই জিজ্ঞেস করলেন, আর যাননি? আর কখনও দেখা হয়নি সুনার সঙ্গে?
বললাম, যাই বইকি, তবে কালেভদ্রে, আর সুনার সঙ্গেও দেখা হয়।
এখনও সে আপনাদের ‘ভাতুয়া’? এখনও সে লাঙল চষে, ফসল ফলায়, ব্লক অফিসের কম্পিটিশনে ফার্স্ট হয়? এখনও সে তেমনি ভুয়াঙ বাজায়, গোরু খেলায়, আপনাদের পইড়ান না পড়িয়ান তোলে?
বললাম, সেই যেবার চাকরি পেয়ে প্রথম গ্রামে গেলাম, আমাদের বাড়ির দাওয়ায় তখন ঘোর মজলিস—
কথা হচ্ছিল রাশিয়া ও আমেরিকা নিয়ে। কে বড়, কার কত বেশি অস্ত্রশস্ত্র, যুদ্ধ বাঁধলে কে জিতবে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাঁধবে কি? বাঁধলে ভারতের কি কোনও ক্ষতি হবে?
কে যেন পুট করে উত্তর দিল, ক্ষতি হবে বইকি, আলবাত হবে, রাশিয়া আমেরিকা আর কোথায়— ভারতের মধ্যেই তো!
যে বলছিল সে আমাকে দেখে আর একটু জোর পেয়ে গেল, ভাবল— যাক, এতক্ষণে একটা শিক্ষিত লোক পাওয়া গেল। বলল, এই তো আমাদের নলিন এসে গেছে, কত বড় চাকুরিয়া! ওই বলুক না, রাশিয়া, আমেরিকা ভারতের মধ্যে কিনা, রাশিয়ার সঙ্গে আমেরিকার যুদ্ধ বাঁধলে ভারতের ক্ষতি কিনা— হক বলুক তো!
যে বলছিল তাকে চিনি, সে আমাদের জরিলাল, গ্রামের মাথায় থাকে। দলিজে কোথাও মাস্টারদাকে দেখলাম না। থাকলে এর মীমাংসা করে দিত এতক্ষণে। একুল ওকুল দুকুল বজায় রেখেই বললাম, তা বইকি, রাশিয়া, আমেরিকা ভূ-ভারতের মধ্যেই।
বলতে না বলতেই আনন্দে লাফিয়ে উঠেছিল জরিলাল। তাকে থামিয়ে দিল দলিজের মাতব্বররা। বলল, ললিন কথাটা কী বলল আগে খেয়াল কর, ভারত নয়, ভূ–ভারত। আরে ভূ–ভারত মানে তো গোটা পৃথিবী। রাশিয়া, আমেরিকার মধ্যে যুদ্ধ বাঁধলে শুধু ভারত কেন, গোটা পৃথিবীরই তো ক্ষতি!
শোনামাত্র, যতটা আনন্দে লাফিয়ে উঠেছিল, ততোধিক হতাশায় বসে গেল জরিলাল। এসময় গোহালে গোরুকে কুঁড়ো দিচ্ছিল আমাদের সুনাভাগ্না। হাতভর্তি কুঁড়োর গুঁড়ো নিয়ে বেরিয়ে এসে জরিলালের জবুথবু অবস্থা দেখে হেসে ফেলল।
দেখলাম, বেশ বয়স হয়ে গেছে সুনার, পিঙ্গল চুলেও বেশ পাক ধরেছে তার। সদ্য সদ্য জরিলালকে আমার কথার মারপ্যাঁচে হারিয়ে দেওয়ার পাণ্ডিত্য দেখে বোধকরি খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠেছিল সনাতন। হয়তো ভাবছিল, ওইসব রুন্ডু-উরুন্ডু লেখাপড়া না জানা ন্যাঙটানুঙটো ছেলেদের সঙ্গে একদা মিশতে না দিয়ে কাজটা তাহলে ভালোই করেছিল সে। কিন্তু মুখে কিছুই বলল না। কোনওদিনই তেমন বেশি কথা বলত না আমাদের সুনাভাগ্না। একে বর্ষার মাস, ব্যস্ততা ভারি। গোরুকে কুঁড়ো খাইয়েই কোদাল কাঁধে জমিনের দিকে চলে গেল। ফিরল সেই যখন কিয়াঝরিয়ার বালিপোত জমিনের উপর পড়ন্ত রোদের ঝিরিঝিরি খেলা শেষ, মাঠ থেকে বিল থেকে গোরু–ছাগল, গোরুচরানি ছাগলচরানিরাও একে একে উঠে এল।
সন্ধেবেলায় আমাদের বাড়ির দলিজ গল্পেগুজবে কথা-উপকথায় তর্কে-বির্তকে আগের মতোই মুখর। কে বড়— রাশিয়া না আমেরিকা, কে ভালো— চিন না জাপান। পাণ্ডবরা অজ্ঞাতবাসে কোথায় ছিল, ব্রহ্মদেশই কি সেই ব্রহ্মলোক, ভসরাঘাটে সুবর্ণরেখা নদীতে ব্যারেজ হলে জল উপছে পড়বে কি আমাদের গ্রামে— ইত্যাদি কতরকম প্রসঙ্গ। মজে ছিলাম, সম্পূর্ণ মজে ছিলাম। মুহূর্তে চাকুরিস্থল কলকাতা, কফিহাউস, শহুরে বন্ধুবান্ধব সব উধাও।
হঠাৎ কী মনে করে মজলিস ছেড়ে ঘরের ভিতর উঠে গেলাম। সেই অন্ধকার দলিজের এককোণ, নিভু নিভু হেরিকেন, অনাবিষ্কৃত রহস্যে রোমাঞ্চকর সন্ধ্যাকাল, আমাদের সুনাভাগ্না খেতে বসেছে। সেই গামলা, সেই ঘটি, বসবার জায়গাটুকু, খাবার ভঙ্গি এখনও অপরিবর্তিত। না লোক, না লোকালয়— এ যেন স্তূপীকৃত অন্ধকারের বিরলে খাবলা খাবলা গ্রাসাচ্ছাদন। আমাদের সুনাভাগ্না হয়তো জলঢালা ভাত আর হড়হড়ে বিরির ডাল ‘হাপরে’ খাচ্ছে। তাই দেখে আমার এতদিনের অভ্যস্ত হঠাৎ বিচ্ছিন্ন বালখিল্যতা পুনরায় পেয়ে বসল। পাশ দিয়ে যাবার অছিলায় আচমকা ঝুঁকে পড়ে মিচকানো হেরিকেনের পলতেটাকে উসকে বাড়িয়ে দিয়ে এগিয়ে গেলাম। দু’পা যেতে না যেতে হাত বাড়িয়ে সুনা সাঁওতাল আলোর বাহুল্যটুকুকে হেরিকেনের ‘ঘোড়া’ মুচড়ে ছোট, এত ছোট করে ফেলল যে পলতের জায়গায় বিন্দুবৎ একটা আগুনের ‘ফুড়গুনি’ তার নীলচে টিমটিমে আভা নিয়ে কোনওমতে টিকে থাকল।
সাত
করমশাই বললেন, বাঃ, এ তো এস ওয়াজেদ আলীর ‘ভারতবর্ষ’— সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে! আচ্ছা, এ তো গেল আপনার চাকরি পাওয়ার সময়ের কথা। চাকরি পাওয়ার এতদিন পর— শেষ দেখা কবে হয়েছিল সুনার সঙ্গে?
শেষ দেখা? মনে মনে বললাম, তা হয়েছিল বইকি, এই তো সেদিন। কিন্তু সে যে আপনাকে বলবার মতো নয় করমশাই, সে ভারি—
মুখে কিছু না বলে মনে মনে সেদিনের ঘটনাটাকে স্মরণে আনলাম।
জুনের মাঝামাঝি। তখনও বর্ষা নামেনি। বিকেলের স্টিল এক্সপ্রেসে ঝাড়গ্রাম, ঝাড়গ্রামে রাত্রিবাস, পরের দিন ভায়া কুঠিঘাট হয়ে ‘রামেশ্বর’ বাসে চড়ে জীউর মন্দিরে, বলতে কী একেবারে আমাদের গ্রামের নাচদুয়ারে নামলাম। নেমে খানিকটা হেঁটে গ্রামে ঢুকছি আর হুড়মুড় করে বৃষ্টিটাও এসে গেল। কতদিন পরে বৃষ্টি, চাষবাসের কাজ শুরুই হয়নি, গ্রামের চাষিবাসি মানুষ জলের জন্য ‘টিট্টিন্ডা পাখি’-র মতো হাঁ করে চেয়ে আছে। বৃষ্টি আসার সঙ্গে আমাকেও আসতে দেখে গ্রামের লোক মজা করে বলল, আমাদের নলিন খুব পয়া, বৃষ্টি নিয়ে গ্রামে ঢুকল!
বৃষ্টিও খুব হল। বিকেলের দিকে আকাশ কিন্তু ফাঁকা। আমাদের বাড়ির দলিজে বসে আছি, হালজোয়াল কাঁধে গ্রামের চাষিমানুষরা একে একে মাঠের দিকে, জমিনের দিকে যেতে লাগল। বেলা প্রায় মরে এসেছে, তবু যেটুকু আলো আছে এখনও তার মধ্যে যতটুকু মাটি উলটে ফেলা যায়। খুব যে ‘বতর’ লেগেছে! ‘বতর’ মানে বৃষ্টির জলে ভিজে মাটির নরম হওয়া। শক্ত মাটিতে যে সময় হাতুড়ি মেরেও পেরেক ঠোকা যেত না, সে সময় লাঙলের ফাল ঢুকিয়ে দিত যে সুনা সাঁওতাল, আমাদের সুনাভাগ্না, জলে ভেজা ‘বতর’ হওয়া মাটিতে সে এখন কোথায়?
তার কথাই ভাবছি। তবে কি এ দিগরে বরাবর ফার্স্ট হওয়া সনাতন আগেভাগেই হাল দেওয়ার কাজ সেরে রেখেছে?
দলিজে কেউ নেই, একমাত্র জেঠু। জেঠু বসে বসে পায়ের উপর পা জড়িয়ে কোলের উপর হাতদুটো রেখে, মাঝে মাঝে হাতদুটোও জড়িয়ে খুলে ফেলছে। ছেলেমানুষের মতো খুলছে-জড়াচ্ছে। ভাব দেখে মনে হল জেঠু বেশ চিন্তিত।
জেঠুকেই জিজ্ঞেস করলাম, বৃষ্টি ধরতে না ধরতে সবাই তো দেখি হাল জুড়তে মাঠে গেল, আমাদের সুনাভাগ্না এখনও গেল না যে?
সুনার নাম শুনে যেন বিরক্ত হল জেঠু। বলল, সুনার কথা আর বলিস না, গেল অঘ্রানে কুমারডুবি দলায় ধান তুলতে গিয়ে কী করে যে পায়ের তলায় একটা পচা খিল ঢুকিয়ে বসল— আজ পর্যন্ত বিছানা ছেড়ে উঠল না! মনে হয় এ জন্মে আর উঠবে না, জন্মের মতো সুনা পঙ্গু, অক্ষম—
অমন দশাসই চেহারার একটা মানুষ যে কিনা যাত্রার আসরে পার্ট দিলে আসর মাত করে ছাড়ত, পাথরের মতো কঠিন শক্ত মাটিতে লাঙলের ফলা ঢুকিয়ে দিত এক–দেড় হাত, বাঁধনা পরবে গোরু খেলাতে গিয়ে গোরুর ছুঁচোলো শিঙের উপর সশরীরে আছড়ে পড়ত, যত কায়দা করে পোঁতা হোক না কেন পড় পড় করে অনায়াসেই ‘পইড়ান’ তুলে ফেলত যে মানুষটা, সে কিনা আজ পঙ্গু, বিকলাঙ্গ! মনখারাপ করে বাইরের দলিজ ছেড়ে ঘরের ভিতর ঢুকে এলাম। সেই অন্ধকার ভিতর–দলিজের এককোণ— সেখানে এখনও উপুড় করা একটা এনামেলের গামলা, তদুপরি একটা উলটানো ঘটি— কে জানে কতদিন হাতের ছোঁয়া লাগেনি তাতে! কতদিন শোনা যায়নি হেরিকেন কি ডিবরির নিভু নিভু আলোয় ডাল–হাঁপরানির শব্দ, কতদিন বাড়ির বালখিল্যদের ভিতর বড়দের দেখাদেখি চর্চিত হয়নি আলোর পলতে উসকানো–মিচকানোর ধারাবাহিক ইতিহাস— পাশ দিয়ে যেতে আসতে এখনও হাত নিশপিশ করে না!
ছটফট করছিলাম কখন সুনার কাছে যাব। সন্ধেবেলায় একফাঁকে বেরিয়ে পড়লাম। বেশি দূরে নয়, আমাদের গ্রাম ডাঙাসাহির মাঝখানে মস্ত বাঁশবনের ভিতর সনাতন টুডু আর পিথো মুর্মুর বাড়ি।
সুনাভাগ্নার ঘরে পৌঁছতে অচেনা লোক দেখে আচমকা একটা ‘ঘুসুর’ উঁচু পিঁড়া থেকে লাফ দিয়ে নেমে ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে ছুটে পালাল অন্ধকার বাঁশবনের দিকে। পিঁড়ায় উঠে বাঁশের আগড় ঠেলে হাঁক দিয়ে ভিতরে ঢুকলাম। একটা ডিবরি জ্বলছিল। জ্বলছিল কী, সেও নিভু নিভু! পলতের জায়গায় বিন্দুবৎ সেই আগুনের ফুড়গুনি আর তার নীলচে আভাটুকু। সে আভায় কোনও কিছু স্পষ্ট নয়, সব যেন সেই অস্ফুট অনাবিষ্কৃত রহস্যে রোমাঞ্চকর! দেখামাত্র এ পক্ষের এতদিনের অভ্যস্ত হাত মুহূর্তে ডিবরির ‘ঘোড়া’ ঘুরিয়ে পলতেটাকে উসকে বড় করে দিল, ও পক্ষের চিরকেলে রপ্ত হাতও আলোটাকে তন্মুহূর্তে মিচকানোর উদ্দেশ্যে চকিতে নেমে এসেছিল বটে, তবে কী ভেবে এতদিন বাদে যেন এই প্রথম থমকে গুটিয়ে নিল।
ডিবরির অপেক্ষাকৃত উজ্জ্বল আলোয় দেখলাম, খাটিয়ায় আধশোওয়া আমাদের সুনাভাগ্না, তার আহত ডান পা-টা ফুলে ঢোল হয়ে আছে এখনও, তাকে বেড় দিয়ে ঝুলছে কালো চুলের দড়িতে বাঁধা একটা বাদভেলার বীজ।
কে যেন পায়ের দিকটায় বসে এতক্ষণ ‘পাতিক্ষুর’ দিয়ে ঘায়ের মামড়ি চাঁছছিল। হইহই করে বলে উঠলাম, ব্লেড দিয়ে ও কী করছ— কোথায় টিটেনাস-ফিটেনাস হবে? বলেই মনে হল, এরা কি টিটেনাস-ফিটেনাস বুঝবে? বুঝুক আর না বুঝুক, পাতিক্ষুর হাতে লোকটা তো অন্ধকারে আড়াল হয়ে গেল কোথাও। বলতে কি একেবারে রুগ্‌ন হয়ে গেছে আমাদের সুনাভাগ্না। মাথার ঝাঁকড়া কাঁচাপাকা পিঙ্গল চুলগুলোও আর নেই, ঝরে গেছে প্রায় সব। দেখে বড় মায়া হল, বড়ই মমতা। একথা সেকথার পরে দুম করে বলে বসলাম, বাকি জীবনটার জন্য তুমি আমাদের বাড়িতে খোরপোষ দাবি করো সুনাভাগ্না।
বলামাত্র কেমন যেন হয়ে গেল সে। তার ঠোঁটদুটো থরথর করে নড়ে উঠল, চোখের কোণ বেয়ে দু’ফোঁটা জলও বুঝিবা গড়িয়ে পড়ল। বিড়বিড় করে যেন বলল, এতদিন তুমাদের পালপোষ করে এসেছি, আজ তুমরা আমাকে খরপুষের লোভ দেখাচ্ছ! বলছ কী, তুমাদের কাছে খরপুষের দাবি তুলতে? অ্যাঁ, দাবিদার?
হতচকিত আমি, এর উত্তরে কী বলব কিছুই ভেবে পাচ্ছি না। বিমূঢ় হয়ে কিছুক্ষণ ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছি। বলতে কী, ভয়ই করছিল আমার, কে জানে হয়তো ছোটবেলার মতো এক্ষুনি ধমক দিয়ে বলে উঠবে— তরহা কেনে? ওইসব রুন্ডু-উরুন্ডুদের ভিতর আমি কেন?
খানিক চুপ থেকে তাই আমি অন্য কথা পাড়লাম। দাঁশাই পরবে ভুঙ–চুঙ–সারেঙ, সেই ভুয়াও বাজানো, সারা দিনমান ‘কেঁদরার ছো’ দেখানো, বাঁধনা পরবে গোরু খেলানো— একে একে কত প্রসঙ্গই তো তুললাম! কোনও কিছুই জমল না, কেমন যেন ছেঁড়াখোঁড়া ভাঙ–ভুড়রু ভাব।
অগত্যা উঠে পড়লাম। কিছুদূর এসে আচমকা মনে হল, দেখি তো উসকানো ডিবরির পলতেটাকে মিচকিয়ে আবার ছোট করে দিল কিনা আমাদের সুনাভাগ্না! আতাঝোপ, বাঁশঝাড়, ঝিঙা–ধুঁধুলের লতাপাতার ভিতর দিয়ে কোনওকিছুই স্পষ্ট দেখা গেল না।
চোখ বুজে, তদগত হয়ে সেদিনকার সেই ঘটনার কথাই এতক্ষণ ভাবছিলাম। চোখ খুলে দেখি, তপন করমশাই জিজ্ঞাসু চোখে আমার দিকেই চেয়ে আছেন।
ও হ্যাঁ, শেষ দেখা? বললাম, তা হয়েছিল বইকি, এই তো সেদিন। কিন্তু সে আজ থাক তপনবাবু, আরেকদিন হবে।
তপন করমশাই গম্ভীর হয়ে বললেন, আপনার ‘ভুঙ–চুঙ–সারেঙ’-এর মানে কিন্তু আমি পেয়ে গেছি।
কী?
ভুঙ–চুঙ–সারেঙ! ভুলচুক সেরে নাও। হাসতে হাসতে করমশাই বললেন, আমাদের যা কিছু ভুলচুক, ধীরে ধীরে সব শুধরে নিতে হবে ‘ললিনবাবু’।
হতে পারে, সে হতে পারে। বলে আমিও হাসতে যাচ্ছিলাম, কেমন যেন থমকে থেমে গেলাম। কথাটার মানে কী করলেন তপনবাবু? কী যেন? ভারি অদ্ভুত তো!

চিত্রকর : শুভ্রনীল ঘোষ